The First Crusade — The Call from the East : Peter Frankopan, translate Biswendu Nanda
আট
সাম্রাজ্যের শহর
কাউন্ট শপথ নিত অস্বীকার করায় কিছু সময়ের জন্যে মনে হয়ছিল হয়ত সমগ্র অভিযানটাই ব্যর্থ হয়ে যাবে — অগ্রগতি থেমে যাবে; যদিও অন্য দলগুলোর নেতারা সম্রাটকে শপথ নেওয়ার বিষয়ে সমর্থন দিয়ে রেখেছিলেন। শপথ নেওয়া রবার্ট, গডফ্রে এবং বোহেমোঁ সকলেই রেমঁদকে শপথ নিতে অনুরোধ করতে থাকেন, কিন্তু কোনও অগ্রগতি হয় না। শেষ অবদি একটি সমঝোতায় অবতীর্ণ হওয়া গেল। তিনি বললেন, ‘এই মুহূর্তে, তার সাথীদের সঙ্গে আলোচনা করে কাউন্ট কথা দিচ্ছেন, তিনি এবং তার সাথীরা কেউই সম্রাটের জীবনের ওপর আঘাত হানবেন না বা তাকে সিংহাসনচ্যুত করবেন না।’ তারপরেও তিনি বলতে থাকেন তার পক্ষে সম্রাটকে অন্য কোনওভাবে শ্রদ্ধা দেখানো সম্ভব হবে না ‘কারন এতে তার অধিকার ক্ষুণ্ণ হবে (৯১)’। আলক্সিওসও এই সমঝোতা মেনে নিতে অস্বীকার করলেন না, কারন যে উদ্দেশ্য তিনি ক্রুসেডারদের শিবির শহরের সুরক্ষা দেওয়ালের বাইরের আয়োজন করেছেন, তার জীবন এবং সিংহাসনের নিরাপত্তা, দুটোই এই শপথের মাধ্যমে সুরক্ষিত থাকবে।
বোহেমোঁর সঙ্গের শপথে আলেক্সিওস অনেকটা নমনীয় লে এবং অনেকটাই ছাড় দিতে প্রস্তুত ছিলেন। তিনি নির্দিষ্ট শর্তে সম্রাটের করদ রাজা হতে রাজি ছিলেন, ‘সম্রাট জানালেন তিনি যদি আমার সামনে শপথ নিতে রাজি থাকেন তাহলে এন্টিওক থেকে ১৫ দিনের লম্বায় এবং ৮ দিনের চওড়া পথে যে জমি পড়বে আমি তাকে দিতে রাজি আছি। তিনি [আলেক্সিওস] শপথ নিলেন, তিনি যদি আনুগত্য মেনে চলেন তিনি তার জমিতে পাও দেবেন না (৯২)’। এই ছাড়ের মূল্য নগন্য ছিল; যদি কিছু থেকেও থাকে সেটা সম্রাটের পক্ষে গেল। বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের পরম্পরার নিয়ন্ত্রণের বাইরে যে জমি তাকে দেওয়া হল, সেটা তুর্কি আর বাইজান্টান সাম্রাজ্যের মধ্যে একটা নিরাপদ অঞ্চল তৈরি করতে সাহায্য করল। নরমান কাউন্টের দৃষ্টিতে তিনি বিশাল এই বাহিনীকে নিজের স্বার্থ সিদ্ধির কাজে লাগাবেন; এবং তার পক্ষে নতুন এই জমিটার প্রতিশ্রুতি পাওয়া খুবই আশাপ্রদ বিষয় কারন দক্ষিণ ইতালিতে তার কাকা আর সৎ ভাই সামগ্রিক রাজত্ব দখল করে রয়েছে। এই চুক্তিতে দু’পক্ষেরই লাভ।
জমি পাওয়ার চুক্তিতে বোহেমোঁ এতই উত্তেজিত ছিলেন যে তিনি আলেক্সিওসের পক্ষ নিয়ে রেমঁদের সঙ্গে সম্রাটের চুক্তিতে মাথা গলাতে শুরু করলেন। একমাত্র বোহেমোঁই অভিযানের সব থেকে শক্তশালী মানুষটিকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন তিনি যদি শপথ নিতে নিরন্তর অস্বীকার করে চলেন তাহলে তিনি তার বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা করতে বাধ্য হবেন (৯৩)। এই নতুন ঘটনাক্রম উদ্ভুত হওয়ার ফলে বোহেমোঁ সারা অভিযানজুড়েই ক্রুসেডারদের মধ্যে খুবই জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন, তারা মনে করছিল এই চলমান বিতর্ক এশিয়া মাইনর অঞ্চলে তুর্কিদের বিরুদ্ধে মহড়া নেওয়ার লক্ষ্যটাই বদলে দিচ্ছে। ক্রুসেডের গতিশীলতা বজায় রাখার সমস্ত শ্রেয় গিয়ে অর্পিত হল বোহেমোঁর কাঁধে আর তার সততাকে কিরা কেটে। তাছাড়া এলেক্সিওসও তার প্রাক্তন শত্রু বোহেমোঁকে যৌথ স্বার্থে আরও ঘনিষ্টভাবে বুঝতে এবং ভরসা করতে শুরু করলেন।
১০৯৬-৯৭ তে সম্রাটের কিছু ছোট সময়ের বাধ্যবাধকতা ছিল, ক্রুসেডারেরা বাইজান্টিয়ামে উপস্থিত হলে নেতাদের সঙ্গে দীর্ঘকালীন রণনীতিতে প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে উদ্যোগী হলেন। পশ্চিমি নেতাদের নেতৃত্বে ক্রুসেড বাহিনী যখন একটার পর একটা শহর দখল করে পেরিয়ে যাবে, সে সময়ে পশ্চিমি নাইটদের বিজিত শহরগুলির কী অবস্থা হবে। কন্সট্যান্টিনোপলে যে শপথ নেওয়া হয়, সেখানে এই বিষয়টা উঠে এল। শপথে অন্য পশ্চিমি নাইটের উপস্থিতিতে বৌলিয়নের গডফ্রে সম্রাটকে স্পষ্ট জানান ‘আমরা আপনার ডাকে এসেছি, আমরা শপথ নিচ্ছি, যে কোনও শহর, ভূমি অঞ্চল বা দুর্গ আমরা অধিকার করব সেটি মূলত রোমক সাম্রাজ্যেরই সম্পত্তি হবে এবং সেগুলি রোমক সাম্রাজ্য নিয়োজিত আমলার হাতে তুলে দেওয়া হবে (৯৪)’।
শপথ নেওয়ার তথ্য বাইজান্টিয়ামের বাইরে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল, মুসলমান বিশ্ব এই সংবাদ জেনে গেল। সাম্রাজ্যের রাজধানীতে যে শর্তে ক্রুসডের আসা নেতৃত্ব রাজি হয়েছে, সেগুলি বাগদাদ এবং দামাস্কাদের এই বিষয় নিয়ে গবেষণা করা জ্ঞানী ভাষ্যকারেরা জেনেগেলেন। জনৈক তুর্কি চিন্তাবিদ লিখছেন, ক্রুসেডারেরা বাইজান্টিয়ামে সম্রাটের সামনে উপস্থিত হলে ‘ফরসিরা প্রথমেই গ্রিসিয় রাজাকে জানিয়ে দিল প্রথম দখল করা শহরটা তারা রোম সাম্রাজ্যের হাতে তুলে দেবে (৯৫)’। আরেকজনের লেখাতে পাই আলেক্সিওস যা চাইছিলেন সেটাই তিনি আদায় করে ছাড়লেন, ‘বাইজান্টিয়াম সম্রাট তাদের তার অঞ্চল থেকে পার হতে দিতে অস্বীকার করলেন। তিনি বললেন, ‘তোমরা যতদিন এন্টিওক আমার হাতে অর্পণ করার প্রতিশ্রুতি না দিচ্ছ ততদিন আমরা তোমাদের ইসলামের ভূমিতে পা রাখার অনুমতি দিতে পারব না (৯৬)’।
ল্যাটিন সূত্র পশ্চিমের নেতৃত্ব যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন সেগুলি এবং তার সঙ্গে আলক্সিওসও যে প্রতিশ্রুতি দিলেন সেই তথ্যগুলিও বিশদে উল্লেখ করেছে। জেস্টা ফ্রাঙ্কোরামের লেখক লিখছেন, ‘সম্রাট তার পক্ষ থেকে আমাদের বাহিনীর প্রতি শুভেচ্ছা জানালেন এবং নিরাপত্তা প্রদান করলেন, এবং তিনি পদাতিক আর নৌবাহিনী নিয়ে আমাদের সঙ্গে আসারও প্রতিশ্রুতি দিলেন; যে সব ভূমি গ্রিক সাম্রাজ্য হারিয়েছে সে সব উদ্ধারের কথা হল, এবং ঠিক হল বাহিনীর সদস্যরা পবিত্র ভূমিতে পবিত্র সেপুলচার দেখার জন্যে তীর্থ যাত্রায় কোনও বাধা সহ্য করবেন না (৯৭)’।
এই চুক্তির ফলে আগামী দিনে ক্রুসেডারেরা কে কোন প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছেন বা করেন নি, সে সন বিষয় নিয়ে পরস্পর পরস্পরকে অভিযুক্ত করবেন। একটা বিষয় পরিষ্কার হয়ে গেল আলেক্সিওস আনুগত্যের ধারণা বিষয়ে নিজে পরিষ্কার ছিলেন এবং একজন পশ্চিমি শাসকের মত করেই তিনি আচরণ করেছেন এবং তাকে শ্রদ্ধা জানাবার বিষয়টি পশ্চিমি নাইটদের বোধগম্যতার মত করে তুলে ধরেছেন। ভবিষ্যতে দুর্গম সময়ে কে কোন শর্ত পালন করবে, আনুগত্য রাখবে কী রাখবে না সেটা অন্য বিষয় এবং সেই সম্ভাবনাটি ভবিষ্যতের গর্ভে নিহিত ছিল।
জেস্টা ফ্রাঙ্কোরামের লেখক বলছেন ক্রুসেডারেরা কন্সট্যান্টিনোপলে একটা বদ্ধমূল ধারণা নিয়ে এসেছিল যে অভিযানে স্বয়ং সম্রাটই সেনাপতির পদ গ্রহণ করবেন। কিবোতোতে জড়ো হওয়া নেতৃত্বের মনে হচ্ছিল সম্রাট নিজেক প্রধান সেনাপতির পদেই দেখতে চাইছেন এবং সে জন্যেই তিনি উপস্থিত নাইট আর তাদের সেনাদের বিপুল উপহার দিচ্ছিলেন, খাদ্য বাসস্থানের ব্যবস্থা করেছিলেন, বাহিনীর গতায়াত নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছিলেন, তুর্কিদের বিরুদ্ধে কী ধরণের রণনীতি নেওয়া যায় সে বিষয়ে পরামর্শ দিচ্ছিলেন। তারপরে তিনি যে শপথের প্রস্তাব দিলেন তাতে উপস্থিত নেতৃত্বের কাছে একটা বিষয় স্পষ্ট হয়ে গেল অভিযানে তিনিই হবেন বাহিনীর অক্ষহৃদয়।
ক্রুসেড নেতাদের এই ভাবনায় আলেক্সিওস বিপদে পড়ে গেলেন। তিনি পশ্চিমের কাছে সাহায্য চেয়েছিলেন কারন এশিয়া মাইনরের বিপুল এলাকা দখলের জন্যে বিশাল বাহিনীর প্রয়োজন ছিল। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে সাম্রাজ্যের ভিতরের অভিজাতদের সঙ্গঠিত চক্রান্ত এবং সাম্রাজ্যের বাইরে থেকে আসা তুর্কিদের অভিযান তার অবস্থানকে ভঙ্গুর করে দিয়েছিল। এই অভিযানে তার পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা নেওয়া খুবই কঠিন ছিল। আন্না কোমনেনে লিখলেন, ‘সম্রাট বাহিনীর সঙ্গে বিধর্মী তুর্কিদের বিরুদ্ধে অভিযানে সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়ার কথা ভাবছিলেন, কিন্তু অভিযানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত বাতিল করলেন বেশ কয়েকটা কারনে — তার মনে হচ্ছিল ফ্রাঙ্কদের বিশাল বাহিনীর কাছে রোমক বাহিনী সংখ্যায় অল্প; এবং তিনি জীবনের অভিজ্ঞতায় জানতেন ল্যাটিনেরা কী ধরণের অবিশ্বাসী হয়।’ তাছাড়া আলেক্সিওসের আশংকা ছিল তার অবর্তমানে কন্সট্যান্টিনোপলে বিদ্রোহ ঘটে যতে পারে। আন্না লিখলেন ‘এই জন্যেই সম্রাট বাহিনীতে তক্ষুণি যোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি জানতেন অভিযানে তার উপস্থিত থাকাটা বিজ্ঞের কাজ হবে না, তিনি কেল্টদের যতটা সম্ভব সাহায্য করার এবং নিজে রাজধানীতে থাকার সিদ্ধান্ত নিলেন (৯৮)’।
সম্রাট মনে করলেন [তিনি যে সারাক্ষণ সেনাবাহিনীকে নেতৃত্ব দেবেন না সেই] সিদ্ধান্তটি তিনি উপস্থিত নেতাদের বলার কাজটি আপাতত স্থগিত রাখবেন। প্রাথমিকভাবে ক্রুসডারদের নেতৃত্ব দিয়ে এশিয়া মাইনর অবদি অভিযানে গিয়ে শুরুর আক্রমনগুলোতে সাথী হবেন। কিন্তু তিনি বুঝতে পারছিলেন না, অভিযান যদি সফল হয় এবং তুর্কিদের বিরুদ্ধে বাহিনী এগিয়ে যেতে শুরু করে, তাহলে অবস্থা কী দাঁড়াতে পারে। কিন্তু ১০৯৭-এর বসন্তের শেষ সময় অবদি ঘটনাক্রম সম্রাটের পক্ষেই ছিল। তিনি প্রত্যেক পশ্চিমি নেতৃত্বের সঙ্গে সফলভাবে চুক্তি সম্পাদিত করেছেন এবং অভিযানে তাকে সাহায্য করতে শপথ গ্রহণ করিয়েছেন এবং নিজে বেশ কিছু সতর্ক প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন; নাইটেরা তার সম্বন্ধে যাই ভাবুন না কেন, তিনি কোনও সময়েই স্পষ্টভাবে বলেন নি, যে তিনি সারাক্ষণ বাহিনীর সঙ্গে থেকে জেরুজালেম অবদি নেতৃত্ব দেবেন। এই অভিযানে নাইটদের সাফল্যের ওপরে দুপক্ষের এবং দুপক্ষের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। আলেক্সিওস অভিনিবেশ সহকারে দেখতে লাগলেন ক্রুসেডারদের বাহিনীর অভিযানের প্রথম লক্ষ্য নিকাইয়ায় যুদ্ধের ফল কী হয়। (চলবে)