হিন্দু শব্দটার উৎস নিয়ে পণ্ডিতরা একটা মতের কথাই বলেন। সিন্ধু থেকে এসেছে হিন্দু। যে আর্যরা সিন্ধু নদের তীর থেকেই পারস্যে ফিরে গিয়েছিল, তারাই নাকি সিন্ধুকে হিন্দু উচ্চারণ করেছিল, লিখিতভাবেও রেখেছিল প্রমাণ। সপ্তসিন্ধুকে Hapta Hindoo এই রোমান হরফে পাওয়া গেছে। পারসিকদের ধর্মগ্রন্থ জেন্দ আবেস্তাতেও ‘হপ্ত হিন্দু’ লেখা হয়েছে। এর বাইরে দ্বিতীয় কোনও মত নেই। কেউ এই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জও করেননি। তবে একটা সংশয় অনেকের মধ্যে দেখতে পাই। এটা নিয়েই আলোকপাত করছি। শব্দটির অস্তিত্ব সুলতানী আমলের আগে ছিল কিনা সেই নিয়ে অনেকের সংশয় দেখা যায়।
খ্রিস্টীয় পঞ্চম পূর্বশতকে, তাকিয়ে দেখি একটা বইয়ের দিকে — বইটির নাম ইন্ডিকা। গ্রীক উচ্চারণে ইন্দিকা। মেগাস্থিনিসের নয়, তাঁর থেকে অনেক আগে, গ্রীক চিকিৎসক Ctesias এর লেখা। কিছুটা বাস্তব কিছুটা আজগুবি এই বই। আজগুবি ব্যাপারটার একটা তাৎপর্য আছে। আজগুবি ব্যাপারগুলো থেকে বোঝা যায় এটা second hand account। হবারই কথা, কারণ এটা আলেকজান্ডারের অনেক আগের সময়। এটি মূলতঃ পারসিকদের কাছ থেকে গ্রীকরা ইন্ডিয়ার ব্যাপারে যা শুনেছিল তার ভিত্তিতে লেখা। হেরোডোটাসও একই ভাবে ইন্ডিয়ার কথা লিখেছেন। অতএব এই ইন্দোই, ইন্দোস, ইন্দিকা, ইন্দিয়া এই গ্রীক কথাগুলো পারসিকদের হাত ধরেই গ্রীসে পৌঁছেছে। সিন্ধু থেকে সোজা ইন্দ হয় না। স থেকে সোজা লুপ্তস্বর হয় না। স থেকে হ হয়, আর হ টা লুপ্তস্বর হয়। পুরোনো পারসিক ভাষায় স হ হয়ে যায় অনেক ক্ষেত্রে। অতএব সিন্ধু আর ইন্ডিয়া শব্দদুটোর মাঝখানে রয়েছে হিন্দ বা হিন্দু বা অনুরূপ কোনো শব্দ। ভারতীয় আর গ্রীকের মাঝে রয়েছে পারসিক। ভাষাগত ভাবে বোঝা গেল হিন্দ/হিন্দু জাতীয় শব্দ পঞ্চম পূর্বশতকে ছিল। পুরোনো পারসিক ভাষায়।
এবার দেখা যাক এই শব্দটার কোনো আর্কিওলোজিকাল এভিডেন্স আছে কিনা? আছে। একদম পাথরে খোদাই করা। ইরানের নকশ এ রোস্তম শিলালিপিতে। পঞ্চম পূর্বশতকেই। দারায়ুসের শিলালিপি। ওখানে আছে “হিদুস”। তবে পুরোনো পারসিক লিপিতে চন্দ্রবিন্দু ছিল না, মানে, কথার মধ্যে চন্দ্রবিন্দু থাকলেও সেটাকে লেখার উপায় ছিল না, অতএব হিদুস শব্দটাকে হিঁদুস বলেই মনে করা হয়। হিদুস শব্দটা মূলত উত্তর পশ্চিম ভারতীয় উপমহাদেশকে বোঝাতে ব্যবহার হয়েছিল।
নকশ এ রোস্তমে এক জায়গায় তিরিশটি আলাদা আলাদা জাতির সৈনিকদের নাম ও মূর্তি সারিবদ্ধভাবে আছে। তিরিশটি জাতির মধ্যে বিভিন্ন ইরানীয় জাতির নামের পাশাপাশি রয়েছে অনেক বিদেশী জাতির নাম — আরব, যবন, ব্যাবিলোনীয় ইত্যাদির সাথে রয়েছে হিঁদুস জাতির বা অঞ্চলের নাম। হিদুস বা হিঁদুস বলতে যে একটা অঞ্চল বা তার মানুষজনকে বোঝাতো দারায়ুসের যুগে, অর্থাৎ শুধুই একটা নদীকে বোঝাতো না — তাতে সন্দেহ নেই।
পরে অবশ্য মেগাস্থিনিসের ও অন্যান্য গ্রীক লেখকদের পরিভাষায় ইন্ডিয়ার ব্যাপ্তি দেখা গেছে দক্ষিণ ভারত অবধি।
এবার দেখা যাক ফার্সী শব্দ হিন্দুস্তান বা হিন্দোস্তান শব্দটা কতটা পুরোনো। ঐ নকশ এ রোস্তমেরই আর একটা শিলালিপিতেই। রাজা শাপুরের শিলালিপি। তৃতীয় শতক। এখানে পাবেন হিন্দেস্তান। আল বিরুনির একাদশ শতকের বইয়ের নামেও আছে হিন্দ। হিন্দু শাহী রাজবংশের কথাও উনি বলেছেন। এটি অবশ্য ইসলাম ধর্ম প্রবর্তনের পরবর্তী যুগে।
তাহলে বোঝা গেল হিন্দু বা হিন্দ বা ইন্ডিয়া শব্দগুলো exonym বা বহিঃপ্রদত্ত নাম (জার্মান জাতি বা চীন দেশের মতই) যা প্রাচীন পারসিক ভাষা থেকে বিভিন্ন দেশে পৌঁছেছে। প্রাচীনত্ব নিয়ে সন্দেহ নেই।
তাহলে কি অন্য কোনও ব্যুৎপত্তি হয় না হিন্দু শব্দটির? আমাদের সুপ্রাচীন সংস্কৃত বা প্রাকৃতভাষায় কি সমোচ্চারিত কোনও শব্দ ছিল না? বেদ উপনিষদে বা ব্রাহ্মণে? হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় বঙ্গীয় শব্দকোষে সংস্কৃত সিন্ধু বা প্রাকৃত হিংহু থেকে হিন্দু আসার কথা লিখেছেন। Av. hendu, ফা. হিনদ্, Hebrew — Hand। সংস্কৃত থেকে প্রাকৃত, না প্রাকৃত থেকে সংস্কৃত, সে বিতর্ক আছেই। সুকুমার সেন তো বলে গেছেন, আর্যরা ভারতে আসার আগেই প্রাকৃতভাষায় কথা বলত এখানকার জনগোষ্ঠী। তবে জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস যে কী করে প্রাচীন বাংলা (গ্রাম্য) হ্যাঁদু, হাঁদু-র সঙ্গে হিন্দু বা হিঁদুর আত্মীয়তা দেখতে পেলেন, সেটাই রহস্য।
শ্রীকৃষ্ণের হিন্দোল (ঝুলন) উৎসব থেকে হিন্দু কথাটির সৃষ্টি কিনা ভেবে দেখা দরকার। শ্রীমদ্ভগবতগীতার প্রাচীনত্ব নিয়ে কোনও সংশয় নেই। শিবভক্তরাও হিন্দোল পালন করে নীলপূজার আগে। বিশেষ করে পাশুপতগোষ্ঠী। হিন্দোল একটি রাগও বটে। রাগের সাতটি জাতির মধ্যে একটি হিন্দোল।
হিন্দোল > হিন্দুল > হিন্দু?
তাহলে তো হিন্দুল শব্দটির পাথুরে প্রমাণ থাকা দরকার। তা আছে বইকি! বঙ্গীয় শব্দকোষেই আছে হিন্দুল শব্দটি। ‘সমুদ্র হিন্দুল জেন কান্দে হুলাস্তুলি’।
বৈষ্ণবদের হিন্দোল বা ঝুলন উৎসব বা শৈবদের চড়কজাতীয় হিন্দোল পার্বণ খুবই প্রাচীন। তার সঙ্গে হিন্দু শব্দটির কোনও যোগ আছে কিনা ভেবে দেখা দরকার।