‘ডাইনীর বাঁশী’ গল্পে যে স্বর্ণ ডাইনির ডাইনিত্ব বর্ণিত হয়েছে তারই পরিণতি ব্যক্ত হয়েছে তারাশঙ্করের ‘ডাইনী’ গল্পে। সুরধুনীর ‘মর্মান্তিক অন্তিম পরিণতি’ লোকবিশ্বাসকে উপজীব্য করে এই গল্পে রূপায়িত হয়েছে। ‘মানবমনের অন্ধ আদিম সংস্কারকে অবলম্বন করে চরিত্রমুখ্য’ গল্প ‘ডাইনী’তে লেখকের সমস্ত সহানুভূতি বর্ষিত হয়েছে অভিশপ্তা মানবীর ওপর। ছাতিফাটা মাঠে পথ হারিয়ে ক্লান্ত তৃষ্ণার্ত তরুণী মা তার কচি শিশু ক্রোড়ে নিয়ে ডাইনির গৃহে উপস্থিত হলে শিশুকে দেখে সুরধুনীর ডাইনিসত্তা জেগে ওঠে। পরবর্তীতে মাতৃক্রোড়ের কচি শিশুটির মৃত্যু হলে তরুণীর ডাইনির কুটিরে উপস্থিত হওয়াকে দোষারোপ করা হয়। ডাইনির গৃহের পাশে বাউরিদের স্বামীপরিত্যক্তা উচ্ছলা মেয়ে ও তার প্রণয়মুগ্ধ বাউরি তরুণের প্রণয় সংলাপ শোনার পর বৃদ্ধা ছেলেটির সামনে উপস্থিত হলে আতঙ্কে পালাতে গিয়ে যুবকটি আহত হয়। আর তার পলায়নে সুপ্ত ডাইনিসত্তা জেগে ওঠে বৃদ্ধার। তন্ত্রমন্ত্রে তরুণ বেঁচে না উঠায় আতঙ্কিত ডাইনি সন্ধ্যার মুখে ছাতিফাটার মাঠ দিয়ে তার বসতি ত্যাগের সময় কালবৈশাখীর ঘূর্ণিঝড়ে পড়ে কণ্টকাকীর্ণ ‘খৈরী গুল্মে’র কাঁটা ডালের সূচালো ডগায় বিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করে। অথচ শিশুটির মৃত্যু ঘটেছিল অতিরিক্ত গরমে ভীষণ ঘেমে দেহের সমস্ত জল বের হওয়ার ফলে। অন্যদিকে বাউরি যুবকের মৃত্যু হয় ধনুষ্টংকারে। লোকসমাজের বিশ্বাস অনুসারে তাদের মৃত্যুর জন্য দায়ী করা হয় সুরধুনীকে। এমনকি তার বাসস্থান নিয়ে লোকবিশ্বাস প্রচলিত হয়। লোকবিশ্বাস মতে ডাইনিরা নির্জনতাপ্রিয়; মানুষের সাক্ষাৎমাত্রেই এদের অনিষ্টস্পৃহা জাগ্রত হয়। এই ডাইনি তিন চারটে গ্রাম ধ্বংস করে একদা আকাশপথে একটি গাছকে চালিয়ে নিয়ে যেতে যেতে জনহীন, ছায়াশূন্য দিগন্ত বিস্তৃত ছাতিফাটা মাঠের নির্জন রূপে মুগ্ধ হয়ে নেমে এসে সেখানে বসতি স্থাপন করে। রামনগরের সাহাদের আমবাগানে গত চল্লিশ বৎসর যাবৎ বসবাসকারী ডাইনির দৃষ্টি নাকি অপলক স্থির, আর সে দৃষ্টি নাকি চল্লিশ বৎসর যাবৎ নিস্তব্ধ হয়ে আছে মাঠটির উপরে। লোকে তাকে পরিহার করে চলে। কারণ সে ‘ভীষণ শক্তিশালিনী, নিষ্ঠুর ক্রূর এক বৃদ্ধা ডাইনী’। (১৯৭৬: ২৪৩) অভিশপ্ত ছাতি-ফাটার মাঠের উপর ক্রূর দৃষ্টি প্রসারিত করে আছে এই লোকবিশ্বাস ছাড়াও ডাইনি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য গুণিনের অলৌকিক ক্ষমতার কথাও এ-গল্পে বলা হয়েছে। ডাইনির মৃত্যুর মূলে গুণিনের মন্ত্রপ্রহারের কথা লোকসমাজের বিশ্বাস অনুসারে বর্ণিত হয়েছে। ‘আকাশ-পথে যাইতে যাইতে ঐ গুণীনের মন্ত্রপ্রহারে পঙ্গুপক্ষ পাখীর মত পড়িয়া ঐ গাছের ডালে বিদ্ধ হইয়া মরিয়াছে। ডালটার নীচে ছাতি-ফাটার মাঠের খানিকটা ধূলা কালো কাদার মত ঢেলা বাঁধিয়া গিয়াছে। ডাকিনীর কালো রক্ত ঝরিয়া পড়িয়াছে।’ (১৯৭৬: ২৫৩) দেবব্রত ভট্টাচার্যের ভাষায় — ‘ডাইনি যে রাতের অন্ধকারে আকাশপথে ইচ্ছেমতো বিচরণ করতে পারে এবং ডাইনি হলেই যে তার গায়ের রক্ত কালো হয়ে যায় এ বিশ্বাস রাঢ় বঙ্গের নিম্নশ্রেণিভুক্ত তথা আদিবাসী উদ্ভূত বহু মানুষের মধ্যে আজও বাসা বেঁধে আছে।’ (দেবব্রত ভট্টাচার্য ২০০৮ : ১৭৩)
‘অশুভশক্তির প্রতি লোকসমাজের আত্যন্তিক বিশ্বাসনির্ভরতা এবং তারই করুণ পরিণতি সম্বলিত’ আরেকটি গল্প তারাশঙ্করের গল্পগুচ্ছের তৃতীয় খণ্ডের ‘ডাইনী’। এই গল্পে লেখক আত্মজীবনীর ভঙ্গিতে স্বর্ণ ডাইনির অন্তরজগতকে আলোকিত করেছেন। লোকের কুসংস্কার ও অপবিশ্বাস থেকে স্বর্ণ সম্পর্কে মিথ্যা সন্দেহ এবং কাকতালীয় ঘটনা পরম্পরায় তাকে দোষারোপের মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক প্রসঙ্গগুলো লেখক তুলে ধরেছেন। লোকসমাজের ভ্রান্ত বিশ্বাস ও ডাইনি সম্পর্কে প্রচলিত সংস্কারের বিরুদ্ধে লেখক। ডাইনি নিয়ে তিনটি ঘটনা হলো — স্বর্ণের মাসী তার ডাইনি সত্তা বিড়ালকে সংক্রামিত করে, তারপর বিড়ালটি মৃত্যুর পূর্বে স্বর্ণের মধ্যে ডাইনি সত্তা সঞ্চারিত হয়। দ্বিতীয় ঘটনা গ্রামের অবিনাশের ডাইনি ভর ও গুণিনের ডাইনিমুক্ত করার ঘটনা। তৃতীয়টি কাঁউর বিদ্যা জানা ডাইনির গাছ উড়িয়ে আকাশ পথে ভ্রমণ ও মন্ত্রবলে গুণিনের মাটিতে নামিয়ে আনা ও তার চামড়া ‘ছিলে’ অর্ধেক গাছ নিয়ে ডাইনির উড়ে যাবার কাহিনি বর্ণিত। তবে এধরনের অপবিশ্বাস কুসংস্কারের বিরুদ্ধে স্বর্ণ ডাইনির প্রতি লেখকের মমত্ব প্রকাশিত হয়েছে। লোকবিশ্বাস মতে, ডাইনির দৃষ্টি ভয়ঙ্কর, তারা কচি নধর দেহে এবং সুন্দর সুশ্রী মানুষের তরুণী নববধূর শরীরের অস্থি চর্ম মেদ মাংস ভেদ করে ভিতরে প্রবেশ করে খোঁজে প্রাণ-পুতুলী। তাকে পেলে চুষে খায়। গভীর রাতে বাট বয়। মাটির উপর বুকে হেঁটে বেড়ায়। উত্তরাধিকার সূত্রে স্বর্ণ তার মাসীর বিড়ালের মাধ্যমে ডাইনিতে রূপান্তরিত হয়। জেলেদের কচি ছেলেকে গুণিন ডাইনি মুক্ত করার সময় স্বর্ণের বিড়ালকে হত্যা করা হয়। বিড়ালের মাধ্যমে ডাইনিত্ব সংক্রমিত হলে স্বর্ণ ডাইনি হয়ে ওঠে। ‘সে আবার কাউকে ডাইনীবিদ্যা দেবে তবে তার মরণ হবে।’ (১৯৭৭ : ১২১) তবে স্বর্ণের হাত নেই তার ভিতরের ডাইনির উপর। সতের/আঠার বছরের অবিনাশকে গোঁসাইবাবা ডাইনিমুক্ত করে অথচ স্বর্ণ প্রহৃত হয়। লেখকের স্মৃতি অনুসারে স্বর্ণ ছাড়া আরো অনেক ডাইনি ছিল গ্রামীণ সমাজে। তার চেয়ে গল্প ছিল অনেক বেশি। যেমন কাউরের বিদ্যা জানা গুণিনের ঘটনা ছিল অনেক। আসলে ডাইনি বিষয়ক তিন গল্পে তারাশঙ্কর ব্যক্ত করেছেন লোকসমাজের অবচেতনের সংগুপ্ত মনোবিকার।
জগদীশ গুপ্তের ‘হাড়’, বিভূতিভূষণের ‘ডাইনী’ এবং মহাশ্বেতা দেবীর ‘ডাইনি’-সহ তারাশঙ্করের ‘ডাইনীর বাঁশী’, ‘ডাইনী’ ও ‘ডাইনী’ (৩য় খণ্ড) অর্থাৎ সবগল্পে ‘ডাইনির কুনজর’ লোকবিশ্বাসের দৃষ্টিতে বর্ণিত হয়েছে। বাংলা ছোটগল্পের সব ডাইনি চরিত্রে এই একই বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয়। মন্দব্যক্তির কুনজর পড়লে খাদ্যদ্রব্য, ফল-ফসল ও শিশুর ক্ষতি হয় বলে লোকবিশ্বাস প্রচলিত। ডাইনি শিশুদের উপর নজর দিয়ে রক্ত শোষণ করে, শিশু শুকিয়ে যায়। ‘ফলন্ত গাছ, পোয়াতী, শিশুছেলে এদের ওপর রাক্ষসীদের ভারি লোভ। মানুষের শরীরের রক্ত চুষে খেয়ে নেয়।’ (১৯৭৫ : ২৩০) তারাশঙ্করের ‘ডাইনী’ গল্পে সাবিত্রীর শাশুড়ি সুরধুনীকে সাবিত্রীর সদ্যোজাত খোকার প্রতি দৃষ্টিকে বলেছে ‘হারামজাদীর চোখ দেখ দেখি’ (১৯৭৬ : ২৪৭)-এর পূর্বে সরকার-গিন্নী তার ছেলেকে নজর দেওয়ার অভিযোগ এনেছিল ‘ওর ঐ চোখের দৃষ্টি দেখে বরাবর আমার সন্দেহ ছিল কখনও আমি ওর সাক্ষাতে ছেলে-পুলেকে খেতে দিই নে। আজ আমি খোকাকে খেতে দিয়ে ঘাটে গিয়েছি আর ও কখন এসে একেবারে সামনে দাঁড়িয়েছে সে কি দৃষ্টি ওর।’ (১৯৭৬ : ২৪৫) তারও পূর্বে বামুন বাড়ির হারু চৌধুরী ১০/১১ বছরের সুরধুনীকে অভিযুক্ত করে ‘হারামজাদী ডাইনী তুমি আমার ছেলেকে নজর দিয়েছ? তোমার এত বড় বাড়? খুন করে ফেলব হারামজাদীকে?’ (১৯৭৬ : ২৪৪) অর্থাৎ খাদ্যগ্রহণরত শিশুকে কুনজর দেওয়ায় তারা পেট ব্যথায় ছটফট করে ওঠে- এই লোকবিশ্বাস বিবৃত হয়েছে এ-গল্পে। প্রকৃত অর্থে খাদ্যলোলুপতার জন্যই ক্ষুধার্ত সুরধুনীর দৃষ্টিতে মানুষ খুঁজে পায় কুদৃষ্টি। ‘ডাইনী’তেও (৩য় খণ্ডে) স্বর্ণ ডাইনির বিচিত্র স্থির দৃষ্টির কথা আছে। ‘ভাবলেশহীন শুষ্ক যেন খটখট করত দুটো হলদে চোখ এই পাথর শুকনো ডাঙার বুকে। ডাইনীর দৃষ্টি। এই দৃষ্টিতে ডাইনীরা কচি নধর দেহের, সুন্দর সুশ্রী মানুষের তরুণী নববধূর দেহের অস্থিচর্ম মেদ মাংস ভেদ করে ভিতরে প্রবেশ করে খুঁজত প্রাণ পুতুলী। তাকে পেলে চুষে চুষে তারা খেয়ে ফেলে।’ (১৯৭৭ : ১১৯) স্পষ্টত কুনজরের প্রসঙ্গ এসেছে এখানে। এ-গল্পে লেখকের অবিনাশদাদাকে ডাইনি নজর দেয় দৃষ্টিবাণে বিদ্ধ করে, তার ভিতর প্রবেশ করে তাকে শুষে খায়। কুনজর দেওয়ার কারণ বর্ণিত হয়েছে তার ঘরের সামনে দিয়ে বড় বড় আম হাতে নিয়ে যাচ্ছিল অবিনাশ (১৯৭৭: ১২১) আম না পেয়ে তাকেই খেয়ে ফেলে ডাইনি। (১৯৭৭: ১২২) [ক্রমশ]