“আমার মতন সুখী কে আছে।
আয় সখী, আয় আমার কাছে
সুখী হৃদয়ের সুখের গান
শুনিয়া তোদের জুড়াবে প্রাণ…..”
এই গানটা মিত্তিরবাড়ির ছোটমেয়ে মিনুদি হারমোনিয়াম বাজিয়ে প্রায় গাইত। প্রথমবার সুখী শুনে চমকে উঠেছিল, আমার নামে কে আবার গান বাঁধল?! পরে বড় হয়ে গোটা গানটা মন দিয়ে শুনেছে। কিছুটা বুঝেছে, কিছুটা বোঝেনি। কিন্তু গানটার এই ক’টা কথা তার মনের মধ্যে একেবারে গেঁথে গেছে।
সুখীকে অনেকে ছিটিয়াল ভাবে। সুখীর তাতে ভারি বয়েই গেছে! ভাবে ভাবুক গে যাক। সুখী সুখীর মত।
অল্পবয়সে তার সমবয়সীরা বস্তির ছেলেদের সঙ্গে অলিতে গলিতে ফুসুরফাসুর করছে। সুখী তখন গোরুর পেছনে পেছনে ঘুরে বেড়ায়। পরনে তার কৃষ্ণাদিদির দেওয়া লম্বা মিডিস্কার্ট আর ব্লাউজ। গোরুর পেছনে মাঠেঘাটে ঘুরে গোবর জড়ো করা তার একটা নেশা ছিল। মা ধ্যাতানি দিত, “ধিঙ্গি মেয়ে হয়েছিস। পথে ঘাটে ঘুরে ঘুরে বেড়াস। এত যে গোবরের ঢের জড়ো করিস, কটা ঘুঁটে দিতে পারিস না। তাতে সংসারের তো কিছু উপকার হয়! পরের বাড়ি বাসন মেজে হাড় মাস আমার ভাজা ভাজা হয়ে গেল। মেয়ের সেদিকে কোনো ভুরুক্ষেপ নেই!”
মায়ের ধ্যাতানিতে সুখী কখনো কখনো ভাঙা বাড়ির দেওয়ালে ঘুঁটে দিত। কখনো দিত না। ঘুঁটে দেওয়ার দেওয়াল অধিকার নিয়ে তার ঝগড়াঝাঁটি বিশেষ ভালো লাগত না। সংসারে ঘুঁটের পাট কবেই উঠে গেছে। সুখীর গোবর জড়ো করার নেশাও ধীরে ধীরে ছুটে গেল।
এখন সে অনেকটা ঝাড়া হাতপা। তিন কুলে কেউ নেই। তার বাপমা, এক দিদি সব্বাই স্বগ্গে গেছে।
মা একসময় হাপিত্যেশ করত, “মেয়ের আমার বিয়েথাতে মন নেই। আমি চোখ বুঁজলে কি যে ওর হবে!?” কিন্তু যখন বাপমা ছিল, তখন মল্লিকদের ধাপিতে সুখী অনেক রাত অবধি বসে থাকত। মল্লিকদের বড় বৌ ধ্যাতানি দিত, “যা রে সুখী, বাড়ি যা। সোমত্থ মেয়ে, এত রাত অবধি বাড়ির বাইরে থাকা ভালো নয়।”
সুখীর ভারি বয়েই গেছে বাড়ি যেতে। হালদারবাড়ির বাসন মেজে বিকেলে সে একপেট ভাত খেত। তারপর অনেকক্ষণ ধরে কর্তামার সঙ্গে সীরিয়াল দেখত। এক একদিন সীরিয়ালের কোঁদল, প্রেমপিরীতি দেখতে দেখতে বেজার হয়ে বলত, “ধুত্তোর এদের কি আর কোনো কাজ নেই!” সীরিয়ালে বিরক্ত সুখী ঠান্ডা শান বাঁধানো মেঝেয় আঁচল মেলে শুয়ে খানিক ঘুম। ভাতঘুম দিয়ে বাইরে গিয়ে তার হাওয়া খাওয়ার সময়। বাইরে সে যে বসত, তার আর বাড়ি যেতে মন চাইত না।
বাড়ি গেলেই মায়েরবাপের সংসারের কিচকিচ। কে যাবে সাত তাড়াতাড়ি বাড়ি?
এমনি করতে করতেই দিন ঢলতে শুরু করেছে। সুখী এখন আধবুড়ি। চুলে পাক ধরেছে। তবে এখনো সে ছিপছিপে লম্বা। কোমর টানটান করে হাঁটে। তার ফুরফুরে মেজাজের কোনো বদল হয় নি।
সুখীর সমবয়সীরা সংসারের জোয়ালে টেনে টেনে ক্লান্ত। তারা বলে, “সুখী তুই বিয়েথা করিস নি, ভালোই আছিস।
হ্যাঁ সুখী ভালোই আছে। করোনা তে কত লোক মরল। কত লোক মরতে মরতে বেঁচে গেল। সুখীর হেলদোল নেই। সে এত রিলিফ পেয়েছিল যে পাশের ঘরটা ক’দিনের জন্যে তাকে ভাড়া নিতে হয়েছিল।
তবে কি সুখী স্বার্থপর? তাও না। যে যখন বলে, সুখী ফাইফরমাশ খেটে দেয়। পয়সা নিয়ে মোটেই আকচাআকচি করে না।
পুজোর সময় এবছর তার চারটে নতুন শাড়ি হয়েছে। সঙ্গে কানের একজোড়া ঝলমলে পাথরের ঝোলানো দুল। মিতালীবৌদি দিয়েছে। পুরনো বলে দু-একটা পাথর খসে গেছে। তাও সেটা সুখীর খুব পছন্দ। সেটা কানে পরে সুখী পুজোর রাতে মাঠের ধাপিতে বসে থাকে। একা। রাস্তা দিয়ে দলে দলে সুবেশ মানুষ কলকল করতে করতে চলে যায়। তারা এই পাঁচদিন প্রাণপণে ভালো থাকতে চায়। সুখীর সুখ মোটেই পাঁচদিনের নয়। তার সুখের ভাগীদারও কেউ নেই। সে পা দুলিয়ে দুলিয়ে তার সেই চেনা গানটা গুনগুন করে গায়, —
“আমার মতন সুখী কে আছে।
আয় সখী, আয় আমার কাছে
সুখী হৃদয়ের সুখের গান
শুনিয়া তোদের জুড়াবে প্রাণ”।
আমার এই লেখাটা কেমন যেন বড়ো ভালো লাগলো।
ভালোবাসা নিও