The First Crusade — The Call from the East : Peter Frankopan, translate Biswendu Nanda
দশ
ক্রুসেডের আত্মা দখলের লড়াই
জেরুজালে বিজয় তো দূরস্থান, তার দেওয়াল চত্ত্বের পৌঁছনোর আশা যে বাহিনী ছেড়ে দিয়েছিল, তাদের সেনারা হঠাতই এক রাতের মধ্যে মহত্তম জয় অর্জন করে হতবাক হওয়ার মত অবস্থা তৈরি হল। কেরবোঘার বিরুদ্ধে বিজয় চমকে দেওয়ার মত ঘটনা বললেও অত্যুক্তি হয় না। যুদ্ধে অংশ নেওয়া সেনা বুঝতেই পারছিল না, কীভাবে তারা এই অসম যুদ্ধে জয়ী হতে পারল। যুদ্ধে অংশ নেওয়া আগুলিয়ার রেমঁদ বললেন কেরবোঘার পালিয়ে যাওয়া আদতে খ্রিষ্টিয় বাহিনীর ওপর সর্বশক্তিমানের আশীর্বাদ বর্ষণ, যার ফলে খ্রিষ্টিয় বাহিনী ধর্মদ্বেষীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে উদ্বুদ্ধ হল। আরেক প্রত্যক্ষ্যদর্শীর লিখল এই বিজয় ঐশ্বরিক শক্তির হস্তক্ষেপ, ছাড়া অসম্ভব ছিল — আকাশ থেকে সন্ত জর্জ, মার্কুইস এবং দিমেত্রিয়াসের নেতৃত্বে অসংখ্য সাদা পোষাক পরিহিত নাইট যুদ্ধস্থলে নেমে এসে ক্রুসেডারদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ লাগিয়ে যুদ্ধ করেছেন (৪৩)। আরেক পঞ্জিকাকারের বক্তব্য সদ্য উদ্ধার হওয়া স্মৃতিবস্তুই, কেরবোঘার বাহিনীর মধ্যে ভয়ের ঠান্ডা স্রোত বইয়ে ক্রুসেড বাহিনীকে জিততে সাহায্য করেছে; যে মুহূর্তে কেরবোঘা এই ক্রুসটার অস্তিত্ব জানতে পেরেছে, তার পালানো ছাড়া অন্য কোনও উপায় ছিল না (৪৪)। সমসাময়িক আরবি পঞ্জিকাকারও যুদ্ধে অসম্ভব হারের যুক্তি দিতে পারেন নি। কেরবোঘা মাথা গরম সেনাপতি হিসেবে বিখ্যাত ছিলেন, বাহিনীতে মোটেই জনপ্রিয় সেনানায়ক ছিলেন না, তাছাড়া আমীরেরা তার সম্বন্ধে খারাপ ধারণা পোষণ করত; বিশেষ করে তিনি ধরাপড়া নাইটদের হত্যা না করার নির্দেশ দেওয়ায় তার বিরুদ্ধে ক্ষোভ জমা হচ্ছিল। তাকে হারিয়েছে তার বাহিনীর সেনাদের ক্ষোভ, তারা প্রথম সুযোগেই তাদের সেনানায়ককে হারানোর সুযোগ খুঁজছিল (৪৫)।
কেরবোঘার বাহিনীর ধ্বংস হয়ে যাওয়া যদিও অনেকের কাছে, বিশেষ করে ক্রুসডারদের কাছে অলৌকিক ঘটনা মনে হচ্ছিল, কিন্তু তাদের জয়ের বেশ কিছু বাস্তব কারনও যে ছিল সে তথ্য অস্বীকার করার উপায় নেই। তুর্কি বাহিনীর মধ্যে তৈরি হওয়া দ্বিধা আর বিভ্রান্তির জন্য দায়ি অযোগ্য নেতৃত্ব আর আক্রমনের খবর ছড়িয়ে দেওয়ার অযোগ্যতা। হাতে গোণা বাহিনী নিয়ে ক্রুসেডারেরা ব্যুহ বানিয়ে বিপক্ষ বাহিনীর ভিতরে প্রবেশ করাতেই দ্রুত আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে, তুর্কি বাহিনীর বহু সেনার ধারণা হল তাদের বাহিনী হারের মুখে, সেনাদের অধিকাংশ পালিয়ে যাচ্ছে এবং বাহিনীর অন্য সেনাপতি তাদের বাহিনীর মোট সংখ্যা ভুলে নিজেদের বাহিনী বাঁচানোর জন্যে কেরবোঘার থেকে নির্দেশ আনাতে চেয়ে আরও সমস্যার সৃষ্টি করে।
ক্রুসেড বাহিনী ক্ষিপ্র, শৃংখলাবদ্ধ এবং যোগ্য নেতৃত্বাধীন — তারা উপযুক্ত ব্যুহ রচনা করে এবং সেই ব্যুহকে শেষ অবদি ধরে রাখার সক্ষমতায় অসামান্য বিজয় সম্পাদন করতে পেরেছে। পশ্চিমিরা তিনটে মুসলমান বাহিনীর বড় আক্রমন রোধ করে এন্টিওকে স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতে পারল। তাদের আর ভয়ের কিছুই রইল না; তাদের বুঝতে বাকি ছিল না যে সর্বশক্তিমান তাদের দিয়ে এই কজগুলো করিয়ে নিচ্ছেন। এখন পবিত্র শহর খ্রিষ্টদের হাত আসা শুধু সময়ের ব্যাপার।
আন্টিওকের অলৌকিক যুদ্ধ জয়ের উত্তর সময়ে ক্রুসেড নেতৃত্ব আগামী সময়ের অবস্থা আঁচ করতে বৈঠকে বসলেন। সিদ্ধান্ত হল শীত না পড়ল দক্ষিণে জেরুজালেমে অভিযান করা উচিৎ হবে না, অভিযানে যাওয়ার আগে তাদের নতুন করে শক্তি সঞ্চয় করতে হবে। এন্টিওক শহরের মধ্যেই মূল দূর্গেরও পতন ঘটল এক সময়। একই সঙ্গে আশেপাশের মানুষজন নতুন করে শহরে খাবার ইত্যাদি রসদ পাঠাতে শুরু করায় বাহিনীর মনোবল বাড়ল।
জেরুজালেমে যাত্রা শুরুতে দেরির সিদ্ধান্ত নেওয়ার অন্যতম কারন ছিল নিজেদের ঘর গুছিয়ে নেওয়া। পঞ্জিকাকার আগুলিয়ারের রেমঁদ বললেন বিজয়ের এই ধারাটাকে বজায় রাখতে খুব তাড়াতাড়ি জেরুজালেমের দিকে যাত্রা করা উচিৎ। তিনি নিশ্চিত ছিলেন বাহিনী যদি সরাসরি পবিত্র শহরের দিকে যাত্রা করে তাহলে পথের মধ্যে তাদের আটকাবার মত কোনও শক্তি আর টিকে নেই, তার আরও যুক্তি কেরবোঘার হারের পর সিরিয়া এবং প্যালেস্টাইনের জনগণ এতই ভয়ে আছে যে পশ্চিমি নাইটদের বাহিনীর দিকে কেউ একটা পাথর ছোঁড়ার সাহস পাবে না (৪৬)। বাহিনীর যাত্রা শুরুর দেরি হওয়ার আরও একটা বড় কারন ছিল এন্টিওকের ভাগ্য নিয়ে নেতৃত্বের মধ্যে একমত না হওয়া। প্রশ্ন উঠল এন্টিওক এবং অন্যান্য শহর এলাকা, দুর্গের নিয়ন্ত্রণ কীভাবে সাধন হবে? স্থানীয় মানুষ বিশেষ করে অধিকাংশ জনগণ যেখানে মুসলমান, তাদের থেকে নিয়মিত রসদ সরবরাহের পাওয়ার নিশ্চয়তা কী? বাইজান্টিয়াম সীমানার বাইরে ব্যক্তিগতভাবে শহরগুলোর দায়িত্ব কে কে নেবে? অভিযানের মূল উদ্দেশ্য কী জেরুজালেমের পতন, না কী বাহিনীর অন্য কোনও গোপন উদ্দেশ্যও রয়েছে? বোঝা যাচ্ছিল কেরবোঘার বিরুদ্ধে জয়ের পরের কয়েকটা মাসের ক্রুসেডারদের আচরণ প্রথম ক্রুসেডের ভাগ্য নির্ধারণ করবে।
এই সমস্যার কেন্দ্রে রয়েছে ব্যক্তি বোহেমোঁর এন্টিওকের দখল রাখার উদগ্র ইচ্ছে বনাম তুলোসির রেমঁদের সব শহর আলেক্সিওসকে ফিরিয়ী দেওয়ার শপথ রক্ষার বিবাদ। তার বক্তব্য, ভূমি বিজয়ে লক্ষ্য না রেখে, ক্রুসেডের জন্যে আসা বাহিনীর পক্ষে জেরুজালেম মুক্ত করার অভিযানের লক্ষ ঠিক রাখা গেলে ক্রুসেডের পবিত্রতা, সততা রক্ষা করা যাবে। দুই প্রখ্যাত নেতৃত্বের দ্বন্দ্বে বাহিনীতে অচলাবস্থা তৈরি হল। বোহেমোঁ এন্টিওকের দিকে যাত্রা করতে অস্বীকার করলেন; বোহেমোঁ যতক্ষণনা তার দাবি ছাড়নছে, ততক্ষণ রেমঁদ জেরুজালেমের দিকে যাত্রা করতে সম্মত হচ্ছিলেন না।
ক্রুসেডের উদ্দেশ্য কী পাল্টে যেতে শুরু করল? এতদিন বাহিনীর নেতৃত্ব যুদ্ধক্ষেত্রে আর নিজেদের মধ্যে যুক্তবৈঠকে অসামান্য একতা প্রদর্শন করেছেন। কিন্তু এন্টিওক দখল হওয়ার পরে নেতৃত্বের পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বিতা আর উচ্চাকাঙ্ক্ষা প্রকট হওয়ায়, ক্রুসেড বাহিনীর মূল লক্ষ ধ্বংস হওয়ার মুখে দাঁড়িয়ে। কেরবোঘার বিরুদ্ধে বিজয়ের পর নেতৃত্বের পক্ষ থেকে একটি অস্বাভাবিক ঘোষণা ছড়িয়ে দেওয়া, যারা এই অভিযানে অংশ নিয়েছেন, সর্বশক্তিমানের ইচ্ছে অনুসরণ করে প্রত্যেকে নিজেদের ইচ্ছে মত পথ বেছেনিন; এই ঘোষণায় প্রমান হল, ক্রুসেড বাহিনী ভিতর থেকে কী পরিমানে ভাগ হয়েছিল। পশ্চিমে যে সব নৈতিকতা বিপুল গুরুত্ব পায়, যেমন ঐতিহ্যর বন্ধন, আনুগত্য, সম্পর্ক, সব কিছু শুধুই এলোমেলো হয়ে যায় নি, ধ্বংস হয়ে যাচ্ছিল। এই নাটকীয় নীতিহীনতার পরিবেশে যাত্রা বজায় রাখার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ত করার সুযোগ পেলেন রেমঁদ; তার সঙ্গীদের কাছে রেমঁদের জনপ্রিয়তা, সম্মান অনেক বেড়ে গেল, অনেকেই তাঁর বাহিনীর সঙ্গে নতুন করে জুড়ে গেলেন (৪৭) যেমন জেস্টা ফ্রাঙ্কোরামের অনামা লেখক, যনি বোহেমোঁর সঙ্গে দক্ষিণ ইতালি থেকেই বাহিনীতে ছিলেন, কিন্তু তাঁর জেরুজালেম যাত্রায় ইচ্ছে নেই বুঝে রেমঁদের বাহিনীতে যোগ দিলেন।
উদ্ভুত অবস্থার সুযোগে অন্য ক্রুসেডারও আখের গুছিয়ে নিতে শুরু করলেন। এন্টিওকে বহুদিন অবরোধে অসুস্থ হয় পড়া বহু দুর্দশাগ্রস্ত পদাতিক সেনা এবং নাইট শিবির ছেড়ে বল্ডউইনের আর্থিক সুযোগ এবং বাহিনীতে চাকরির প্রতিশ্রুতিতে এডেসার দিকে রওনা হলেন (৪৮)। বল্ডউইনের ভাই গডফ্রে টেলবাশিরের (বা তুর্বেসেল — অনুবাদক) মত স্থানীয় বেশ কিছু দুর্গ আর শহর দখল করে তাদের থেকে অর্থ আদায় করে নিজের বাহিনীর মধ্যে ভাগ করে দিচ্ছিলেন। এতে বাহিনীর মধ্যে গডফ্রের জনপ্রিয়তা বাড়ল এবং অনেকেই অর্থ পাওয়ার আশায় তার বাহিনীতে যোগ দিতে চাইল। এমন কী নিচের দিকের থাকবন্দীর নাইটেরা ঝোপ বুঝে কোপ মারতে শুরু করল। রেমঁদ পিলেট একটি বাহিনী তৈরি করে সেনাদের সহজে লুঠের মাল ভাগ করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে স্থানীয় উর্বর জাবাল আস-সুমাক উপত্যকায় নিয়ে গেল। শুরুতে সাফল্য এলেও শেষে ১০৯৮-এর জুলাইতে ভুল খবরে মাররাত আন-নুমান শহর আক্রমন করে লুঠ করতে গিয়ে গোটা বাহিনীই ধ্বংস হয়ে গেল (৫০)। (চলবে)