এই মুহূর্তে বিশ্বনাট্য ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা রবীন্দ্রনাথের “রক্তকরবী”র শতবর্ষ। বহুবার পরিমার্জনা, সম্পাদনা করে প্রথম লেখাটি সম্পূর্ণ হয় ১৯২৩ সালে। নাটকটি যখন গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়, তখন জয় গোপাল ব্যানার্জি লিখেছিলেন, এই নাটকের মধ্য দিয়েই একটা রাজনৈতিক উত্থান হতে পারে আজ।
যদিও রবীন্দ্রনাথ জীবৎকালীন এই নাটকটির সফল মঞ্চায়ন দেখে যেতে পারেননি। বরং একটি প্রয়াসে তাঁকে সভাপতি করে সম্মানিত করা হয়েছিল। তাঁর অভিভাষণ এর একটি উদ্ধৃতির উল্লেখ করলে বোঝাযাবে, নাটকটির প্রযোজনা বিষয়ে তিনি কতোটা সংবেদনশীল ছিলেন। “আজ আপনাদের বারোয়ারী সভায় ‘নন্দিনী’ পালা অভিনয়। প্রায় কখনো ডাক পড়ে না। এবারে কৌতুহল হয়েছে। ভয় হচ্ছে পালা সাঙ্গ হলে ভিখ মিলবে না, কুত্তা লেলিয়ে দেবেন। তারা পালাটিকে ছিঁড়ে কুটিকুটি করার চেষ্টা করবে। এক ভরসা কোথাও দন্তস্ফুট করতে পারবে না। আপনারা প্রবীণ। চশমা বাগিয়ে পালাটার ভিতর থেকে একটা গূড় অর্থ বের করবার চেষ্টা করবেন। আমার নিবেদন, যেটা গূঢ় তাকে প্রকাশ্য করলেই তার সার্থকতা চলে যায়। হৃদপিণ্ডটা পাঁজরের আড়ালে থেকেই কাজ করে। তাকে বের করে তার কার্যপ্রণালি তদারক করতে গেলে কাজ বন্ধ হয়ে যায়।”
এরপর তাঁর অসাধারণ ব্যাখ্যা “রক্তকরবী” বিশ্বভারতী সঙ্কলনে পেয়ে যাবেন। ১৯৫৪ সালে ১০ মে শ্রী শম্ভু মিত্র মিত্রের নির্দেশনায় তাঁর দল ‘বহুরূপী’-ই প্রথম সমস্ত দর্শক ও বিদগ্ধ মানুষজনকে বিস্মিত করে যেভাবে ‘রক্তকরবী’-র অসাধারণ মঞ্চায়ণ করলেন আপামর মানুষ বিস্ময়ে বিমুগ্ধ হলেন। তবুও তা নিরঙ্কুশ নয়। বিশ্বভারতীর কিছু পান্ডা পিছনে পড়ে গেলেন। কিন্তু দর্শকের অভিনন্দনের তোড়ে বানের জলের মতো ভেসে গেল সেই সব অভিযোগ। এই বিষয়ে শ্রী অশোক মজুমদারের একটি উদ্ধৃতি এখানে বিশেষভাবে প্রণিধান যোগ্য।

“অথচ রবীন্দ্র রচনা নিয়ে যথেচ্ছাচার করতে কায়েমি স্বার্থের দুঃসাহসের অন্ত নেই। এতটুকু লজ্জা, এতটুকু গ্লানিবোধ করতেও তাদের দেখিনা। কিন্তু পরম শ্রদ্ধায় হাজার হাজার দর্শকের সামনে বারবার ক্ষমতার প্রমাণ যাঁরা দিয়েছেন সেখানে পাহারাদারদের দন্ড উদ্যত। এক এক সময় মনে হয় রবীন্দ্রনাথ কি নিজের পরিণামের কথা চিন্তা করেই “রক্তকরবী” লিখে গেছেন। তাঁর সৈন্যরা আজ তাঁকেই মানছে না! তাঁর সৃষ্টি যে মাত্র কয়েকজন সর্দারের হাতে জালের আড়ালে বন্দি হতে বসেছে — তার প্রতিকার কি?”
“রক্তকরবী” প্রসঙ্গে এই নাটকের প্রথম সফল ও কিম্বদন্তী রূপকার শ্রী শম্ভু মিত্র বলেছেন, “আমোদপ্রমোদ জগতের যাঁরা কর্ণধার তাঁরা সর্বদা যৌনমোহের কথা বলে থাকেন, এবং বলে থাকেন যে রবীন্দ্রনাথের লেখা কেবল বুদ্ধিজীবীদের জন্য এবং জনচিত্তে নাকি তাতে আলোড়ন সৃষ্টি করে না। আমরা মনে করেছিলাম যে রবীন্দ্রনাথের ক্ষমতা সমুদ্রের মতো বিরাট, তাতে আপামর জনসাধারণের চিত্ত আলোড়িত হতে বাধ্য।”
আমার বিপুল সৌভাগ্য শ্রী শম্ভু মিত্রের জীবনের শেষ ২৬ বছর আমি অত্যন্ত ঘনিষ্ট সংসর্গ করেছি। একটি কথা তিনি প্রায়ই বলতেন, থিয়েটার একান্তভাবে সাম্প্রতিক। সমকালীন মানুষেরা মঞ্চের এপারে ওপারে থাকে। সেজন্য আঙ্গিক ও প্রকাশের ভাব ও ভাষাও হতে হবে সাম্প্রতিক। পুরনো কোনও সফল চাবিকাঠিতে দর্শকের মনের দরজা খুলবে না। এই কথাগুলি ছিল আমার কাছে এক মস্তবড় অভিজ্ঞান।

তবে যে বিশ্বাস ও ক্ষমতা নিয়ে শ্রী শম্ভু মিত্র “রক্তকরবী”-র মতো একটি নাটক কে প্রতিকী থেকে রক্তমাংসে জ্যান্ত করেছিলেন — সেটি একটি বিরল প্রতিভা ছাড়া সম্ভব হতো না। আমার পাথেয় ছিল, রবীন্দ্রনাথ সামগ্রিক ভাবে আমার অত্যন্ত প্রিয় শুধু নয়, বহু চর্চিত। আর সবচেয়ে বড়ো ইন্ধন পেয়েছি শম্ভুদার (মিত্র) কাছে। তাই প্রথম যেবার “রক্তকরবী” মঞ্চস্থ করি আমন্ত্রিত নির্দেশক হয়ে ‘পূর্ব পশ্চিম’ নাট্যদলে ২০১১ এবং ‘সন্দর্ভে’ ২০১৬ সালে, দুবারই অসম্ভব জনপ্রিয় হয়েছিল দর্শকের কাছে। অন্তত এই দুবারে ২৪৬টি শো হয়, ভারতের নানা প্রান্তে।
এবার ” রক্তকরবী”-র শতবর্ষে আমরা আবার এই প্রযোজনাটি মঞ্চস্থ করেছি। তবে সময় কাল অনুযায়ী এবারের গুরুত্ব অসীম। তাই আরও বেশি সতর্ক হয়ে আমরা কাজটা শুরু করেছি। এখনো পর্যন্ত দুটি শো হয়েছে। বিপুল সাড়া পেয়েছি আপামর দর্শকের কাছে, যা আমাদের অসম্ভব অনুপ্রাণিত করেছে। তবে একটি কথা বলা এক্ষেত্রে অবশ্য প্রয়োজনীয়। শ্রী শম্ভু মিত্র পথ না দেখালে আমাদের পক্ষে অসম্ভব ছিল এই প্রযোজনা মঞ্চস্থ করা।
কবি শঙ্খ ঘোষের কথা দিয়েই শুরু করা যাক। ‘যেমন প্রমথ নাথ বিশি একবার লিখেছিলেন, (যাঁর অনেক দিন রবীন্দ্র সান্নিধ্য পাবার সুযোগ হয়েছিলো এবং বেশ কয়েকটি নাটকে তিনি অভিনয় করেছিলেন) তিনি যখন রবীন্দ্রনাথের নাটক কে পূর্ণাঙ্গ নয় বলে রায় দিলেন, তখন নিশ্চয়ই বুঝতে হবে পূর্ণাঙ্গতার একটা পূর্ব নির্দিষ্ট কাঠামো তাঁর মনে রয়ে গেছে। সাধারণ রঙ্গমঞ্চের বাইরে কোনো পূর্ণাঙ্গ নাট্যশিল্প সম্ভব নয়। ‘আর রবীন্দ্রনাথের নাটক যে আদৌ নাটক নয় তার সবচেয়ে বড়ো প্রমান এর অভিনয়গত বিফলতা। এমনকি বহুরূপীর “রক্তকরবী” মঞ্চস্থ হওয়ার তিন-চার বছর পর শিশির কুমারের মনে হয় ‘এগুলো কি নাটক হলো? ওঁর কোনো বই-ই দাঁড়ায়নি।’ রবীন্দ্রনাথের নাটকে সমাজে অভ্রান্ত ভাবে সেদিন প্রতিষ্ঠিত করে দেয়, বহুরূপীর “রক্তকরবী” তে মঞ্চের ওপরে সত্যিকারের কিছু মানুষজনের চলাফেরা দেখতে পেয়ে স্বস্তি আসে দর্শকের মনে, আমরা যেন খুঁজে পাই আমাদের প্রতিবাদের ভাষা বা পদ্ধতি, নাটকটি ঠিক ভাবে পড়তে শিখি আমরা। “রক্তকরবী”-র শতবর্ষে দাঁড়িয়ে আমাদের মনে হয় আমরা যেন খুঁজে পাই আমাদের প্রতিবাদের ভাষা বা পদ্ধতি, নাটকটি ঠিক ভাবে পড়তে শিখি।

“রক্তকরবী”-র এই শতবর্ষে দাঁড়িয়ে আমাদের মনে হয় আজকের দেশকাল এতো সাম্প্রতিক, এতো আপন নাটক আর কী-ই বা আছে, যা এই সময়কে এতো গভীর ও বহুস্তরিভূত সত্যতায় খুঁড়ে আনতে পারে। শোষণে, অত্যাচারে, জোরজুলুমে, আজকেও আমরা এক উৎকট যক্ষপুরীর নাগপাশে বন্দী। সর্বগ্রাসী তার ক্ষমতা। সেখানে নন্দিনী আসে প্রাণের বার্তা নিয়ে। সেই প্রাণের যাত্রায় ওতোপ্রোতো জড়িয়ে আছে — ফাগুলাল, বিশু, চন্দ্রা, কিশোর, গোকুলের মতো জনমানুষ। আবার সহজাত বোধ জ্ঞান বুদ্ধি অধ্যাপক ও আছেন। একদিকে তাদের সংশয়, সন্দেহ, ভয়, বিষাদের জ্বালা, পারস্পরিক অবিশ্বাসের তিক্ততা, মাতালের বিলাপ যেমন আছে, তেমনি আর একদিকে কেমন এক অজানা রহস্য নন্দিনী,
তার কাছে যক্ষপুরীর জনমানুষ যেন নিজেদের হারিয়ে যাওয়া কোনো জিয়নকাঠির খোঁজ পায়। তাই চূড়ান্ত মুহূর্তে নন্দিনীর জয়ের প্রেরণায় অপ্রতিরোধ্য তাদের প্রতিবাদের ব্যাপ্তি।

এই শতবর্ষে “রক্তকরবী” করার সময় — সামাজিক, রাজনৈতিক পরিস্থিতির অনেক বদল হয়েছে। আজকের পামটপ, ল্যাপটপ-এর যুগে মানুষের ব্যবহার ও প্রকাশের বদল ঘটেছে অনেক। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, আদি কবির রামায়ণ-এ রাবণের দশটা মুন্ড ও দশটা হাত ছিলো। কিন্তু মানুষের বৈজ্ঞানিক বুদ্ধিতে একালের রাবণের অদৃশ্য অজস্র মাথা ও হাত গজিয়েছে। ফলে শোষণ আগের থেকে অনেক জটিল ও ভয়ংকর হয়ে উঠেছে। মানুষ অনেক বেশি অসহায় এই যক্ষপুরীতে। আমরা বিশ্বাস করি পৃথিবীতে যতদিন এই শোষণ থাকবে, মানুষ যতদিন নিপিড়ীত হবে ততদিন “রক্তকরবী”-র প্রাসঙ্গিকতা আরও বেশি জরুরি হবে। এবারেও আমরা সমকালীন ভাষা ও আঙ্গিকে সাজিয়ে “রক্তকরবী” কে যতোটা সম্ভব সাম্প্রতিক করার চেষ্টা করেছি। দর্শক বিপুলভাবে গ্রহণ করেছেন, অভিনন্দিত করেছেন, আমাদের এই প্রয়াসকে — যা আমাদের অনুপ্রাণিত করেছে। আমাদের বিশ্বাস এবারের এই প্রযোজনা আরও অনেক দূর যাবে আমাদের একান্ত চেষ্টা যাতে আরও নিখুঁতভাবে যাতে দীর্ঘ সময় নাটকটি করে যাওয়া যায়।
বিশিষ্ট নাট্যকার ও চিত্র পরিচালক গৌতম হালদারকে পেজফোর-এর পক্ষ থেকে শেষ শ্রদ্ধা। ৩ নভেম্বর ২০২৩ তিনি চলেগেলেন। পুজোর কয়েকদিন আগে আমার অনুরোধে রক্তকরবীর ১০০ বছর নিয়ে লিখেছিলেন। আজ সেই লাখাটাই তুলে দিলাম।