ন’দিন পেড়িয়ে দশ দিন হয়ে গেল, মাটির নীচেই তাঁরা আটকে রয়েছেন। এত দিন ধরে ধসে পড়া সুড়ঙ্গে ৪১ জন শ্রমিক আটকে আছেন। এরই মধ্যে দেশে ক্রিকেট বিশ্বকাপ প্রতিযোগিতার আসর জমে উঠেছিল। ভারত অস্ট্রেলিয়া ফাইনাল ম্যাচ ঘিরে যে বিপুল উদ্দিপনা তৈরি হয়েছিল তাতে তাঁদের কথা আমরা ভুলেই গিয়েছিলাম। তবে যাতে তাঁদের সুড়ঙ্গ থেকে বের করে আনা যায় তার জন্য নানা কৌশল অবলম্বন করে কাজ চলছিল যদিও এখনো পর্যন্ত কাজের কাজ কিছু হয়নি। ধ্বংসস্তূপ খুঁড়ে চওড়া পাইপ ঢুকিয়ে আটকে পড়া শ্রমিকদের বাইরে বের করে আনা পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু সেই খোঁড়াখুঁড়ির কাজও বন্ধ হয়ে যায় সুড়ঙ্গের ভিতরে ধস নামায়। তাহলে কি উদ্ধার কাজে তেমন কোনো অগ্রগতি নেই? তাঁদের নিরাপত্তা ও জীবন নিয়ে উদ্বেগ যে ক্রমশ বাড়ছে, সে কথা বলাই বাহুল্য।
গত রবিবার ভোর সাড়ে ৫টা নাগাদ উত্তরাখণ্ডের উত্তরকাশী জেলায় ব্রহ্মখাল-যমুনাত্রী জাতীয় মহাসড়কের নির্নীয়মান ওই টানেলটির একটি অংশ ধসে পড়ে। পরে খবরে বলা হয়, টানেলটি ধসে পড়ার আগের রাতে সেখানে ৫০ থেকে ৬০ জন শ্রমিক কাজ করছিলেন। ধসের পর যারা টানেলের বেরিয়ে যাওয়ার মুখে কাজ করছিলেন তাঁরা বেরিয়ে আসতে পেরেছিলেন। কিন্তু মাটির প্রায় ২০০ মিটার গভীরে যে ৪০-৪১ জন শ্রমিক কাজ করছিলেন তাঁরা আটকা পড়ে যান। টানেলটি প্রায় ৪ হাজার ৫৩১ মিটার লম্বা। মাটি ধসে সেটির বেরিয়ে যাওয়ার মুখটি বন্ধ হয়ে গিয়েছে।ধসে পড়া টানেলের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে মাটি ছাড়াও বড় বড় বোল্ডার থাকায় ড্রিল করার কাজ ব্যহত হচ্ছে। শুক্রবার ভূগর্ভে ড্রিল মেশিনটি বন্ধ হয়ে গেলে উদ্ধারকর্মীরা সেটি পুনরায় চালু করার চেষ্টা করে। সেই সময়ে বড় ধরনের ফাটলের শব্দ শোনার পর তারা কাজ থামিয়ে দিয়েছে বলে জানা যায়। কি কারণে প্রায় সাড়ে চার কিলোমিটার দীর্ঘ এই টানেলটির একটি অংশ ধসে পড়লো সে সম্পর্কে কর্তৃপক্ষ এখনো কোনো তথ্য জানায়নি। তবে ভারতের পাহাড়ি রাজ্য উত্তরাখণ্ডে নিয়মিতই ভূমিধস, ভূমিকম্প এবং আকস্মিক বন্যা হতে দেখা যায়। টানেলটি উত্তরাখণ্ডের যে জাতীয় মহাসড়কে নির্মিত হচ্ছে সেটি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর চারধাম হিন্দু তীর্থযাত্রা মহাসড়কের অংশ। ধসে পড়া টানেলটি রাজ্যের উত্তর কাশীর সিল্কিয়ারাকে দন্দলগাঁও-এর সঙ্গে সংযুক্ত করবে। যার ফলে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের তীর্থস্থান উত্তর কাশীর থেকে যমুনাত্রী ধামের মধ্যেবর্তী সড়ক পথের দূরত্ব ২৬ কিলোমিটার কমে যাবে। উত্তরাখণ্ডে হিন্দুদের চারটি তীর্থস্থানকে জুড়ে দেওয়ার লক্ষ্যে চারধাম মহাসড়কটি নির্মিত হচ্ছে।।৮৯০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই মহাসড়কটি নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ১৫০ বিলিয়ন আমেরিকান ডলার।
উদ্ধারকারীরা সুড়ঙ্গে আটকে পড়া ৪১ জন শ্রমিকের কাছে পৌঁছনোর চেষ্টা করছেন ঠিকই, কিন্তু এখনও সেই সব চেষ্টার তেমন কোনো ফল পাওয়া যায়নি। বরং সময় যত এগোচ্ছে, উৎকণ্ঠা, আশঙ্কা, উদ্বেগ আর কষ্ট ততই বাড়ছে। আটকে থাকা শ্রমিকদের মুখে এখন একটাই কথা, ‘আর তো পারা যাচ্ছে না, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমাদের এখান থেকে বের করুন।’ আর দুঃশ্চিন্তা সেও তো কেবল নিজের জন্য নয়। কেমন আছেন অসুস্থ-বয়স্ক মা-বাবা? কেমন আছে ছেলে-মেয়ে-বউ? ওই অন্ধকূপের মধ্যে দশ দিন ধরে আটকে রয়েছেন আরামবাগের নিমডাঙির জয়দেব প্রামাণিক। তাঁর মা-বাবা কেমন আছেন, জানতে পারছেন না। তাই নিজে এমন বিপদের মধ্যে থেকেও সারাক্ষণ মাথার মধ্যে তাঁদের কথাই ঘুরে ফিরে ভাবছেন। অন্ধ কারার মধ্যেও বারবার ভেসে উঠছে বাবা-মায়ের মুখ। জানা নাই কবে ফের পৃথিবীর আলো দেখতে পাবেন।
সোমবার ছ’ইঞ্চি চওড়া পাইপের মাধ্যমে খিচুড়ি, ডালিয়া এবং নানা রকম ফল পাঠানো হয়েছিল, সেই সঙ্গে পাঠানো হয় মোবাইল ফোন। এরপর উদ্ধারকারীরা সেই পাইপের মাধ্যমেই সুড়ঙ্গের ভিতর পাঠিয়েছেনএন্ডোস্কোপিক ফ্লেক্সি ক্যামেরা । তাতে আটকে পড়া শ্রমিকদের প্রথম ভিডিয়োটি ধরা পড়েছে। দেখা যায় সুড়ঙ্গের ভিতরে ৪১ জন শ্রমিক একটি ছোট জায়গায় দাঁড়িয়ে রয়েছেন। তাঁরা নিজেদের মধ্যে কথা বলছেন কিন্তু তাঁদের শুকনো মুখগুলি যতটুকু দেখা যাচ্ছে তাতে বোঝাই যাচ্ছে উদ্বেগ আর আশঙ্কায় তাঁরা নুয়ে পড়েছেন। প্রশাসন বারে বারেই জানাচ্ছে আটকে পড়া সব শ্রমিকই সুস্থ আছেন। কিন্তু আসল কথা হল, খোঁড়ার কাজ এখনো পর্যন্ত মাত্র ২৬ মিটার এগিয়েছে। আর শ্রমিকেরা আটকে রয়েছেন ৬০ মিটার গভীরে।জানা গিয়েছে, শ্রমিকদের সুড়ঙ্গ থেকে উদ্ধার করতে আরও চার দিন লাগতে পারে।