ব্রোকার হার্ভে ম্যাক্সওয়েলের অফিসের কনফিডেনসিয়াল ক্লার্ক পিচার। সামান্য আগ্রহ ও বিস্ময়ের দৃষ্টিতে সাধারণত তার নিয়োগকর্তা তার দিকে তাকালেন। ম্যাক্সওয়েল ও তার যুবতী স্টেনোগ্রাফার সাড়ে নয়টায় দ্রুত অফিসে প্রবেশ করলেন।
“গুড-মর্নিং, পিচার” বলে ম্যাক্সওয়েল তার নিজের ডেস্কের দিকে ছুটে গেলেন। তারপর তার জন্য রাখা চিঠি ও টেলিগ্রামের বিশাল স্তূপে তিনি যেন ডুবে গেলেন।
তরুণীটি এক বছর হলো ম্যাক্সওয়েলের স্টেনোগ্রাফার হিসাবে কাজ করছে। তরুণীটিকে সুন্দরী বলা যেতে পারে।
মেয়েটি শোভাবর্ধনকারী আড়ম্বরপূর্ণ পোশাক পরে। তবে সে কোন চেইন, ব্রেসলেট বা লকেট পরে না। মধ্যাহ্নভোজের আমন্ত্রণ গ্রহণ করার কথা তার মনে ছিল না। তার সেদিনের পোশাক ধূসর ও সাদামাটা হলেও তা কিন্তু তার ফিগারের সঙ্গে মানান সই ছিল। ঝালর দেওয়া পাগড়ির মতো টুপিটা যেন মাকাউয়ের সোনালি-সবুজ ডানা। আজ সকালে তাকে লাজুক ও দীপ্তিময় দেখা ছিল। তার চোখে ছিল স্বপ্নময় উজ্জ্বলত, তার গালে গোলাপী আভা। তার অভিব্যক্তি সুখস্মৃতিতে ভরা।
পিচার তখনও কিছুটা কৌতূহলী। আজ সকালে সে মেয়েটির একটি পার্থক্য লক্ষ্য করেছে। সোজা পাশের রুমে তার ডেস্কে যাওয়ার বদলে সে বাইরের অফিসে বসল।একবার সে ম্যাক্সওয়েলের ডেস্কের কাছে গেল। তার উপস্থিতি সম্পর্কে ম্যাক্সওয়েলের সচেতন হওয়ার জন্য তা যথেষ্টই কাছাকাছি।
সেই ডেস্কে বসে থাকা মানুষটি যেন মানুষ না; নিউইয়র্কের একজন ব্যস্ত ব্রোকার।
“আচ্ছা — এটা কি? “ম্যাক্সওয়েল কড়া গলায় জিজ্ঞেস করলেন। তার খোলা মেইলটি তার ডেস্কে পড়েছিল। তার তীক্ষ্ণ ধূসর চোখ নৈর্ব্যক্তিক ও রুক্ষ। তার মেজাজের অর্ধেকটা যেন অধৈর্য হয়ে জ্বলে উঠছে।
“কিছু না,” স্টেনোগ্রাফার উত্তর দিয়ে একটু হেসে সরে গেল।
“মিস্টার পিচার, “মেয়েটি কনফিডেনসিয়াল ক্লার্কে বলল, “মিস্টার ম্যাক্সওয়েল কি গতকাল অন্য স্টেনোগ্রাফারের বিষয়ে কিছু বলেছিলেন?”
পিচার উত্তর দিল, “তিনি আমাকে আরও একজনের কথা বলেছিলেন। আমি গতকাল বিকেলে এজেন্সিকে জানিয়েছিলাম যে আজ সকালে কয়েকজনকে পাঠাতে। এখন ৯.৪৫ বাজে, এখনও কাউকে দেখা যায়নি।”
“আমি যথারীতি কাজ করব,” যুবতীটি বলল, “যতক্ষণ না কেউ জায়গা পূরণ করতে আসে।” সে সঙ্গে সঙ্গে তার ডেস্কে গিয়ে বসল।
ব্যবসার ভিড়ের সময় ম্যানহাটনের ব্যস্ত ব্রোকার চশমা পরেন না। তিনি চশমা পরে প্রতিবন্ধী সাজতে চান না। কবি গেয়েছেন “গৌরবময় জীবন থিতু হয় ভিড়ের সময়।” ব্রোকারের ঘন্টা শুধুমাত্র ভিড়ে নয়, মিনিট ও সেকেন্ড সমস্তই যেন স্ট্র্যাপে ঝোলে।
আজকের দিনটি ছিল হার্ভে ম্যাক্সওয়েলের ব্যস্ত দিন। ডেস্ক টেলিফোনের আওয়াজ দীর্ঘস্থায়ী। পুরুষরা অফিসে ভিড় করতে শুরু করে রেলিং ধরে জোরো জোরে চেচাতে শুরু করল আনন্দে উত্তেজিতভাবে। মেসেঞ্জার ছেলেরা মেসেজ ও টেলিগ্রাম নিয়ে ছুটে এলো। অফিসের কেরানিরা ঝড়ের সময় নাবিকদের মতো লাফিয়ে উঠে। এমনকি পিচারের মুখটা অ্যানিমেশনের মতো কিছুটা শিথিল হয়ে যায়।
এক্সচেঞ্জে হারিকেন ঝড়, ভূমিধস, তুষারঝড়, হিমবাহ কিংবা আগ্নেয়গিরির উদগীরণ যেন হয়। ম্যাক্সওয়েল তার চেয়ার প্রাচীরের সঙ্গে ঠেলে দিয়ে তিনি ব্যস্ততার সঙ্গে ব্যবসায়িক লেনদেন করতে লাগলেন।
ব্যস্ততার মধ্যেও ব্রোকার হঠাৎ একটি মেয়েকে ছাউনির নীচে দেখতে পেলেন। মেয়েটির মাথায় সোনালি চুলে বাদামের মতো বড় পুঁতির একটি স্ট্রিং দেখে তিনি সচেতন হয়ে উঠলেন। তিনি দেখলেন সে একজন স্বয়ংসম্পূর্ণ তরুণী। পিচার তাকে পরিচয় করাতে সেখানে ছিল।
ম্যাক্সওয়েল অর্ধেকটা ঘুরে দাঁড়ালন, তার হাতে ধরা কাগজ আর টেপ।
“কি ব্যাপার?” তিনি ভ্রুকুটি করে জিজ্ঞেস করলেন।
“একজন স্টেনোগ্রাফার ওখানে বসে আছে।” পিচার বলল। “আপনি গতকাল আমাকে তাদের ফোন করতে বলেছিলেন তারা আজ সকালে একজনকে পাঠিয়েছে।”
“তোমার ভুলো মনা।” ম্যাক্সওয়েল বললেন, “আমি তোমাকে কেন এমন নির্দেশ দেবো? মিস লেসলি যে বছর এখানে ছিল সেই বছর সে নিখুঁত তৃপ্তি দিয়েছিল। যতদিন সে কাজ করতে চায় ততদিন জায়গাটি তার। এখানে কোনও জায়গা খোলা নেই, ম্যাডাম। সেই আদেশটি তাকে জানাও।”
পিচার অপেক্ষারত মেয়েটিকে জানিয়ে দিল এখানে কোন পোস্ট খালি নেই। সে তার কথা শুনে চলে গেল। ব্যবসার তাড়া ও গতি আরও দ্রুত বেড়েছে। মেঝেতে তারা অর্ধডজন স্টকের হিসাব পাউন্ডে করা হছিল। ওখানে ম্যাক্সওয়েলের গ্রাহকরা জাদরেল বিনিয়োগকারী। তখনো ক্রয়-বিক্রয়ের অর্ডার আসছিল।
তার নিজের ধারণগুলো বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। লোকটি উচ্চ-গিয়ারের সূক্ষ্ম শক্তিশালী মেশিনের মতো কাজ করছিলেন — সম্পূর্ণ উত্তেজনাপূর্ণ, পূর্ণ গতিতে, নির্ভুল, কখনও দ্বিধা না করে, সঠিক শব্দ ও সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রস্তুত হয়ে কাজ করছিলেন।
স্টক ও বন্ড, ঋণ, বন্ধকী, মার্জিন ও সিকিউরিটিজ এখানে অর্থের একটি জগত ছিল এবং এতে মানব ও প্রকৃতির জগতের জন্য কোন স্থান ছিল না।
মধ্যাহ্নভোজের সময় ঘনিয়ে এলে হট্টগোল কিছুটা শান্ত হয়ে এল।
ম্যাক্সওয়েল ডেস্কের পাশে তখন হাতে টেলিগ্রাম ও মেমোরেন্ডাম নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন।
তার জানালা খোলা ছিল। জানালা দিয়ে সম্ভবত একটি হারিয়ে যাওয়া গন্ধ আসছে। লিলাকের মিষ্টি গন্ধ ব্রোকারকে এক মুহুর্তের জন্য বিমোহিত করে তুললো। এই গন্ধটি মিস লেসলির ছিল, এই গন্ধ একান্ত তার নিজস্ব, তা শুধুমাত্র তার।
সেই গন্ধ যেন তাকে প্রাণবন্ত করে তুললো। অর্থের জগৎ হঠাৎ করেই ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। সে পাশের ঘর ছিল – বিশ পা দূরে।
ম্যাক্সওয়েল জোরে জোরে বলল। “আমি এখন তাকে জিজ্ঞাসা করব। আমি ভাবছি কেন আমি তা অনেক আগে করিনি?”
তিনি হুট করে ভিতরের অফিসে ঢুকে গেলেন। তিনি দেখলেন, স্টেনোগ্রাফারের ডেস্কে লেসলি বসে আছে। ব্রোকার হাসিমুখে তার দিকে তাকালেন। তিনি দেখতে পেলেন লেসলির পেলব গোলাপী গাল। তার চোখ দুটো সদয় দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে। ম্যাক্সওয়েল তার ডেস্কে একটি কনুই হেলান দিলেন।তিনি তখনও দুহাত দিয়ে কাগজগুলো আঁকড়ে ধরেছিলেন এবং কলমটি তার কানে গোজা ছিল।
“মিস লেসলি,” তিনি তাড়াতাড়ি কথা শুরু করলেন, “আমার কাছে একটি মুহূর্ত বাকি আছে। আমি এই মুহূর্তে কিছু বলতে চাই। তুমি কি আমার বউ হবে?”
আমি তোমাকে সাধারণ উপায়ে প্রেম করার সময় পাইনি, কিন্তু আমি সত্যিই তোমাকে ভালবাসি।”
“ওহ, কি কথা বলছেন?” যুবতীটি চিৎকার করে উঠল। সে তার পায়ের কাছে উঠে এসে তার দিকে তাকাল, বৃত্তাকার চোখে।
“বুঝো না?” ম্যাক্সওয়েল অস্থিরভাবে বললেন।
“আমি চাই তুমি আমাকে বিয়ে করো। আমি তোমাকে ভালোবাসি, মিস লেসলি। আমি তোমাকে বলতে চেয়েছিলাম, কিন্তু পরিস্থিতি অনুকূল ছিল না।”
স্টেনোগ্রাফার খুব অদ্ভুত আচরণ করল। প্রথমে মিস লেসলি বিস্ময়ে পরাস্ত বলে মনে হল।তারপর তার বিস্ময়কর চোখ থেকে অশ্রু প্রবাহিত হল। তারপরে সে যেন রৌদ্রোজ্জ্বল হাসি হাসল, এবং তার একটি হাত ব্রোকারের ঘাড়ে কোমলভাবে স্পর্শ করল।
“আমি এখন জানি,” সে মৃদুস্বরে বলল। “এই পুরোনো ব্যবসা যেটা সময়ের জন্য তোমার মাথা থেকে অন্য সব কিছু বের করে দিয়েছে। আমি প্রথমে ভয় পেয়েছিলাম। তোমার কি মনে নেই, হার্ভে? আমরা গত সন্ধ্যায় 8টার দিকে ছোট চার্চে কর্নারে বিয়ে করেছি।”
লেখক পরিচিতি : বিশ্বখ্যাত লেখক ও. হেনরি (O. Henry) অত্যন্ত জনপ্রিয় গল্পকার, সাহিত্যিক। ‘ও হেনরি’ আসলে লেখকের ছদ্মনাম। তাঁর আসল নাম উইলিয়াম সিডনি পোর্টার। নিজেকে আড়াল করে রচনাকে আরো সমৃদ্ধতর করতে ছদ্মনামের ঘোমটা নেন। রসিকতা, বিশেষ ধরনের চরিত্রায়ন ও গল্পের শেষে চমকের জন্য বিশ্বসাহিত্যে পরিচিত ও বিখ্যাত ও হেনরি। তিনি আমেরিকান জীবনযাপন নিয়ে ছয় শতাধিক গল্প লিখেছেন। তিনি ১৮৬২ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আমেরিকার নর্থ ক্যারোলিনায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর স্মৃতির প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি। উল্লেখ্য যে, ১৯১০ সালের ৫ জুন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরে মারা যান ও হেনরি। তার লেখা “The romance of a busy broker” গল্পটিকে বঙ্গানুবাদ করা হলো
মনোজিৎকুমার দাস, কথাসাহিত্যিক ও অনুবাদক, লাঙ্গলবাঁধ, মাগুরা, বাংলাদেশ।