গত ১৬ মে থেকে চারুবাসনায় (সুনয়নী আর্ট গ্যালারি) শুরু হয়েছে সুশান্ত দাসের একক চিত্র প্রদর্শনী। প্রদর্শনীতে ছোট বড় মিলিয়ে আছে মোট ৬৫টি ছবি। কোনটা কালি ও কলম, কোনটা অ্যাকরিলিক, কোনটা আবার মিশ্র মাধ্যম। কোনটা কাগজে, কোনটা ক্যানভাসে। কিন্তু সব ছবির বিষয়বস্তু প্রকৃতি। তাই সুশান্ত এই প্রদর্শনীর নাম দিয়েছে ‘সাগা অব নেচার’।
বস্তুতান্ত্রিকতার এই প্রচণ্ড হট্টগোলের যুগে প্রকৃতির দিকে মুখ ফেরানোর দরকার। সে কাজ মূলত কবি-শিল্পীদের। তাঁরা তাঁদের সৃজনশীল সৃষ্টির মাধ্যমে জনমানসের চেতনায় ক্রমাগত ধাক্কা দেবেন, এই প্রত্যাশা তাঁদের কাছে। সুশান্ত প্রকৃতির ভাষাকে শিশুর ভাষার সঙ্গে তুলনা করেছে। শুধু অনুমান আর অনুভব দিয়ে তার মর্ম উদ্ধার করা যায়। ‘মুখপাতে’ সে লিখেছে, ‘একটি বেদনাহত পত্রবৃন্তের মর্মকথাকে আমরা কেমন করে তুলে ধরতে পারি — যদি আমার মাধ্যম হয় ছবি আঁকা? কিংবা রাতের ফোটা ফুলগুলির পালাগানের শেষে প্রথম প্রকট সকালে মৃত শরীরের মতো মাটিতে লুটিয়ে ঝরা? অথচ কী অদ্ভুতভাবে সে যেন ক্ষণিকের অতিথি। সূর্যের প্রথম সকালে উজ্জ্বল জেগে ওঠা পদ্মগুলি গোধূলির মৃদু আলোয় কেমন অভিমানী বিরহী নিজেকে গভীর অনুযোগে লুকিয়ে নেয় নিজেকে। সাঙ্গ হওয়ার আগেই অভিসার যাত্রা। ঠিক সেই মুহূর্তটি আমরা কোন চেতনার রঙে প্রকাশ করতে পারি?’

সুশান্তের এই লেখা পড়তে পড়তে মনে হয় সে কবি। কবি তো সে ছিলই। যৌবনের প্রথম দিকে সে কবিতা লিখত, সাহিত্যচর্চা করত। তার শিক্ষিকা অঞ্জনা গুহ ঠাকুরতা এই বিস্ময় প্রকাশ করেছেন — ‘চিত্রকলা বিষয়ে তার যে এত নিপুণতা ও অনুরাগ, তা জানতাম না’। তিনি আরও বলেছেন, ‘saga of nature’ সুশান্তের প্রথম একক প্রদর্শনী। কোথাও প্রথাগত তালিম না নিয়েও ছবিগুলিতে তার রঙের ব্যবহার, প্রকৃতির সবুজ স্নিগ্ধতার প্রতি তার মগ্নতা আমাকে অভিভূত করেছে। বিশেষ করে হাঁসগুলি তো অপরূপ। তারা অনেক না-বলা কথা ব্যঞ্জনায় বলে দেয়।’
সুব্রত গঙ্গোপাধ্যায় বলেছেন, যে সকল নিজস্ব চিত্রকর্ম নিয়ে সুশান্ত দাস একটি একক চিত্র প্রদর্শনীর উপস্থাপনা করার জন্য এগিয়ে চলেছেন তার জন্য আমার পক্ষ থেকে অশেষ সাধুবাদ জানাই এবং প্রত্যেকটি চিত্রপট আমাকে এতটাই মুগ্ধ করেছে তা সত্যিই অভাবনীয়। সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক পরিমন্ডল নিয়ে আবৃত করা প্রতিটি পটচিত্রঅত্যন্ত সুন্দর এবং মনের মধ্যে একটা অপূর্ব শান্তি নিয়ে আসে।

ফুল, পাখি, লতাপাতার অসাধারণ ছন্দময় আধা বিমূর্তের বিশেষ একটা অনুধাবন যুক্ত প্রতিটি রেখা অঙ্কনে এবং মনোরম রঙের ব্যবহারে প্রতিদিন ভীষণভাবে নিজস্ব হাতকে শক্তিশালী করে তুলেছে, স্থির চিত্রের নিদর্শনগুলিও অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী সুন্দর ভাবনায় সংযুক্ত যা সত্যিই অপূর্ব এবং মনকে আনন্দে ভরিয়ে দেয়।
সমীর আইচ লিখেছেন, খুব খুশি হলাম সুশান্তর ছবি দেখে, কোনো ভনিতা ছাড়া চিত্তের প্রকাশ। অসংখ্য ভালো কাজের সমাবেশ। প্রকৃতির অদ্ভূত বিন্যাস।

মোহন গঙ্গোপাধ্যায়ের সংযোজন
যন্ত্রণার ঝাঁকুনি প্রায়শই জাগ্রত হওয়ার মনোরম ইচ্ছার দিকে নিয়ে যায়। যন্ত্রণার অনুভূতি একটি প্রচ্ছন্ন ধারণার জন্ম দেয়। শিল্পের ভাষা ভিতর থেকে আসে, যা প্রায়শই বোঝার অযোগ্য বলে মনে হয়। এটি একটি শিশুর অবাস্তবতা বলে মনে হচ্ছে যার মধ্যে প্রাকৃতিক প্রভাবের চিত্র রয়েছে, যা প্রাপ্তবয়স্কদের মনের কাছে বেশ অজানা। তাই, প্রকৃতি মাতার দ্বারা প্রকৌশলী অন্তর্নিহিত অনুভূতিগুলিকে বোঝার চেষ্টা করা আমাদের পক্ষে স্পষ্ট। সুশান্ত দাসের চিত্রশিল্প কথার প্রথম একক প্রদর্শনী, যা মনোমুগ্ধকর ও হৃদয়গ্ৰাহী হয়ে উঠেছে। এই ধরনের ট্রায়াল যেকোনো ধরনের শিল্পের মাধ্যমে হতে পারে, তা অঙ্কন, চিত্রকলা বা অন্য কোনো মাধ্যমে। কীভাবে একজন মৃত ফুলকে ধরে রাখতে পারেন, যার প্রস্ফুটনের সময়কাল স্বল্পস্থায়ী। ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রকৃতির বিভিন্ন মেজাজ রঙে চিত্রিত করা হয়, তবে এটি শিল্পীর জন্য একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ। যা প্রকৃতির SAGA এমন একটি চ্যালেঞ্জের মস্তিষ্কের শিশু। এখানে সুশান্তর মহতী উদ্যোগটি কেবল নিছক একটি পরীক্ষা নয়। ঐতিহ্যগত বা প্রাতিষ্ঠানিক কেন্দ্রে প্রশিক্ষিত না হয়েও তাঁর চিত্রায়নে অন্য মাত্রা এনে দিয়েছে।
উল্লেখ করতেই হয় শিল্পকলা ও সংস্কৃতির জগতের একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি সুশান্ত দাস।

বহু চিত্রকলা প্রদর্শনী সুশান্ত নিজের দায়িত্বে করেছেন এবং সারা ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে এবং বিশেষ বিশেষ উল্লেখযোগ্য প্রদর্শনশালায় অসংখ্য বিশিষ্ট চিত্রশিল্পীদের চিত্ররচনা নিয়ে। সুশান্তর চিত্রশিল্পে রঙের মেলবন্ধনের মাধুর্য্য চিত্রশিল্পীদের সত্যিই অভিভূত করবে তা নির্দ্বিধায় স্বীকার করতেই হয়।
চিত্রশিল্পর সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরেই নিযুক্ত সেই কারণেই শিল্পবোধ সুশান্তকে মর্মে মর্মে বুঝিয়ে দিয়েছে। শিল্প পথযাত্রার জন্য যে নিমগ্নতার একটা বিশাল প্রয়োজন হয়, নিজস্ব আসনে বসে নিজেকে স্বশিক্ষিত করার জন্য কঠোর পরিশ্রম ও ধ্যানময়তায় কতটা নিমগ্ন হতে হয়। সুশান্ত তা প্রমান করে দিয়েছেন।
যে সকল নিজস্ব চিত্রকর্ম নিয়ে শিল্পী একটি একক চিত্র প্রদর্শনীর উপস্থাপনা করার জন্য এগিয়ে এসেছেন, এজন্য অশেষ সাধুবাদ জানাতেই হয়। প্রত্যেকটি চিত্রপট দর্শকপ্রেমীদের মুগ্ধ করবেই। সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক পরিমণ্ডল নিয়ে পটচিত্র অত্যন্ত সুন্দর এবং মনের মধ্যে একটা অপূর্ব শান্তি নিয়ে আসে। ফুল, পাখি, লতাপাতার অসাধারণ ছন্দময় আধা বিমূর্তের বিশেষ একটা অনুধাবন যুক্ত প্রতিটি রেখা অঙ্কনে এবং মনোরম রঙের ব্যবহারে ভীষনভাবে নিজস্ব হাতকে শক্তিশালী করে তুলেছে। স্থির চিত্রের নিদর্শনগুলিও অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী সুন্দর ভাবনায় সংযুক্ত যা সত্যিই অপূর্ব। যা মনকে আনন্দে ভরিয়ে দেয়।

সুশান্ত দাসের এই অতুলনীয় শিল্পপথ দীর্ঘায়িত হবার মনোনিবেশ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তাঁর একক প্রথম চিত্রপ্রদর্শনীতে প্রত্যেকটা পটচিত্র অবশ্যই সকল শিল্পী, দর্শক ও শিল্পরসিক বর্গকে সমাদৃত করে তুলবে। ১৬ মে এই চিত্রশিল্প প্রর্দশনের উদ্বোধন হলেও, তা চলবে আগামী ৩১ মে পর্যন্ত। যা চিত্রশিল্পপ্রেমীদের কাছে বাড়তি পাওনা।
সুশান্তকে অভিনন্দন জানিয়েছেন শিল্পী যোগেন চৌধুরী, সুব্রত গঙ্গোপাধ্যায়, সমীর আইচ। প্রদর্শনীতে দর্শক সমাগমও আশাপ্রদ। আগামী ৩১ মে পর্যন্ত চলবে এই প্রদর্শনী।
Very good
খুব সম্ভাবনাময় শিলপী সুশান্ত।অসাধারণ সূক্ষ্মতা ও সংবেদনশীলতায় ভরা কাজ।মনের মধ্যে গভীর রেশ রেখে যায়-জীবনানন্দের কবিতার মতো।
সুশান্ত আমার নিকটতম প্রতিবেশী। পাড়ার মধ্যে নিজেকে গুটিয়ে রাখা এক আত্মমগ্ন যুবক সে। তার প্রথম প্রদর্শনী এত গুণী মানুষদের প্রশংসা অর্জন করেছে জেনে ভীষণ গর্ববোধ হচ্ছে।