The First Crusade — The Call from the East : Peter Frankopan, translate Biswendu Nanda
নয়
শত্রুর সঙ্গে প্রথম মোলাকাত
১০৯৭-এর গ্রীষ্মে শুরু হওয়া বাইজান্টাইন সেনার অভিযান, দর্শনীয়ভাবে সফল হল। স্মিরনা, এফিসাস-সহ উপকূলের প্রায় সব কটা শহর দখলে এল বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের মুখে হাসি ফুটিয়ে, অবশেষে। ফিলাডেলফিয়া, সারদিস, লাওডিকিয়া, খোমা এবং ল্যাম্পির মত শহর দখল হল, হয় সেনা বল প্রয়োগ করে, না হয় আগে থেকেই নাগরিকদের কাছে ডাউকাসের পক্ষ থেকে আত্মসমর্পণের বার্তা পাঠিয়ে তাদের আত্মসমর্পণে বাধ্য করে। ১০৯৮-এর গ্রীষ্মে সাম্রাজ্যের অক্ষহৃদয়ে প্রবেশের জন্যে জরুরি শর্ত ছিল, উপকূল বাইজান্টাইন অঞ্চল সাম্রাজ্যের দখলে আসা; সে ঘটনাটা ঘটল। উদ্ধার করা শহরগুলোতে দ্রুত ডিওজেনিসের চক্রান্ত উত্তর সময়ে উঠে আসা নতুন একঝাঁক আমলা বাইজান্টন প্রশাসক যেমন কাসপাক্স, হাইলিয়াস, পেটজিয়াস, মাইকেল কেকাউমেনোস, ইউস্টাথিওস কামিজথেসরা প্রশাসনে এল। ১০৯০-এর মাঝমাঝি সময়ের আগে এদের নাম প্রশাসনিক সেবায় উচ্চারিত হয় নি; সাম্রাজ্যের পুর্বদেশগুলোয় তারাই এখন লড়াই আর সুরক্ষার প্রধান মুখ হলেন (৩৯)।
এক দশক জুড়ে সাম্রাজ্যের মাথা ব্যথা চাকা শেষ অবদি স্মিরনা থেকে পালাতে বাধ্য হলেন। নাটকীয়ভাবে শহরের পতন ঘটল। স্মিরনা পতনের পরে কিলিজ আরসালানের কাছে চাকা এলেন ভবিষ্যত কর্মের পরামর্শ গ্রহণ করতে। তার সম্মানে ভোজসভা আয়োজন করা হল। সেই ভোজসভায় আলোচনা চলার সময়ে নিকাইয়ার প্রাক্তন শাসক চকার পেটে তরোয়াল ঢুকিয়ে হত্যা করা হল। এশিয়া মাইনর অঞ্চলে তুর্কিরা চাকাকে বোঝার বেশি কিছু ভাবছিলেন না (৪০)।
বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের সামরিক ভাগ্য পরিবর্তনের ধাক্কায় কিলিজ আরসালান সম্রাটের সঙ্গে সমস্ত দ্বন্দ্ব মিটিয়ে নেওয়ার বার্তা পাঠালেন। আন্না কোমনেনের ভাষায় ‘বার্তাগুলোকে সফলভাবে প্রয়োগ করা হল’। যদিও তিনি বলেন নি কোন শর্তাধীন চুক্তিতে দুই পক্ষ সমঝোতায় উপনীত হলেন, যাই হোক ‘সমুদ্রসন্নিহত প্রদেশগুলিতে শান্তি ফিরে এল’ বলার মাধ্যমে কয়েটা বিষয় নিশ্চিত হল, এশিয়া মাইনর অঞ্চলে বাইজন্টিয়াম সাম্রাজ্যের ভাগ্য ফিরল হঠাতই এবং সন্দেহাতীতভাবে (৪১)।
পূর্ব প্রদেশগুলির বশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ শহর নতুন করে সাম্রাজ্যের অধীন ফিরে এল। তুর্কিদের উপমহাদেশ থেকে ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়ার জন্যে অনেক কিছুই করণীয় ছিল, কিন্তু সম্রাটকেও বাস্তবজনোচিত যুক্তিবুদ্ধি প্রয়োগ করে ভাবতে হচ্ছিল একবারেই তিনি কতটা অঞ্চল উদ্ধার করতে পারবেন এবং উদ্ধার হওয়া অঞ্চল দখলে রাখতে পারবেন। ১০৯৭-৯৮-এর বিজয়ের ঘনঘটাকে চিরস্থায়িত্ব দেওয়ার জন্য তাঁকে নিশ্চিতভাবে যোগ্য, দক্ষ এবং অনুগত আমলা বেছে নেওয়া জরুরি কাজ ছিল। নিকাইয়া থেকে বাহিনী সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার মুহূর্ত থেকে সম্রাটকে চিন্তা করতে হচ্ছিল তুর্কিরা নতুন করে সেই সব বিজয়ী অঞ্চল, শহরে সাম্রাজ্যের ওপর চাপ বাড়াতে জোটবদ্ধ হবার উদ্যম নিতে পারে। কিলিজ আসরালানের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদিত হওয়া আলেক্সিওসের পক্ষে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা পদক্ষেপ, যে ঘটনাক্রম মাথায় রেখে তিনি পশ্চিম এশিয়া মাইনরের অক্ষহৃদয়ে তার সাম্রাজ্যের অবস্থান নতুন করে গড়ে তুলতে এবং বাইজান্টিয়ামে তার নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করতে পারেন।
সম্রাট সুচতুরভাবে ক্রুসেডারদের বাহিনীর প্রাবল্যকে নিজের স্বার্থ পূরণে এবং বাহিনীর সামরিক ক্ষমতা, দক্ষতা সরাসরি নিকাইয়া উদ্ধারে এবং পরোক্ষ আর সার্বিকভাবে পশ্চিম এশিয়ায় তুর্কিদের উপস্থিতির ওপরে প্রশ্ন তুলে দেওয়ার কাজে ব্যবহার করলেন। সমস্যা হল, আলেক্সিওসের সঙ্গে কিলিজ আরসালান চুক্তিতে আগ্রহী হয়ে উঠে বিশাল দখল নেওয়া অংশ সম্রাটকে ছেড়ে দেওয়ার নেতিবাচক পরিণতির ধাক্কা পড়ল ক্রুসেডারদের অভিযানে। আলেক্সিওসের সঙ্গে কিলিজ আরসালান চুক্তির বিষয়টা সামনে আসতেই তুর্কিরা সক্রিয় হয়ে উঠতে শুরু করে।
নিকাইয়া থেকে পশ্চিমি বাহিনী দুই ভাগে ভাগ হল — বোহেমোঁ, ট্যানক্রিড আর নরমান্ডির রবার্ট এক দলে রইলেন আর ফ্লান্ডাসের রবার্ট, তুলোসির রেমঁদ, ভারনান্ডোয়িসের হিউ আর লেপুইএর বিশপ অন্য দলে। বাস্তব বুঝে ক্রুসেডে আসা বাহিনীকে দুই ভাগে ভাগ করা হল। যদিও রসদ সরবরাহ নিশ্চিত করেছিলেন সম্রাট, কিন্তু বিশাল একটাই বাহিনীর জন্য বিপুল রসদ সরবরাহ করা খুবই সমস্যার বোঝা হয়ে উঠতে পারত। চরম গ্রীষ্মে আনাতোলিয় উপত্যকাজুড়ে নিয়মিত সরবরাহ বজায় রাখা মুশকিল ছিল।
জুলাই মাসে যাত্রা শুরুর কিছু দিনের মধ্যেই ধ্বংস শহর ডোরিলায়নের কাছাকাছি পৌঁছে মূল বাহিনীর থেকে বেশ কিছুটা এগিয়ে থাকা বোহেমোঁ আর তার ছোট বাহিনী বুঝল তাদের ওপর দূর থেকে গভীর নজরদারি চলছে। তিনি সঙ্গে সঙ্গে নজরদারির বার্তা মূল বাহিনীকে পাঠিয়ে দিলেন; পশ্চিমি বাহিনীর মুখোমুখি হওয়ার জন্যে আসা কিলিজ আরসালানের নেতৃত্বে বিশাল তুর্কি বাহিনী ক্রুসেডার দলকে আক্রমন করল। ‘আকাশ কালো করে তীরের ঝাঁক ছুঁড়ে, নেকড়ের মত যুদ্ধ চিৎকারে’ তুর্কি বাহিনী আক্রমন শানালে ভয় আর আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল ক্রুসেড বাহিনীতে’ (৪২)।
তুর্কি সেনার চিৎকৃত যুদ্ধ আওয়াজের ধাক্কাটুকুতেই বিপক্ষ কাহিলপারা। ‘তুর্কিরা আধো আধো শয়তানি শব্দে বিপুল চিৎকারে অপশব্দ ব্যবহার করছিল, যেগুলো আমার বোঝার বাইরে থেকে গেল’ লিখছেন জনৈক প্রত্যক্ষ্যদর্শী। তারা মাঝে মাঝে চিৎকার করত ‘আল্লাহু আকবর’। কিন্তু শুধুই চিৎকার পশ্চিমিদে ভয় পাইয়ে দেয় নি। আক্রমন এতই ভয়ঙ্কর ছিল, সেনাদের মনে হচ্ছিল যেন শেষের সে দিন নিশ্চিতভাবে এগিয়ে আসেছে অভিযাত্রী দলের দিকে; পুরোহিতদের সর্বশক্তিমানের কাছে চোখে জল এনে প্রার্থনা করা ছাড়া অন্য কোনও রাস্তা নেই মনে হচ্ছিল (৪৩)। আরেক পশ্চিমির ভাষ্যে, ‘আমি আর কী বলব? চৌদিক শত্রুর রণব্যুহে ঘিরে থেকে আমরা ভয় চকিত ভেড়ার মত এক জোট হয়ে কাঁপতে থাকলাম… আমাদের পালাবার উপায় থাকল না। বুঝলাম আমাদের পাপের শাস্তি মাথার ওপর খাঁড়া হয়ে ঘুরছে… আমাদের বাঁচার আশা রইল না (৪৪)’।
তুর্কি ঘোড়সওয়ার ধনুর্ধরদের চাপে ক্রুসেড বাহিনী নদীর কিনারে চলে আসতে শুরু করে। শেষ অবদি এটাই তাদের বাঁচার উপায় দেখাল, কারন ভারী লোহার বর্ম আর ভারি হাতিয়ার নিয়ে দীর্ঘক্ষণ লড়াই করার জন্যে সেনার নিয়মিত জল পান জরুরি ছিল। এটাই তাদের জীবন-মৃত্যুর মধ্যে পার্থক্য টেনে দিল। তাছাড়া তুর্কিরা যে দিক থেকে আসছিল সেই অঞ্চলটা ছিল জলকাদা ভর্তি জমি, ফলে তুর্কি ঘোড়াগুলি খুব বেশি দ্রুত এগোতে পারছিল না।
বিলশা ক্ষয়ক্ষতি বিপুল সেনার প্রাণ হারানো সত্ত্বেও বাহিনী নিজদের নতুন করে গুছিয়ে নিয়ে সারিবদ্ধ হয়ে পালটা লড়াই ফিরিয়ে দিল। বোহেমোঁর যোগ্য নেতৃত্ব, দুর্গতির সময়ে তাৎক্ষণিক ভাবনাসঞ্জাত রণনীতি আর বাহিনীতে শৃংখলা রাখার দক্ষতা থেকে আমরা আন্দাজ করতে পারি কেন এই নরমান নেতৃত্বের গ্রহণ-যোগ্যতা বাহিনীর সেনাদের মধ্যে আগামী দিন আরও গ্রহনীয় হয়ে উঠবে। তিনি বাহিনীর সেনাদের ধৈর্য ধরতে বললেন এবং খোলা মাঠে এটাই ছিল বাহিনীর প্রথম যুদ্ধ পরীক্ষা এবং তিনি নিজেই উদাহরণ হয়ে উঠে বাহিনীকে রক্ষা করলেন। ক্রুসেডারেরা সর্বশক্তিমানের প্রতি বিশ্বাস রেখেছিলেন, ‘আমরা বাহিনীর লাইনে সর্বশক্তিমানের উপাসনাযোগ্য একটা গোপন বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছিলাম ‘নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে থাক, পবিত্র ক্রুস আর খ্রিষ্টের ওপর ভরসা রাখ। আজ সর্বশক্তিমানকে তুষ্ট কর, তবেই তুমি আগামী দিনে লুঠের মাল অর্জন করবে! (৪৫)’। তবে শুধু বিশ্বাসই বোধহয় নাইটদের বাঁচায় নি।
বাকি বাহিনী নিয়ে গডফ্রে, রেমঁদ এবং হিউ যুদ্ধক্ষেত্রে এসে পড়ায় যুদ্ধের ধার পশ্চিমিদের দিকে ঢলে পড়তে থাকে। এর পরে লেপুইএর আধিমারের এসে পড়াও নির্ণায়ক হয়ে উঠল। বিশপ তুর্কি শিবির ধ্বংস করে পুড়িয়ে দিয়ে পিছন থেকে শত্রুকে আক্রমন করেন। হতবাক তুর্কিরা পশ্চিমি বাহিনীর গতিময়তায় ত্রস্ত হয়ে পালিয়ে যেতে থাকে। যে যুদ্ধ হঠাতই ক্রুসেডকে লজ্জাজনকভাবে থামিয়ে দেওয়ার মত অবস্থায় চলে এসেছিল, সেটি ক্রুসেডারদের উজ্জীবিত করল পাল্টা লড়াই দিতে। কোনও কোনও লেখক একে বলেছেন সর্বশক্তিমানের হস্তাবলেপন এবং তার ইচ্ছের বহিঃপ্রকাশ ‘এটা সর্বশক্তিমানের কুদরত ছাড়া আর কিছুই নয়, দ্বিতীয়, তৃতীয় দিনও তুর্কিরা পালাতে থাকে। এই বিজয়ে আপ্লুত হয় আমরা সর্বশক্তিমানকে কৃতজ্ঞতা জানালাম। তাঁর সনির্বন্ধ ইচ্ছে যে আমাদের যাত্রা কিছুতেই শুন্যে পর্যবসিত হবে না, বরং এটি আরও উজ্জ্বল, সমৃদ্ধ হবে খ্রিষ্ট জনগণের জন্যে এবং স্বয়ং সর্বশক্তিমানের জন্যেও (৪৬)’। (চলবে)