অদ্য ভ্রাতৃদ্বিতীয়া। ভগিনী যমুনা যমরাজের ললাটে চন্দন,হরিদ্রা, চুয়ার তিলক আঁকিয়া দিয়াছেন। ভ্রাতাকে দীপ হস্তে আরতি করিয়াছেন। যমজ হইলেও ভ্রাতার পদস্পর্শ করিয়া আশীর্বাদ লইয়াছেন। কৃতান্তের কজ্জ্বলকালো প্রশস্ত ললাটে চন্দন, হরিদ্রার টিকা সুন্দর শোভা দিতেছে। যমুনার স্বহস্তে বানানো অত্যন্ত স্বাদু মিষ্টান্ন উদরস্থ করিয়া যমরাজ প্রসন্ন চিত্তে মহিষবাহনে আপনার কার্যালয়ে পৌঁছিয়া দেখিলেন, তাঁহার প্রধান করণিক চিত্রগুপ্ত তখনো অনুপস্থিত।
কিয়ৎক্ষণ পর চিত্রগুপ্ত দ্রুত শ্বাস লইতে লইতে ত্বরিত চকিত পদক্ষেপে কার্যালয়ে উপস্থিত হইলেন। হস্তে তাঁহার তালপত্রের পুঁথি। তাঁহার প্রশস্ত ললাটে স্বেদবিন্দু ভেদ করিয়া সিন্দূর এবং চন্দনের একাধিক তিলক জাজ্বল্যমান। গলায় শোভিত পুষ্পমালিকা। আজকে তাঁহার বেশভূষায় কিঞ্চিত যত্নের ছাপ। উজ্জ্বল বর্ণের পোশাকে, রত্নভূষিত আভরণে চিত্রগুপ্ত অন্যান্য দিবস অপেক্ষা আজ কিঞ্চিত সুন্দর দেখাইতেছেন। চলনে গমনে ব্যস্ততা সত্ত্বেও যেন কোথাও তাঁহার দেহে মনে পুলক প্রকাশ পাইতেছে।
যমরাজ তাঁর অধস্তন কর্মচারীটির বিলম্বে আগমন হেতু ভ্রূকুঞ্চিত করিলেন। কিন্তু চিত্রগুপ্তের এ হেন পোশাকের ঔজ্জ্বল্য, চেহারার কান্তি দেখিয়া উৎসুক হইয়া পড়িলেন। শেষ অবধি কৌতূহল দমন করিতে না পারিয়া জিজ্ঞাসা করিয়াই ফেলিলেন, “বৎস চিত্রগুপ্ত তোমার আজিকার এই বিলম্ব, বেশভূষা, মাল্য এসবের কারণ কি? এই পুলকিত রূপে কদাপি দেখি নাই। তোমারও গৃহে কি আজ ভাতৃদ্বিতীয়ার উৎসব পালিত হইয়াছে?”
যমরাজের প্রধান করণিকটি তাঁহার লেখনী স্থগিত রাখিয়া করজোড়ে বিগলিত হইয়া বলিলেন, “হে প্রভু এ বিশ্বসংসারে আপনার তো কিছুই অজ্ঞাত নেই তবু আপনার জ্ঞাতার্থে সবিনয়ে জানাই, মর্ত্যে আমার মুষ্টিমেয় উপাসক আছেন।”
“উপাসক?”, যমরাজ বিস্মিত হইলেন।
“হ্যাঁ ধর্মাবতার! শ্রীবাস্তব, নিগম, সিনহা, খাড়ে, দয়াল, মাথুর, সাকসেনা এইসব উপাধিধারীরা আমাকে তাঁহাদের উপাস্য বলিয়া মনে করেন। এঁনারা জাতিতে কায়স্থ। ইঁহাদের পূর্বপুরুষ অতীতে আমারই মত হিসাবরক্ষক, করণিক ছিলেন। আজ তাঁহারা একত্রে মিলিত হইয়া আমাকে স্মরণ করেন। বিশেষ পূজার্চনা করেন। ভোগ নিবেদন করেন। আমিও সম্বৎসরের এই একটিমাত্র দিনে তাঁহাদের আহ্বান উপেক্ষা করিতে পারি না। যদিও এই ভক্তের সংখ্যা আজ ক্রম হ্রাসমান।নব্যপ্রজন্মের আমার প্রতি অধিক ভক্তিশ্রদ্ধা নাই”, একথা বলিয়া চিত্রগুপ্ত দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিলেন।
এদিকে মৃত্যুবিভাগের প্রধান দেবতারও একটি হতাশার দীর্ঘনিঃশ্বাস পড়িল। হৃদয়ে একটি ঈর্ষার ছোট্ট কাঁটা বিঁধিল।
যমরাজ ভাবিলেন, “আমার অধস্তন কর্মচারীও মর্ত্যে বিশেষ দিনে পূজা লাভ করে! তারও একটি উপাসক গোষ্ঠীও আছে। আমি মৃত্যু বিভাগীয় প্রধান হইয়াও এই মর্যাদা হইতে বঞ্চিত রহিলাম? মর্ত্যে সব দেবতা পূজিত হন, আমার কোনো পূজা নাই, ভক্ত নাই!”
মনের মধ্যে যমরাজের জ্বলন, ঈর্ষা, ক্ষোভের ঘূর্ণন হইতে লাগিল। ইত্যবসরে এক সদ্যোমৃত ব্যক্তি যমালয়ের বিচারসভার দ্বারে করজোড়ে দন্ডায়মান ছিল তাহার ওষ্ঠাধরে স্মিত হাসি। যমলোকের এক ভীষণদর্শন প্রহরী তাহাকে মুষলাঘাত করিতে করিতে বিচারসভায় উপস্থিত করিল।
চিত্রগুপ্ত খাতা খুলিলেন। মৃত ব্যক্তিটি বঙ্গতনয়, জাতে কায়স্থ। জীবিতকালে সে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছিল।
কালান্তক বলিলেন, ” রে পাপিষ্ঠ! যমালয়ের বিচারসভায় আসিয়াও তুই ভীত নহে? হাসিতেছিস?
সে যথাপূর্বক স্মিত হাসিয়া বলিল, “নরকযন্ত্রণার ভয় কাহার থাকে না ধর্মাবতার? তবে জীবনে আমি অসংখ্য অনৃতভাষণ করিয়াছি, এখন সত্যকথন কহিব। আর মরিলেও আমার অনুসন্ধিৎসা, রসবোধ এখনো কম হয় নাই। আপনাদের কথোপকথন দূর হইতে শুনিয়া আমার হাসির উদ্রেক হইল। “ইহাতে হাসির কি হইল?” যমরাজ প্রশ্ন করিলেন।
“হে দেবতা, রাজনীতির পোড় খাওয়া মনুষ্য আমি। অন্যের মুখচ্ছবি পড়িতে পারি। আপনাদের মনের ভাব আমি বুঝিয়াছি।”
যমরাজ বলিলেন, “চিত্রগুপ্ত, তোমার এই কায়স্থ উপাসকটি বড়ই বাতুল”।
মৃত বঙ্গতনয়টি তৎক্ষণাৎ জোড়হস্ত করিয়া বলিল, “আমার বাতুলতা ক্ষমা করিবেন হে মৃত্যু দেবতা। আমি জন্মসূত্রে কায়স্থ সন্তান হইলেও কলমপেষা করণিক নহি। চিত্রগুপ্ত পূজার কথা ইতিপূর্বে কদাপি শুনি নাই। আপনাদের স্মরণে থাকিতে পারে, বঙ্গদেশে ইংরেজদের আগমনের পর জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে কিছু বাঙালি মনুষ্য ইংরিজি ভাষা শিখিয়া করণিক পদে প্রতিষ্ঠিত হইয়া ছিলেন। হিসাবনিকাশ কার্যে পারদর্শী হইয়া উঠিয়া ছিলেন। তখন ইংরেজরাই ছিলেন উঁহাদের ভগবান। সেখানে চিত্রগুপ্ত, কায়স্থ জাতি কেহই কোনো বিশেষ মর্যাদা পায় নাই প্রভু। আমরা চিত্রগুপ্তের আশীর্বাদ বঞ্চিত প্রভু। বাংলায় এ পূজা বিশেষ প্রচলিত নয়। তবে আমরা এক্ষণে দেশীবিদেশী সর্বধর্মের সাধনায় রত হইয়াছি। বর্তমানে অসংখ্য দেবদেবীর পূজা আমরা ভক্তি সহকারে করিয়া থাকি। প্রতি জনপদে অসংখ্য মন্দির প্রতিষ্ঠা করিয়াছি। সেখানে সপ্তাহের প্রতিদিন নির্দিষ্ট দেবতার পূজা অনুষ্ঠিত হয়। ভক্তের ঢল নামে। আপনারাই বা উপেক্ষিত হইবেন কেন?”
এ হেন সদ্যোমৃত ব্যক্তির যুক্তিপূর্ণ, সাহসী বাক্যালাপ শুনিয়া যমরাজ বড়ই চমৎকৃত হইলেন। তাঁহার শিংশোভিত মস্তকে তৎক্ষণাৎ বজ্রের ন্যায় বুদ্ধি চমকিয়া উঠিল। বঙ্গতনয়ের প্রস্তাব তিনি বড়ই প্রফুল্ল হইলেন। মর্ত্যে তাঁহার পদপ্রতিষ্ঠার ক্ষীণ আলো দেখিতে পাইলেন। তিনি এও ভাবিলেন, “ঐ বুদ্ধিমান বঙ্গনেতাটি আমার বিশেষ সহায়তা করিতে পারে। সহকারী চিত্রগুপ্তের বুদ্ধির তীক্ষ্ণতা এখন অতীত। তাহা বিশেষ ফলপ্রসূ হয় না।”
অতঃপর চিত্রগুপ্তকে কৃতান্তদেব আদেশ দিলেন, “তুমি নিজকার্যে মনোনিবেশ কর। বিশেষ কার্যহেতু কিয়ৎক্ষণ আমি কার্যালয় ত্যাগ করিলাম। বিনা প্রয়োজনে আমাকে আহ্বান করিও না।” একথা বলিয়া তিনি বঙ্গতনয়টিকে লইয়া অতি দ্রুতপদে গোপন শলাকক্ষে প্রবেশ করিলেন।