আমার বক্তব্য কানামামা যখন জানেন তিনি কানা (অর্থাৎ, এ সম্পর্কে তাঁহার কনশাসনেস আছে) এবং ছানি কাটানো যখন তাঁহার আয়ত্তাধীন তখন অন্ধ অবস্থায় নিষ্ক্রিয় বিলাপ-বিলাসে দিন যাপন করা বিপ্লবে বিশ্বাসী কানামামার পরোক্ষে বিপ্লব-বিরোধিতা। অতএব, ছানি না কাটিলে ভবিষ্যৎ ইতিহাস ইহাকে মূল্য দেওয়া দূরের কতা, সমাজ-বিপ্লবের যুগে ডিমর্যালাইজড পেটিবুর্জোয়া-এর এই স্বার্থপর সংক্ষোভের প্রতি হয়ত কোনো মনোযোগই দিবে না। না হয় বড় জোর উহার কাপুরুষ পলায়ন প্রবৃত্তিকে ঘৃণার সহিত অঙ্কিত করিবে। এবং সে সময় ‘নির্বোধ’, ‘প্রবঞ্চক’ ইত্যাদি ছাড়া অন্যান্য বিশেষণ সাম্যবাদী সাহিত্যের অভিধানে পাওয়া যাইবে সত্য (এখনো যায়) কিন্তু ঐ দুইটি বিশেষণও থাকিবে। যদি সাম্যবাদী-অসহিষ্ণু অথচ অনেষ্ট কোনো বুদ্ধিজীবীর রচনার সমালোচনা আমাকে করিতে হইত, তবে আমাকে আরও অবজেক্টিভ আরও ব্যাপক ও আরও নৈর্ব্যক্তিক হইতে হইত, কিন্তু, সাম্যবাদে বিশ্বাসী ও সাম্যবাদী আন্দোলনের সহানুভূতিশীল শ্রীযুত সেনের কাব্যের আলোচনায়, আমি কতকগুলি কাব্যের বিশেষণ ইচ্ছা করিয়াই ব্যবহার করিয়াছি, এই প্রসঙ্গে মার্ক্সিস্ট সমালোচনার নামে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও নিস্ফল আক্রোশের অভিযোগ আনিয়ে শ্রীযুত সেন ব্যবহারিক সুরুচি ও মানসিক শুচিতার পরিচয় দেন নাই।
গত দশ বছরের বাংলা কবিতায় প্রগতি (?) আলোচনা আমি পূর্বে করিয়াছি এবং তৎসম্পর্কে ‘To be able to preserve one’s personal integrity’-র (Ibid) তাৎপর্যও দেখাইয়াছি। এই personal integrity সংরক্ষণ সম্পর্কে শ্রীযুত সেন আধুনিক ইংরেজী কাব্য হইতে ইলিয়টকে নজীর টানিয়েছেন ও ইলিয়টী কাব্যের দুর্বোধ্যতা ও সভ্যতার ক্ষয়িষ্ণুতা সম্পর্কে সুতীব্র চেতনার বিশেষভাবে উল্লেখ করিয়াছেন। ইহার মধ্যে গত দশ বছরের বাংলা কাব্যধারার সহিত ইলিয়টের কাব্যধারার সমান্তরালতা প্রদর্শনের ইঙ্গিত পাঠকমাত্রের নিকট স্পষ্ট হইয়া উঠে। অবশ্য যাঁহারা ভারতীয় বা বঙ্গদেশীয় অবস্থা সম্পর্কে ‘বুর্জোয়া যুগ’ ‘বুর্জোয়া সভ্যতা’ ‘বুর্জোয়া সমাজ’ ‘বুর্জোয়া কবি’ প্রভৃতি শব্দ ব্যবহার করিতে বিন্দুমাত্র ইতস্তত করেন না, তাঁহাদের নিকট হইতে ইহার বেশি আশা করাও অন্যায়; ঐতিহাসিক বস্তুবাদ যে বহু কমরেডকে ইতিহাস পাঠের পরিশ্রমের হাত হইতে নিষ্কৃতি দিয়াছে, একথা একদা ফ্রেডরিশ এঙ্গেলস বহু দুঃখেই বলিয়াছিলেন। আমার বক্তব্য ছিল বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় ও তৃতীয় দশকে ইংল্যান্ডে বসিয়া সভ্যতার ক্ষয়িষ্ণুতা সম্বন্ধে যে মনোভাব বা অ্যাটিটুড লইয়া ইলিয়ট কাব্য রচনা করিয়াছেন তাহার সুরিয়ালিজম ও অ্যার্নাকিস্ট রূপ ব্রিটেনের সমাজবিপ্লবের বিন্দুমাত্র সহায়ক নয়, বরঞ্চ তাহার ফ্যাসিস্ত ভাবাদর্শে পরিণতিই স্বাভাবিক বেশী। পরবর্তী সাম্যবাদী লেখক তাঁহার কাব্যের কতটুকু বৈপ্লবিক সদ্ব্যবহার করিতে সক্ষম হইবেন সে প্রশ্ন এখানে অবান্তর, স্পেংলার ও হাক্সলির লেখা পড়িয়াও অনেক বিপ্লবীর উপকার হইতে পারে, তাহাতে আশ্চর্য হইবার কিছুই নাই। কিন্তু উদ্দেশ্যহীনভাবে যে ডেকাডেন্স নিঙড়ায়, তাহার কপালে (অন্যের নয়) যে তাহা হইতে এক ফোঁটা বিপ্লবও জোটে না, বরঞ্চ ভয়াবহ ফ্যাসিস্ত ভাবাদর্শে পরিণত হয়, যে বঙ্গীয় কবিগোষ্ঠী ইলিয়টী ঢং-এ কাব্য রচনা করিয়া ভবিষ্যৎ বিপ্লবী কাব্যের ভিৎ রচনা করিতে চাহিতেছেন, একথা তাঁহাদের মনে রাখা উচিত; তাঁহারা যেন নিজের ভবিষ্যৎ আগে ভাবিতে বসেন। ইংল্যান্ডের সামাজিক পরিমন্ডলীতে ইলিয়টের হয়ত কোনো সামাজিক উপযোগিতা আছে, বাংলাদেশে ইলিয়ট সম্পূর্ণ সমাজসম্পর্কহীন, তাঁহার অবস্থা কলিকাতার ছাদের টবে বিলাতী মৌসুমী ফুলের মতো। কাব্যে ঐতিহ্যবাদী ইলিয়টের সহিত বঙ্গীয় কাব্যের কোনো ঐতিহ্যগত সম্পর্ক নাই। তথাপি যদি কাব্য বিপ্লবের হাবিলদার সাজিবার জন্য বাংলাদেশের কাব্যবেদীতে ইলিয়টের প্রতিষ্ঠা করেন, তবে তাঁহাদের প্রবঞ্চকই বলিব। এই নজীর প্রদর্শনের মধ্যে মমত্ববোধ ও একত্ববোধ যে পুরামাত্রায় রহিয়াছে তাহা যে-কোনো পাঠকের চোখে পড়িবে। কর্নফোর্ড, কডওয়েল ও হেন্ডারসনের লেখায় কোথায় ইলিয়টকে বিপ্লবী-কাব্যের পুরোধা বলা হইয়াছে, জানাইলে সুখী হইব। কডওয়েলের ইল্যুশন অ্যান্ড রিয়ালিটি যদি সাম্যবাদী সমালোচনার স্ট্যান্ডার্ড হয়, তবে অডেন, স্পেন্ডার ও ডে-লুইসকে সাম্যবাদী লেখক বলা চলে না, অতএব উহাদের রচনা বিতর্কের মধ্যে না আনাই ভালো। ইংল্যান্ডের সাম্প্রতিক কাব্যের সমালোচনায় কর্নফোর্ডের কথাটা আবার স্মরণ করি: ‘There is no middle position between Revolution and Reaction.’ এই মূলসূত্রই ‘ইউনাইটেড ফ্রণ্ট’ আন্দোলনের ভিত্তি।
উপসংহারে শ্রীযুত সেন বলিয়াছেন, ‘বাংলাদেশের আজ যে অবস্থা তাতে অগ্রগামী ব্লক রাতারাতি গুন্ডাব্লকে পরিণত হলেও বাহবা পায়। যে গালি-গালাজ, যে উগ্র বামপন্থা আজ সাম্যবাদের নামে সমালোচনা-সাহিত্যে আস্ফালনরত সেটা পূর্বতন বাঙালি সন্ত্রাসবাদের দায়ভাগ।’
কথাটা সাম্যবাদীগণ বলেন, শ্রীযুত সেনও বলেন, আমিও বলি। কিন্তু কথাটির সত্যতা নির্ভর করিতেছে কনটেক্স-এর উপর। কঠোর বিরুদ্ধ সমালোচনাকারীকে কৌশলে সাম্যবাদ-বিরোধী দলভুক্ত বলিয়া প্রচার করিয়া শ্রীযুত সেন কি ভারতবর্ষের অফিসিয়াল সাম্যবাদের সমর্থন এ সহানুভূতি লাভ করিতে চাহেন? কারণ এই অতিসত্য উক্তিটি এত অবান্তর, এত অসঙ্গত ও এত অপ্রত্যাশিত যে ইহাকে অপকৌশলী ডিমাগগী ছাড়া আর কোনো আখ্যা দান সম্ভব নহে।
বাংলা কবিতা : সমর সেন
কবিতার সঙ্গে সমাজের সম্পর্ক কী সেটা স্পষ্টভাবে বলা কঠিন। অনেকে বলেন কবিতা আসে শুধু অন্তঃপ্রেরণার তাগিদে। কথাটি বলা সহজ, কিন্তু সঠিক নয়, কারণ অন্তঃপ্রেরণা অন্তরের জিনিশ নয়, তার মূল উৎস বিশাল ও বিক্ষুদ্ধ বহির্জগত। এ-সূত্রে কবিতার ভাষা ও ভাষার ব্যক্তিগত, স্বতন্ত্র ব্যবহারের কথা উল্লেখ করতে পারি। আমরা কোনো বিশেষ সমাজে বিশেষ সমাজে জন্মাই, এবং সামাজিক জীব হিশেবে প্রচলিত কোনো ভাষা ব্যবহার করি। কিন্তু কবিতা লেখার সময় সে-ভাষার উপরে যে স্বতন্ত্র ছাপ পড়ে তার নাম ডিকশন, এবং এই স্বতন্ত্র ব্যবহারের শক্তি কবির পুরুষকারের পরিচায়ক। অথচ এই পুরুষকার কাজ করে বহু শতাব্দীর শ্রমলব্ধ জটিল ব্যাকরণের সাহায্যে, এবং একটি বিশেষ সামাজিক পরিস্থিতির পটভূমিকায়। কবিতা অনেকটা নাটকীয় স্বগতোক্তির মতো, কিন্তু কাব্যবিচারে আমরা নাটকের কথা ভুলে যেতে চেষ্টা করি কিংবা অস্বীকার করি। পারপার্শ্বিকের উপর নির্ভরতা অস্বীকার করা অসম্ভব। পারিপার্শ্বিকের প্রভাব বিশিষ্টভাবে উপলদ্ধি করা, মেনে নেওয়া স্বাধীনতার সূত্রপাত।
এখনো অনেকে বিশুদ্ধ কবিতায় সম্পূর্ণ আস্থা রাখেন; এঁরা হচ্ছেন পূর্বযুগের ক্রিশ্চানদের মতো, যাঁরা কুমারী মেরীর বিশুদ্ধ গর্ভধারণে সর্বান্তঃকরণে বিশ্বাস করতেন। কবিতার কারণ এঁদের কাছে অনাবিল অন্তঃপ্রেরণা, অন্তঃপ্রেরণা এঁদের কাব্যলোকের নিরাকার ব্রক্ষ্ম, একমেবোদ্বিতীয়ম্। একটি সহজ সত্য এঁরা ভুলে যান যে ভিতরের প্রেরণা যদি কবিতার মূল এবং একমাত্র উৎস হতো তাহলে প্রতিবছরে, প্রতিমাসে, প্রতিসপ্তাহে মহৎ কবিতা রচিত হবার পথে কোনো অন্তরায় থাকতো না। কাব্যের ইতিহাসে অন্তরায় আসে, তার কারণ কবিতা বিশুদ্ধ কল্পনা নয়, পরিবর্তনশীল সমাজগতির, স্থানকালপাত্রের মুখাপেক্ষী, এবং মুখাপেক্ষী হলেও মাঝে-মাঝে সমাজের মুখ-বদলানোর কাজে সাহায্য করতে পারে। সামাজিক পরিস্থিতি এবং অন্তঃপ্রেরণার মধ্যকার আত্মীয়তার জটিল কিন্তু অনস্বীকার্য। আমরা কিন্তু একটিকে মানলে অপরটিকে অবহেলা করি, মনে করি কাব্যের ঈশ্বরকে মানলে সমাজের কুবেরকে মানা অসম্ভব।
এ-সব কথা বলার প্রয়োজন বিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে বোধ করি নেই, কিন্তু বাংলাদেশে যাঁরা কবিতা লেখেন তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি বিচার করে দেখলে এ-কথা সহজে বোঝা যায় যে কাব্যবিচারের পার্থক্য প্রকৃত কাব্যরচনাকে কীভাবে প্রভাবান্বিত করে। যাঁরা বিশুদ্ধ সাহিত্যে বিশ্বাস করেন, এবং তাঁদের সংখ্যা বাঙালি কবিদের মধ্যে এখনো বেশি, তাঁধের লেখায় ভারসাম্য ক্রমশই কমে আসতে থাকে, এবং তাঁদের প্রতিভা শেষ পর্যন্ত কয়েকটি ম্যান্যারিজমের প্রকাশে, পুনরাবৃত্তিতে পরিণত হয়। ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি না-থাকলে কাব্যে মূলসূত্র খুঁজে পাওয়া অসম্ভব, এবং মূলসূত্রহীন কাব্য এক ধরণের মস্তিষ্কবিকৃতির নামান্তর। (আগামীকাল শেষ পর্ব)