কালীপূজার আগের দিন ভূতচতুর্দশী। এই দিন দুপুরে চোদ্দ রকম শাক খাওয়ার বিধি আছে।
দুপুরে খাওয়ার ওই ১৪ টি শাকের নাম হল — ওল, নটে, বেথুয়া, সর্ষে, কালকাসুন্দী, জয়ন্তী, নিম, হেলেঞ্চা, সজনে, পলতা, গুলঞ্চ, ভাঁটপাতা, শলপা, শুষণী।
তারপর সন্ধ্যায় চোদ্দ প্রদীপ, চোদ্দ পুরুষের জন্যে। তাঁরা হলেন পিতা, মাতা, পিতামহ, পিতামহী, মাতামহ, মাতামহী, প্রপিতামহ, প্রপিতামহী, প্রমাতামহ, প্রমাতামহী, বৃদ্ধপ্রমাতামহ, বৃদ্ধপ্রমাতামহী, শ্বশুর, শাশুড়ি।
প্রশ্ন হচ্ছে, চোদ্দ শাক খাওয়ার বিধি কেন? ধনতেরাসের সঙ্গে একে জড়িয়ে মনপসন্দ একটি থিয়োরি তৈরি করা হচ্ছে আজকাল। আয়ুর্বেদের জন্মদাতা হিসেবে ধন্বন্তরিকে স্মরণে রাখতেই নাকি এই পুষ্টিগুণসম্পন্ন রোগপ্রতিরোধক চোদ্দ শাক ভক্ষণের নিয়ম। সত্যিই কি তাই?
নাকি বৈদিক বা পৌরাণিক কোনও ব্যাখ্যা আছে?

হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বঙ্গীয় শব্দকোষ-এ পাই, শাক শব্দটির একটি প্রধান অর্থ হচ্ছে শক্তি। ঋগ্বেদে শক্তি অর্থে শাক শব্দটির প্রয়োগ আছে। আদ্যাশক্তি মা কালীর পূজা একদিন পরেই। তাই তার প্রস্তুতি হিসেবেই কি চোদ্দ শাক খাওয়ার বিধান দিয়েছেন পণ্ডিতরা?
ভাবনাটি যে অমূলক নয়, তার প্রমাণ পাচ্ছি শক্তিপূজার বিবরণে। তন্ত্র পুরাণে দেবী কালীর একাধিক রূপভেদের উল্লেখ পাওয়া যায়। তোড়লতন্ত্র অনুসারে, কালী নয় প্রকার। যথা: দক্ষণাকালী, কৃষ্ণকালী, সিদ্ধকালী, গুহ্যকালী, শ্রীকালী, ভদ্রকালী, চামুণ্ডাকালী, শ্মশানকালী, ও মহাকালী।
মহাকাল সংহিতার অনুস্মৃতিপ্রকরণে নয় প্রকার কালীর উল্লেখ পাওয়া যায়। যথা: দক্ষিণাকালী, ভদ্রকালী, শ্মশানকালী, কালকালী, গুহ্যকালী, কামকলাকালী, ধনকালী, সিদ্ধিকালী, চণ্ডিকালিকা।
অভিনব গুপ্তের তন্ত্রালোক ও তন্ত্রসার গ্রন্থদ্বয়ে কালীর ১৩টি রূপের উল্লেখ আছে। যথা — সৃষ্টিকালী, স্থিতিকালী, সংহারকালী, রক্তকালী, যমকালী, মৃত্যুকালী, রুদ্রকালী, পরমার্ককালী, মার্তণ্ডকালী, কালাগ্নিরুদ্রকালী, মহাকালী, মহাভৈরবঘোর ও চণ্ডকালী।

জয়দ্রথ যামল গ্রন্থে কালীর যে রূপগুলির নাম পাওয়া যায়, সেগুলি হল — ডম্বরকালী, রক্ষাকালী, ইন্দীবরকালী, ধনদাকালী, রমণীকালী, ঈশানকালী, জীবকালী, বীর্যকালী, প্রজ্ঞাকালী ও সপ্তার্ণকালী।
মহাকাল সংহিতা অনুসারে মা কালীর আবার নব রূপের পরিচয় পাওয়া যায়। যেমন কালকালী কঙ্কালকালী, চিকাকালী এমন সব রূপের পরিচয় পাওয়া যায়।
এছাড়াও বিভিন্ন মন্দিরে ব্রহ্মময়ী, আনন্দময়ী, ভবতারিণী ইত্যাদি নামেও মা কালীর পূজা বা উপাসনা করতে দেখা যায়।
হিন্দুধর্মে কালীকে বিভিন্ন তত্ত্বজ্ঞানীগণ অদ্বৈতবাদে চিন্তা করেছেন।
অভিনব গুপ্তের লেখা তন্ত্রলোক ও তন্ত্রসার গ্রন্থে কালীর যে তেরোটি রূপের কথা বলা হয়েছে তার সঙ্গে ভদ্রকালীকে যোগ করলে চোদ্দ কালীমাতার সন্ধান মেলে। এই চোদ্দটি রূপের এক একটি রূপকে স্মরণ করতেই চোদ্দ শাক ভোজনের নিয়ম। শাক এখানে শক্তি। মা কালীর আরাধনার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে চোদ্দ শাক।