অতি সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের টাঙ্গাইল শাড়ি (নদিয়া ও পূর্ব বর্ধমান) ভৌগোলিক নির্দেশনা তকমা বা GI (Geographical Indication) পেয়েছে ভারত সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে। এই খবরে বাংলাদেশে শুরু হয়েছে বিতর্কের ঝড়। সেই ঝড়ে বাংলাদেশের হাজার হাজার মানুষ নাকি সামিল হয়েছেন এবং প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছেন বলে সে-দেশের বিবিধ সংবাদমাধ্যম অনবরত প্রচার করে চলেছে।
তা এই ‘জিআই’ নিয়ে বিতর্ক, বাত-বিতন্ডা যে হবে তা নিশ্চিতই ছিল। একে তাই অস্বাভাবিক বলা যাবে না যেহেতু টাঙ্গাইল স্থানটি বাংলাদেশে এবং টাঙ্গাইল শাড়ির উদ্ভব সেখানেই (অবিভক্ত ভারতের বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার টাঙ্গাইল মহকুমায়)। সরকারি স্তরে বাংলাদেশ ভারত সরকারের সঙ্গে কথা বলবে বলে স্থির করেছে, এমনকি, প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক সংস্থায় এ নিয়ে দায়-দরবার করবে বলেও মনস্থ করেছে। তা করুক, এ নিয়ে কারও কোনও আপত্তি থাকার কথা নয়। কিন্তু ছুতো পেয়ে জিআই বিষয়ে নিতান্তই অপ্রাসঙ্গিক এমন সব মন্তব্য করছেন তাঁরা যা কিনা মিথ্যাচারের নামান্তর। আর সবচেয়ে আশ্চর্যের ও দুঃখের বিষয় হল যে, এই মিথ্যাচারে কণ্ঠ মিলাচ্ছেন এমন কিছু স্বনামধন্যজনেরা যাঁরা কিনা বয়নশিল্প তথা টাঙ্গাইল শাড়ি বিষয়ে উভয় বঙ্গের অতীত ও বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। অতীত নিয়েও ভাবনা-চিন্তা তাঁদের কম নয়। সে ভাবনায় ছিল নির্ভেজাল নিরপেক্ষতা। দুই দেশের মাঝের সীমানা এমনভাবে প্রকট হতে আগে দেখিনি কখনও!

তা যাই হোক, তাঁদের সকলের কথা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে লেখার কলেবর বেড়ে যাবে। তাই দু’চার জনের কথার প্রেক্ষিতে যতটা সম্ভব সংক্ষেপে বলার চেষ্টা করি। একে আত্মপক্ষ সমর্থন বলে যেন কেউ ভেবে বসবেন না। কারণ এ-বঙ্গের টাঙ্গাইল শাড়ির জন্য আত্মপক্ষ সমর্থন দিনকে দিন বলে প্রমাণ করার সামিল। তাই তার জন্য শব্দ-খরচ নিষ্প্রয়োজন। তাছাড়া জিআই দিয়ে তাঁত ও তাঁতির আখেরে যে কোনও লাভ নেই তা বলাই বাহুল্য। এ-দেশে শান্তিপুরি, ধনিয়াখালি ইত্যাদি শাড়ি জিআই পেয়েছে এক দশকের বেশি সময় আগে। জিআই তাদের কাউকেই তড়াতে পারেনি, পাওয়ারলুমের অনৈতিক আগ্রাসনে তাদের ভূলুন্ঠিত দশা অন্যদের মতোই। ফলে আজ যে তকমা পাওয়ার জন্য কোমর বেঁধে বাংলাদেশ যুদ্ধে নেমে পড়েছে, শুকনো আইনি ফরমূলায় তা যদি পেয়েও যায়, তার জন্য আত্মপ্রসাদে দু’দিন ভেসে বেড়াবে। কিন্তু তারপর? সাধের জিআই তকমা ফ্রেমে বাঁধানো ছবি হয়ে দেওয়ালে ঝুলবে, হস্ততাঁত ও তাঁতির অবস্থার ইতর বিশেষ যে কিছু হবে না।

বয়ন তথা ফ্যাশন জগতের উজ্জ্বল নক্ষত্র বলে সারা বিশ্ব যাঁকে এক ডাকে চেনে, তিনি বিবি রাসেল। আমাদের কাছে পরম শ্রদ্ধেয়া তিনি, একান্ত আপনজনের মতো। তাঁকে তাই বিবি’দি বা আরও সংক্ষেপে দিদি বলে আমরা সম্বোধন করে থাকি। ভারত সরকারের এই জিআই প্রদান কান্ডকে তিনি স্রেফ ‘ছিনতাই’ বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর এই উচ্চারণে উত্তেজনার আভাস তো ছিলই, আবেগতাড়িত অতিরঞ্জনের মিশেলও যে ছিল তা বলাই বাহুল্য। ‘ছিনতাই’ বলতে আমরা অবোধজনেরা সাদা কথায় বুঝি ‘জোর করে কেড়ে নেওয়া’। যথাযোগ্য সম্মানসহ দিদিকে প্রশ্ন করি, টাঙ্গাইল শাড়ির জিআই স্বীকৃতি কোন অর্থে কেড়ে আনা হল? নাকি পথের পাশে নিদারুণ অবজ্ঞা অবহেলায় পড়েছিল ১৫০ বছর (কেউ ২০০, কেউ ২৫০, অতি উচ্ছ্বাসে কেউ বা আবার ৫০০ বছরও বলছেন) যে ‘ঐতিহ্য’ ধূলি-মলিন অবস্থায়, ফিরেও তাকায়নি কেউ, কেউ বা তাকালেও উপেক্ষাভরে দৃষ্টি সরিয়ে নিয়েছে; সেই উপেক্ষিত ঐতিহ্যকে আপনপর না-ভেবে দরদি কেউ সমাদর করে তুলে এনে যদি সম্মানের আসনে বসায়— সে-কাজকে বোধকরি আর যাই হোক ‘ছিনতাই’ বলে অভিহিত করা যায় না। তাছাড়া যেখানে সেই ঐতিহ্যের সৃষ্টিকারক তথা মূল ধারক-বাহকরা, যাঁরা দুর্ভাগ্যের শিকার হয়ে প্রায় সকলেই আজ এ-বঙ্গে এসে থিতু হয়েছেন এবং সেই ঐতিহ্য আঁকড়েই তাঁরা বেঁচে-বর্তে আছেন, সেখানে ছিনতাইয়ের প্রশ্নই অবান্তর। তাঁদের জীবন-জীবিকা নিয়ে ভাবনা-চিন্তার মানবিক দায় ভারত সরকারের কাঁধেই বর্তেছে। উদ্বাস্তু হয়ে এলেও তাঁরা এখন এ-দেশের নাগরিক। ফলে তাঁদের স্বার্থ, তাঁদের ইতিহাসকে, অতীত শিক্ষা-দীক্ষা, শিল্প-সংস্কৃতিকে একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্র উপেক্ষা করে কী করে।

আসলে বিবি’দি নানাভাবে এটাই বলতে চেয়েছেন যে, ভারত টাঙ্গাইল শাড়িকে জিআই দিয়ে অন্যায় করেছে। অন্তত এতদিনে আইনের বই ঘেটে যুৎসই ধারা বের করে কাজটিকে নস্যাৎ করার চেষ্টা করাছেন তাঁরা। আইন যদি তাঁদের পক্ষে যায়, জিআই পেয়ে তারা যদি সন্তোষ পান, অন্য কারও আপত্তি আর খাটবে কীসে! তবে আক্ষেপের কথা এই যে, ১৫০ বছর ধরে টাঙ্গাইলে যে শাড়ির উৎপাদন চলে আসছে, ব্রিটিশ যুগে তো নয়ই, পাক আমলেও নয়, এমনকি স্বাধীন বাংলাদেশেও টাঙ্গাইল শাড়িকে ‘ঐতিহ্য’ ‘সম্পদ’ বলে তাঁরা আদৌ আপন করে নিয়েছিলেন কি? সেই কোন যুগে কোন এক কবি ‘নদী চর খালবিল গজারির বন…’ ইত্যাদি দু’লাইন ছড়া লিখেছিলেন, তাই নিয়ে গর্ব করে দিন কাটিয়েছেন বিদ্বজ্জনেরা। কবি-সাহিত্যিকরা কদাচিৎ কখনও বা উদাস সুরে তা গেয়ে উঠেছেন। কিন্তু সে-সুর তাঁতিপাড়া পর্যন্ত আদৌ পৌঁছেছে কোনওদিন? শাড়ির সমাদর হয়তো করেছেন, কিন্তু দারিদ্র্য জর্জরিত হতশ্রী তাঁতিপাড়ায় কতজনের পদস্পর্শ পড়েছে? শিল্পী অভিধাপ্রাপ্ত তাঁতি মানুষগুলি কেমন, কেমন তাদের ঘর-বসত, দিনযাপন— দেখতে গেছেন ক’জন বা! বন্যা-খরা-ঝড় বাদলে তাঁতিপাড়াও বিদ্ধস্ত হয়েছে বারে বারে, মহামারিতে উজাড় হয়ে গেছে বাইশ গাঁয়ের তাঁতি পরিবারগুলি। সাহায্যের হাত বাড়িয়ে এগিয়ে গেছেন কেউ— কোনও সরকার, বা সেবাসংস্থা! ত্রাণ-সাহায্য কথাটাই আমাদের জানা ছিল না অনেক বড়োবেলা অব্দি। কাপড়ের বাজারের মন্দা, সুতার আকাল, মহাজনি শোষণ— সব মুখ বুজে সয়েছে তাঁতিরা; তাঁদের তড়াতে আসেননি কেউ স্বজন-বন্ধু হয়ে। ভারত ভাগ হওয়ার পর বসাক তাঁতিরা টাঙ্গাইল থেকে চলে আসতে শুরু করে। তখনও পূর্ব পাকিস্তানে টাঙ্গাইল শহরকে কেন্দ্র করে ২২ গ্রামে (এটি কথ্য। গুণতিতে গ্রাম সংখ্যা তারও বেশি, প্রায় ৩০) প্রায় হাজার দশেক তাঁতি বসবাস করতেন। তাঁরা সবাই ছিল হিন্দু ও বসাক পদবিধারী।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ভয়ঙ্কর ভাবে উৎপীড়িত হয়ে (নলশোঁধা ও ঘারিন্দাতে যে নারকীয় হত্যাকান্ড ঘটেছিল, নৃশংসতার ইতিহাসে তা বিরলতম) এবং পরে স্বাধীন বাংলাদেশে তাঁতিদের পাড়ায় চুরি-ডাকাতির প্রাবল্যে সর্বশান্ত হয়ে প্রায় সবাই যখন চলে আসেন এ-বঙ্গে, আজ যাঁরা টাঙ্গাইল শাড়িকে তাদের ‘প্রাণের সম্পদ’, ‘মূল্যবান ঐতিহ্য’, ‘মহান শিল্প’ ইত্যাদি বলে বাগাড়ম্বর করছেন, তখন কারও কি একবারও মনে পড়েছিল এই শিল্পী-কারিগরদের যথোচিত সমাদরে করে দেশত্যাগ থেকে বিরত করা দরকার? দেশের স্বার্থেই এই সম্পদ রক্ষার্থে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়ার কথা চিন্তা করার? কোনও শিল্পকে সম্পদরূপে ভাবতে হলে তার যথাযথ লালন-পালন ও পরিচর্যা যে কর্তব্যের মধ্যে পড়ে, সে বোধটুকুও কারও মনে জাগরিত হয়েছি কি? আজ তাঁরা দাবি করছেন, দেশভাগের পর ‘বিভিন্ন কারণে’ ‘কিছু বসাক তাঁতি’ দেশান্তরি হয়েছেন। অথচ সত্যটা হল, মাত্র দুটি গ্রামের (চন্ডী ও পাথরাইল) ‘কিছু বসাক তাঁতি’ বাদ দিয়ে সব গাঁয়ের তাঁতিরাই দেশান্তরি হয়েছিলেন। ফলে শতাংশের বিচারে হিসাবটা কি দাঁড়ায়! আর যতই ছিঃ ছিঃ করুন তাঁরা, ভারত সরকার এই জিআই দিয়ে ধাক্কা না দিলে বাংলাদেশের সরকার ও ‘হাজার হাজার’ জনতা এমন হা-হা রবে শোর মাচাতো না কোনওদিনই। [ক্রমশ]
অবসরপ্রাপ্ত সমবায়কর্মী, লেখক ও তাঁতশিল্প গবেষক, ফুলিয়া