পুরস্কার হিসাবে মুখ্যমন্ত্রী পুষ্কর সিং ধামির দেওয়া ৫০ হাজার টাকার চেক পেয়েও ‘অসম্মানিত’ বোধ করছেন সুড়ঙ্গে আটকে পড়া শ্রমিকদের উদ্ধারকারী ১২জন র্যাট হোল মাইনার। তাঁরা চেক নিলেও জানিয়েছেন, চেক তাঁরা ভাঙাবেন না। বরং সরকার বিমাতাসুলভ আচরণ বন্ধ না করলে ওই চেক তাঁরা ফিরিয়ে দেবেন। কয়েকদিন আগে দেরাদুনে এক অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী ধামি সুড়ঙ্গে আটকে পড়া শ্রমিকদের উদ্ধারকারী ১২জন র্যাট হোল মাইনারকে পুরস্কৃত করে তাঁদের হাতে ৫০ হাজার টাকার চেক তুলে দেন। অসন্তোষ সত্ত্বেও তাঁরা তা গ্রহণ করায় মুখ্যমন্ত্রী তাঁদের দাবি নিয়ে সরকারি কর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করতে বলেন। পরবর্তীতে তিনি তা খতিয়ে দেখবেন বলে আশ্বাস দেন। উদ্ধারকারী প্রত্যুতরে জানিয়েছেন, সরকার সিদ্ধান্ত না নেওয়া পর্যন্ত তাঁরা চেক ভাঙাবেন না।
প্রসঙ্গত, সুড়ঙ্গে আটকে পড়া ৪১ শ্রমিককে উদ্ধারের সব প্রচেষ্টা যখন বিফল হয়, বিদেশ থেকে আনা যন্ত্র যখন বিকল হয়ে পড়ে, এমনকি বিদেশি বিশেষজ্ঞরা যখন উদ্ধারকাজে অন্তত এক মাস সময় লাগবে বলে জানান, তখন মুশকিল আসান করতে হাজির হয়েছিলেন কয়লাখনিতে দু’আড়াই ফুট সুড়ঙ্গ কেটে কয়লা তুলতে দক্ষ এই ১২জন এবং দু’দিনের মধ্যে ৪১ শ্রমিককে উদ্ধার করেন নিজেদের প্রাণ বিপন্ন হতে পারে জেনেও, এই পদ্ধতি কিন্তু ভারতে বেআইনি। উদ্ধার পাওয়া ৪১ শ্রমিক তারপর নানাভাবে সম্মানিত হলেও সরকারের দেওয়া ৫০ হাজার টাকার চেক তাঁদের অখুশি করে। তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাঁরা চেক নিয়ে জানিয়েছেন, ৪১জন উদ্ধার পাওয়া শ্রমিকদের রাজ্য সরকার দিয়েছে ১ লাখ আর উদ্ধারকারীদের ৫০ হাজার! উদ্ধারকারীরা জানান, তাঁরা তো কেউ টাকা চাননি, চেয়েছিলেন সরকার এমন ব্যবস্থা করুক, যাতে চিরকাল তাঁদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সুড়ঙ্গ খুঁড়তে না হয়। কিন্তু সরকার পুরস্কার হিসাবে দিলেন টাকা। তার মানে কি সরকার তাঁদের জীবনের ঝুঁকি নেওয়া কাজেই উৎসাহিত করল।

সবাই এই কাজ করতে পারেন না। অন্য কাজ না পেয়ে মানুষ বাধ্য হয়ে এই কাজে আসেন। বেআইনি হলেও এই কাজের দক্ষ শ্রমিকদের খনি খোঁড়া ছাড়াও বহু কাজে লাগানো হয়। যেমনটা উত্তরকাশীর সিলকিয়ারা-বালাকোট সুড়ঙ্গে করা হল। কিন্তু দক্ষ কাজের জন্য তাঁদের সরকারি সংস্থাগুলোয় নিয়োগ করা যেতে পারে। তাতে তাঁদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত হয়। কিংবা এমন আর্থিক সহায়তা, যাতে তাঁরা ভবিষ্যৎ অন্যভাবে তৈরি করতে পারেন। উল্লেখ্য, ২৬ কিমি দূরত্ব কমিয়ে সাড়ে চার কিমি করতে যে সুড়ঙ্গ তৈরি হচ্ছিল তা নিয়ে বিজ্ঞানীরা শুরু থেকেই আপত্তি জানিয়েছিলেন কিন্তু মোদী সরকার কোনো যুক্তি কানে তোলেনি । অথচ সেই বিপর্যয় ঘটলো। বিদেশি যন্ত্র আর বিশেষজ্ঞরা হতাশ করলেও ১২জন ‘জন হেনরি’ এক বেলায় গোটা দেশবাসীর ১৭ দিনের ৪০০ ঘণ্টার উৎকন্ঠার অবসান ঘটিয়েছেন।
অনেকেরই মনে পড়তে পারে থাইল্যান্ডে কোচের সঙ্গে বন্যার জলে ভেসে গুহায় আটকে পড়া ১২ জন খুদে ফুটবলারদের কথা। তাঁদেরও উদ্ধার করেছিলেন থাইল্যান্ডের খাদান শ্রমিকরা। মনে পড়তে পারে সাহসী মাইন ইঞ্জিনিয়ার যশবন্ত সিং গিলকে, যিনি রানিগঞ্জের কুনুস্তরিয়ায় কয়লা খনি দুর্ঘটনায় নিজের জীবন বাজি রেখে উদ্ধার করেছিলেন আটকে থাকা ৬৫ জনকে। যশবন্তের সঙ্গে উদ্ধারে নেমেছিলেন সব খাদান কর্মীরা। যশবন্ত সিং গিল এখন বায়োপিকের হিরো। কিন্তু খনিতে যখন ৬৫ জন শ্রমিক আটকে পড়েছিলেন, তখন তাঁর একমাত্র লক্ষ্য ছিল ৬৫ জনকে বাঁচানো। অন্যকে বাঁচাতে গিয়ে নিজের জীবন বিপন্ন হতে পারে, মূহুর্তের জন্য সেকথা ভাবেননি। তাই বিশেষ ক্যাপসুল লিফট বানিয়ে শ্রমিকদের সেখান থেকে বার করে আনা কোনও মোড়কে ঢাকা যায় না। এই তো কয়েক মাস আগে ঝোড়ো হাওয়ায় উত্তাল সমুদ্রে ডুবে গিয়েছিল ‘স্বাধীন ফিশিং’ নামে একটি বাংলাদেশের মেছো ট্রলার। ১১ জন মৎসজীবী জলে ভাসতে ভাসতে এসে পড়েছিলেন ভারতীয় জলসীমায়। তাঁদের দেখতে পান বঙ্গোপসাগরের মাছের সন্ধানে যাওয়া ভারতীয় ট্রলার ‘মা-মালবিকা’র মৎসজীবীরা। তাঁদের নিজেদের জীবন বাজি রেখে বাঘের চর থেকে উদ্ধার করেন বাংলাদেশের মৎস্যজীবীদের। নিজের জীবন বাজি রেখে অন্যকে বাঁচানো তো কোনো পুরস্কার কিংবা বাহবা পাওয়ার জন্য নয়, কেবলমাত্র সহমর্মিতার কারণেই। সরকার এই সব কাজের সাফল্যে পুরস্কার হিসাবে টাকা দেন, আমরা তাঁদের হিরো বানাই, বেআইনি হওয়া স্বত্বেও তাঁরা ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে বাধ্য হন, তাদের অন্য কাজেও ব্যবহার করা হয় কিন্তু তাদের জীবনের নিশ্চয়তার কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়