হোম স্টে থেকে একটু আগে একটি ছেলে এসে খবর দিয়ে গেল যে, রাতের খাবার তৈরী হয়ে গেছে। সাড়ে নটা নাগাদ আমরা রুটি, ডাল, নিরামিষ তরকারি দিয়ে খাবার পর্ব চুকিয়ে ঘরে এলাম।
সবাই গল্প করতে করতেই তাতাই বললো, ও দুদিন ওয়ার্ক ফ্রম হোম করবে, তাই আমরা যেন নিজেরা ঘুরে বেড়াই। ওর সময় হবে না।
মনে মনে ভাবছি, কাল ভোরে উঠবো। ভোরবেলার দৃশ্য দেখবো না এমন সুন্দর জায়গায় এসে, তা কি হয়? আমাদের বাড়ির লোকেরা শীতকালে কদাচিৎ ভোরের হাওয়া গায়ে মাখতে ময়দানে যাওয়া আসা করি। আর ছেলেদের ছোটবেলায় স্কুলের তাড়ায় উঠতে হতো সকালে। এরা বড় হয়ে যাবার পরে সেই তাড়া তো আর নেই। তাই যেভাবেই হোক, কাল তো উঠবোই ভোরে।
মন চঞ্চল থাকলে কিছুতেই মন বসে না। তাই সতর্ক হয়ে ঘুমিয়েছি, যদি সকাল হয়ে যায়, আমি জেগে ওঠার আগে। ভোর আর সকালের একটা তফাৎ তো আছেই, যেটা নিজের চোখে না দেখলে অনুভব করা যায় না।
সাড়ে তিনটে নাগাদ ঘুম ভেঙে গেছে, বিছানার ঠিক পাশেই জানালা, পর্দা ঢাকা। পর্দা সরিয়ে দেখি, পঞ্চমীর চাঁদ আকাশে। তখন কাচের জানালা খুলিনি, পাছে আওয়াজে সকলের ঘুম ভেঙে যায়। যেহেতু এখানে নিজের বাড়ির মতই ব্যবস্থা, তাই নিরাপত্তার অভাব তো নেই। আস্তে করে দরজা খুলে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম।
গ্রিল দেওয়া বারান্দা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখলাম অল্প চাঁদের আলোতে হাল্কা অন্ধকার মিলেমিশে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে আছে। বড্ড মায়াময় এই আকাশ, বাতাস, আলো আঁধারির পৃথিবী। ঘরের দিকে একবার তাকিয়ে দেখলাম, ছোটো ছেলেটা এই কিছুক্ষণ আগে রাত্রি দেড়টা নাগাদ তার অফিস সেরে ঘুমাচ্ছে। বড় ছেলেটা তো কাছে থাকে না, আজ প্রায় পাঁচ/ছয় বছর হলো। মনের ভিতরটা কেমন হু হু করে উঠলো ছেলেটার কথা ভেবে। চোখ ফেটে জল আসে। আমি তো বেড়াতেই এসেছি, কিন্তু বড় ছেলের অভাবটা যেন খুব বেশি করে বোধ হচ্ছে, সবসময় তো মনকে বোঝাই, ওদের জীবনের একটা গতি আছে, মায়ের আঁচলের তলায় বসিয়ে রাখলে তো হবে না। ওদেরকে ওদের মত চলতে দিতেই হবে।

এইসব ভাবতে ভাবতেই আকাশের রঙ ফিকে হতে শুরু করেছে। অনেক দুরে পাহাড়ের গায়ে লাল আভা। ধীরে ধীরে সেই আলো পাহাড়ের ওপার থেকে উপরের দিকে উঠছে। সামনে তাকালে তো আদিগন্ত ধানের ক্ষেত।
অঞ্চলটায় আদিবাসীদের বসবাস আছে, সবাই খুব সাদামাটা জীবন যাপন করে। এই সকাল, তার হৃদয়ের দরজা সকলের জন্যে খুলে দেবার আগেই কয়েকজন মেয়ে এবং পুরুষ হেঁটে হেঁটে আসছে, তাদের পিঠে কিছু বাঁধা, হয়তো কিছু কাজের জিনিস হবে, দেখি তারা এসে বড় রাস্তার ধারে দাঁড়ালো, দেখতে দেখতে দলটা কুড়ি/পঁচিশ জনের হয়ে গেল, আর হঠাৎ একটা গাড়ি এসে তাদের সকলকে নিয়ে চলে গেল।
পরে এখানে জিজ্ঞাসা করে জানলাম, ওরা চা বাগানে কাজ করতে যায়। তখন মনে হলো এখানে চা বাগান তো দেখেছি অনেক।
মাঠের দিকে তাকিয়ে দেখি, বেশ কিছু লোক বসে দাঁড়িয়ে আছে। একটা গাড়ি এল, ঠিক ওই ট্রাকটরের মত দেখতে, ওমনি সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়লো, ক্ষেতের মধ্যে কেটে রাখা ধান সব ওই গাড়িতে চালান হচ্ছে, আর কিছুক্ষণ পরেই মাটিতে বিছিয়ে রাখা বিরাট প্লাস্টিকের চাদরের উপরে ধান ঝাড়া হয়ে পড়ে যাচ্ছে। এইরকম মেশিনে ধান ঝাড়া তো দেখি নি আগে কখনো। এক ঘন্টার মধ্যেই কয়েক বস্তা ধান বাঁধা ছাদা শেষ হলো এবং অন্য আর একটি গাড়ি এসে তা নিয়েও গেল। কিছু ছোটো ছোটো ছেলে মেয়ে গরুর পাল কে তাড়া করে যাচ্ছে, খেলছে। বেশ আছে এরা, স্কুল যাবার কোনো তাড়া নেই, বকুনি নেই, নিষ্ঠুর প্রতিযোগিতা নেই, হিংসা, স্বার্থপরতা নেই। এখানে তো দেখলাম, সকলেরই একটু জমি আছে, ছোটো পুকুর আছে, গাছ পালা আছে, কোনোরকমে পেটের ভাত জুটেই যায়।

বেঁচে থাকার আর পেট ভরার মত অবস্থা হলে জীবন তো কেটেই যায়, সন্ধ্যে হলে নেশা করে প্রায় সবাই। কিন্তু কোথাও তেমন অসভ্যতা দেখিনি।
চারদিকে অজস্র পাখির গান, মুরগির প্রথম ডাক, লাউ আর পুঁই গাছের মাচা সব মিলিয়ে মিশিয়ে এমন একটা সকাল, যা চোখ জুড়িয়ে দিল শুধু নয়, মনের মধ্যে এক অপূর্ব ছবিও এঁকে দিলো রঙ তুলি দিয়ে। “তোমারি গেহে পালিছ স্নেহে তুমি ধন্য ধন্য হে।” ওই পাহাড়ের উল্টো দিকে ভুটান। সৌন্দর্য বর্ণনা করা যায় না।
হোম স্টের লোকজন উঠে পড়েছে। তারা আর ময়না বলে দুটি মেয়ে কাজ করে এখানে, আগেই আলাপ হয়েছিল। এরা একটু দুরের গ্রামে থাকে। সপ্তাহে একবার করে বাড়ি যায়, বাকি দিন এখানেই থাকে।
মুরগির চালা ঘর খুলে দিল তারা। সব দলবল নিয়ে বেরিয়ে পড়লো। ঘর থেকে ঝুড়িতে করে কয়েকটা ডিম নিয়ে বেরিয়ে তার চোখ পড়লো আমার দিকে। হেসে বললো, চা আনবো দিদি?
আমি ঘড়ির দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়লাম। ওদিকে একটা জলা মত আছে, দেখি ময়না তাতে ভাত আর মুড়ি ফেলছে, আমাকে অবাক চোখে তাকাতে দেখে বললো, এইখানে তেলাপিয়া আর শিঙ মাছের চারা ফেলেছে। মাঝে মাঝে তুলে খায় ওরা। আমার সত্যিই মনে মনে নিজের জন্যই কষ্ট হচ্ছিল, এইরকম একটা জীবন পেলে বেশ হতো।
বহু বছর বাদে এমনি একটা সকাল উপভোগ করতে পারছি বলে ঈশ্বরকেও অশেষ ধন্যবাদ দিই মনে মনে।

একটু বেলার দিকে এগারোটার সময় আমি আর অরুণাভ একটা টোটো নিয়ে একটু আশেপাশে বেরিয়ে আসবো বলে বেরোলাম। বানিয়া নদীর ওখানে গিয়ে একটু দাঁড়িয়ে রইলাম, খুব শান্ত পরিবেশ তো, কোথাও কোনো ব্যস্ততা নেই। অখন্ড অবসর আর প্রকৃতির অঢেল সম্পদ চোখ চেয়ে দেখে দেখে আর যেন ফুরায় না। আসলে আমরা যারা সারাজীবন শুধু ছুটে বেরিয়েছি, বেঁচে থাকার তাগিদে, তাদের কাছে এমন নিরিবিলি নির্জনতা খুবই উপভোগ্য। বয়েস তো একটা সময় থামতেই বলে, আমরাই শুনি না কখনো। এখানে এসে এই উপলব্ধিটাই হলো, কেউ যেন বলছে, “এবারে একটু থামতে হবে। অনেক কিছু দেখা শোনা এখনও বাকি আছে, ধীরে চলো, ক্ষতি কি?”
শহরের কোলাহল ছেড়ে এসে এ যেন মুক্তির আনন্দ। কত যে নাম না জানা ফুল, কতরকম পাখি আর তাদের কতরকম গলার আওয়াজ, ভাবাই যায় না। এই সময়টুকু বেঁচে থাকুক আমার প্রাণে, আমার মনে। এই উৎসারিত আলোয় নিজেকে যেন খুঁজে পাই। প্রতিদিন এভাবেই একটা করে নতুন সকাল আসুক আমাদের সকলের জন্যে।
সকাল গড়িয়ে দুপুর। এখান থেকে কুচবিহার যাওয়া যায় সহজেই। তবে আমরা আর গেলাম না। ছেলে অফিস করবে, নিজেরা বেড়াবো, কেমন যেন লাগে। তাই এইখানেই থেকে গেলাম কটা’দিন। আর শরীর মন তো তৃপ্ত। তাই কোথাও না পাওয়ার কোনো অভাব বোধ নেই।
আজ বিকেলে ফেরার পালা। তাই বানিয়া নদী ঘুরে, মথুরা টি এস্টেট-এর ছোট বাজার ঘুরে চলে এলাম আমরা। ফিরে এসে খেতে গেলাম। পটল ভাজা, ডাল, বাঁধাকপির তরকারি আর বাটা মাছের ঝাল, চাটনি আর পাঁপড় দিয়ে। ঘরে এসে একটু বিশ্রাম নিতে না নিতেই বেরোবার তাড়া দিচ্ছে অরুণাভ। কোথাও যাবার ব্যাপার হলেই হলো, প্লেন বা ট্রেন যাই হোক, কম করে চার ঘণ্টা আগে সে বাড়ি থেকে সকলকে তাড়িয়ে নিয়ে বের করবেই। আমার সঙ্গে তো প্রতিবারই ঝগড়া লাগে, কিন্তু উপায় তো নেই। সমঝোতা করতেই হয়, কর্তার ইচ্ছায় কর্ম। শুনলাম, পৌনে ছ’টায় ট্রেন, কিন্তু আমরা চারটের সময় স্টেশনে পৌঁছে গিয়েছি।

অবশেষে গাড়ি চলতে শুরু করেছে। আমার মনে হচ্ছিল, ভাঙলো মিলন মেলা তোমার সঙ্গে। আমাদের পৃথিবী, আমাদের প্রকৃতি, আমাদের মা সবসময় তাদের আঁচল বিছিয়ে বসে থাকে, শুধু আমাদেরই সময় নেই দু দন্ড বসার। কত দিনের কত কথা যে মনে পড়ে যাচ্ছে আমার। সূর্যের আলো ম্লান হয়ে গেছে, আমার মনের ব্যথাটুকুই যেন ছড়িয়ে আছে সর্বত্র। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে মনে হলো, দিগন্ত রেখার প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে কেউ, ডাকছে হাতছানি দিয়ে। মনে মনে বলছিলাম আবার আসবো। শিকড়হীন হয়ে আমরা চিরদিন শিকড়ের সন্ধানেই ঘুরে মরি, আমাদের স্বভাবই এমনি। একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলাম, তাতাই বললো, “মা, ট্রেন তো একদম রাইট টাইমে যাচ্ছে। কালকে ঠিক সময়ে পৌঁছতে পারলে ভালো হয়।”
আমি ফিরে এলাম পূর্ণ বাস্তবে। ভাবতে বসলাম, কাল বাড়ি গিয়ে কি কি কাজ করতে হবে!
ছেলেকে বললাম, “তোর বাবা আর আমার ওষুধগুলো ঠিক মত দিস, আমি তো এত অল্প আলোয় কিছু দেখতে পাই না।”

রাতের অন্ধকারে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখি দুঃখ, অভিমান, সুখ, রাগ, পাওয়া না পাওয়া সব ভেসে যাচ্ছে তরতর করে। কাল সকাল থেকেই নাগরিক জীবনের মুখোমুখি হবার জন্যে প্রস্তুত হচ্ছে মন। সেখানে বিদ্বেষ নেই, ঝগড়া নেই, আছে শুধু বোঝাপড়া।
মনে মনে প্রতিজ্ঞা করি, আবার আসবো তোমার কোলে, তোমার কাছে। সেদিন হয়তো তোমাকে অন্য রূপে অন্য কোথাও পাবো।
এক্সসেলেন্ট, অনবদ্য লাস্ট প্যারাগ্রাফ। এই লেখিকার আরও রচনা পড়ার ইচ্ছে রইলো। অভিনন্দন ও নমস্কার