মনে পড়ছে, তিনবার আমাদের মধ্যে সত্যিকারের তর্ক বেধেছিল। বলাই বাহুল্য, একবারও আমরা কোনও সিদ্ধান্তে আসতে পারিনি। আমরা কথা শেষ করেছিলাম এই বলে, বাকিটা চিঠি লিখে জানাব। চিঠি তুমিও লেখনি, নানা কাজে ব্যস্ত থাকায় সে চিঠি আমারও লেখা হয় নি। আজ যখন তুমি নেই, আর শেষ বসন্তের ঠাঠা মধ্যাহ্ন নৈহাটির একটা দুপুরের স্মৃতিকে মনে কেবলই উস্কে, তখনই তোমাকে এই চিঠি লিখতে বসে গেলাম।
আমার পরলোক নেই সমরেশ, তাই জানি, এই চিঠি কখনোই তোমার কাছে পৌঁছুবে না। তুমি পরলোক মানতে কি না, জানি নে। তুমি মার্ক্সবাদ মানতে, কিন্তু মাতৃশ্রাদ্ধে আর পাঁচজন সাধারণ হিন্দুর মতোই তুমি মাথা ন্যাড়া করেছিলে। তোমার হাতে ইদানিং আংটিও দেখতাম। আর সে আংটি কোনও মূল্যবান ধাতুরও নয়। প্রতিকূল শক্তিকে যারা দৈববলে বশীভূত করতে চান, তাদেরই হাতে এই রকম আংটি দেখেছি। তুমি জানতে আমি নাস্তিক, মাতৃশ্রাদ্ধ আমি করিনি। অলৌকিক কিছুতে আমার বিশ্বাস নেই। সেই কারণেই তোমার হাতে ধাতুর আংটি আমি প্রথম দেখে, অবাক হয়েছিলাম। কিন্তু ব্যাপারটা তখন কেন জানিনে, জিজ্ঞাসা করা হয়ে ওঠেনি। সম্ভবত এই ব্যাপারে আবার তর্ক উঠুক সেটা আমি চাইনি।
দুই
এ চিঠি তোমার হাতে পৌঁছুবে না, জানি। যেমন এ বাড়ি থেকে আর একটা জিনিসও কোনওদিন সমরেশ বসুর বাড়িতে গিয়ে পোঁছুবে না। সেটা টুনির জন্য কেনা মোটা চওড়া শাঁখা। প্রথম যখন টুলু (আমার বউকে তুমি প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত টুলুই বলে গেলে) টুনির হাতে বাগবাজারের মোটা শাঁখা পরিয়ে দেয়, সেটা তোমার এতই ভাল লেগেছিল যে, টুনিকে সেই শাঁখার সঙ্গে অন্য কোনও গহনা পরতে বারণ করেছিলে। টুনির হাতে শাঁখাজোড়া যেন সত্যিই হাসত। তোমার মৃত্যুর কয়েক মাস আগে টুনির একটি শাঁখা ভেঙে গিয়েছিল। তুমি আমাকে আর এক জোড়া শাঁখা কিনে দিতে বলেছিলে। সেটা দিতে দেরি হচ্ছিল। সারদাবাবুদের বাড়িতে এক রাতে দেখা হতে তার জন্য আমাকে তোমার চোস্ত জবানে যা বলার বলেছিলে। তারপরে টুনির হাতে সেই শাঁখা দেখে তবে তোমার স্বস্তি ফিরে এসেছিল। টুনির শাঁখার জন্য আর আমাদের ঝামেলা পোয়াতে হবে না সমরেশ।
তোমার জীবনের সঙ্গে আমার জীবনের এত মিল হল কী করে, সেইটাই বড় আশ্চর্য ঠেকে। আমরা দুজনেই জীবনের পাঠশালার পড়ুয়া, মিল শুধু এইখানেই নয়। মিল আরও নানা জায়গায়। এক জায়গায় দেখলাম, জীবনে একটি মাত্র চাকরিই তুমি করেছ এবং সেটা ইছাপুর রাইফেল কারখানায়। চাকরিটার যে বিবরণ পেলাম, তাতে মনে হয়, চাকরিটা ভিউয়ারের বা ঐ জাতীয় কিছুর। এটা লিখছি এই কারণে যে, কাশীপুর গানশেল কারখানায় আমিও ৪৬ সালে ভিউয়ারের চাকরির ইন্টারভিউ দিয়েছিলাম। চাকরিটা পেতে পেতেও পাইনি। ৪১ সালে কলকাতায় আমার প্রথম চাকরি ইলেকট্রিক মিস্তিরির সাগরেদি করা। এবং এই সময়ে আমার সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি প্রাণতোষ ঘটকদের শ্যামপুকুরে বিরাট বাড়িটার ওয়্যারিং-এ সাহায্য করা সাদা বাংলায় গুলি ঠোকা।
জগদ্দল নৈহাটি এলাকায় তুমি তখন সত্য মাস্টারের সাগরেদ হয়ে প্রলেতারিয়েত হবার সাধনা চালিয়ে যাচ্ছ, আমিও তখন ওই একই অঞ্চলে ভাট পাড়ার রাখালরাজ ভবনে মাঝে মাঝে আস্তানা গেড়ে, গায়ের থেকে মধ্যবিত্তের গন্ধ তুলে ফেলবার প্রাণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছি। আমার কর্মক্ষেত্রও ছিল ভাটপাড়া-জগদ্দল। তোমাদের জগদ্দলের পাটকল শ্রমিকদের নেতা চতুরালির ক্যাডারদের হাতে বেদম ঠ্যাঙানি খেয়ে চব্বিশ ঘন্টা বিছানা ছেড়ে উঠতে পারিনি, এই কাহিনী তোমাকে বলি যেদিন প্রথম তোমার সঙ্গে দেখা এবং পরিচয় এবং প্রগাঢ় বন্ধুত্ব হয়ে যায়, সেইদিনেই। সেটা ৫২ কি ৫৩ সাল। তুমি দেশ পত্রিকায় গল্প দিতে গিয়েছিলে। তার আগে তোমার ‘গুণিন’ দেশ পত্রিকায় ছাপা হয়ে গিয়েছে। শুধু তাই নয়, তোমার প্রথম বই ‘উত্তরঙ্গ’ এবং আমার প্রথম বই ‘এই কলকাতায়’ বেরিয়ে গিয়েছে। এবং তাজ্জবের কথা, সিগনেট প্রেস প্রকাশিত ‘টুকরো কথার’ একই সংখ্যায় তোমার এবং আমার বই কে ‘অন্য ধরণের’ এই বলে মন্তব্য করা হয়েছে। দেশে প্রতি সংখ্যায় তখন রূপদর্শীর নকশা বের হচ্ছে।
দেশ থেকে বেরিয়ে আমরা সোজা বারদুয়ারিতে গিয়ে বসেছিলাম। সমরেশ, কে কতটা ডিক্লাসড হতে পেরেছিলাম, জানিনে, কিন্তু আমাদের জীবনের একটা পর্যায়ে, কচি বয়সে, আমাদের মধ্যবিত্ত অস্তিত্বটার বিরুদ্ধে আমরা আন্তরিকভাবেই বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলাম।
যথেষ্ট পরিমাণে চেষ্টা করা সত্বেও যে আমরা সত্যকারের প্লোরেতারিয়েত হয়ে উঠতে পারছিলাম না, সেটা ছিল আমাদের দু-জনেরই গভীর যন্ত্রণার কারণ। আমিই কিন্তু তোমাকে সেদিন, আমাদের সাক্ষাতের প্রথম দিন, দেশ অফিস থেকে বারদুয়ারিতে টেনে নিয়ে যাই। তুমি এমন জায়গার সন্ধান রাখতে না। সেখানকার পরিবেশ নোংরা, ঘাম ও দেশী মদের গন্ধে ভুরভুরে। মাতালের চিৎকার খিস্তিতে কান পাতা দায়। কিন্তু সেদিন একটা পাঁইট খালি করার পর তোমার চোখে এমন একটা শিশুর মুগ্ধতা দেখেছিলাম, যা আমি আজও ভুলতে পারিনি। আমরা যেন গোর্কির গল্পের দুই চরিত্র হয়ে উঠেছি সেই সর্বহারা পরিবেশে এমন মনে হচ্ছিল। তুমি জাত-রোমান্টিক সমরেশ। শেষ অবধি তাই থেকে গেলে।
মনে পড়ছে, হাঁ সমরেশ, এখন এতদিন পরে, তোমাকে চিঠি লিখতে গিয়ে সেইদিনের সন্ধ্যাটা ধীরে ধীরে সিনেমার ফ্ল্যাশ ব্যাকের মতো ফুটে উঠছে। তুমি তখন খুব ছিপছিপে ছিলে। তোমার নাকে মুখে এবং চোখে এক ধরনের তীক্ষ্ণতা ছিল। তুমি তখন শার্ট পরতে। সেদিন তোমার গায়ে শার্টই ছিল। বারদুয়ারির খদ্দেরদের অধিকাংশই প্লোরেতারিয়েত শ্রেণীতেও অন্ত্যজ বলে গণ্য হত। অর্থাৎ এরা এমন সর্বহারা যে, এদের চটকল মজুরদের মতো হপ্তায় হপ্তায় মজুরিও জোটে না। ঠ্যালাওয়ালা রিকশওয়ালা ধুকুড়িয়া বাগানের মাগির দালাল ছ্যাকড়া গাড়ির সহিস কোচোয়ান মস্তান গোয়ালা, এরাই ছিল সেই সন্ধ্যায় আমাদের সঙ্গী। হ্যাঁ, আর ছিল একটা ডিউটি শেষ-করা কনস্টেবল। যার উপস্থিতি তোমার আমার দুজনের চোখেই বিশেষ হয়ে উঠেছিল।
আমার মুখে রেনেসাঁস কথাটা শুনে তুমি খুব ঠাট্টা করেছিলে আমাকে। তুমি পরবর্তী কালেও বেশ কয়েকবার আমাকে রেনেসাঁস-বাবু বলে খোঁচা মারতে ছাড়নি। বুর্জোয়া কথাটা তুমি তখন প্রায় গালাগালির সমার্থক করে তুলেছিলে। যেমন, কমিউনিস্টরা করে থাকে। পরিচয় পত্রিকা তখন ছিল তোমার আদর্শ। দেশ পত্রিকায় যদিও তখন তোমার ‘গুণিন’ গল্পটা প্রকাশিত হয়েছে এবং সন্তোষকুমার ঘোষ, তাঁর স্বভাব অনুযায়ী আমাদের কাছে তার তারিফ করে বেড়াচ্ছেন, তবু আমি লক্ষ্য করেছিলাম, তোমার একটা ভাল গল্প দেশের মতো ‘বুর্জোয়া’ কাগজে প্রকাশিত হওয়ায় তোমার মনে চাপা অস্বস্তি খচ খচ করছিল। ওই গল্পটা পরিচয় পত্রিকাতে প্রকাশিত হলেই যেন তুমি স্বস্তি পেতে বেশি।
আমাদের মতো ডিক্লাসড মধ্যবিত্তকে কী করে জীবন সংগ্রামে টিকে থাকতে হয়েছে, সেই সব কথা যখন আমরা বিনিময় করছিলাম, তখন তোমার সংগ্রামের কাহিনী, তোমার আটপুরের কাহিনী, তোমাকে আমার মনে একেবারে হিরোর আসনে বসিয়ে দিয়েছিল। মাত্র আট টাকা মাসোহারায় জগদ্দলে আমাকে ইউনিয়ন সংগঠনের কাজে লাগিয়ে দেওয়া হয়েছিল। নবদ্বীপের বাড়িতে তখন আমার মা চারটি নাবালিকা মেয়েকে কী করে প্রতিপালন করছিলেন, তা তিনিই জানেন। গৌরীকে আমি আমার মায়ের সমপর্যায়ে ফেলি। কেন না, তোমার আটপুরের জীবনে গৌরীকে তোমার চার ছেলেমেয়েকেই প্রতিপালন করতে হয়েছে। কী করে, তা তোমার চাইতে গৌরীই ভাল জানে। অথবা জানে না। সংগ্রাম সংগ্রাম খেলা আমরা খেলেছি বটে সমরেশ, কিন্তু আসল সংগ্রাম করেছে তো গৌরী, করেছেন আমার মা।
যাইহোক, আমাদের প্রথম মোলাকাতের দিনে আমার যে কাহিনীটা তোমাকে ইমপ্রেস করেছিল, সেটা বলি। জগদ্দলে আমরা একটা দর্জি ইউনিয়ন সংগঠন করে ফেলেছিলাম। বারাকপুর মহকুমার দর্জি ইউনিয়ন। তোমার যেমন সত্য মাস্টার, আমার তেমন নেপেনদা, নৃপেন চৌধুরী। দর্জি ইউনিয়ন সংগঠনে নৃপেনদার দানই ছিল বেশি। যাই হোক, অত্যন্ত অসুস্থ হয়ে ভাটপাড়ার হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলাম। ১৯৪৫ সালের কথা। শীতকাল। গরম জামা কাপড় আমার ছিলই না। আমার দর্জি বন্ধু যারা দু-একজন আমাকে দেখতে টেখতে আসত হাসপাতালে, তাদেরই একজন পরামর্শ দিয়েছিল, মাস্টার, তুমি খালাস হবার দিন হাসপাতালের একটা কম্বল যদি ঝেপে দিতে পার, তবে তা দিয়ে তোমাকে একটা অলেস্টার বানিয়ে দেব। তাই হল। আর সেই অলেস্টার গায়ে চাপিয়ে কী রেলাই না দিয়েছি বেশ কয়েক বছর ধরে।
এই গল্পটা যখন শেষ হল, তখন আমাদের পেটে পাঁইট দুয়েক করে মাল ঢুকেছে। আর তোমার অট্টহাসিতে বারদুয়ারির সেই গমগমে গোলমালেও ছেদ পড়ে যাচ্ছিল। তুমি আমার কাঁধে একটা থাপ্পড় মেরে বলেছিলে, ‘শালা ফটিচর।’ সে সেই থেকেই আমাদের তুই তোকারি, সমরেশ। কেন জানিনে, তোমার ‘মাসের প্রথম রবিবার’ গল্পটি যখন পড়ি, তখন তোমার সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাতের কথাটা মনে পড়ে যায়। মাসের প্রথম রবিবারে দুই যুবকের দেশী মাল টানার গল্প। কিন্তু ওই গল্পের একটা সংলাপ এই রকম, ‘আমরা তো শালা নাইনটিনথ্ সেঞ্চুরির রেনেসাঁসে বিশ্বাস করি না।’ কথাটা আলটপকাই এসে গেছে একজনের মুখে। কেন, সমরেশ? আসলে তোমার জীবনের নীতিজ্ঞানের শিকড় গাড়া ছিল সেই উনিশ শতকী মূল্যবোধে।