The First Crusade — The Call from the East : Peter Frankopan, translate Biswendu Nanda
বার
প্রথম ক্রুসেডের ফলাফল
শপথ রাখা না রাখা, পূর্বে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পালন করা বা ভঙ্গ করার অভিযোগ প্রতি-অভিযোযের ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যেও বোহেমঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল এন্টিওক ধরে রাখার অধিকার নিয়ে বাইজান্টিয়াম এবং তাঁর সহযাত্রী ক্রুসেডার নাইট নেতৃত্বের তোলা প্রশ্ন আর অভিযোগের বিরুদ্ধে তার যুক্তিমালা সাজানো আর শানানোও। এই রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা থেকেই সম্রাটের বিরুদ্ধে গোটা দ্বাদশ শতাব্দ জুড়ে ইওরোপিয় লেখকের বিষ ছড়িয়েছেন এই প্রবণতাটা দেখাতে আলেক্সিওস, ক্রুসেডে যাওয়া নেতাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি পালন করছেন না। ঐতিহাসিকেরা উদ্দেশ্য সাধনের জন্যে চরমতম মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে যতটা পারা যায় সম্রাট আলেক্সিওসের চরিত্র হনন করেছেন এবং সেটা উদ্দেশ্যপূর্ণই।
তবে সম্রাট্র চরিত্র হননে জেস্টা ফ্রাঙ্কোরাম বা আগুলিয়ারসের পঞ্জিকা যতটা না কার্যকরী প্রমানিত হয়েছে, তার থেকে ঢের কার্যকর ছিল বোহেমোঁর বিষাক্ত উচ্চগ্রাম স্বর, বিশেষ করে ১১০৪-এর শেষের দিকে তাঁর ইতালিতে ফিরে এসে বাইজান্টিয়ামের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাওয়ার সেনা বাহিনী তৈরি করার উদ্যোগ নেওয়া। ১১০৭-এর আশেপাশে রবার্ট দ্য মঙ্ক, ডোলের বাল্ডরিক এবং নজেন্টের গুইবার্ট ক্রুসেডের ইতিহাস লিখলেন মূলত জেস্টা ফ্রাঙ্কোরামে উল্লিখিত সম্রাটের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক, নেতিবাচক ঘটনাবলী, তথ্য হুবহু ব্যবহার করে। ১০৯৬-এর বিপুল জনগণকে নিয়ে যাওয়া ক্রুসেড যাত্রায় হত্যাকাণ্ড চালানোর খবরে আলেক্সিওসের উল্লাস প্রকাশ করার অভিযোগ ‘কর্তব্যনিষ্ঠ’ভাবে লিখেছে ওপরে উল্লিখিত তিনটি ইতিহাস (৬৪)। জেস্টার থেকে শব্দান্তর করে স্পষ্টভাবে অভিযোগ করা হল, তিনি কাপুরুষ ছিলেন বলেই এন্টিওকের যুদ্ধে বাহিনী পাঠান নি (৬৫)।
এই লেখকেরা জেস্টা থেকে সম্রাটের চরিত্র হনন, এবং তথাকথিত অবহেলা আর ত্রুটির যে কটা উদাহরণ পেয়েছেন সেই তথ্যগুলি তারা শুধুই প্রতিবর্ণীকরণ করে নিজেদের লেখা ইতিহাসে জুড়ে দিয়েছেন। এদের মধ্যে নজন্টের গুইবার্ট ইতিহাস লেখা আর তথ্য তৈরিতে ব্যাপক স্বকীয়তা দেখিয়েছেন। তিনি লিখলেন, সম্রাটের মা ছিলেন ডাইনি, মন্ত্রতন্ত্র প্রয়োগ করে মানুষ মারা আর অতিদক্ষ মহিলা। আলেক্সিওস কঠোর নির্দেশ জারি করে যে সব নাগরিকের একটির বেশি কন্যা সন্তান আছে, তাদের মধ্যে একজনকে যৌনকর্মী হতে বাধ্য করা হয় এবং তাদের খাটিয়ে যে অর্থ পাওয়া যেত সেটি সরাসরি সাম্রাজ্যের কোষাগার সঞ্চিত হয়েছে। কোনও পরিবারের একটার বেশি ছেলে হলে অন্তত একটাকে তিনি সুন্নত করার নির্দেশ দিতেন। তাই বিপুল সংখ্যক যুবার যৌবন হরণ করার পরে, তিনি নিজের সাম্রাজ্য বাঁচাতে পশ্চিমের সাহায্য যে চাইবেন এতে আর আশ্চর্য হওয়ার কী আছে (৬৬)।
এই ধরণের উদ্ভুত সব অভিযোগ জনসমক্ষে পরিবেশিত হইয়েছে দ্বাদশ শতাব্দজুড়ে। তার পরেও যে সব ক্রুসেডের ইতিহাস লেখা হয়েছে তাতেও এই ধরণের নানান অভিযোগ বারবার উল্লিখিত হয়েছে। এই রকম এক ইতিহাসে বলা হয়েছে ১০৮৫-তে আলেক্সিওস রবার্ট গিসকার্ডকে পরাজিত করতে পেরেছিলেন রবার্টের স্ত্রীকে বিবাহ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে রবার্টকে বিষ প্রয়োগ করিয়ে (৬৭)। এই অভিযোগের চরিত্র ধরে অন্য নেতারা তার বিরুদ্ধে আক্রমন শানিয়েছেন, যেমন হোভেডেনের রজার বলেছেন সিকেলগাইতাকে সম্রাট বিয়ে করে রাজ্ঞী পদে বসানোর পরে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারেন (৬৮)।
আলেক্সিওসের বিরুদ্ধে অভিযোগমালা লিপিবদ্ধ করার তীব্রতা বেড়ে চলে দ্বাদশ শতাব্দে। মামসবারির উইলিয়াম লিখছেন এই মানুষটা ‘বিখ্যাত তার সততার জন্যে নয় বরং বিশ্বাসঘাতকতা এবং চাতুরির জন্যে’ (৬৯)। টাইরের উইলিয়াম বেশ কয়েক দশক পরে লিখবেন কোন দৃষ্টিতে সম্রাটকে পূর্বের ল্যাটিন সভ্যতা দেখেছে। আর্চবিশপ লিখলেন আলেক্সিওসকে বিশ্বাস করা যায় না, কারন তিনি ‘কাঁকড়াবিছের চরিত্রের, মুখ দেখে ভয় পাওয়ার কিছু নেই কিন্তু বিষভরা লেজ থেকে নিজকে বাঁচিয়ে রেখো (৭০)’।
এই সব দৃষ্টিভঙ্গী শতাব্দের পর শতাব্দ প্রচারিত হয়েছে। অষ্টাদশ শতকে এডওয়ার্ড গিবন মধ্যযুগের প্রচারে খুবই প্রভাবিত হয়েছেন। তিনি লিখছেন, ‘সম্রাট আলক্সিওসকে শেয়ালের সঙ্গে তুলনা করব, যে সিংহের পদাঙ্ক অনুসরণে তার এঁটো খাদ্য গ্রহণ করে।’ এমনকী তাঁর দাবী সাম্রাজ্ঞী আইরিন তার স্বামীর সম্বন্ধ খুব উচ্চধারণা পোষণ করতেন না এবং তাঁর সেই ধারণা তিনি প্রত্যেককে বলে বেড়াতেন। সম্রাটের প্রয়াণের পর নাকী যে মৃত্যু গাথা তার সমাধির ওপর লিখিত হয় সেখানে নাকী লেখা ছিল ‘তুমি যেরকমভাবে বঁচেছ, সেভাবেই মরলে — কপটাচারী হিসেব (৭১)’।
সম্রাটের খ্যাতি কোনওদিনই উজ্জ্বল হয় নি এবং তার চরিত্র হনন করেই প্রথম ক্রুসেডের ব্যাখ্যা নির্মিত হয়েছে। জেরুজালেম অভিযানের বর্ণনায় সম্রাট সম্পূর্ণভাবে অনুপস্থিত থাকেন, বিশেষ করে ক্রুসড নির্মাণে তার অবদান বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে গিয়েছে এন্টিওক উদ্ভুত বিতর্কে। ল্যাটিন ঐতিহাসিকেরা তাকে উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে পাশে সরিয়ে রেখেছেন — আলেক্সিওস সেই সময় থেকেই ক্রুসেড অভিযানের কুশীলবদের মধ্যে প্রান্তিক চরিত্র হয়েই রয়ে গিয়েছেন।
১১০৮-এ ডায়াবোলিস চুক্তিতে আকেক্সিওসের সাফল্যও তার এই চরিত্র চিত্রণ আরও জোরদার করেছ, ঐতিহাসিকেরা তার দাবিগুলি প্রায় স্বীকার করেছেন বিশেষ করে ক্রুসেডারদের দখল করা এলাকাগুলি আইনি স্বীকৃতি দিয়ে এন্টিওকের মত শহরগুলিতে তার দখলি গুরুত্ব হ্রাস করেছে। যেহেতু বোহেমোঁ সাম্রাজ্যের নতুন ‘নিয়োগ’কে স্বীকৃতি দিয়ে আর এন্টিওকে ফিরে যান নি, তাই নাকি এন্টিওকের ওপর সাম্রাজ্যের কর্তৃত্ব বাস্তবিক না হয়ে ধারণায় থেকে গিয়েছে বলে তারা মনে করেন। টানক্রেডএর কাছে প্রতিনিধি পাঠিয়ে সম্রাটের শর্ত আরোপ করা উদ্যমকেও গুরুত্ব দেওয়া হয় নি; সে সম্রাটের ডায়াবোলিস চুক্তির দাবি মানতে অস্বীকার করে প্রতিনিধিকে বলেছে যদিও তার বিপক্ষ দল এন্টিওকে আগুণে হাত নিয়ে আসে তাহলেও সে এন্টিওকের ওপর কর্তৃত্ব হ্রাস করব না (৭২)।
১১১১-এ বোহেমোঁর প্রয়াণের পর, সম্পাদিত চুক্তির শর্ত অনুযায়ী এন্টিওকের কর্তৃত্ব বাইজান্টিয়ামের নিয়ন্ত্রণে আসার কথা। কিন্তু তার মৃত্যু সম্রাটের পক্ষে সুখদ হল না, কারন জীবিত বোহেমোঁ ট্যানকরাডকে বড়ভাবে নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতে পারত। বর্তমানে সম্রাটের পক্ষে বোহেমোঁর সঙ্গে চুক্তির শর্ত অবলম্বনে রাজনৈতিক সুযোগ নিতে পারাটা সমস্যার হয়ে গেল।
অথচ বোহেমোঁ বিশ্বাসঘাতক হিসেবে চিহ্নিত না হয়ে পশ্চিমি জাহানে পরিচিত এবং স্মরণীয় হয়ে রইলেন বীরের সম্মান পেয়ে। এপিরাসের যুদ্ধে বোহেমোঁ অসম্মানজনক হারের মুখোমুখি হয়ে আরও অসম্মানজনক চুক্তিতে উপনীত হতে হলেও পশ্চিমা জগতে তাঁর সম্মান একটু টসকায় নি – কারন এই লজ্জাজনক হারের সংবাদ বাইজান্টিয়াম সাম্রাজ্যের বাইরে খুব বেশি প্রচার পায় নি। তার মৃত্যুর এক দশক পরে আচেনের এলবার্ট লিখছেন ‘শক্তিমান বোহেমোঁ এন্টিওকের রাজা নির্বাচিত হলেন (৭৩)’। দক্ষিণ ইতালির কাপোলার ক্যাথিড্রাল অব ক্যানোসায় তার সমাধিতে উতকীর্ণ লিপিতে ডায়াবোলিস চুক্তির বিন্দুমাত্র ছাপ পড়ে নি, বরং তার স্মৃতি উজ্জ্বলভাবে খোদিত হয়ে রয়েছে এই বাক্যের মাধ্যমে
‘ছাদের তলায় শুয়ে আছেন মহানুভব সিরিয় রাজা;/বিশ্বে তার থেকে আর ভাল মানুষ জন্মাবে না।/ গ্রিস চারবার বিজিত হয়েছে, এবং বিশ্বের অন্যান্য অংশ বোহেমোঁর শক্তি সম্বন্ধে অবগত ছিল।/ যুদ্ধক্ষেত্রে দশ জনের ব্যুহ রচনা করে তিনি হাজার সেনার বাহিনীকে হারিয়েছেন তার পবিত্রতার জোরে, এটা এন্টিওকের শহরের সকলে জানেন (৭৪)’
বোহেমোঁ কত মহান ছিলেন তার পরিচয় পাই চার্চের দক্ষিণ প্রান্তের ব্রোঞ্জের দরজায় খোদিত উতকীর্ণ লিপিতে, ‘তিনি বাইজান্টিয়াম দখল করেছিলেন এবং সিরিয়াকে শত্রুর হাত থেকে বাঁচিয়েছিলেন। তিনি ঈশ্বরের স্তরে না পৌঁছলেও, সাধারণ মানুষের শক্তির থেকে অনেক বেশি সম্মানিত ছিলেন। চার্চে প্রবেশ করে বলশালী বোহেমোঁর জন্যে প্রার্থনা করুন, করতে থাকুন, যাতে এই মহান সেনানী স্বর্গে সুখী থাকেন (৭৪)’। (চলবে)