১৩৫৫ বঙ্গাব্দের বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকায় প্রকাশিত ডক্টর রমেশচন্দ্র মজুমদারে মহাশয়ের প্রবন্ধে সোনামুখীকে তাঁতিদের গ্রাম ব’লে উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন “ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর আমলেও সূতিবস্ত্র, রেশম, লাক্ষা ও নীলের বিপুল ব্যবসার কেন্দ্র ছিল এই জনপদ। তন্তুবায় ও সুবর্ণবণিক সম্প্রদায়ই অতীতে এখানে সামাজিক নেতৃত্ব দিয়েছে। স্থানীয় পুরাকীর্তিগুলির অধিকাংশ তাঁদেরই তৈরী। জনশ্রুতি, প্রাচীন গ্রামদেবী সুবর্ণমুখীর নামানুসারেই এ জনপদের নাম।”
সোনামুখীর শ্রেষ্ঠ পুরাকীর্তি, বাজারপাড়ার তাঁতি পরিবারের, ইটের, পশ্চিমমুখী, পঁচিশ-রত্ন, শ্রীধর (শালগ্রাম) মন্দির। এটিই বাঁকুড়া জেলার একমাত্র পঁচিশ-চূড়াযুক্ত দেবগৃহ। জেলার ক্ষেত্র সমীক্ষা করতে এসে এই মন্দির দেখে বাঁকুড়া জেলার পুরাকৃতির লেখক অমিয়কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয় জানিয়েছেন “চারদিকে ত্রি-খিলান দালানযুক্ত এবং উচ্চতায় প্রায় ২৫ ফুট ও দৈর্ঘ্যপ্রন্থে ১৩ ফুট ৭ ইঞ্চি , এই ছোট আয়তনের দ্বিতল দেবালয়ের কেন্দ্রীয় চূড়া ছাড়া আর চব্বিশটি চূড়াকে, অভিনবভাবে, প্রতি তলের প্রতি কোণে তিনটি ক’রে বিন্যস্ত করা হয়েছে। পুবের দেওয়ালে নিবদ্ধ স্লেট পাথরের লিপিটি নিম্নরূপঃ “সকাব্দা ১৭৮৭ বাং ১২৫২ সাল…শ্রীধর মন্দিরং… পঞ্চবিংশতিচূড়ঙ্কং কানাঞি রুদ্রদাসেন তন্তবায়েন যত্নতঃ নির্মায়িতং বরং সৌধং নানা- চিত্রসমল্লিতং… হরি সূত্রধরেণ বিনির্মিতং।”

এর অনুপম সৌন্দর্যের টানে বার বার ছুটে এসেছেন ডেভিড ম্যাকাচ্চনের মতন গবেষকেরা। অমিয়কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয় আরও জানাচ্ছেন “বাংলাদেশে মন্দিরনির্মাণ শিল্পে সূত্রধর সম্প্রদায়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা নতুন করে বলবার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু সোনামুখীর এই মন্দির ও আকুই, কোঙারপুর, বাঁকাদহ প্রভৃতি স্থানের কয়েকটি দেবালয় ছাড়া বাঁকুড়া জেলার আর কোথাও প্রতিষ্ঠালিপিতে তাঁদের নাম দেখতে পাওয়া যায় না। যদিও মেদিনীপুর, হাওড়া, বর্ধমান ও বীরভূম জেলার বহু ক্ষেত্রে এই শূদ্রবর্জনরীতির ব্যতিক্রম দেখা যায়”। তিনি আরও জানিয়েছেন “আলোচ্য মন্দিরের আসল বৈশিষ্ট্য কিন্তু তার ‘টেরাকোটা’ অলংকরনের প্রাচুর্য ও বৈচিত্র্যে। এ মন্দিরের মত চারদিকের দেওয়ালে, এমন কি ঢাকা বারান্দার গায়েও, পোড়ামাটির সজ্জা বাঁকুড়া জেলার অল্প কয়েকটি মন্দিরে মাত্র ব্যবহৃত হয়েছে। গঠন শৈলীতে মন্দিরটি দ্বিতল। প্রতি তলের চারকোণে তিনটি হিসাবে চূড়া নিবদ্ধ করে এটিকে পঁচিশ চূড়া করা হয়েছে। এই মন্দিরটি পঁচিশ রত্ন। প্রতিটি খিলানে রয়েছে অসংখ্য ছবি। মন্দিরের উপরে উঠার সিঁড়ি আছে। একটি সিঁড়ি নীচের দিকে নেমে গেছে। বৈচিত্র্যের দিক থেকেও এ দেবালয়ের অলংকরণ শীর্ষস্থানীয়; রামায়ণ মহাভারতের বিবিধ আলেখ্য ছাড়াও, কৃষ্ণলীলা, পৌরাণিক (শৈব, শাক্ত, বৈষ্ণব উপাসনা নির্বিশেষে), সামাজিক, পশুপক্ষীচিত্র ও ফুলকারি নকশার অজস্র ব্যবহারে মন্দিরটিকে এক রত্নপেটিকার মত মনে হয়। এখানে বৈষ্ণব ও মাহেশ্বর কাল্টের প্রভাব সুস্পষ্ট। একটি টেরাকোটা ফলকে দেখা যায় উমা-মহেশ্বর মূর্তি, আবার পাশের ফলকেই বিষ্ণুও অনন্তশয্যায় শায়িত।

বিশেষজ্ঞদের মতে বয়সে নবীনতার কারনে কারিগরির ধরণ কিছুটা মোটা দাগের ও পূর্বতন ফলকের নিরিখে লালিত্ববর্জিত। তবে ‘টেরাকোটা’ শিল্পীদের হাতে একই বিষয়বস্তুর চিত্রায়ণে যুগে যুগে যে পার্থক্য ঘটেছে তার তুলনামূলক সমীক্ষার জন্য অপেক্ষাকৃত আধুনিক এ মন্দিরের সজ্জা প্রকরণ খুবই মূল্যবান উপাদান”। সংকীর্ণ মহাদানি গলির ভিতর দিয়ে গিয়ে দেখা গেল ১৮৪৫ সালে প্রতিষ্ঠিত শ্রীধর মন্দিরের করুণ দশা। যথাযোগ্য যত্নের অভাবে ভেঙ্গে পড়তে শুরু করেছে এই মন্দির। টেরাকোটাও নষ্ট হয়েছে কিছু জায়গায়। সবথেকে উঁচু চুড়াটি ভেঙে পরেছে। দু-পাশে পাঁচিল উঠে এটির বিশালতা অনেকটাই খর্ব করেছে। কয়েকবার স্থানীয় উদ্যোগ নিয়ে আগাছা পরিষ্কার করানো হয়েছিল। আবার আগাছা জন্মাতে শুরু হয়ে গিয়েছে। চুঁড়াটিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

শ্রীধরের বর্তমান সেবাইত জানালেন, “তিন পুরুষ ধরে আমরাই পুজো করছি। সারা বছর বহু দেশি-বিদেশী পর্যটক এই মন্দির দেখতে আসেন। শিল্পকর্মের প্রশংসা করে যান, ঐ পর্যন্তই। এই মন্দিরের সংস্কার নিয়ে কারও কোন মাথা-ব্যথা নেই।” পরিশেষে শ্রীধর মন্দির সম্পর্কে একটি কথাই বলা যায়, যে যাঁরা বিষ্ণুপুরের মন্দির দেখেছেন, অথচ সোনামুখীর শ্রীধর মন্দির দেখেননি, তাঁরা বাঁকুড়া জেলার শিল্পকলার অমরাবতী দর্শন থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
চমৎকার প্রতিবেদন।
ধন্যবাদ
ইতিহাসভিত্তিক চমৎকার প্রতিবেদন।