শ্রীযুত সেন ক্ষয়িষ্ণু মধ্যবিত্ত সমাজের অধিবাসী অথচ বিপ্লবী। অতএব, স্বভাবতই আমরা তাঁহার কাব্যে ভাবাদর্শের বেদনাময় পরিণতির একটি পথরেখা আবিষ্কার করিব। কিন্তু কোথায় সে পরিণতি? ক্ষয়িষ্ণু সমাজের ক্ষয়িষ্ণু কবি শ্রীযুত সমর সেনের সাম্যবাদী ভাবাদর্শ উর্বশীর মতো ‘যখনি জাগিলে বিশ্বে যৌবনে গঠিতা পূর্ণ প্রস্ফুটিতা’। কবি ক্ষয়িষ্ণু বলিয়া কাব্যও ক্ষয়িষ্ণু হইবে, কিন্তু ভাবাদর্শ হইল সমস্ত ক্ষয়, অপচয়ের ঊর্ধ্বে সুগঠিত, সুসম্পূর্ণ, সুসমৃদ্ধ সাম্যবাদ। কোকেনের প্যাকেটে ঔষধের লেবেল মারিয়া দিবার মধ্যে যেটুকু বাহাদুরী আছে তাহা শ্রীযুত সেনেরই প্রাপ্য। একটি উদাহারণ দিই:
‘তবু জানি —
জটিল অন্ধকার একদিন জীর্ণ হবে, চূর্ন হবে, ভস্ম হবে
আকাশগঙ্গা আবার পৃথিবীতে নামবে
ততদিন
ততদিন নারীধর্ষণের ইতিহাস’
‘তবু জানি’ — কিন্তু তিনি জানিলেন কি উপায়ে? জটিল অন্ধকার একদিন জীর্ণ হবে, চূর্ণ হবে, ভস্ম হবে, এ জ্ঞান তাঁহার কোথা হইতে আসিল? বিপ্লবী আন্দোলনের ভিত্তিমূল শ্রমিক ও কৃষকশ্রেণীর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা তো তাঁহার নাই। অভিজ্ঞতার পরিধি তো একদিকে অশিব, অসত্য, অসুন্দর মধ্যবিত্তজীবন ও অন্যদিকে —
‘আবার নিঃশব্দ হিংস্র প্রান্তরে,
রক্ত-পতাকা আকাশে ওড়ে,’
এই পর্যন্ত। তিনি তো Marxist – তিনি তো গান্ধীর মতো inner voice কিংবা সুভাষ বসু-র মতো intuition-এ বিশ্বাস করেন না। এ ভাবাদর্শ তিনি গ্রহণ করিয়াছেন কোন প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ও বেদনার সংঘাতে? বর্তমান decadent মধ্যবিত্ত সমাজে বুদ্ধিহীন বুদ্ধিজীবীর ভিড়ের মধ্যে Text book of Marxism-এর যে সহজ সিদ্ধির পথ শ্রীযুত সেন আবিষ্কার করিয়াছেন তাহাতে তাঁহার বৈষয়িক ধূর্ততার প্রশংসা না করিয়া আমরা থাকিতে পারি না। ‘রোমান্টিসিজম’-এর ভীরু কবির ভাবাদর্শ যে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা বিচ্যুত হইয়া রোমান্টিক হইয়া উঠিয়াছে, কবির কি সে খেয়াল নাই?
কিষাণ-মজদুর, লালঝান্ডা-ব্যারিকেড সংঘর্ষ লইয়া উত্তেজক কাব্য-রচনার হুকুম কেহ কোনোদিন শ্রীযুত সেনকে দিয়াছেন কিনা জানি না, বোধহয় এ অভিযোগ শ্রীযুত সেনের স্বকপোলকল্পিত। কিন্তু কেহ যদি বিপ্লবী-কবিযশাকাঙ্ক্ষী কাহাকেও সমাজের অগ্রগামী বিপ্লবীশ্রেণীর জীবন বৈপ্লবিক ভঙ্গীতে দেখাইবার অনুরোধ করেন, তবে কি তাঁহার অনুরোধ অযৌক্তিক হইবে? শ্রীযুত সেন বলিবেন, তিনি বিপ্লবী কবি বটে তবে বিপ্লবীশ্রেণীর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা তাঁহার নাই, অর্থাৎ কেবলমাত্র রাষ্ট্রিক ক্ষেত্রে বিপ্লবী আন্দোলনে যোগদান করিতে হইলে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার প্রয়োজন, সাহিত্যে কিংবা কাব্যে নহে। Revolutionary trainning এড়াইয়া বিপ্লবী সাজিবার ইহা এক অদ্ভুত কৌশল। শ্রীযুত সেনের এ ফাঁকিকেও না হয় আমরা ক্ষমা করিলাম, কিন্তু যে মধ্যবিত্ত জীবনের সহিত তাঁহার জন্মগত ও প্রাত্যহিক পরিচয় তাহার গলিত, স্থবির ও নপুংসক রূপটিই তাঁহার চোখে পড়িল, অথচ ইস্পাত-কঠিন যে অংশ ব্যক্তিগত ভাবাদর্শে কিংবা নিষ্ঠুর পারিপার্শ্বিকতার আঘাতে বিপ্লব-প্রবাহের সহিত আপনাকে মিশাইয়া দিয়াছে ও দিতেছে তাহার কঠোর সুন্দর রূপ, তাহার শ্রেণীবিচ্যুতির বেদনা-ইতিহাস, তাহার বুদ্ধিবিদগ্ধ আশাবাদের কোনো আভাস শ্রীযুত সেনের কাব্যে মেলে না। শ্রীযুত সেন যে কাব্য আন্দোলনের উত্তর-সাধনা করিতেছেন তাহা অতীতে মধ্যবিত্তপরিচালিত বিপ্লবী আন্দোলনকে উপেক্ষা করিয়াছে – অসহযোগ, আইন অমান্য ও সন্ত্রাসবাদের সহিত কোনো সম্পর্কই রাখে নাই, তাই আজ সাম্যবাদী আন্দোলনের সহিত তাহার এই ঐতিহ্যহীন একত্ববোধের পশ্চাতে যে বিরাট প্রবঞ্চনা রহিয়াছে তাহাতে আশ্চর্য হইবার কিছু নাই।
সমালোচনা দীর্ঘ হইয়া পড়িতেছে, এইবার শ্রীযুত সেনের কাব্যিক আঙ্গিক সম্পর্কে কিছু বলিয়া উপসংহার করিব। শ্রীযুত সেনের কবিতা সাধারণের বোধগম্য নহে — কেবলমাত্র ‘chosen few’-এর উপভোগ্য। আমি যথেচ্ছ দুইটি স্থান উদ্ধার করিতেছি : —
আকাশচরের শব্দ আকাশ ভরায়।
নীবিবন্ধে কুটগ্রন্থি,
শিবিরে আর নিবিড় মায়া নেই।
তুষার পাহাড়ের শান্তি যদিচ শিশিরে ঝরে।
কিংবা,
পেস্তাচেরা চোখ মেলে শেষহীন পড়া
অন্ধকূপে স্তব্ধ ইন্দুরের মতো,
ততদিন গর্ভের ঘুমন্ত তপোবনে
বণিকের মানদন্ডের পিঙ্গল প্রহার।
এ কবিতা ‘intelectual clique’-এর জন্য লেখা, আমার আপনার জন্য নহে। পাঠক-সম্প্রদায়ের প্রতি এই সানুনাসিক অবহেলা, আপনার কাব্যকে সর্বসাধারণের উপভোগ হইতে বাঁচাইয়া দুর্বোধ্য করিবার এই গলদঘর্ম প্রয়াস, ইহা আর যাহাই হউক, বিপ্লবী মনোভাবের পরিচায়ক নহে। মসীকৌলীন্যের অভিমানে শ্রীযুত সেন আজ আর্টের প্রচাররূপ ও communicativeness-কে পরোক্ষভাবে অস্বীকার করিতেছেন। রচনার আবেদনের পরিধি সঙ্কীর্ণ হইতে সঙ্কীর্ণতর হইয়া ক্রমে আত্মতৃপ্তিতে পরিণত হইতে বসিয়াছে। এই শম্বুকবৃত্তিকে কি বিপ্লবী প্রচেষ্টা বলিব? ইহা বিপ্লবের নামে individual anarchy-র চরম অবস্থা মাত্র। সমুদ্রপারে subjective individualism-এর যে ঐতিহাসিক আন্দোলন একদা বিপ্লবীরূপে উদ্ভূত হইয়া অবশেষে কালের কঙ্কালপথে বিষাক্ত প্রতিক্রিয়ায় পরিণত হইয়াছে, সাম্যবাদের ছকরূপে ইহা তাহারই অনুকরণহীন অনুকরণ মাত্র।
কাব্যের বিষয়বস্তু, কাব্যের উৎসমুখ, কাব্যের দায়িত্বের প্রশ্নকে ছাপাইয়া আজ কাব্যের আঙ্গিকের প্রশ্ন বড় হইয়া উঠিয়াছে। যৌবনের তাগিদে বল্কল পরিবর্তনের প্রয়োজন হয়, খুশিমতো বল্কল পরিবর্তন করিলে সঙ্গে সঙ্গে দেহেরও পরিবর্তন হইবে ইহা মনে করা বাতুলতা। বিষয়বস্তুর অভিনবত্বে ও অভ্যন্তরীণ তাগিদেই আঙ্গিকের পরিবর্তন হইবে, ইহার জন্য সচেতন প্রচেষ্টা হয় নির্বোধ কালক্ষয় নতুবা সংগ্রাম এড়াইবার প্রচেষ্টা। Technique fetishism-এ ইহার অনিবার্য পরিণতি। ঘোড়া আসিলে চাবুকের জন্য ভাবিতে হইবে না। স্বল্পপরিসর প্রবন্ধে আমারদের বক্তব্য যথাযথভাবে বলিবার সুযোগ মিলিল না, বারান্তরে এ সম্বন্ধে আরও লিখিবার ইচ্ছা রহিল। ইতিমধ্যে শুধু এই কথাটি পাঠককে স্মরণ রাখিতে বলি যে, ইন্টেলেক্টুয়ালী কুসংসর্গ হইতে সাম্যবাদের সাবধান হইবার দিন আসিয়াছে। (চলবে)