চার.
বাংলা ছোটগল্পের এই ডাইনি প্রজ্ঞাবান কেউ নয়, লোকচিকিৎসকও নয়, ইউরোপের ডাইনিদের মতো প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের প্রতিপক্ষও নয়। কিন্তু স্লিম্যান বর্ণিত লোকমানসসম্ভূত নির্মাণ। এখানে দরিদ্র একাকী অসহায় নারীকে গ্রামসমাজ ডাইনি বলে চিহ্নিত করে রেখেছে। তার কাছ থেকে অমঙ্গলের আশঙ্কা করেছে। তেমনি আবার আদিবাসী সমাজে নারীকে ডাইনি আখ্যা দেওয়ার করুণ চিত্রও রয়েছে বাংলা ছোটগল্পে। মানুষের শঠতার কারণে নারীকে ডাইনি আখ্যা দিয়ে লাঞ্ছিত করার অ-মানবিক কাহিনি হলো মহাশ্বেতা দেবীর (১৯২৬-২০১৬) ‘ডাইনি’। অন্ধবিশ্বাস ও সংস্কারে উন্মত্ত হয়ে একজন নারীকে নিক্ষেপ করা হয়েছে অমানবিক পরিস্থিতির মধ্যে। এই নারীর রয়েছে একদিকে মাতৃসত্তা অন্যদিকে সমাজের শঠ ব্যক্তিদের আরোপিত ডাইনিসত্তা। তারাশঙ্করের ‘ডাইনী’তে যেমন উভয় সত্তা একটির পর একটির জাগরণ ঘটেছে তেমনি নিষ্ঠুর, নির্মম মানবতাহীন সমাজের পরিচয় ব্যক্ত করেছেন মহাশ্বেতা দেবী।
মূলত মহাশ্বেতা দেবীর ‘ডাইনি’ (২০১৪ : ৩২২-৩৫৫) গল্পে আদিবাসী সমাজের নিম্নবর্গের মানুষের অন্ধ সংস্কার তুলে ধরা হয়েছে। তাদের বিশ্বাস কোনো মানুষের উপর প্রেত বা পিশাচ ভর করলে তারা ডাইনি হয়ে যায়। এ গল্পে ডাইনির ক্ষমতা দেখানো হয়েছে। তাদের প্রভাবে আকাল আসে, খরা হয়, মড়ক দেখা দেয়। নি¤œবর্গের সমাজে প্রভুত্বশক্তি হনুমান মিশ্র ব্রাহ্মণ, তাদের ভাষায় ‘বরাম্ভোন দেবতা’। সে নিজের পুত্রের অপকর্মের দায় চাপিয়ে দেয় গঞ্জু, দোসাব, ধোবী, ওরাওঁ এবং মুণ্ডাদের ওপর। প্রচার করে যে ডাইনির আবির্ভাব হয়েছে তাদের পাপাচারের কারণে। এই ব্রাহ্মণের অপপ্রচারে নিম্নবর্ণের জীবনে পারস্পরিক অবিশ্বাস দানা বেধে ওঠে। নিজেদের মধ্যে ডাইনি খোঁজা শুরু হয়। এই সমাজে ডাইনি সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা হলো — ডাইনি দূর থেকে নজর দিয়ে বা তুক করে দুধে দই কাটায়, ছাগল-গাই মেরে ফেলে; শস্য নষ্ট করে, খরা ডাকে আকাল ঘটায়, ছোট ছেলেপিলের প্রাণ নেয়, রজস্বলা মেয়েকে স্বদলে টানে, গর্ভিনীর গর্ভে ঢোকে। এসব কারণে সেই সমাজ থেকে ডাইনিকে তাড়িয়ে দেওয়ার রেওয়াজ রয়েছে। প্রকৃত ঘটনা গল্পের শেষে উন্মোচিত হয়েছে। টুরার পহানের মেয়ে সোমরিই ডাইনি বলে মিথ্যা অভিযুক্ত হয়েছে হনুমান মিশ্র কর্তৃক। তারই নিকৃষ্ট অপকৌশলে বোবা সোমরিই ডাইনি বলে বিতাড়িত হয়েছে। অসহায় সোমরিইকে গর্ভবতী করেছে হনুমানের ছেলে। তারপর তাকে তাড়িয়ে দিয়েছে জঙ্গলে। আর ডাইনির মিথ্যা কাহিনি ছড়িয়ে সহজ সরল কুসংস্কারগ্রস্ত গ্রামবাসীর সঙ্গে প্রতারণা করেছে। হনুমান মিশ্ররা নিজেদের অপরাধ আড়াল করার জন্য নারীসমাজকে এভাবে নিন্দিত করে তোলে। গ্রামবাসীরা শেষ পর্যন্ত প্রকৃত সত্য জানতে পেরে মিশ্রের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। গঞ্জু, দোসাব, ধোবী ও মুণ্ডদের এই পরিবর্তন এ গল্পের মুখ্য ব্যঞ্জনা।
গল্পে আদিবাসী সমাজে ডাইনি সম্পর্কিত নানা বিশ্বাসের প্রসঙ্গ ঘুরে ফিরে এসেছে। আকালের সঙ্গে যা যা ঘটেছে সবই ডাইনির কারণে। শিশুরা রিলিফ প্রদত্ত সয়াবিনের দুধ খেয়ে ঘাড় উলটে বমি তুলে মরে যাচ্ছে। মরছে গাই-মোষ। গাছ থেকে টাউরি খেয়ে ঘুরে পড়ে মরে যাচ্ছে দাঁড়কাক। ডাইনির উপস্থিতিতে এসব ঘটেছে। ডাইনি থাকলে অত্যাশ্চর্য সব ঘটনা ঘটতে পারে; চকমকি ঠুকে বিড়ি খেতে গিয়ে দেখা যায় চকমকি পাথর থেকে আগুন না, বেরিয়েছে রক্ত। আঁতুড়ে শিশু হেঁটে চলে যাচ্ছে, আগুনের মালসা পায়ে ঠেলে। সমাধির পাথর ঠেলে মৃতেরা উঠে বসে গান গাইছে। সামগ্রিক বিপর্যয় ও আতঙ্ক অধিকাংশই কেউ চোখে দেখে না কানে শুনে বিশ্বাস করে। টাহাড়ের হনুমান মিশ্র জানিয়েছে অধিবাসীরা মহাপাপী তাই ডাইনি কুরুডা, মুরহাই, হেসাডি আরো অনেক গ্রাম কেন্দ্র করে ঘুরছে। উলঙ্গ নারী রক্তবর্ণ মেঘে চেপে উড়ে গেছে। সেই ডাইনিকে খুঁজে বের করে তাড়াতে হবে। তাকে আঘাত করে রক্তপাত ঘটালে বা পুড়িয়ে মারলে সমূহ সর্বনাশ।
হনুমান মিশ্রের নির্দেশ অনুযায়ী ডাইনিকে গ্রামবাসীরা কুরুডা থেকে মুরহাই থেকে হেসাডি থেকে জিলাদের মাঠে তাড়িয়ে নিয়ে যায়। ডাইনি তাড়াতে গিয়ে হেসাডি, ঢাই টুরা, কুরুডা সব গ্রামের শক্ত-পোক্ত পুরুষেরা জড়ো হয়ে নানা ক্রিয়াকা- ও আক্রমণ প্রতিআক্রমণ শেষে জানতে পারে ডাইনি নেই। প্রকৃত ঘটনা হলো টুরার পহানের মেয়ে সোমরিই ডাইনিরূপে মিথ্যা অভিযুক্ত। তাকে তাড়িয়ে দিয়ে জঙ্গলে প্রচার করেছে ডাইনিকে প্রাণে মের না তাড়িয়ে দাও। ‘শেষ পর্যন্ত গ্রামবাসীরা ডাইনির অস্তিত্বকে অস্বীকার করে। ডাইনির অসত্যতা বিষয়ে এদের সম্যক উপলব্ধি হয়। মিশ্রজীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার অঙ্গীকার করে। গঞ্জু, দুসাব, ধোবী ও মু-াদের এ ধরনের পদক্ষেপে সমাজ পরিবর্তনের এক ক্ষীণতম আশার সঞ্চার হয়।’ (অজয় গুপ্ত ২০১৪ : ৫৯৮)
‘ডাইনি’ গল্পে আদিবাসীদের নির্মম শোষণের চিত্র রয়েছে। ন্যূনতম খাদ্য জোটাতে যাদের প্রাণান্তকর চেষ্টা চলে তারা আবার অন্ধসংস্কারে আটকে যায়। সীমাহীন দারিদ্র্য, অজ্ঞতা, বেঁচে থাকার করুণ অভিজ্ঞতা রূপ পেয়েছে এ গল্পে। অজ্ঞ, মূর্খ আদিবাসী নিম্নবর্ণের জীবনে ডাইনি একটা মজ্জাগত বিশ্বাস। নিজেদের পাপে গ্রামে ডাইনির আবির্ভাব ঘটেছে এই বিশ্বাস করানোর মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে ব্রাহ্মণ শ্রেণির অপতৎপরতা যা শোষণের অংশ। নিজেদের মধ্যে ডাইনি খুঁজতে গিয়ে পরস্পরের প্রতি নিষ্ঠুর আচরণও করে তারা। চূড়ান্ত নির্দয় হওয়ার ঘটনাও আছে এ গল্পে।
বস্তুত ক্ষুরধার রচনাভঙ্গিতে নির্যাতিত জীবনের কাহিনি লিখেছেন মহাশ্বেতা দেবী। ব্যঙ্গ-বিদ্রুপে মমতায় চরিত্রগুলি জীবন্ত; ভাষা কাব্যময়। বিষয়-চরিত্র ও যথোপযুক্ত ভাষা প্রয়োগে গল্পটি শিল্পোত্তীর্ণ। কাল্পনিক নয় বাস্তব সমাজের চিত্রণ রয়েছে এতে। সমাজের শোষণের মাত্রাটি তুলে ধরেছেন লেখক। পরিবেশনার দক্ষতায় হতভাগ্য নারীর সমস্যা, নির্যাতন একাত্ম করে তোলা হয়েছে। মহাশ্বেতা দেবী তাঁর ‘বাঁয়েন’ গল্পেও ডোম সমাজের অলৌকিক বিশ্বাসের মানবিক পরিণতি দেখিয়েছেন। ডোম সমাজের বিশ্বাস বাঁয়েন রাক্ষুসী। সমাজের অনিষ্ট করে। মরা ছেলেকে আদর করে দুধ খাওয়ায়। লোক বিশ্বাস অনুযায়ী বাঁয়েনের দৃষ্টিতে আস্ত একটা গাছ পর্যন্ত শুকিয়ে যায়। বাঁয়েন যদি কাউকে নেবার জন্য মনস্থ করে তবে প্রচ- রোদের মধ্যেও সে ছেলের মুখে ছায়া ফেলে রাখে ইত্যাদি। ছোট ছেলেদের অনিষ্টকারী বাঁয়েন চণ্ডী শেষে নিজের জীবন দিয়ে প্রমাণ করে সে মানব। ট্রেন দুর্ঘটনা থেকে মানুষকে বাঁচায় সে। (মহাশ্বেতা দেবী ‘বাঁয়েন’ ২০১৪: ৫১-৫২) [ক্রমশ]