| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

আশাপূর্ণা দেবীর ট্রিলজি : সমাজ বিবর্তনের দলিল (শেষ পর্ব) : মোজাম্মেল হক নিয়োগী

Reporter
মোজাম্মেল হক নিয়োগী / ৪৭০ জন পড়েছেন
আপডেট রবিবার, ১৯ মে, ২০২৪

বকুলকথা

ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও কঠিন চার দেওয়ালে বন্দি থেকে সুবর্ণলতা পারেননি তাঁর চার কন্যাকে নিজের মতো তৈরি করতে। লেখাপড়ার প্রতি অদম্য ইচ্ছে ও প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও বাবা ও ভাইদের অবহেলা ও মেয়েদের লেখাপড়াকে তুচ্ছজ্ঞানমূলক নিগ্রহের কারণে পারুলও এক সময় হাল ছেড়ে দিয়ে জেদ করে লেখাপড়ার প্রতি বীততৃষ্ণা প্রকাশ করে। কিন্তু তার মধ্যে কাব্য-প্রতিভা ছিল। অগোচরে কবিতা লিখত। ‘এখানে বাতাস’ নামের ছন্দোবদ্ধ কবিতাটিই তার জাজ¦ল্যমান প্রমাণ। চারপুত্র আর চার কন্যার মধ্যে ব্যতিক্রম কেবল বকুল। বকুল নিজের মতো করে নিজেকে তৈরি করে সাহিত্যচর্চা এবং পূর্ণ লেখালেখিতে মনোযোগ দেন অনামিকা দেবী নামে। সংসার জীবনের মায়াতেও তিনি বন্দি হননি। চার দেওয়াল তাঁকে আটকিয়ে রাখতে পারেনি। তিনিই হয়ে উঠেন দেশের যশস্বী লেখিকা, পরিণত হন দেশের একজন গুরুত্বপূর্ণ মানুষ হিসেবে। এই চরিত্রের মধ্যে কি আমরা আশাপূর্ণার দেবীর ছায়া দেখতে পাই—কে জানে। লেখকের লেখায় ব্যক্তিগত জীবনের ছাপ পড়ে, এখানে লেখিকার জীবনের ছাপ পড়াটা অস্বাভাবিক নয়। একটি প্রবন্ধে এমন আভাসও মিলে।

ট্রিলজির প্রতিটি খণ্ডে পারিবারিক গল্পই নির্মিত হয়েছে। ব্যতিক্রম কেবল বকুলের একাকী যশস্বী লেখক জীবনের কথা প্রস্থিত হয়েছে বিভিন্ন আঙ্গিকে। একজন যশস্বী লেখক যে সমাজের অনেক দায় বহন করেন এবং সমাজের মানুষ তার কাছ থেকে অনেক কিছু আশা করে তার স্বরূপ বোঝা যায় তৃতীয় খণ্ডে তথা বকুলকথায়। তবে সমাজের দায়ের পাশাপাশি লেখকের লেখা নিয়ে বাণিজ্যিক বিষয়ও উঠে এসেছে।

পারুলের সংসার হলেও অন্য দশজন বাঙালি গিন্নির মতো তিনি নিজেকে মানাতে পারেননি যেমনটি মানিয়েছেন চাঁপা ও চন্দন। তারা ঘরকন্না ও স্বামী-সংসার নিয়ে নির্ঝঞ্ঝাট বাঙালি গৃহিণী হয়ে দিনাতিপাত করেন। একাকী নিঃসঙ্গ জীবনযাপনের গল্প নির্মিত হয়েছে পারুলকে নিয়ে। তিনি গঙ্গাধারে একটি বাড়িতে থাকেন, সাহিত্যচর্চা তথা কবিতা লিখে সময় কাটান। সন্তান থাকে দূরের কর্মক্ষেত্রে। স্বপ্নময়ী পারুল বকুলের মতো দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মানুষ না হলেও খুব হতাশার কথা রচিত হয়নি তাঁর জীবনকে কেন্দ্র করে। তবে তিনি যে সময়কে ধরে এগিয়ে গেছেন তা তার কবিতায় কিছুটা হয়তো ধরা পড়েছে। না-হয় বকুল হয়তো বর্তমান সময়ের অনেকের মতো বলতে পারত না তোমার কবিতা বুঝি না। একথা সত্য যে, আধুনিক কবিতার ছাঁচ তৈরি হওয়ার পর থেকে কবিতার ঘাড়ে বদনামের বোঝাটি উঠে গেছে। কবিতা দুর্বোধ্য একথা তখন থেকেই উচ্চারিত হয়ে আসছে যা এই যুগের মানুষের মুখেও শোনা যায়। নাটক নভেল মেয়েদের সৃষ্টিছাড়া করে এই বদনাম ট্রিলজির তিনটি খণ্ডেই পরোক্ষভাবে বলা হয়েছে। এই কথা যদিও নাটক নভেলকে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর জন্য বরং সমাজের দুর্মূর্খ মানুষের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রকাশ করার জন্য লেখিকা সচেতনভাবেই বিভিন্ন সংলাপে প্রকাশ করেছেন।

স্ত্রীকে নির্যাতন ও মেয়েদের শিক্ষার বিরোধিতা করলেও স্ত্রী বিয়োগের পর বকুল যাকে কি না সৃষ্টিছাড়া মেয়ে হিসেবেই বলা হয়ে থাকে তাকে কিঞ্চিৎ খাতির করে নিজের বাড়িতে একটু ঠাঁই করে দিয়েছেন বাবা প্রবোধচন্দ্র। তরুণী বকুলের জন্য তাঁর বাবা ও দাদারা অনেকটা দায়সারা ছিলেন এবং এ কারণেই তার বিয়ে হয়নি। বকুল যে চিরকুমারী থাকবেন তা নয়। নির্মলের সঙ্গে দীর্ঘদিনের প্রেমও করেছেন। কিন্তু মেয়ের পক্ষ থেকে প্রস্তাব দেওয়ার পরও মেনিমুখো নির্মল তার জেঠিমায়ের তীব্র শাসনের মুখে বকুলকে বিয়ে করার সাহস দেখাতে পারেনি। নির্মলের মা বকুলকে পছন্দ করতেন, বিশেষ করে তার পদ্য লেখার জন্য। বিয়ের কার্ডও বকুলের পদ্য দিয়ে মুদ্রিত হয় এবং বকুল বুকে পাষাণ বেঁধে অন্য দশটি মেয়ের মতো বিয়ের কাজকর্ম করেছে নির্মলের মা ও জেঠিমার কথায়।

এখানে এসে লেখক বর্ণনা করছেন, ‘‘অনামিকার আমলে প্রবোধচন্দ্রের মতো রক্ষণশীল ব্রাহ্মণের ঘরে বিয়ে না হয়ে পড়ে থাকা মেয়ের দৃষ্ঠান্ত প্রায় অবিশ্বাস্য, তবু এহেন বিশ্বাস্য ঘটনাটি ঘটেও ছিল। ঘটেছিল নেহাৎই ঘটনাচক্রে। না, কোনো উল্লেখযোগ্য কারণে নয়, স্রেফ ঘটনাচক্রেই।

নামের আগে চন্দ্রবিন্দু হয়ে যাওয়া সেই প্রবোধচন্দ্রের রাশ খুব ভারী না হলেও গোঁয়ার্তুমি ছিল প্রবল, তিন-তিনটে মেয়ের যথাবয়সে যথারীতি বিয়ে দৌড়ে এসে ছোট মেয়ের বেলায় তিনি যে হের গেলেন, সেটা মেয়ের জেদে অথবা তার ‘চিরকুমারী’ থাকবার বায়নায় নয়, নিতান্তই নিজের আলস্যবশত।”

তবে বাবা প্রবোধচন্দ্র হয়তো বকুলের প্রতি দয়াকাতর হয়ে অথবা অপরাধবোধ থেকে বকুলকে নিজের বাড়ির একটি ঘর ও ছাদ উইল করে দিয়ে যায়। এটিই হালে স্বস্তির কথা—‘মৃত্যুকালে প্রবোধচন্দ্র তাঁর পুরনো বাড়ির নবনির্মিত তিনতলার ঘর বারান্দা ছাদ ইত্যাদি কেনই যে তাঁর বিরক্তিভাজন হাড়জ্বালানী ছোট মেয়ের নামে উইল কওে দিয়ে গিয়েছিলেন, সেই এক রহস্য। তবে দিয়েছিলেন তাঁর পুত্রদেও চমকিত বিচলিত ও গোত্রান্তরিতা কন্যাদের ঈর্ষিত করে।’

স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ের আধুনিক কলকাতার যাপিত জীবনের চালচিত্র নিখুঁতভাবে ফুটে উঠেছে বকুলকথায়। মেয়েরা চারদেয়ালের বন্দি জীবন থেকে বেরিয়ে এসে মুক্ত বাতাসে নিশ্বাস নিতে পারছে, কোথাও যাওয়ার বাধা নেই, মত প্রকাশের পরাধীনতা নেই, মেয়েদের শিক্ষার ক্ষেত্রে যে প্রাচীর ছিল তারও কোনো অস্থিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না। পরিবর্তনশীল শহর জীবনের অফুরন্ত বৈচিত্র্য ও প্রাণপ্রাচুর্য এ খণ্ডে উৎকীর্ণ হয়েছে।

নতুন চরিত্র হিসেবে যোগ হয়েছে বকুলের ছোড়দার (মানু) মেয়ে কলেজ পড়ুয়া অতিশয় স্মার্ট শম্পা। শম্পা বকুলের নেওটা বলা চলে এবং পিসি যেন তার একমাত্র প্রিয় ও বিশ্বস্ত বন্ধু যাকে সব কথা অকপটে বলা যায়। পিসিও শম্পার সব কথা শুনেন কিন্তু কোনো শাসনত্রাসনের কথা বলেন না। পরিণামে কলেজ পড়–য়া মেয়েটি ‘ছেলেশিকারী’ রূপে অনেকের মাথায় গোলমাল করে দিয়ে ঘোল খাওয়ায় কিন্তু কাউকেই প্রেমিক হিসেবে গ্রহণ করেনি। মেয়েটি এমন ছেলেশিকারী হলেও তার মধ্যে কোথায় যেন নিষ্পাপ সততা রয়েছে বলে বকুল উপলব্ধি করেন। এজন্য তাকে ছেলেদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করার খেলা না করার জন্য শাসন করতে গিয়েও থেমে যান। তার প্রতি জন্মায় বকুলের অগাধ বিশ্বাস।

শেষ পর্যন্ত কলেজপড়ুয়া অত্যন্ত স্মার্ট আধুনিকা শম্পা এমন এক ছেলেকে পছন্দ করে যে কারখানার শ্রমিক, দেখতে ‘কাফ্রি ক্রীতদাসের’ মতো কিম্ভূতকিমকার। তার নাম সত্যবান হলেও শারীরিক কাঠামো ও গায়ের রঙের কারণে শম্পা জাম্বুবান বলে ডাকে। নিজেও অকপটে সত্যবানের বর্ণনা দিয়ে মজা করে। সত্যবান শম্পাকে উঁচু শ্রেণির মানুষ হিসেবে সমূহ সমীহ করে এবং প্রথম দিকে ম্যাডাম বলেও সম্বোধন করে। সে কারখানার শ্রমিক, প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়াও নেই, নিজেকে শম্পার যোগ্য মনে না করে বারবার শম্পাকে প্রত্যাখ্যান করতে চেয়েছে কিন্তু শম্পা তাকে সাঁড়াশি দিয়ে ধরেছে যেন শম্পার বাহুমূল থেকে মুক্ত হওয়ার কোনো উপায় থাকে না। একদিন শম্পা সত্যবানকে নিয়ে উধাও হয়ে গিয়ে বড় পিসি পারুলের বাসায় আশ্রয় নেয়। তখন সত্যবান ছিল খুব অসুস্থ। স্মার্ট শম্পার কথাবার্তার ধরনও চমৎকার যার কথায় বড় পিসিও রাগ করতে পারেন না। সত্যবানকে চিকিৎসা করে ভালো করলে একদিন সে কারখানায় যাওয়ার পর শ্রমিকদের আন্দোলনের সময় পায়ে বোমার আঘাত লাগে। অসুস্থ সত্যবানকে নিয়ে শম্পা আবার উধাও হয়ে বস্তিতে এবং সেখানেই তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয় আরেক বস্তিবাসীর সহায়তায়। বোমার আঘাতে তার পায়ের অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল যে পরিণামে হাঁটু পর্যন্ত দুই পা কেটে ফেলতে হয়েছে। পরিবারের কারোর দিকে না তাকিয়ে, কারও সিদ্ধান্ত না নিয়ে নিজের সিদ্ধান্তেই তাকেই বিয়ে করে বস্তিতে থাকতে শুরু করে। এমন সৃষ্টিছাড়া সিদ্ধান্তের জন্য শম্পার পরিবার দুশ্চিন্তায় ও মনোকষ্টে বিধ্বস্ত হয় এবং সমাজে মুখ দেখানোর উপায় থাকে না। শম্পা পরিবারের কাউকে গ্রাহ্য করেনি তার কোনো কাজের জন্য। শম্পার চরিত্র সৃষ্টিতে তার পরিবারের সঙ্গে কোনো মিথস্ক্রিয়া উপন্যাসে বিস্তৃত হয়নি। কেন হয়নি তা রহস্যজনক।

এই চরিত্রটির এমন দুঃসাহসিক প্রেম এবং ঘরছাড়া হয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে সমাজের বিয়ের প্রথা ভেঙে চুরমার করে দেওয়ার অভিলিপ্সা লেখিকার ছিল কি না বোঝা মুশকিল। স্বভাবতই এটি একটি বিরল ম্যাচিং ঘটনা, এই ঘটনায় আবেগীয় গভীর প্রেমের কোনো আস্ফালনও উন্মোচিত হয়নি এবং কোনো কারণে শম্পা কারো প্রতি প্রতিশোধ স্পৃহা নিয়েও এই ঘটনা ঘটায়নি। খুব স্বভাবসুলভভাবে ঘটনাটি ঘটিয়েছে। এই প্রেম ছিল একান্তই শম্পার একতরফা। সে তার খামখেয়ালিপনার মধ্য দিয়ে জীবনের এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে ঘরছাড়া হয় এবং বস্তিতে থেকে সত্যবানের জীবনের ভার ঘাড়ে নিয়ে জীবন-সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়। উপন্যাস পাঠে পাঠকের মনে আসতে পারে হয়তো বিয়ে প্রথার বিরুদ্ধেও লেখিকা শম্পাকে তৈরি করেছেন যা একটি বাক্যেও এমন ধারণার মৃদু তাপ পাওয়া যায়—‘হয়তো বহু পুরনো, বহু ব্যবহৃত ওই বিয়ে প্রথাটাই থাকবে না পৃথিবীতে।’

প্রথম প্রতিশ্রুতিতে নবকুমারের মাস্টার ভবতোষ, বন্ধু নিতাই; সুবর্ণলতায় জগু ঠাকুর এবং বকুল কথায় বকুলের প্রেমিক নির্মলের স্ত্রী মাধুরী বৌ, সনৎকাকা ও নমিতা ছোট চরিত্র হলেও মনে দাগ কাটার মতো। সনৎকাকা একজন প্রগতিশীল উদার ব্যক্তি এবং শিল্প-সাহিত্যের বড় সমঝদার। নমিতা গৃহবধূর চরিত্রটি আকস্মিক সৃষ্টি হয়েছে যে চরিত্রের মাধ্যমে নারী নির্যাতনের প্রতিবাদ করতে গিয়ে স্বামীকে ত্যাগ করে শহরে চলে আসে এবং পর্যায়ক্রমে অভিনয়ের দিকে ঝুঁকে। তবে শেষ পর্যন্ত তার চরিত্র স্খলনের ইঙ্গিতও পাওয়া যায়। ভবতোষ, নিতাই, জগু ঠাকুর ও সনৎকাকা আদর্শিক চরিত্রের প্রতিভূ যারা মানুষকে কেবল উদার মনে বিলিয়ে দিতে পারেন এবং প্রগতিশীল মানসিকতার মানুষগুলো সমাজের কল্যাণের জন্য ব্রতী।

প্রথম প্রতিশ্রুতি ও সুবর্ণলতার শেষ পৃষ্ঠায় পাঠকের দীর্ঘশ্বাস যেমন ঘনায়িত হয় ঠিক তেমন ঘনায়িত দীর্ঘশ্বাস সৃষ্টি হয় না বকুলকথায়। বরং এই খণ্ডে পাঠকের হৃদয়ে আক্ষেপের ঝংকার উঠতে পারে অথবা একটি সংগ্রামী মেয়ের জন্য বুকে সাহস সঞ্চারিত হতে পারে—‘শম্পা খেটে খেটে রোগা হয়ে যাওয়া মুখে মহোৎসাহের আলো মেখে বলে, ‘আমার নতুন সংসার দেখতে গেলে না পিসি? যা গুছিয়েছি দেখে মোহিত হয়ে যাবে। দক্ষিণের বারান্দায় বেতের মোড়া পেতে ছেড়েছি। আর তোমার জাম্বুবানকে তো প্রায় মানুষ করে তুলছি। চাকাগাড়ি চড়িয়েই একবার সেজপিসির কাছে নিয় যাবো ঠিক করেছি।’

আশাপূর্ণা দেবীর এই ট্রিলজটি একটি সেরা কাজ হিসেবেই এখন পর্যন্ত সাহিত্যবোদ্ধাদের কাছে আলোচিত ও পরিচিত। উপন্যাস নির্মাণেও রয়েছে সূক্ষ্ম স্বাতন্ত্র্য। তিনি উপন্যাসটির কাহিনি বর্ণনা করেছেন অনেকটা গল্প বলার ঢঙে অর্থাৎ বড়রা যেমন ছোটদের গল্প বলে শোনান ঠিক তেমনি কোথাও কোথাও মনে হয়। প্রায় শত বছরের ক্যানভাসে নির্মিত উপন্যাসে অসংখ্য চরিত্রের মধ্য থেকে তিনি কেবল গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রগুলোই চিত্রিত করে ঘটনাবন্দি করেছেন। অনেক উপন্যাসে যেমন—মানিক বন্দোপাধ্যায়ের কিংবা বিভূতিভূষণের উপন্যাসে পরিবেশের ডিটেইল বর্ণনা পাওয়া যায় এখানে তেমনটি পাওয়া যায় না। চরিত্রচিত্রণেও তিনি খুব সতর্ক ছিলেন। যেমন- সত্যবতীর শুধু একটি সন্তানের জন্মের কথা জানা যায়, সুবর্ণলতার কখন কোন সন্তান হয়েছে কোনোভাবেই জানা যায়নি। এমনকি এত বড় সংসারের কখন ছেলে বা মেয়ের বিয়ে হয়েছে তারও কোথাও উল্লেখ নেই। তিনি সচেতনভাবেই এগুলো এড়িয়ে গিয়ে তিনটি চরিত্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ও নাটকীয় ঘটনা রঞ্জিত করেছেন। তবে মেনে নিতে হবে যে, সন্তানদের উপস্থিতি মাঝে মাঝে পাওয়া গেছে এবং স্বীকার করতে হবে যে, সবার চরিত্র নিয়ে যদি তিনি নাড়াচাড়া করতেন তাহলে হয়তো এটি এতো দীর্ঘ হতো যে পাঠকের পড়ার উপযুক্ত থাকত না ও ধৈর্যও থাকত। এদিক থেকে উপন্যাস নির্মাণের কৌশলের জন্য লেখিকা প্রশংসার্হ।

আগেইে বলেছি, প্রায় শতবর্ষের ক্যানভাসে নির্মিত উপন্যাসে তিনি কালের প্রবাহ উন্মোচন করেছেন জীন থেকে জীবনরহস্য বা জিনোম সিকোয়েন্স উন্মোচনের মতো। তদানীন্তন সমাজে নারীর দুর্দশা ও যৌথ পরিবারের যে রসায়ন ও মিথস্ক্রিয়া হয় সেগুলোর নিখুঁত বর্ণনা পাঠককে মুগ্ধ করে। শরৎসাহিত্যে একই সময়ের নারী সমাজের দুঃখ দুর্দশার চরিত্র পেলেও আমরা সত্যবতী, সুবর্ণলতা এবং বকুলের মতো প্রতিবাদী, অগ্রসর চিন্তক ও আশাবাদী স্বপ্নদ্রষ্টা নারীর চরিত্র খুব একটা দেখি না। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় নারীদের ঘর থেকে বের না হওয়া এবং লেখাপড়া করা নিন্দনীয় বিষয়গুলোর ভেঙ্গেচুরে একাকার করা হয়েছে এই ট্রিলজিতে। অন্যদিকে যৌথ পরিবারের প্রথাও ভেঙে চুরমার করে ছোট্ট পরিবারের (সিঙ্গেল ফ্যামিলি) গড়ার বিবর্তন সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে।

একটি সত্য এখানে বিমূর্তভাবে লক্ষ্যণীয় যে, নারীরা চারদেওয়ালে বন্দি থেকে নির্যাতিত ও অনগ্রসর খেটে খাওয়া মানুষের জীবনের গল্প উপন্যাসে প্রতিষ্ঠিত হলেও তিনটি উপন্যাসেই আদতে নারীর চৈতন্য, ক্ষমতা, স্বেচ্ছাচারিতা ও দাপুটে একক সিদ্ধান্তগ্রহীনকারী হিসেবে দেখতে পাই। রামকালীর পরিবারে তিনি প্রবল প্রতাপশালী ও দাপুটে পুরুষ হলেও সত্যবতীর স্বামীর পরিবারে এলোকেশীই একক সিদ্ধান্তের অধিকারিনী ছিলেন। সত্যবতীর স্বামী ও সন্তান সবাই ছিল তার কাছে থাকত তটস্থ। শেষ পর্যন্ত সত্যবতীই এলোকেশীর রাহুগ্রাস থেকে মুক্ত হয়ে নিজের মতো করে সংসার নির্মাণের দিকে মন দেন। যদিও নবকুমার পৌরুষ্য দেখানোর জন্য সত্যবতীর কোনো কোনো সিদ্ধান্ত মানতেন না কিন্তু পারিবারিক অনেক সিদ্ধান্তই মেনে চলতেন এবং তবে সূক্ষ্ম বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করলে বলা যায় সত্যবতীর নির্দেশনাতেই সংসার পরিচালিত হতো। সুবর্ণলতার বিয়েটাও হয়েছিল এলোকেশীর সিদ্ধান্তে যা একজন দোর্দণ্ড প্রতাপের নারীর ভূমিকা প্রমাণ করে। অনুরূপভাবে মুক্তকেশী অর্থাৎ সুবর্ণলতা শাশুড়িও এলোকেশীর মতোই পরিবারের নিয়ন্ত্রক ছিলেন এবং ছেলেরা বা ছেলের বৌরা তাঁর কথার অবাধ্য হওয়ার সাহস দেখাত না। মাঝে মাঝে স্পষ্টভাষী ও একগুঁয়ে প্রকৃতির সুবর্ণলতা শাশুড়ির কথা মানতে পারত না বলে তাকে একদিন বাড়ি থেকে বাপের বাড়িতেও রেখে এসেছিল মুক্তকেশীর কথায়। কিন্তু বাপের বাড়িতে এক বেলা আহারও জুটেনি সুবর্ণলতার, ফিরে আসতে হলো স্বামীর বাড়িতে। এই ঘটনা কেবল সুবর্ণর জন্য নিন্দা ও জঘন্য অপমানের ছিল না, তার বাবা নবকুমারের জন্যও ছিল। সুবর্ণলতার দুঃখ হলো সে কোনো দিন বাপ বা ভাইয়ের কাছে কোনো কিছুর জন্যই আশ্রয় পায়নি। শেষ পর্যন্ত সুবর্ণলতা স্বামী প্রবোধকুমারকে নিয়ে পৃথক হয়ে প্রথমে ভাড়া বাসায় এবং পড়ে নিজের বাড়ি নির্মাণ করেন। এখানেও সুবর্ণলতার সিদ্ধান্তই ছিল গুরুত্বপূর্ণ। বকুলকথায় কয়েকটি মূল চরিত্রের মধ্যে বকুল, পারুল, শম্পা এরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ সিদ্ধান্তে জীবন যাপন করতেন। আরেকটি প্রতাপশালী নারী চরিত্র হলো নির্মলের জেঠিমা। ওই যৌথ পরিবারের সকল সিদ্ধান্ত নিতেন তিনি এবং চুন থেকে পান খসার উপায় ছিল না। এ-কারণেই নির্মল বকুলকে গভীরভাবে ভালোবেসেও জেঠিমার কথার অবাধ্য হতে না পেরে বুকলকে বিয়ে করতে পারেনি। বকুলকথা উপন্যাসে সময়ের হালে পালের বাতাসে বকুল নিজেও হতাশ হন। তিনি নারীর স্বাধীনতা চেয়েছেন কিন্তু স্বেচ্ছাচারিতা চাননি। তাঁর চিন্তা ও সমাজ বাস্তবতার দুটি ধারা পরস্পর মুখোমুখি হয়ে মনের ভেতরে নতুন সংকটের তৈরি করে। এমনকি আধুনিক আঁটসাঁটো পোশাকও যে তাঁর পছন্দ নয় এজন্য তাঁর আক্ষেপের দীর্ঘশ্বাস শোনা যায়।

গত শতাব্দী ছিল মূলত পৃথিবীর পরিবর্তনের বিপ্লবের শতাব্দী। রুশ বিপ্লব, জার্মান বিপ্লব, হাঙ্গেরিয়ান বিপ্লব, আগস্ট বিপ্লব (ভিয়েতনাম), প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধ, ভারতের স্বাধীনতা, চীন বিপ্লব, কিউবান বিপ্লব ইত্যাদি বিপ্লবগুলো পৃথিবীর সব দেশের মানুষেরই চোখ-কান খুলতে থাকে। তারা নিজেদের অধিকার সচেতন হয় এবং অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের তৈরি না করলে পরিবর্তিত পৃথিবীতে টিকে থাকার প্রশ্নে মানুষের বন্দিদশা থেকে মুক্ত হতে শুরু করে। বন্দিত্ব থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য নারী সমাজও তাদের দেওয়াল ভাঙতে থাকে এবং স্বাধীনভাবে পুরুষের মতো সমান অধিকার নিয়ে বাঁচার আন্দোলনে যোগ দেয়। ফলশ্রুতিতে, তাদের শিক্ষার অধিকার সম্প্রসারিত হয়। বকুলকথা উপন্যাসে সে সময়কে পৃষ্ঠাবন্দি করা হয়েছে সেটি উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়। সুবর্ণলতায় স্বদেশি আন্দোলনের আভাস থাকলেও ভারতের স্বাধীনতা বা সেই সময়ের কোনো আভাস এই ট্রিলজিতে উৎকীর্ণ হয়নি। তবে আখ্যান বিশ্লেষণ করলে স্পষ্টতই বোঝা যায় এটি স্বাধীন ভারতের পটভূমিতে রচিত।

আশাপূর্ণা দেবীর ট্রিলজির একটি সংক্ষিপ্ত উপস্থাপন করলেও অনেক কথা না-বলা থেকে গেছে। শেষে এসে মনে হলো বিদগ্ধ এই লেখিকার কথা দিয়েই হয়তো না-বলা কথার কিছুটা তৃষ্ণা নিবারণ হতে পারে। এ-কারণেই আলোচনা শেষ করার পূর্বে বকুলকথা খণ্ডের ফ্ল্যাপের লেখাটি পাঠক সমীপে পেশ করছি—‘যখন আমাদের সমাজে অন্তঃপুর ছিল অবহেলিত, যখন সেখানকার প্রাণীরা পুরোপুরি আস্ত মানুরে সম্মান কখনো পেত না, তখন সামান্য কটি মেয়ে এগিয়ে এসে প্রতিবাদ করে, সমাজের শৃঙ্খল ভেঙে মুক্ত পৃথিবীর আলো এনে দেবার সুযোগ করে দেয় অন্তঃপুরে। সত্যবতী ছিল সেই সামান্য কজন মেয়ের অন্যতম। সত্যবতীর মেয়ে সবর্ণলতা সত্যবতীর মতো তেন না পেলেও নীরবে সেই নারীমুক্তিরই আকাঙ্ক্ষাকে লালিত করে গেছে। সেই আকাঙ্ক্ষার লালিত ফলবতী হয়েছে সুবর্ণলতার মেয়ে বকুলের জীবনে, যে যশস্বী লেখিকা হয়েছে অনামিকা দেবী নামে। কিন্তু বকুল তথা অনামিকা কি তার সমাজের নূতন রূপে মা ও দিদিমার সাধানয় সাফল্য দেখতে পাচ্ছে? না দেখছে শেকল-ছেঁড়ার এক ভয়াবহ উন্মাদনায় নারী-প্রগতির নামে চলছে স্বেচ্ছাচার। এই জিজ্ঞাসাই বকুল না অনামিকা দেবীকে বারে বারে উন্মনা করে তুলছে। আশাপূর্ণা দেবীর সত্যবতী ট্রিলজির এই শেষ খণ্ডে এই প্রশ্ন বড় হয়ে উঠেছে—স্বাধীনতা ও স্বেচ্ছাচার: এই দুইটির সীমারেখা কোথায়? সে সীমারেখার অন্বেষাই বকুলকথা উপন্যাসের মূল উপজীব্য।’

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev