পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে ক্যারিয়ার
তরুন আতিক যখন সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন (১৯৫১), তখন পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে হাতে গোনা কয়েকজন বাঙালি অফিসার কর্মরত ছিলেন। বৈষম্যপূর্ণ ও পাঞ্জাবি-প্রভাবিত পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে ব্যাপক প্রতিযোগিতার মধ্যে বাঙালিদের টিকে থাকতে হতো। কারো অনুকম্পা অনুগ্রহ নয় নিজেদের যোগ্যতার বলে প্রবল প্রতিযোগিতারে ভিতর দিয়ে বাঙালি সেনাকর্মকর্তারা তাদের আসন তৈরী করে নিয়েছিলেন। আর্টিলারি কোরে এ প্রতিযোগিতা ছিল আরো বেশি। শুরু থেকেই তিনি একটি চমৎকার ক্যারিয়ার গড়ে তুলতে আপ্রাণ চেষ্ঠা করেন। প্রশিক্ষণ কোর্সেগুলোতে (মোট ১৩ টি) মেধার পরিচয় দেন।
ঢাকার নবাব পরিবারের সন্তান ব্রিগেডিয়ার খাজা ওয়াসিউদ্দিন (পরে লেঃ জেনারেল, রাষ্ট্রদূত) ১৯৫৯-৬০ সালে আর্টিলারি পরিদপ্তরের পরিচালক ছিলেন। তাঁর ষ্টাফ অফিসার ছিলেন মেজর কাজী নুরুজ্জামান (পরে লেঃ কর্ণেল, বীর উত্তম, ৭ নং সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার)। তরুন আতিক এই দুই জন জেষ্ঠ আর্টিলারি অফিসারদের দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন।
জেঃ আতিক মালির সেনানিবাসস্থ বিমান বিধ্বংসী গোলন্দাজ স্কুল থেকে গানারি স্টাফ কোর্স ও যুক্তরাষ্ট্রের গাইডেড মিসাইল স্কুল থেকে ‘‘ইলেকট্রনিক্স’’ এর উপর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। তিনি গোলন্দাজ বাহিনীর সকল স্তরে চাকুরী করার দুর্লভ সুযোগের অধিকারী। নিজেকে একজন ভালো ‘‘রেজিমেন্টাল সোলজার’’ হিসেবে গড়ে তোলেন। পরবর্তীতে কমান্ড, স্টাফ এবং প্রেষণে বিভিন্ন ধরনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দক্ষতার সঙ্গে পালন করেন। তিনি মেজর হিসেবে ইন্টার সার্ভিস সিলেকশন বোর্ডের (আইএসএসবি) গ্রাউন্ড টেস্টিং অফিসার (জিটিও) হিসেবে কাজ করেন। লেঃ কর্ণেল আতিক ১৩ এলএএ রেজিমেন্ট আর্টিলারির অধিনায়ক, (কমান্ডিং অফিসার) ছিলেন। সুদক্ষ আর্টিলারি অফিসার হিসেবে আর্টিলারি ইউনিটের পরিবেশগত প্রোথিত, ’’মেটিকুলাস প্ল্যানিং’’ এর বিষয়টি পরবর্তী উচ্চতর নেতৃত্বের দায়িত্ব পালনকালে চমৎকারভাবে কাজে লাগিয়েছিলেন।
আরব সাগর তীরে একাকী বাঙালি ক্যাপ্টেন
১৯৫০-দশকের শেষের দিকের একটি ঘটনা। করাচীর কাছে আরব সাগর তীরের এক রেঞ্জে বিমান বিধ্বংসী আর্টিলারি রেজিমেন্টের কোর্স শুটিং চলছে। বিমান বিধ্বংসী গান বা কামান দিয়ে সমুদ্রের উপরে উড়ন্ত লক্ষ্যবস্তুতে (বেলুন) ফায়ার করা হচ্ছে। বিভিন্ন ব্যাটারির ফায়ারিং এর পর তরুন অফিসারগণ ফায়ার করছেন। কিছুটা পরীক্ষার মতো। এবার ফায়ার করবেন রেজিমেন্টের একমাত্র বাঙালি অফিসার ক্যাঃ আতিক। তখন সব কিছু ম্যানুয়েল। লিড ক্যালকুলেশন করলেন তিনি গানের গেজেটে। এলিভেশন ট্রাকিং শুরু হলো। লক করা হলো টার্গেট। সবার লক্ষ্য এই বাঙালি অফিসার কি করছে? টেনসান হচ্ছে তবুও ধীর স্থিরভাবে কাজ করছেন এই ক্যাঃ। একমাত্র বাঙালি অফিসার কি পারবে আজ বাঙালির মান বাচাঁতে? এবার ফায়ার করলেন আতিক। লক্ষ্য বস্তু — বেলুন ধ্বংস হলো। সেদিন এভাবেই যেন বাংলা মায়ের সম্মান রেখেছিলেন তরুন বাঙালি ক্যাপ্টেন। তবে বেলুনের মতো চুপসে গেল রেজিমেন্টের কয়েকজন অবাঙালি কর্মকর্তা। ক্যাপ্টেন আতিক ফায়ারিং এ ব্যর্থ হলে যারা বেশ উল্লসিত হতেন।
সৌভাগ্যক্রমে জেঃ আতিকের সঙ্গে অনেক বার তাঁর জীবনের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলার আমার সুযোগ হয়েছে। একবার রাওয়ার অনুষ্ঠানে দেখা হলে আলাপচারিতায় জেঃ আতিক আমাদের কয়েকজনকে বলেছিলেন — ‘‘তোমরা কতো ভাগ্যবান। আর্মিতে এখন প্রায় সবাই বাঙালি। আমাদের সময় প্রতি পদে সতর্ক হয়ে চলতে হতো। তীব্র প্রতিযোগিতা ছিল। তবে আমরা যোগ্যতা দিয়েই নিজেদের আসন অধিকার করতাম’’।
বিবাহ ও পরিবারের সাতকাহনঃ
তৎকালীন তরুন অফিসার ক্যাপটেন আতিক ১৯৬১ সালে বেগম মুনিরা মহব্বত এর সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। বিবাহত্তোর সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়েছিল ঢাকার শাহবাগ হোটেলে। সেই অনুষ্ঠানে টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার এলাকা থেকে অনেক আত্মীয় স্বজন এসেছিলেন। বেগম মুনিরা আতিক এর শিকড় প্রথিত রয়েছে দেলদুয়ার এর জমিদার বাড়িতে।
বেগম মুনিরা আতিক অত্যন্ত সামাজিক, দয়ালু ও সুগৃহিনী মহিলা ছিলেন। সেনাপরিবার কল্যাণ সমিতির পৃষ্ঠপোষক হিসেবে এই প্রতিষ্ঠানকে তিনি সুসংগঠিত করেন। এই দম্পত্তির তিন সন্তান। ছেলেঃ শফিকুর রহমান ও আকিলুর রহমান। মেয়েঃ ডাঃ মাহেরা আতিক। সবাই স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। বেগম আতিক ২০১০ সালে মৃত্যুবরন করেন।
ক্যাপ্টেন আতিকের বিয়ের সময় বেশ মজার একটা ঘটনা ঘটেছিল। ২০২০ সালে রাওয়া থেকে প্রকাশিত ‘রাওয়া মিরর’ পত্রিকায় “মেজর আবদুল গণি : বাংলাদেশ সেনাবাহিনী গঠনে তাঁর অবদান’’ শীর্ষক তাঁর একটি ছোট্ট প্রবন্ধ ছাপা হয়। সেই লেখায় প্রচারবিমুখ এই জেনারেল, তাঁর ব্যক্তিগত একটি মজার বিষয় শেয়ার করেন। ঐ সময় (১৯৫০-৬০ দশক) বৃটিশ সেনাবাহিনীর প্রভাবান্বিত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অফিসার মেসে ও বাজারে সুরা অবাধে পাওয়া যেত। সুরাপানের ব্যাপারটা গভীরভাবে বাঙালি অভিভাবকদের মনে প্রোথিত হয়েছিল। ক্যা: আতিকের হবু শাশুড়ী সেই সময়ে তাঁর দূর সম্পর্কের ভাই ক্যাপটেন কাজী গোলাম দস্তগীরকে (পরে মেজর জেনারেল) জিজ্ঞাসা করেন ক্যাপ্টেন আতিক সুরা পান করেন কিনা? উত্তরে ক্যাঃ দস্তগীর বলেন — “বুবু, আমি পান-সিগারেট-চা খাই ও (ক্যাপ্টেন আতিক) তাও খায় না। সুরা তো দূরের কথা।”
মান্ডি বাহাউদ্দিন ক্যাম্পে দূর্বিষহ যে জীবন
১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১। লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উঠলো। পূর্বদিকে স্বাধীন বাংলাদেশে তখন বিজয়ের আনন্দ হিন্দোল। কিন্তু পশ্চিম দিকে, পাকিস্তানে খাঁচাবন্দী হয়ে গেলো প্রায় ২৮ হাজার বাঙালি সৈনিকসহ প্রায় ২ লক্ষ বাঙালী। ১০ জানুয়ারী ১৯৭২ সালে, অল ইন্ডিয়া রেডিওর সহায়তায় বাংলাদেশ বেতারযোগে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ধারা বিবরণী শুনছিলেন লেঃ কর্ণেল আতিক। অদ্ভুত আবেগ আর আনন্দ উচ্ছাসে মন ভরে গেল এই কর্ণেলের।
কিন্তু আবার অনিশ্চিত জীবন শুরু হলো। পাঞ্জাবের মান্ডি বাহাউদ্দিন ক্যাম্পে ছিল বন্দী ছিলেন লেঃ কর্ণেল আতিকসহ কয়েকশো অফিসার ও সৈনিক। চতুর্দিকে কাঁটাতার দিয়ে ঘেরাও করা ছিল এই ক্যাম্প। কাঁটা তারগুলো ছিল বিদ্যুতায়িত। এই পরিস্থিতিতেও অসহনীয় অবস্থা থেকে বিভিন্ন ক্যাম্পের বেশ কিছু তরুন সেনা কর্মকর্তা পালানোর চেষ্টা করলেন। টানেল কেটে কেউ কেউ পালাতে সক্ষমও হলেন নাটকীয়ভাবে। প্রত্যেকের পালানোর ইতিহাস অশ্রুতভাবে রোমাঞ্চকর। অনেক বছর পর লেঃ কর্ণেল এম এ হামিদ তাঁর ‘‘একাত্তরের যুদ্ধে জয় পরাজয়, মুক্তিযুদ্ধে পশ্চিম পাকিস্তানের দৃশ্যপট’’ গ্রন্থে লিখবেন ক্যাম্পের দুর্বিসহ জীবন ও শ্বাসরুদ্ধকর পালানোর ঘটনা।
ক্যাম্পের অসহনীয় জীবন। দেশে ফেরার সকল পথ বন্ধ। এর মধ্যেও পাকিস্তানে আটক বাঙালিদের বাংলাদেশে ফেরত নেয়ার বিষয়ে বঙ্গবন্ধু- সরকারের উদ্যোগগুলো মনে আশা জাগাতো। বিবিসির বাংলা বিভাগের মাধ্যমে দেশের আত্মীয় স্বজনের বার্তা শোনার ব্যবস্থা ছিল। এটিই সৈনিকদের মন চাঙ্গা করে রাখতো। এতো হতাশা অবসাদ অনিশ্চয়তার মধ্যেও কর্ণেল আতিক মনে করতেন যে একদিন আলো আসবেই।
১৯৭৩ সালের সেপ্টেম্বরের দিকে বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হলো। সংসারের অধিকাংশ জিনিষ ফেলে আসতে হলেও লেঃ কর্ণেল আতিক গোপনে তাঁর কাছে থাকা আর্টিলারীর কিছু প্রেসি, প্যামপ্লেট সুটকেসে নিয়ে এলেন কিছুটা ঝুঁকি নিয়েই। ক্যাম্পের ‘‘দুর্ধষ্য’’ পাকিস্তানি কমান্ডার জানতেই পারলো না যে ক্যাম্প থেকে ‘পাচার’ হয়ে যাওয়া পাকিস্তান আর্মির আর্টিলারি প্যামপ্লেট নিয়েই একদিন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর আর্টিলারি ট্রেনিং যথাযথভাবে শুরু হবে।
প্রত্যাবাসন পর্ব — ১৯৭৩
প্রায় পৌনে ২ বছর পাকিস্তানের বিভিন্ন ক্যাম্পে অন্তরীন প্রায় ২ লক্ষ বাঙালির চরম দুঃখের দিন শেষ হলো। বাংলাদেশে প্রত্যাবাসন বা রিপ্যার্টিয়েশন শুরু হলো প্রথম ব্যাচের সামরিক-অসামরিক ১৬৮ জন বাঙালি নিয়ে। তাদের নিয়ে ১৯৭৩ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা ৬:৪০ মিনিটে আরিয়ানা আফগান এয়ারলাইন্সের একটি বিমান ঢাকার তেজগাঁও বিমান বন্দরে ল্যান্ড করলো। সন্ধ্যায় বিমান বন্দরে হাজার হাজার মানুষ (মূলত আত্মীয় স্বজন) তাদের প্রীতি ও ভালোবাসা ঢেলে মাতৃভূমিতে স্বাগত জানায়। আত্মীয় স্বজন জানতো না এই ফ্লাইটে কে কে আসবেন। উড়োজাহাজটি ঢাকার মাটি স্পর্শ করার সঙ্গে সঙ্গে সৃষ্টি হয় মর্মস্পর্শী দৃশ্যের। সমবেত জনতা মূহুর্তে চঞ্চল হয়ে ওঠেন। সব নিয়ম কানুন ভেঙে টার্মিনাল ভবনে হাজারো জনতা খুঁজে বেড়ায় প্রিয়জনকে।
অবশেষে পরিবারগুলো নেমে আসতে থাকে উড়ো জাহাজ থেকে। এই সময় বিমান বন্দরে উপস্থিত ছিলেন সেনাবাহিনীর সিজিএস মুক্তিযুদ্ধের অসম সাহসী বীর মুক্তিযোদ্ধা ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ, বীর উত্তম। প্রথমে শিশু পুত্র কন্যার হাত ধরে সস্ত্রীক নেমে এলেন ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সাহসী কর্মকর্তা মেজর আবু ওয়াহিদ মোহাম্মদ নুরুল আজিম (পরে লেঃ কর্ণেল, শহীদ)। সবার চোখে মুখে কি আনন্দ। বাংলার মাটি স্পর্শ করার পর স্বাধীন আকাশের দিকে হাত ছুড়ে মেজর আজিম বললেন ‘‘জয় বাংলা’’। পরের দিন দৈনিক বাংলার হেড লাইন ছিল — ‘‘স্বদেশের মুক্ত মাটিতে ওরা ফিরলেন’’।
এর প্রায় ১০ দিন পর, ১৯৭৩ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর আরিয়ানা আফগান এয়ার লাইন্সের একটি প্লেনে লাহোর থেকে সপরিবারে রওনা করলেন লেঃ কর্ণেল আতিক। তাঁর কাছে দু’আড়াই ঘন্টা সময়কে মনে হচ্ছে যেন দু’হাজার ঘন্টা। প্লেন কখন প্রিয় বাংলাদেশের মাটি স্পর্শ করবে? আর কখন মাটি ছুয়ে দেখব? ভাবছেন কর্ণেল আতিক। অবশেষে ২৯ সেপ্টেম্বর বিকেলে ঢাকায় এসে পৌছালেন তাঁরা। [ক্রমশ]