ফ্রেডরিক রোজ সকালে তার ব্যালকনিতে বসে অপেরা স্টাইলে, উচ্চ স্বরে ক্রীসমাস ক্যারল গায়। পাশের ফ্ল্যাটের সঙ্গীতা বড্ড বিরক্ত হয়। সে নার্স। নাইট-ডিউটি করে এসে সবে তখন বালিশে মাথা রেখেছে। আরেকটা বালিশ কানের ওপর চেপে ধরে সে ঘুমোতে চেষ্টা করে। ফ্রেডরিক এই সময়টাতে না গেয়ে থাকতে পারে না। একটা সময় সে সেন্ট এরিনা চার্চের ক্যারল গ্রুপের লীড সিঙ্গার ছিল। আজ অথর্ব হয়ে তার কোথাও নড়বার আর উপায় নেই। মডেল স্ট্যাটাসের গোটা কমপ্লেক্সে তার উচ্চগ্রামের কণ্ঠ প্রতিধ্বনিত হয়। মহামানবের আগমনের সঙ্কেত সে না জানিয়ে কেমন করে থাকে!
লিন্ডাকে মম’স গ্রুপের সিক্রেট স্যান্টা একটা ওভার সাইজের জামা পাঠিয়েছে। লিন্ডা রেগেমেগে সে ক’থা হোয়াটস্ অ্যাপ গ্রুপে লিখেই ফেলল। পরে তার সিক্রেট স্যান্টা আরো ছোটো ছোটো সুন্দর উপহার পাঠালো। লিন্ডা তার কৃতকর্মের জন্যে বড়ই লজ্জিত। শেষমেশ সে ক্ষমা চাইলো গ্রুপের সকলের কাছে। উৎসব বোধহয় উদার হতেও শেখায়।
প্রিয়াঙ্কা সারাদিন তার স্কুটি নিয়ে টো টো কোম্পানি। ছেলেদের সঙ্গেই তার মেলামেশা। মেয়ে বন্ধু তার নেই বললেই হয়। পড়াশোনায় একেবারে লবডঙ্কা। পাড়ার আন্টিরা তাকে মোটেই ভালো চোখে দ্যাখে না। বড়দিনের সময় সবার কাছে চাঁদা তুলে সামনের ছোটো পার্কটা টুনি বাল্ব, বেলুন, কাগজের শিকলি, ক্রীসমাস ট্রী দিয়ে সাজিয়ে ফেলল বাউন্ডুলে মেয়েটা। বিকেলে মা আর বাচ্ছা পার্টি। সবাই নাচল, গাইল। কেক, প্যাটিস, চানাচুরের পার্টি হৈ হৈ করে জমে উঠল। নিন্দেমন্দ করা আন্টীরাই প্রিয়াঙ্কার পিঠ চাপড়ে তারিফ করে গেল।

ট্রুডিকে রোজ সকালবিকেল নিয়ম করে তার আয়া হুইলচেয়ারে ঘোরায়। গোমড়ামুখো ট্রুডি কারোর সঙ্গে বিশেষ কথা বলেনা। বড়দিনের ছোঁওয়া লাগতেই ট্রুডির চুলে রঙ, ঠোঁটে লিপস্টিক, গলায় মুক্তোর মালা। ট্রুডি এখন যাকেই দেখছে হাত নাড়ছে। মেরী ক্রিসমাস বলে ফ্লাইং কিস ছুঁড়ে দিচ্ছে। বাচ্ছাদের মুঠোয় ভরে দিচ্ছে চকলেট। উৎসবের আনন্দে অসুস্থ, গোমড়ামুখো ট্রুডিও কেমন বদলে গেছে। আয়া স্বপ্না ভাবে বদমেজাজি বুড়িটা অন্যসময় এমন খুশিমেজাজ থাকে না কেন?
রেশমা কুনকোলিওঙ্কার তালিগাঁও মার্কেটে সব্জীর ছোট্ট দোকান চালায়। মোন্টো আর পিন্টো যমজ দুই ভাই তার দোকানে ফাই ফরমাশ খাটে। রেশমাই তাদের খাওয়ায় পড়ায়। ইস্কুলে পাঠায়। বাপ মরেছে তাদের। মাও ছেড়ে কোথায় পালিয়েছে! রেশমা শুনেছে তাদের বাপ খ্রীস্টান ছিল। প্রতিবছর বড়দিনে দুই-ভাইকে নতুন জামা কিনে দিতে রেশমা কখনো ভোলে না। যীশুর জন্মদিনে মোন্টো আর পিন্টোকে একবার চার্চে নিয়ে গিয়ে যীশু ভগবানের দর্শন করিয়ে আনে।

মারিয়া সুগন্ধি ক্যান্ডেল বানায়। চার্চের সামনে টেবিল পেতে সে বিক্রি করে তার রঙবেরঙের সুগন্ধি ক্যান্ডেল। এবছর তার বিক্রিবাটা একেবারেই ভালো হচ্ছিল না। বড়দিনের দুদিন আগের মেঘলা বিকেলে সে ভাবছিল, এবার টেবিল গুটিয়ে বাড়ি ফিরলেই হয়। বৃষ্টি নামতে পারে। আজ আর কেউ এদিক পানে আসবেনা। হঠাৎ ট্যুরিস্ট বাস এসে দাঁড়ালো চার্চের গেটে। একদল ছেলেমেয়ে হৈ হৈ করে নামল বাস থেকে। মারিয়ার টেবিলের সামনে এসে পটাপট করে সব ক্যান্ডেল ওরাই কিনে নিয়ে জ্বালিয়ে দিল প্রভুর মূর্তির সামনে। মারিয়া ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিয়ে মনে মনে বলল, সবই তোমার কৃপা প্রভু! লাল-নীল মোমবাতির আলোয় তার স্বপ্নরা এখন উদ্ভাসিত।
অ্যালবার্ট আর মিকির বড় মনখারাপের মধ্যে দিন কাটছিল। এবছর বড়দিনেও তাদের একমাত্র ছেলে অ্যান্ডি, বৌমা আর তাদের দুই ফুটফুটে নাতি নাতনি কানাডা থেকে আসতে পারবে না। অ্যালবার্ট কতদিন দেখেনি নাতি-নাতনি দুটোকে। বহুদিন হল মিকি তার ছেলেবৌকে বুকে জড়িয়ে ধরেনি। প্রতিবছরের মত অ্যান্ডি এবারেও ঠাট্টা করে বলেছে, “মাম্মা তুমি সরপোটেল বানাচ্ছিলে না? দ্যাখো আমি এখান থেকে গরম মশলার সুগন্ধ পাচ্ছি।”

মশালাদার পর্ককারি সরপোটেল ছেলেটার খুব পছন্দ। বৌমার পছন্দ নারকেলের দুধ দিয়ে তৈরি বাথ কেক। এসব ভাবতেই মিকির চোখে জল এলো। ছেলের জোরাজুরিতে অল্প একটু সরপোটেল আর বাথকেক বানিয়েছে মিকি। নিজেরা আর কত খাবে! কাল সকালে প্রতিবেশী মার্থাকে দিয়ে আসবে।
রাতে মিকি আর অ্যালবার্ট তৈরি হচ্ছিল। বারোটার সময় চার্চের মিডনাইট মাসে যাবে। হঠাৎ দরজায় নক। এতো রাতে আবার কে এলো রে! ধীর পায়ে অ্যালবার্ট দরজা খুলতেই চমক! ছেলেবৌ, নাতিনাতনি দরজায়। অ্যালবার্টের ঘরের সামনে দুটো ফুটফুটে বাচ্ছা যেন দেবদূতের মত আলোর কিরণ ছড়িয়েছে। অ্যালবার্ট আর মিকি সে খুশির আলো দু-হাত বাড়িয়ে ঘরের মধ্যে নিয়ে এল। অ্যালবার্টের মনে পড়ল, যীশু বলেছেন, “Behold, I am coming soon! My reward is with me, and I will give to everyone according to what he has done. “
চোখের সামনে সব ফুটে উঠলো দৈনন্দিন জীবনের একঘেয়েমি থেকে আনন্দের বন্যায় ভেসে যাবার ছবি ।
প্রাপ্তি আমার। অসংখ্য ধন্যবাদ জানাই।