The First Crusade — The Call from the East : Peter Frankopan, translate Biswendu Nanda
নয়
শত্রুর সঙ্গে প্রথম মোলাকাত
টারসোস, আদান আর এশিয়া মাইনরের দক্ষিণ পশ্চিম এলাকার অন্য উদ্ধার করা শহরের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করে শহরগুলির পরিচালনাভার টাটিকিওস এবং বাইজান্টিয়ানদের হাতে তুলে দেওয়া হল। ঠিক একইভাবে এর পর ছমাসেরও কম সময়ে টাটিকিওস সরবরাহের খোঁজ এবং নিরাপত্তা বিধান করার জন্যে বাহিনীর খোঁজে ক্রুসেডারদের দল ছাড়ার সময় তিনি শহরগুলি বোহেমোঁর নিয়ন্ত্রণে রেখে যাবেন (৫৮)। স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছিল বল্ডউইন সম্রাট আলেক্সিওসের স্বার্থরক্ষায় আগ্রাসীভাবে সক্রিয় ছিলেন এবং এরই কাছাকাছি সময় থেকে বিভিন্ন শহরের মানুষেরা তুর্কী শাসন মুক্ত হতে চেয়ে সাম্রাজ্যের প্রতিনিধি হিসেবে বল্ডউইনের কাছেই সামরিক সাহায্য চেয়ে পাঠাবে। কিছুদিনের জন্যে মূল বাহিনীতে যোগ দেওয়ার পর বল্ডউইন, নতুন করে আলাদা বাহিনী নিয়ে ককেসাসের দিকে যাত্রা করলেন। তাঁর কাছে সামরিক সাহায্য চেয়ে বার্তা পাঠিয়েছিলেন এডেসা শহরের বাইজান্টাইন প্রশাসক টোরোস; স্থানীয় এক সূত্র বলছে, এই মানুষটা তুর্কিদের বিরুদ্ধে ‘সিংহের মত নির্ভীক’ভাবে লড়ছিলেন এবং শহরের সুরক্ষার জন্যে যত কিছু পদক্ষেরপ গ্রহণ করার ছিল নিয়েচলেছিলেন দৃঢ় সিদ্ধান্তে (৫৯)।
স্থানীয় মানুষদের চোখে বল্ডউইন হয়ে উঠলেন অঞ্চলের মুক্তিদাতা। জনৈক প্রত্যক্ষ্যদর্শী লিখলেন, ‘আমরা যখন আরমেনিয়দের শহরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম, অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম তারা আমদের বাহিনীকে অভ্যর্থনা জানাতে হাতে পতাকা নিয়ে শহরের প্রাকার ছেড়ে বেরিয়ে আসছিল; তারা অসামান্য উৎসাহে আমাদের পা, আমাদের বস্ত্র খণ্ডগুলো এমনভাবে চুম্বন করছিল, ঠিক যেমন করে তারা সর্বশক্তিমানের পা ও বস্ত্র চুম্বন করে; তারা শুনেছে বহুকাল ধরে অত্যাচার করা তুর্কদের কবল থেকে আমরা তাদের নিরাপত্তা বিধান করার জন্যে মুক্তিদাতা হয়ে এসেছি (৬০)’। শহরের হাররান দরজায় উতকীর্ণ লিপির সম্ভাব্য পাঠ এবং প্রজাদের পক্ষ থেকে বল্ডউইনের সামরিক বাহিনীকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানোর তরিকা থেকে একটা বিষয় পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিল, সম্রাট আলেক্সিওস তুর্কিদের কবল থেকে ভূখণ্ড রক্ষার তীব্র, প্রাণপন চেষ্টা চালাচ্ছেন এবং তিনি এই উদ্ধারের কাজটা ক্রুসেড শেষ হওয়ার আগেই নিম্পন্ন করে ফেলতে চাইছেন – তারে কাজকর্মের দরুন এই বার্তা প্রজাপুঞ্জের মনের মধ্যে স্থায়ীভাবে গেঁথে গিয়েছিল (৬১)। এছাড়াও জানা গেল এডিসার নাগরিকেরা বল্ডউইনকে শহরের অর্ধেক রাজস্ব এবং কর দেওয়ার প্রস্তাব পাঠিয়েছেন। মাথায় রাখতে হবে এই অর্থ বল্ডুইনের নিজের সিন্দুকে যাবে না; এই অর্থটি যে সম্রাটের জন্যে উদ্দিষ্ট এবং তার প্রতিনিধি মার্ফত দেয় পারম্পরিক রাজস্ব এটাও পরিষ্কার ছিল (৬২)।
প্লাস্টেনসিয়া এবং টারাসোসের মত এডেসার ভৌগোলিক অবস্থানও ক্রুসেডের সামগ্রিক সামরিক পরিকল্পনার দিক থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল; বল্ডইন জানেন শহরটিকে ঘাঁটি বানিয়ে তাঁর দখলে আনা বিশাল ভূখণ্ডতে নজরদারি চালানো সম্ভব। এডেসা দখলও সম্রাটের বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ ছিল। সম্রাট আলেক্সিওস পূর্ব অঞ্চলে তার নিযুক্ত প্রশাসকের নিয়ন্ত্রণে থাকা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহর এবং অঞ্চলে যোগাযোগের জাল তৈরি করতে চাইছিলেন। বল্ডউইন ধর্মপ্রাণ, অভিজ্ঞ এবং দক্ষ, তিন ভাইদের মধ্যে ছোট, একাদশ শতকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমিদারির পরিমান এতই কমেগিয়েছিল যে তার পক্ষে সম্পূর্ণ ভূস্বামীত্ব বিক্রি করে জেরুজালেমের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার সিদ্ধান্ত নিওয়া খুব একটা কঠিন ছিল না। বল্ডউইন সে সব ক্রুসেডারের মধ্যে অন্যতম প্রধান পুরুষ ছিলেন, যারা ক্রুসেড যাত্রাকে শুধুই আত্মনিবেদনের তীর্থ যাত্রা হিসেবে গণ্য করেন নি, বরং তাদের কাছে এই যাত্রা পূর্ব দেশে নতুন করে জীবন শুরুর উদ্যম ছিল।
বল্ডউইন কন্সট্যান্টিনোপলের পক্ষে এডেসার প্রশাসকের দায়িত্ব গ্রহন করলেন। আমরা এই তথ্যটা জানলাম শুধু তাঁর বাইজান্টিয়াম আঙ্গিকের কাপড় পরা অথবা এই অঞ্চলের অভিজাতদের মত দাড়ি রাখার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত থেকেই নয়, অন্যান্য বেশকিছু সূত্র থেকেও। উদাহরণস্বরূপ এডেসার দায়িত্ব নেওয়ার এবং অবস্থান সুরক্ষিত করার পরে, শহরের বাইরের অঞ্চলে ভ্রমন করার সময় তিনি তাঁর বাহিনীর সামনে দুটি শিঙ্গা ফোঁকা বাধ্যতামূলক করলেন। বল্ডউইনের রথে লাঞ্ছিত ছিল একটি স্বর্ণাভ ঢাল এবং ঢালের ওপরে কন্সট্যান্টিনোপলের সাম্রাজ্য লাঞ্ছিত ঈগলের ছাপ্পা; এই ছবি অঞ্চলে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের বার্তা বাহক হিসেবে গণ্য হত (৬৩)।
এডেসায় আলেক্সিওসের প্রতিনিধি হিসেবে বল্ডউইনের নিয়োগের আনুষ্ঠানিক ডিক্রি জারি হলে তাঁকে সরকারিভাবে ডাউক্স বা প্রশাসকের পদ দেওয়া হয় – এই জন্যে ল্যাটিন সূত্রে তাঁকে ডিউক হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে, যদিও এই উপাধি তিনি পারিবারিকভাবে নয়, কর্ম সূত্রে অর্জন করেছেন (৬৪)। এডেসায় তাকে যে দায়িত্ব অর্পণ করা হয়, সেই ধারাগুলো বিশ্লেষণ করলে আমরা বুঝতে পারব কেন তিনি শহরের দায়িত্ব ছেড়ে ক্রুসেড বাহিনীতে অংশ নিতে অস্বীকার করেছিলেন (৬৫)। তার ব্রিটিশ স্ত্রী গোডিভেরির মৃত্যুর পরে স্থানীয় এক অভিজাতর কন্যাকে বিবাহ করা থেকে পরিষ্কার তিনি শহরে শেকড় ছড়াতে চাইছিলেন (৬৬)। বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের পূর্বাঞ্চল উদ্ধার করার উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনায় তিনিই ছিলেন আলেক্সিওসের অন্যতম প্রধান সেনাপতি।
একদিকে বল্ডউইন সম্রাটের পক্ষ নিয়ে, তাঁর সাম্রাজ্যের হারানো কর্তৃত্ব এবং জমি ফিরিয়ে দেওয়ার জন্যে সর্বস্ব পণ করেছন, অন্যদিকে বাকি ক্রুসেডারদের নিয়ে ক্রুসেড বাহিনী পূবের দিকে এগিয়ে চলছিল। ১০৯৭-এর অক্টোবরে তারা মহান এন্টিওক শহরে পৌঁছবে। শহর শুধু কঠোর নিরাপত্তা বলয়ে ঘেরা ছিল তাই নয়, এর প্রাকৃতিক অবস্থানটাও উল্লেখ্য ছিল — এর দুদিক পাহাড়ি ঢালে নিরাপদ, পশ্চিম দিকে অরন্তেস নদী আরও বড় বাধা তৈরি করেছে; এন্টিওকের দেওয়াল ছিল ২০ মিটার উঁচু আর দুমিটার মোটা আর দেওয়াল জুড়ে শত্রুপক্ষের ওপর নজরদারি করার জন্যে অসংখ্য বুরুজ (৬৭)।
এন্টিওকের স্বাভাবিক প্রাকৃতিক অবস্থান বা তার নিরাপত্তা বলয় শুধু তার নিরাপত্তা বিধান করত না, শহরের বিশাল আয়তন আরেকটা জোরের জায়গা ছিল। শহরকে ঘিরে দেওয়ালটার দৈর্ঘ ছিল প্রায় পাঁচ কিলোমিটার, ১৫০০ একর। জনৈক নিরীক্ষক বলেছেন রসদ ফুরিয়ে নাগরিকদের যদি খাদ্যে অভাব না ঘটে তাহলে তারা যতদিন খুশি নিজেদের স্বাধীনতা বিজায় রাখতে পারত (৬৮)। শহরটা এত বড় ছিল যে শহরের মধ্যে চাষের ফসলের ওপর ভরসা করে অনন্তকাল বেঁচে থাকা যেত।
এন্টিওকের প্রশাসক শহরের নিরাপত্তা নিয়ে এতই আশ্বস্ত ছিলেন যে শহরের বাইরে বিশাল বাহিনী এসে উপস্থিত হলেও তিনি আলাদা বাড়তি নিরাপত্তা বিধান তৈরি করেন নি। ফলে আক্রমনকারীদের হাতে বেশ কিছু সময় ছিল বাইরের দিকের দেওয়ালটা কতটা দুর্ভেদ্য সেটি বুঝে নেওয়ার এবং সেই অনুযায়ী রণনীতি তৈরি করার। ক্রুসেডারেরা খুবই সুবিধেজনক সময়ে এন্টিওকে পৌঁছে ছিল, তখন গ্রীষ্ম চলে গেছে আর বিপুল খাদ্যদ্রব্য চতুর্দিকে ছড়ানো। ‘বাগানভরা ফল, খেতভরা ভুট্টা, আপেল গাছে আপেল ঝুলছে এবং আরও বিপুল পরিমান খাদ্যদ্রব্য চারিদিকে ছড়িয়ে আছে’ দেখে আর তাদের আনন্দ ধরে না (৬৯)।
শুরুতে সেখানে অদ্ভুত স্বাভাবিকত্বের পরিবেশ ছিল। দেওয়ালের বাইরে বিশাল বাহিনীর উপস্থিতি অগ্রাহ্য করেই নাগরিকেরা তাদের কাজ সম্পাদন করতে শহর থেকে স্বাভাবিকভাবে ঢুকত বেরত; আর যারা বাহিনীকে আক্রমন করতে আসত, তারা পরিকল্পনা সাজিয়েই আবশ্যিক সমস্যার মুখোমুখি হতে হব জেনেই, অবহেলায় আসত। তুলোসির রেমঁদের চ্যাপলেইন লিখছেন শুরুর দিকে পশ্চিমিরা ‘সব থেকে ভাল অংশের মাংসটাই খেত, নিরামিষ খাদ্য আর মদ্যের কথা ভাবতেই হত না। সে সব চমৎকার দিনে দেওয়ালের ওপরে মাথা তোলা পাহারাদারেরা মনে করিয়ে দিত দেওয়ালের ওপারে শত্রুর উপস্থিতি (৭০)’। (চলবে)