চন্দ্রবাড়ির সিংহবাহিনীর পুজোয় সকাল থেকে আজ ঢাকের বাদ্যিতে মনখারাপের বোল, “ঠাকুর থাকবে কতক্ষণ, ঠাকুর যাবে বিসর্জন।”
বর্ষীয়ান পুরুতমশাই ধরা গলায় বিসর্জনের মন্ত্রপাঠ করছেন আর ধুতির খুঁটে চোখ মুছছেন।
“ওঁ গচ্ছ গচ্ছ পরমস্থানং স্বস্থানং দেবী চণ্ডিকে।
ব্রজস্রোতা জলে বৃদ্ধৈ তিষ্ঠ গেহে চ ভূতলে।।
ওঁ দুর্গে দেবী জগন্মাতঃ স্বস্থানং গচ্ছ পূজিতে।
সম্বৎসরে ব্যতীত তু পুনরাগমনায় চ।।”
কান্না বড় ছোঁয়াচে রোগ। দেখা গেল ঠাকুরদালানে চন্দ্রদের বড় গিন্নির ফাঁদি নথের ফাঁক দিয়ে জলের ধারা নামছে। মেজবৌ গায়ত্রীও ঘন ঘন শাড়ির আঁচলে চোখ মুছছে। বড়খুকি, ছোটখুকি নাক টানছে। নব পরিণীতা ছোট বৌ কাকলির এবছর শ্বশুরবাড়ির পুজোয় প্রথম যোগদান। সে বেচারী হতভম্ব। তাঁর কান্না পাচ্ছে না, — কি হল রে বাবা, সবাই এত কান্নাকাটি করছে কেন?
বাড়ির সেজছেলেটি দর্শনের অধ্যাপক। সে বিসর্জনের মন্ত্রের ব্যাখ্যা করছে তার সুদূর ক্যালিফোর্নিয়া থেকে আসা মার্কিনি বন্ধু রিচার্ডসনকে ।
— হে দেবী চণ্ডিকা, হে দেবী দুর্গা, তুমি পরম ক্ষমাশীলা। আমার অশেষ অজ্ঞানতার জন্য আমায় ক্ষমা করো। আমার ত্রুটিযুক্ত পূজা ও আরাধনায় ক্ষুব্ধ না হয়ে আমায় বাঞ্ছিত ফল প্রদান করো, হে অম্বিকে। দশমী তিথি আগত, ভারাক্রান্ত হৃদয়ে তোমায় বিদায় জানাচ্ছি। তুমি গাত্রোত্থান করো। গমন করো তথায়, যথায় পরম শিব বিরাজিত। বৎসরান্তে পুনরায় সপরিবারে এসো মা। তুমি আনন্দময়ী, তোমার আগমনে যেন দিকে দিকে আবার আনন্দবার্তা ঘোষিত হয়।
রিচার্ডসন একথা শুনে ঘন ঘন মাথা নাড়ছে বটে, তবে সে এ কথার কতটা মর্মোদ্ধার করতে পারছে, সে কথা বোঝা ভার।
এদিকে ভার হয়ে রয়েছে আকাশের মুখ। যেন মায়ের আসন্ন বিদায় বেদনায় বিষণ্ণ, থমথমে। পুজোবাড়ির পরিবেশ নবমীর রাত থেকেই বিষাদঘন হয়ে আছে। সেজ বৌ শিবানী কাল ঝগড়াঝাঁটি করে, কেঁদেকেটে বাপেরবাড়ি চলে গেছে।
ব্যাপারটা আর কিছুই নয়, বড়খুকি দোষের মধ্যে তাকে বলেছিল, “অমন পটের বিবির মত সেজেগুজে বসে থেকোনা সেজ বৌদি। অন্য বৌদিদিদের সঙ্গে পুজোর কাজে একটু হাত লাগাতেও তো পারো!” ব্যস যায় কোথায়! সে ধনীর দুলালী, তায় বাপমার একমাত্র সন্তান! সেই যে রাগ করে, ছেলের নড়া ধরে বাপের ঘরে চলে গেল শিবানী, তারপর থেকে তার আর কোনো খবর নেই।
সেজবৌ অভিমান করে চলে গেলেও তিনশো বছরের পুরনো পুজোর কাজ তো থেমে থাকে না। দীর্ঘদিনের সিংহবাহিনীর প্রধান সেবায়েত পুরোহিত কেদার চাটুজ্জে বড়ই নিয়মনিষ্ঠ, সময়নিষ্ঠও বটে। তাঁর আদেশে পুজোর নিয়মের, সময়ের একচুল এদিক-ওদিক হবার যো নেই।
তিনি বাকি মন্ত্রপাঠ করতে করতে গ্রন্থি কেটে, ঘট নড়িয়ে দিলেন। অপরাজিতা পুজো করে, দর্পণে মায়ের প্রতীকী বিসর্জন হল। তারপর আমের পল্লব দিয়ে পরিবারের সবার মাথায় শান্তিজল ছেটালেন। বড় বৌ কৃষ্ণা পেতলের থালায় মায়ের আশীর্বাদী মহা অর্ঘ্য, চাঁদমালা মাথায় ঠেকিয়ে ঠাকুরঘরে এনে তুললেন। সামনে গঙ্গাজলের ছড়া দিল মেজ বৌ। পেছনে শাঁখ বাজাতে বাজাতে চলল বড়খুকি। উলু দিল অন্য বৌ-ঝিয়েরা।
কাজ এখনো অনেক বাকি। চিঁড়ে, দই, কলা, বাতাসা, ডাবের জল দিয়ে দধিকর্মা মেখে বাড়ির ছেলেবুড়ো, ঝি-চাকর সবাইকে সে প্রসাদ বিলি করা। পুজোর সব বাসন ধোওয়া মোছা করে, হিসেব মিলিয়ে বড় সিন্দুকে তোলার পালা। কত্তাদের জন্যে সিদ্ধির শরবত বানানো। মাকে বরণের বরণডালায় সিঁদূর-আলতা-কাজললতা, প্রদীপ, সশীষ ডাব, ধানদুব্বো, পান গুছিয়ে রাখা। পানের খিলি, সন্দেশ সব থালায় সাজিয়ে রাখতে না রাখতেই আলতাদিদি এসে হাজির। তার কাছে আলতা পরে তাকে প্রসাদ, পুজোর পার্ব্বণী দিয়ে বিদায় দেওয়া হল।
ইতিমধ্যে আকাশ আরো ঘনিয়ে এসেছে। বাড়ির সবার মনে আশঙ্কা বাড়ছে। আজ ভালোয় ভালোয় বিসর্জনের পর্ব মিটলে হয়!
— খাওয়া দাওয়ার পাট আজ তাড়াতাড়ি চুকিয়ে ফেলো। আকাশের অবস্থা ভালো নয়।
বড় কর্তা রমেশ চন্দ্র হুকুম দিলেন।
হুকুম দিলেই তো হল না, বনেদী বাড়ির দশমীর দ্বিপ্রাহরিক ভোজনের ঘটাও তো কিছু কম নয়! শাকভাজা, শুক্তো, ডাল, পাঁচভাজা, রুই মাছের কালিয়া, ইলিশের সর্ষেবাটা, বাসন্তী পোলাও, চাটনী, পায়েস এতকিছু এলাহী খাওয়াদাওয়ার পাট চুকতে না চুকতে বরণ করার সময় এসে গেল। এদিকে আকাশ তখন গজরাচ্ছে। বাতাস বাড়াচ্ছে তার বেগ। অশনি হানছে মুহুর্মুহু। তার শব্দে কান পাতা দায়!
খানিকটা শঙ্কিত হয়েই গা’ধুয়ে, চুল বেঁধে, লালপেড়ে শাড়ি পরে, মুখে পান দিয়ে চন্দ্রদের বড়বৌ মা দুগ্গাকে বরণ করতে এলেন। তাঁর বারবার কেন মনে হতে লাগল, — বচ্ছরকার দিনে সেজবৌ এমনভাবে রাগ করে বাড়ি ছেড়ে চলে গেল, সে কি ভালো হল?
মনের কথা মনে রেখেই কর্তব্য সারলো সে। প্রথমে গঙ্গাজলে বিশুদ্ধ করে, একে একে ধানদুব্বো, প্রদীপের আগুনের তাপ মায়ের শরীরে দিয়ে, মায়ের কপালে তিনবার ডাবের শিষ ঠেকিয়ে, মায়ের কপালে সিঁদূর পরিয়ে, মুখে সন্দেশ দিয়ে, হাতে পানের খিলি দিয়ে, মায়ের কানে ‘আবার এসো মা’ বলে যখন বরণপর্ব শেষ হল, তখন ঠাকুরদালানের বাইরের চাতাল অবিশ্রান্ত ধারায় ভেসে যাচ্ছে। অকালের এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিজলি গেল উড়ে। অন্ধকারে চিরাচরিত সিঁদূরখেলার উৎসাহে ভাঁটা পড়ল সবার। দেবীর বিসর্জনের আগেই আঁধার এল নেমে। এক লহমায় ম্রিয়মাণ হয়ে গেল জমজমাটি পুজোবাড়ির পরিবেশ।
মা’কে কাঁধে করে যে সব বেহারারা গঙ্গারঘাটে নিয়ে যায়, তাদেরও দেখা নেই। এই জলঝড়ে তারা আসবেই বা কি করে? তাহলে কি আজ বিসর্জন হবে না? তিনশ বছরের পুজোয় এমনটা কখনো হয়েছে বলে শোনা যায় নি। বাড়ির কর্তাদের মুখেচোখে আশঙ্কা। মেয়েমহলে অমঙ্গলের ভাবনা। অন্ধকারে বসে পরিবারের জল্পনাকল্পনা যখন তুঙ্গে, সেইসময় চন্দ্রদের বাড়ির সদর দরজায় সজোরে কড়া নাড়ার আওয়াজ।
— কে এলো রে বাবা, এই বৃষ্টি মাথায় করে?
দরজা খুলতেই দেখা গেল চারটে মুষকো মত ষণ্ডাগুণ্ডা লোক।
— কোত্থেকে এলে তোমরা? কে পাঠালে?
উত্তর এল,
— শিবানীদিদিমণি পাঠিয়েছেন।
— কেন?
— মা’কে কাঁধে করে গঙ্গার ঘাটে নিয়ে যেতে হবে না?
— কিন্তু তোমরা পারবে? তোমরা তো এ’কাজ করোনি কখনো। এ’কাজে আমাদের বাঁধা লোক আছে, তারা এই দুর্যোগে আসতে পারে নি।
— ঠিক পারবো কর্তা।
চারটে লোক এমন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে মাথা নাড়ল, এই দুর্যোগে এমন অকূলের কূল হয়ে দেখা দিল যে তাদের ওপর বিশ্বাস করা ছাড়া উপায় ছিল না। এদিকে শিবানীদিদিমণির স্বামী, বাড়ির সেজবাবুকে জিজ্ঞেস করেও লোকগুলোর ব্যাপারে সঠিক খোঁজ পাওয়া গেল না।
বাড়ির সেজবাবু দর্শনের অধ্যাপকটি গম্ভীরভাবে বললেন, — আমার শ্বশুরবাড়িতে মেলা চাকরবাকর। সবার কি মুখ চিনে আমি বসে আছি?
মোবাইল যুগ তখনো শুরু হয়নি, তাই সেজবৌকে ফোন করে নিশ্চিন্ত হওয়াও গেল না। তবে অভিমানী, অপরিণামদর্শী সেজবৌয়ের হঠাৎ এমন দায়িত্ববোধের পরিচয় পেয়ে সবাই একটু আশ্চর্য হল বইকি!
চারটে স্বাস্থ্যবান লোক ততক্ষণে অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্রতায় দড়িদড়া, বাঁশ দিয়ে একচালার সিংহবাহিনীর পুরো পরিবারকে শক্ত করে বেঁধে ফেলেছে। দুর্যোগ প্রায় অনেকটা কেটে গেছে। বৃষ্টি গেছে ধরে। যদিও বিজলী সদয় হয় নি। হ্যারিকেন আর টর্চের আলোয় বড় বৌ কৃষ্ণা যেন দেখলো মায়ের ঠোঁটে এক চিলতে হাসি আর চোখের কোণে চিকচিক করছে জল। পতিগৃহে যাবার আনন্দে মা কি এতই খুশি?
সকালের মন্তরেই মাকে বিদায় জানিয়ে শিবের কাছে ফিরে যেতে বলেছেন পুরুত মশাই। তাই সে মেয়ে কেমন করে থাকে বাপের ঘরে? বিবাহিত মেয়ে বেশিদিন বাপের ঘরে থাকলে যে তার আদর কমে যায়! তাই দুর্যোগ বুঝি কেটে গেল। নিশ্চিন্তে মেয়ে চললেন পতিগৃহে। সব দুশ্চিন্তা, দুর্ভাবনার অবসান হল।
দেবী বিসর্জনের পর সবাই ব্যস্ত হয়ে গেল প্রণাম, মিষ্টিমুখ, কোলাকুলিতে।
কিছুক্ষণ পরে সবার টনক নড়ল।
— ওমা ঐ চারটে মুশকো লোক কোথায় উধাও হল? ওরা পয়সা নিল না। বিসর্জনের পর একটু মিষ্টিজল খেল না! গেল কোথায় সব!
পরের দিন শিবানীদিদিমণি গোঁসাত্যাগ করে শ্বশুরবাড়িতে আবার সেজবৌ হয়ে ফিরে এলেন। নাছদরজা দিয়ে ঢুকে প্রথমেই বড়জায়ের সঙ্গে দেখা। তাঁর পা ছুঁয়ে প্রণাম করতেই তিনি ছোটজায়ের চিবুক ধরে আদর করে বললেন, — ভাগ্যি সেজ তুই লোক পাঠিয়ে ছিলি! তাইতো মায়ের বিসর্জন ঐ দুর্যোগেও নির্বিঘ্নে হতে পারল। আমি জানি তো, সেজ আমাদের তেমন বৌ নয়! আমি তো সকলকে বললাম, ওর যথেষ্ট কর্তব্যজ্ঞান আছে। খালি একটু অভিমানী!
সেজবৌ শিবানী চোখ কপালে তুলে বলল, — কি যে সব বলো বড়দি? কত্তাদের সঙ্গে তুমিও সিদ্ধি খেয়েছ নাকি!
আমি আবার কোথায়, কবে, কি জন্যে লোক পাঠাব? আমার বলে গা গতরে কাল কি যন্তন্না! বিনি আমার অনেকক্ষণ হাতপা, মাথা টিপল। আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। রাতে মা ডাকাডাকি করে চারটে লুচি খাওয়াল, তারপর আবার ঘুম।
তোমার ঠাকুরপো তো কাল শ্বশুরবাড়ি বাড়ি যায় নি। এখেনেই ছিল। তাই তোমাদের এখানে কি হল, না হল সে খপর আমি পাইও নি। তুমি জানোই তো আমাকে, সেসব খপরে আমার দরকার কিসের বাপু!
একথা বলে মল ঝমঝমিয়ে সেজবৌ সামনের দিকে হাঁটা দিলে। বড়বৌ গালে হাত দিয়ে মেঝেতে ধপাস করে বসে পড়লেন। তাঁর মাথা ঘুরছে!