বেশ কিছুদিন ধরে আমাদের রাজ্যের অনেক জায়গা থেকে খবর আসছে বহু লোকের নাকি আধার নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া হয়েছে। অনেকের কাছে ডাক মারফত চিঠিও এসেছে। কিন্তু কি কারণে তার আধার নিষ্ক্রিয় করা হচ্ছে সে বিষয়ে তাকে আগাম কোনও খবর দেওয়া হয়নি। আচমকা আধার নিষ্ক্রিয় করে দেওয়ার ফলে সর্বত্রই আধার নিয়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এদিকে দেশের সুপ্রিম কোর্ট আধার বাধ্যতামূলক নয় বলে রায় দিয়েছে। কিন্তু সে কথায় কর্ণপাত না করেই কেন্দ্র সরকার প্রায় সব ক্ষেত্রেই আধারকে বাধ্যতামূলক করেছে। আমাদের রাজ্য সরকারও কেন্দ্রের পথেই হাঁটতে বাধ্য হয়েছে। প্রসঙ্গত, আধার না থাকলে, সরকারের যে বিভিন্ন প্রকল্প তার সুবিধা পাওয়া যায় না, বিভিন্ন যে সব পরিষেবা রয়েছে সেগুলি পাওয়া যায় না। এমনকি আধার না থাকলে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট অচল হয়ে যায়। রান্নার গ্যাসও মেলে না। মেলে না ফোনের সিমকার্ডও। এই অবস্থায় কোনো আগাম নোটিস না দিয়ে আচমকা আধার নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া হলে সাধারণ মানুষ যে সমস্যায় পড়বেন সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
এদিকে জানা যাচ্ছে সারা দেশে ৩২ কোটি আধার কার্ড নিষ্ক্রিয় করা হচ্ছে। সংখ্যাটা আরও বাড়তে পারে বলেও খবর। প্রসঙ্গত, আমাদের রাজ্যের উত্তর ২৪ পরগনা, নদিয়া, জলপাইগুড়ি, হুগলি ও মালদহ জেলায় প্রায় দু’লক্ষ পঁচিশ হাজার আধার কার্ড রয়েছে। যাদের আধার কার্ড নিষ্ক্রিয় হয়েছে তারা ব্যাঙ্কে টাকা লেনদেনের কোনো কাজ করতে পারছেন না, কেন্দ্রীয় প্রকল্পের কোনো সুবিধা পাচ্ছেন না। তারা রেশন থেকে কোনো জিনিসপত্র পাচ্ছেন না। এরপর আশঙ্কা করা হচ্ছে তাদের ভোটার কার্ডও নিষ্ক্রিয় করা দেওয়া হবে। অসমের মতো এ রাজ্যেও ‘ডি-ভোটার’ বা ‘ডাউটফুল ভোটার’ করে রাখা হবে।
অন্যদিকে রাজ্যের নমঃশূদ্র ওয়েলফেয়ার বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী জানা যাচ্ছে, যাদের কার্ড বাতিল হয়েছে তাঁদের অধিকাংশই ১০০ দিনের কাজ প্রকল্পের জবকার্ড হোল্ডার। উল্লেখ্য রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী জবকার্ড হোল্ডারদের মনরেগা প্রকল্পের বকেয়া টাকা দেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন। কিন্তু সেই টাকা কি তারা পাবেন? মনে করা হচ্ছে সেই টাকা পাওয়া বানচাল করতেই নাকি এই ভাবে আধার বাতিল। তবে কি আধার নিস্ক্রিয় ষড়যন্ত্র? দেখা যাচ্ছে আধার নিস্ক্রিয় হওয়ার ক্ষেত্রে অধিকাংশ হচ্ছেন মতুয়া, নমঃশূদ্র, তফসিলি জাতি এবং অন্যান্য গরিব মানুষ। মুখ্যমন্ত্রী অবশ্য জানিয়েছেন, তাঁদের জন্য রাজ্য সরকার ‘আধার গ্রিভান্স পোর্টাল অব গভর্নমেন্ট অব ওয়েস্ট বেঙ্গল’ চালু করছে। যাঁদের আধার নিস্ক্রিয় হয়েছে, তারা এই পোর্টালে নিজেদের নাম নথিভুক্ত করলে রাজ্যের উদ্যোগে বিকল্প কার্ড পাবেন এবং সেই কার্ড দেখিয়েই সরকারি পরিষেবা পাবেন।
লক্ষ্যনীয় বিষয় হল লোকসভা নির্বাচন যখন দরজায় কড়া নাড়ছে ঠিক তার আগে আধার নিস্ক্রিয়-র এই ঘটনা। আধার নিস্ক্রিয়- এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই প্রবল বিতর্কের পাশাপাশি আধার কর্তৃপক্ষ। তারা জানাচ্ছেন, কারও আধার কার্ড বাতিল হচ্ছে না। বাতিল বা নিস্ক্রিয় নিয়ে যদি কারও অভিযোগ থাকে, তা হলে সেটা আধার কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে। কিন্তু প্রশ্ন হল, যদি আধার নিস্ক্রিয়ের সিদ্ধান্ত নাই হয়ে থাকে, তা হলে কীভাবে এ ধরনের চিঠি মানুষের ঠিকানায় পৌঁছল? তা নিয়ে কিন্তু কর্তৃপক্ষের কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়নি। তাদের বক্তব্য, আধার নথিতে কোনো অসামঞ্জস্য বা অসম্পূর্ণতা থাকলে তা আপডেট করতে হয়। কিন্তু তা নিস্ক্রিয় হওয়ার প্রশ্ন নেই। আধার কর্তৃপক্ষের বক্তব্যও এক্ষেত্রে স্পষ্ট নয়, কেন আধার নিষ্ক্রিয় হল বা সেটা হওয়ার আগে কোনো নোটিস কেন পেলেন না সেই সব মানুষ, সবটাই ধোঁয়াশা থেকে গেল।
এবার আরও একটি প্রশ্ন সামনে এসে পড়ছে, লোকসভা নির্বাচনের ঠিক আগে আধার নিয়ে এই ধরনের ঘটনা কি কেন্দ্রের শাসকদল বিজেপিকে কিছুটা হলেও অস্বস্তিতে ফেলবে না? রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আধার নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারকে তীব্র আক্রমণ করেছেন। সংগত প্রশ্ন, লোকসভা ভোটের ঠিক আগেই কেন হাজার হাজার আধার নিস্ক্রিয় হয়ে গেল? কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে রাজ্য বা জেলা প্রশাসন-এর কাছে কোনো সদুত্তর নেই। অথচ আধার তৈরি করতে একটা সময় থেকে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে এক হাজার টাকা। তাছাড়া আধার কার্ড তো কেন্দ্রীয় সরকারের দেওয়া জাতীয় পরিচয়পত্র। রাজ্য সরকারের দেওয়া কোনো পরিচয়পত্র তার জায়গা নিতে পারে কি? রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, মতুয়াদের বিরাট সংখ্যক ভোট আছে। তাই আধার নিস্ক্রিয় নিয়ে রাজনৈতিক চাপানউতোর চলছে। যত কম সংখ্যক মানুষের কাছে আধার নিষ্ক্রিয়ের চিঠি আসুক না কেন এক ধরনের ভয় তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব বৃহত্তর জনসমষ্টিতে পড়তে বাধ্য। বিজেপি এবং তৃণমূলের মধ্যে রাজনৈতিক সংঘর্ষ শুরু হয়েছে। দু’দলের সব নেতারাই একে অপরের বিরুদ্ধে রণংদেহী ভূমিকায় নেমে আসর মাতাচ্ছেন। এরা একে অন্যের বিরুদ্ধে যত চিৎকার করছেন ততই সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ-আতঙ্ক বাড়ছে। দু’পক্ষই প্রতিযোগিতায় নেমেছে আধার হারানো ব্যক্তিদের মুশকিল আসানে। একপক্ষ বলছে তাদের কাছে আবেদন করলে আধার ফের চালু করে দেওয়া হবে। অন্য পক্ষ বলছে আধার গেছে তো কি হয়েছে বিকল্প কার্ড তারা দিয়ে দেবেন। এই কাজিয়ার আড়ালে চাপা পড়ে যাচ্ছে মূল বিষয়টি।
আগাম নোটিস ছাড়া কেন আধার নিষ্ক্রিয় হলো তার কোনও সন্তোষজনক উত্তর কিন্তু মেলেনি। কেউ বলছে বাতিল হয়নি, নিষ্ক্রিয় হয়েছে। কেউ বলছে প্রযুক্তিগত কারণে এমনটা হয়েছে রাতের মধ্যে ঠিক হয়ে যাবে। আবার কেউ বলছে আধার আপডেট করতে গিয়ে এমন হয়েছে। আবেদন করলে ঠিক করে দেওয়া হবে। এটাও বলা হচ্ছে যাদের আধার বাতিল হয়েছে তারা নাকি বাংলাদেশ থেকে আসা হিন্দু। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বলছেন একটি ফর্ম পূরণ করে তাঁর কাছে পাঠালে তিনি ঠিক করার ব্যবস্থা করবেন। এমনকি বিজেপি’র পার্টি অফিসে জমা দিলেও কাজ হয়ে যাবে। বিপরীতে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বলে দিয়েছেন কোথাও যাবার দরকার নেই। তিনি আধারের বিকল্প কার্ড করে দেবেন।