ছাতিমের মাতাল করা সুগন্ধ আর কোজাগরী চাঁদের মায়ায় কবির ভাবনা এলোমেলো হয়।
শারদ পূর্ণিমার ষোলোকলায় পরিপূর্ণ চাঁদকে রুপোর বাটিতে ক্ষীর নিবেদন করে বিমলা, কমলা, সুনীতারা। সারারাত ধরে সেই জ্যোৎস্নামাখা ক্ষীর সকালে প্রসাদ হয়ে যায়। তাতে মিশে যায় চাঁদের অমৃতকিরণ। হিন্দি বলয়ের মানুষ বিশ্বাস করে সে অমৃতময় ক্ষীর শরীরের রোগবালাই দূর করবে।
আমরা সাদা পেঁচার পিঠে চাপা মা লক্ষ্মীকে তাঁর চরণচিহ্ন এঁকে আল্পনা দিই। ধান ছড়িয়ে তাঁর আসন পাতি। কলার পেটোয় সপ্ততরী সাজাই। সারারাত তাঁর আহবানে আলো জ্বালি। দুয়ার খুলে রাখি। তিনি যাতে বিরূপ না হয়ে ফিরে যান।

আমার এক বৌদ্ধ বান্ধবী জানিয়েছিল, তারা ত্রৈমাসিক বর্ষাব্রতের শেষে প্রবারণা উৎসবের আয়োজন করে। বুদ্ধপূর্ণিমার পর এটি তাদের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব। বৌদ্ধবিহারগুলি আজ নবসাজে সজ্জিত হয়।
ভগবান বুদ্ধ জন্ম থেকেই জড়িয়ে আছেন পূর্ণিমার শুভ্রতায়। গৌতম বুদ্ধ বুদ্ধত্ব লাভের পর আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে আশ্বিনী পূর্ণিমা পর্যন্ত তিন মাস ধ্যানরত ছিলেন। আজকের তিথিতে ধ্যান শেষে তিনি প্রবারণা উৎসবের সূচনা করেছিলেন। কথিত আছে এই তিথিতে গৌতম বুদ্ধ ৬০ জন প্রশিক্ষিত শিষ্যকে ধর্ম প্রচারণার জন্য বিভিন্ন স্থানে প্রেরণ করেন। তিনি তাঁদের বলেছিলেন, “তোমরা বহুজনের হিতের জন্য, বহুজনের সুখের জন্য চারিদিক ছড়িয়ে পড়।”

আষাঢ় মাসের পূর্ণিমা থেকে আশ্বিন মাসের পূর্ণিমা পর্যন্ত বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা বর্ষাব্রত পালন করেন। এই সময় তাঁরা বিহারে অবস্থান এবং জ্ঞানচর্চা করেন। এই সাধনার সময় নানা ধরনের ভুলভ্রান্তি হতে পারে। তাই এই ব্রত শেষে তারা আশ্বিনী পূর্ণিমায় প্রবারণা করে থাকেন। প্রবারণায় তাঁরা জ্ঞাত বা অজ্ঞাত সকল ভুলের সংশোধনের জন্য প্রধান ভিক্ষুর কাছে আসেন। এই সময় জ্যেষ্ঠ ভিক্ষুরাও নবীনদের কাছে তাদের ভুলের কথা জানান। এজন্য একে বলা হয় ভিক্ষুদের আত্মসমর্পন ও আত্মনিবেদনের অনুষ্ঠান। এই অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে বৌদ্ধরা প্রবারণা উৎসব করে থাকেন। গৃহী মানুষরা ভিক্ষুদের চীবর দান করেন।
প্রবারণা হলো অশুভকে বর্জন করে সত্য এবং সুন্দরকে বরণের দিন। প্রবারণা পারস্পরিক মিলন উৎসবও বটে। পূর্বকৃত সব ত্রুটি-বিচ্যুতি ক্ষমা করে পারস্পরিক মিলন ঘটে প্রবারণার মাধ্যমে। গতকাল তাঁরা আকাশে ফানুস উড়িয়েছিলেন, যাতে সমস্ত পাপ মুক্ত হয়ে যায়।

আমরাও দুদিন আগে লক্ষ্মীর প্রসাদ গ্রহণ করে পৃথিবীতে ধনধান্যের সমৃদ্ধি চেয়েছি। চাঁদের কিরণমাখা ক্ষীরের প্রসাদে তৃপ্ত হয়েছি।
মধুরঙা চাঁদের জ্যোৎস্নায় এখনো ডুবে কার্তিকের রাত। তিথির পরে তিথির ঘাটে উৎসবের পালা চলতেই থাকবে। আমরা এই প্রবারণা উৎসবের রেশ নিয়ে পূর্ণচাঁদের আলোয় দাঁড়িয়ে আত্মশুদ্ধি চাইব। কবি শ্রীজাতর কথায় বলব, বাড়ন্ত এই জ্যোৎস্না বরং ভাগ করে দাও সবার ছাদে।