ফরিদাবাদ থেকে দিল্লি বেড়াতে আসা এক মহিলার সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনার গল্প এটি। এক মহিলা দিল্লি বেড়াতে আসেন। তিনি ফিরে গিয়ে দিল্লিতে তার সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলি তার বন্ধুদের কাছে বর্ণনা করেন। তার সাথে ঘটে যাওয়া সমস্ত ঘটনা এতই আকর্ষণীয় যে যখনই তার বন্ধুরা তার বাড়িতে জড়ো হয়ে তাকে তার দিল্লি ভ্রমণের গল্প বর্ণনা করতে বলে।
“ঠিক আছে আপু, চলো আমরাও আসি”, করিডোর থেকে এই আওয়াজটা ভেসে এলো, আর সাথে সাথে একটা মেয়ে তার কুর্তার গোড়ায় হাত মুছতে মুছতে ঘরে ঢুকলো।
তার পরিচিতদের মধ্যে মালেকা বেগমই প্রথম ট্রেনে উঠেছিলেন। তিনি ফরিদাবাদ থেকে একদিনের জন্য দিল্লি এসেছিলেন, এমনকি তার এলাকার লোকেরাও তার যাত্রার গল্প শোনার জন্য উপস্থিত ছিল।
“যদি আসতেই হয় তাহলে আসো! আমার মুখ সম্পূর্ণ ক্লান্ত। আল্লাহ যদি মিথ্যাকে দাওয়াত না দেন, আমি তোমাকে শতবার বলেছি। এখান থেকে ট্রেনে করে দিল্লি পৌঁছে সেখানে তার পরিচিত স্টেশন মাস্টারের সঙ্গে দেখা হয়। তিনি আমাকে ট্রেনের বেঞ্চ কাছে রেখে গেলেন। আমি বোরকায় জড়িয়ে বেঞ্চে বসে রইলাম। পুরুষেরা এমনি খারাপ, কোনো নারীকে একা এভাবে বসে থাকতে দেখলেই তারা মহিলার সঙ্গে কথা বলতে উৎসুক হয়ে ওঠে।
তখন পান খেতেও ভালো লাগেনি।
তাদের কাশি ও কর্কশ কন্ঠস্বরে ভয়ে আমার শ্বাস বন্ধ হাবার উপক্রম। আমার খুব ক্ষুধা লাগে। আমি আল্লাহর কাছে খাবার প্রার্থনা করি। যতদূর চোখ যায় শুধু স্টেশন দেখা যাচ্ছিল। রেললাইন, ইঞ্জিন ও পণ্যবাহী ট্রেনও দেখা যাচ্ছিল। সবচেয়ে বেশি আমি ট্রেনে থাকা কালো পুরুষদের ভয় পেয়েছিলাম।”
“ইঞ্জিনে কে থাকে?” কেউ বাধা দিয়ে জিজ্ঞেস করল।
“কে আমি জানি কি? আমি জানি না আন্টি কে থাকে। হয়তো নীল জামা পরা, দাড়িওয়ালা কিংবা ক্লিন-শেভেনওয়ালা কেউ হয়ত। এক হাতে তার ধরা চলন্ত ইঞ্জিনের সুইজ।
দিল্লি স্টেশনে এত বেশি সাহেব এবং মেম সাহেব আছেন যে তাদের গণনা করা যাবে না। তারা হাতে হাত রেখে ঝগড়া করতে থাকে। আমাদের ভারতীয় ভাইরাও চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকে। অসভ্যদের চোখ যেন জ্বলছিল। তাদের একজন আমাকে বললো, ‘আমাকে তোমার মুখ দেখাও।’
আমি সাথে সাথে…”
“তাহলে কি দেখাওনি?” শ্রোতাদের একজন জিজ্ঞাসা করল।
“আল্লাহ আল্লাহ করুন। মুখ দেখাতে গেলে আমার মনটা যেন লাফিয়ে উঠতে শুরু করে”, তার মনোভাব পরিবর্তন করে, “যদি আপনি শুনতে চান তবে বাধা দেবেন না।”
ছিল সম্পূর্ণ নীরবতা। ফরিদাবাদে এমন মজার কথাবার্তা বিরল ছিল এবং মালেকার কথা শোনার জন্য বহু দূর থেকে মহিলারা আসতেন।
“হ্যাঁ, খালা, দর কষাকষিকারীরা আমাদের মতো নয়। পরিষ্কার খাকি জামা, কারো কারো সাদা, কিন্তু কারো ধুতি ছিল নোংরা, তারা চলন্ত গাড়িতে ঝুড়ি, পান, লোহা, সিগারেট, দই, বড় খেলনা, মিষ্টি নিয়ে ঘুরে বেড়াত। একটা গাড়ি এসে থামল। এমন আওয়াজ হল যে কানের পর্দা ফেটে যাবে, একদিকে কুলিদের চিৎকার যাত্রীরা বিরক্ত। একে অপরের উপর ছিটকে পড়ছে। আর আমি বেচারা বসে আছি মাঝখানের বেঞ্চে। ও মাই গড, ট্রেন শুরু হলে যাত্রী ও পোর্টারদের মধ্যে হাতাহাতি শুরু হয়।”
“আমি এক টাকা নেব।”
“না, তুমি দুই আনা পাবে।”
স্টেশন ফাঁকা হয়ে গেলে ঘণ্টাখানেক সংঘর্ষ হয়। শুধু স্টেশনের খাঁটিরা জড়ো করা ছিল। প্রায় দুঘণ্টা পর একটা লোককে দেখা গেল, গোঁফ টেনে ধরে অকপটে বলতে লাগল, ‘তোমার খিদে লাগলে, আমি তোমার জন্য কিছু পুরি আর ডাল নিয়ে আসি, তুমি খাবে? ওখানে হোটেলে আছে। ‘
রশিদ জাহান (Rashid Jahan) (২৫ আগস্ট ১৯০৫-২৯ জুলাই ১৯৫২) : একজন ভারতীয় লেখক ও চিকিৎসক ছিলেন। উর্দু সাহিত্যের ছোট গল্প ও নাটকে তিনি সামাজিক অবস্থা তুলে ধরায় বিশেষভাবে পরিচিত। তার লেখা ছোটগল্পের সংকলন আঙ্গার ১৯৩২ সালে প্রকাশিত হয়।
মনে করা হয় জাহান তার জীবদ্দশায় প্রায় ২৫-৩০টি মৌলিক ছোটগল্প ১৫-২০টি মৌলিক নাটক লিখেছিলেন। জাহান যে নাটকগুলি লিখেছিলেন তা রেডিওর উদ্দেশ্যে লেখা ছিল এবং সাধারণত তার জীবদ্দশায় অল ইন্ডিয়া রেডিওতে প্রচারিত হয়েছিল। তিনি ২৯ জুলাই ১৯৫২ সালে লোকান্তরিত হন। তার ছোট গল্প ‘দিল্লি সফর’ (Dilli Ki Sair) কে বঙ্গানুবাদ করা হলো।]
মনোজিৎ কুমার দাস, অনুবাদক ও কথাসাহিত্যিক, লাঙ্গলবাঁধ, মাগুরা, বাংলাদেশ।