১৯৩০ সালের মে মাসে কবি কাজী নজরুল ইসলামের পুত্র বুলবুল বসন্ত রোগে মারা যায়। পুত্র শোক ভোলার জন্য তিনি তখন অনেক চেষ্টা করছেন। কবি জসীম উদ্দীন সে সময়ের স্মৃতিচারণ করে লিখেছেন — ‘তিনি তখন কবি নজরুলকে খুঁজে পেলেন ডি.এস লাইব্রেরির দোকান ঘরের একটি কোণে। পুত্র শোক ভুলার জন্য নজরুল সেখানে বসে হাসির কবিতা লিখছিলেন এবং কেঁদে কেঁদে নিজের দু’চোখ ফুলিয়ে ফেলছিলেন।’ এত শোকাগ্রস্ত হয়েও নিজেকে রক্ষা করতে পারেননি নজরুল। প্রয়াত পুত্র বুলবুলকে কেন্দ্র করে শুরু হলো তাঁর পরলৌকিক চর্চা। সেই যুগটা ছিল প্ল্যানচেটের যুগ। লেখক সাহিত্যিকগণ তো বটেই সাধারণ মানুষও সে সময় প্ল্যানচেটের মাধ্যমে তাদের প্রিয় মানুষদের আত্মা এই ভূমিতে নামাতেন। তাঁদের কথা শুনতেন। নজরুল যে সময় লেখালেখি করতেন সে সময় পরলৌকিক চর্চার বিষয়গুলো বিস্ময়করভাবে চর্চিত হতো মূলত দু’টি কারণে। প্রথমত এই সংস্কৃতিটি এসেছিল ইউরোপ থেকে। কারণ ১৮০০ শতকের শুরু থেকে ১৯০০ শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত ইউরোপে পরলৌকিক চর্চা ছিল বহু চর্চিত একটি বিষয়। দ্বিতীয়ত পশ্চিমবঙ্গের বিখ্যাত লেখক ও প্রকাশক সবিতেন্দ্রনাথ রায় তার ‘কলেজ স্ট্রিটে সত্তর বছর’ গ্রন্থে লিখেছেন- একালের পাঠকেরা অনেকে হয়তো ‘ভূতুড়ে কান্ড’ বলে একটি চটি বই দেখেননি। এটি মূলত প্ল্যানচেটের কাহিনী। তখনকার দিনে প্ল্যানচেটের চলন ছিল খুব। রবীন্দ্রনাথও কিছুকাল প্ল্যানচেটের পাল্লায় পড়েছিলেন। তো হয়েছে কি নজরুল যে সময় লেখালেখি করতেন সে সময় সেই ভূতুড়ে কান্ড বইটি অসম্ভব জনপ্রিয় হয়েছিল এবং সে কারণেই বোধকরি ধনী-গরিব শিক্ষিক-অশিক্ষিত সবাই প্ল্যানচেটের প্রতি ঝুঁকেছিলেন। বিখ্যাত লেখক বিভূতি ভূষণের পরলোকতত্ত্ব আধ্যাত্মিকতায় খুব বিশ্বাস ছিল। প্ল্যানচেট ইত্যাদি বিষয়ে আরেক বিখ্যাত সাহিত্যিক অচিন্ত্য কুমারের সঙ্গে তার নিয়মিত পত্রালাপ হতো।
প্রায় দিন সন্ধ্যা বেলায় প্ল্যানচেটে বসেতন অচিন্ত্যবাবু ও তাঁর স্ত্রী নীহারকণা। এক অশরীরী আত্মা এসে জানালেন, তাঁদের বাড়িতে আসতে তার কষ্ট হয়, কারণ তাঁদের বাড়িতে ঠাকুরের কোনো আসন নেই। পরের দিন কোর্ট থেকে ফেরার সময়ে এক ব্যক্তি অচিন্ত্যবাবুকে একটি ক্যালেন্ডার উপহার দেন। অচিন্ত্যবাবু এসে ক্যালেন্ডারটিতে দেখলেন, শ্রীরামকৃষ্ণদেবের ছবি আছে। স্বামী-স্ত্রী দু’জনে শোয়ার ঘরে ছোট একটি টেবিলে আসন পেতে তার ওপর টাঙালেন ক্যালেন্ডারটি, ধুপ ধুনো প্রদীপ জ্বেলে দিলেন।
সন্ধ্যাবেলা প্ল্যানচেট করতে গিয়ে এক অবিশ্বাস্য ব্যাপার ঘটল। দেখা গেল, প্ল্যানচেটের টেবিল কিছুতেই ধরে রাখা যাচ্ছে না। সেটি কেবলই যেন ছুটে ঠাকুরের ছবির দিকে যেতে চায়।
এই ঘটনা অচিন্ত্যকুমারকে গভীরভাবে শ্রীরামকৃষ্ণেষর জীবনের ও কর্মের প্রতি আকৃষ্ট করল। শুরু হলো অধ্যায়ন, মনন ও চিন্তন। এরই ফলশ্রুতি রচিত হলো পরমপুরুষ শ্রী শ্রীরামকৃষ্ণ গ্রন্থটি। ধারাবাহিকভাবে বেরোল মাসিক বসুমতী পত্রিকায়। একে একে চার খন্ডে বেরোল বইটি সিগনেট প্রেস থেকে। অভূতপূর্ব সাড়া পেল। কত বই যে বিক্রি হলো বলার নয়। এই বইটি সে সময় পাঠক লাইন ধরে কিনেছিল।
রবীন্দ্রনাথের প্ল্যানচেটের কথা পূর্বেই বলা হয়েছে। সে কথা তিনি তাঁর আত্মস্মৃতিতে তিনি বিস্তারিত লিখেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভ্রাতুস্পুত্র অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরও ঠাকুরবাড়ির প্ল্যানচেটের কথা কিছু কিছু লিখেছেন। তার আত্মজীবনী ‘আপন কথায়’ লিখেছেন- একটা শোনা-কথা বলি। তখন বাড়িতে প্ল্যানচেট চালিয়ে ভূত নামানো চলছে। দাদামশায়ের (গিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর) পার্ষদ দীননাথ ঘোষাল প্ল্যানচেটে এসে হাজির। বড়ো জ্যাঠামশায় (দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর) তাঁকে জেরা শুরু করলেন- পরকালটা এবং পরকালটার বৃত্তান্ত শুনে নিতে চেয়ে। প্ল্যানচেটে উত্তর বার হলো- ‘যে কথা আমি মরে জেনেছি, সে কথা বেঁচে থেকে ফাঁকি দিয়ে জেনে নেবে এ হতেই পারে না।’ কবি কাজী নজরুল ইসলাম প্ল্যানচেটের মাধ্যমে মৃত পুত্র বুলবুলের আত্মা নামাতে চেয়েছিলেন কি না সে বিষয়টি স্পষ্ট নয়। তবে তিনি মৃত পুত্রের দেখা পেতে পরলৌকিক চর্চা শুরু করেছিলেন। এ বিষয়ে সাহায্যের জন্য তিনি গেলেন লালগোলা হাইস্কুলের হেডমাস্টার শ্রীযুক্ত বরদাচরণ, মজুমদারের কাছে। মুজফফ্র আহমদ, তার স্মৃতিকথা, কাজী নজরুল ইসলাম গ্রন্থে লিখেছেন- “আগেই সে বারীন্দ্রকুমার ঘোষের নিকট হতে শুনছিল যে ত্যাগী যোগী শ্রীঅরবিন্দ তাঁর সাধনার দ্বারা যেখানে পৌঁছেছেন গৃহী যোগী শ্রীবরদাচরণ মজুমদারও তাঁর সাধনার দ্বারা তার কাছাকাছি পৌঁছেছেন। এটা নিমতিতাতে নজরুলের শ্রীবরদাচরণ মজুমদারের সহিত দেখা হওয়ার অনেক আগেকার কথা। শুধু মনে শান্তি লাভ করার জন্যে নজরুল, এই গৃহী যোগীর নিকটে যায়নি, সে স্থূলদেহে পুত্র বুলবুলকে অন্তত একটিবার দেখতেও চেয়েছিল। ডক্টর সুশীলকুমার গুপ্ত নজরুলের পরম বন্ধু শ্রীনলিনীকান্ত সরকারের লেখা হতে নিয়ে লিখেছেন, “বরদাচরণের যোগশক্তির প্রভাবে নজরুল তাঁর মৃতপুত্র বুলবুলকে একবার স্থূলদেহে দেখতে সমর্থ হন।” (নজরুল চরিত মানস, ভারতী সংস্করণ, ১২৫ পৃষ্ঠা)।
যে বুলবুলের স্থূলদেহ মাটির তলায় পচে গিয়েছিল সে কি করে স্থূলদেহ নিয়ে বাবার সামনে হাজির হতে পারল? নিছক একটা ভ্রান্তির ব্যাপার। এখান হতেই নজরুলের সর্বনাশের আরম্ভ হয়েছিল।”
তবে কাজী নজরুল ইসলাম ছোটবেলা থেকেই কিছুটা পরলৌকিক ও আধ্যাত্মিক বিষয়ের প্রতি অনুরাগী ছিলেন। মুজফফ্র আহমদ, তার স্মৃতিকথা, কাজী নজরুল ইসলাম গ্রন্থে লিখেছেন- নানান সূত্র হতে খবর পাওয়া গেছে যে শিশু ও বাল্যকালে নজরুল ইসলাম হাজী পাহালওয়ান নামক একজন ফকীরের কবরের সেবা করেছে। সেবা করার মানে এই যে সে কবরের ধুলো ঝেড়েছে এবং সাঁঝের বেলায় কবরে তেলের বাতি জ্বালিয়েছে। বিচার করে কোনো কিছু বোঝার মতো বয়স তার সেটা ছিল না। মুরব্বি ও গুরুজনেরা তার মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন যে যাঁকে ওখানে কবর দেওয়া হয়েছে দীর্ঘকাল আগে মরে গেলেও তাঁর অলৌকিক ক্ষমতা আছে। লেখক শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের পুস্তক হতে আমরা জানতে পেরেছি।
যে বেশ বড় হয়ে নজরুল যখন রানীগঞ্জের শিয়ারশোল রাজ হাইস্কুলে পড়ছিল তখন সে গাঁজা কিনে সন্ন্যাসীকে ঘুস দিয়েছে। সন্ন্যাসীর নিকট হতে সে জানতে চেয়েছে যে কোনো একটি বিষয়ে তার কি হবে। ওই রানীগঞ্জেরই হাতবাঁধা ফকীরের বিষয়ে সে মুক্তি’ নাম দিয়ে একখানা কবিতা লিখেছে এবং বলেছে যে ঘটনাটি সত্য। বছরের একটা সময়ে নিমগাছের সবপাতা ঝরে পড়ে আবার একদিন রাতারাতি সব পাতা নূতন গজিয়েও যায়। এটা আমরা বরাবর দেখে আসছি। কিন্তু নজরুলের কবিতায় ছিল যে নূতন পাতা গজানো হচ্ছে হাতবাঁধা ফকীরের কারামত। এইভাবে নজরুলের মনে ফকীর ও সাধু-সন্ন্যাসীরা তাঁদের যে অতিপ্রাকৃত ও অলৌকিক কাজ করার ক্ষমতা আছে এই রকম একটা ধারণা তার ছোট বয়স হতেই জন্মিয়ে দিয়েছিলেন।’
কাজী নজরুল ইসলামের জন্ম হয় ১৮৯৯ সালের ২৫ মে পশ্চিমবঙ্গে বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে। বাবা ছিলেন কাজী ফকির আহমেদ, মা জাহিদা খাতুন। বাবা ফকির আহমেদ ছিলেন স্থানীয় মসজিদের ইমাম এবং মাজারের খাদেম। দরিদ্র মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহণ করা নজরুলের প্রাথমিক শিক্ষা ছিল ধর্মভিত্তিক। তাঁর ভবঘুরে বাল্যকাল আর তাঁর স্কুল শিক্ষা নিয়ে নানা গল্প প্রচলিত আছে। সেসব কথা আমরা জানতে পারি নজরুলের বন্ধু ও বিখ্যাত লেখক শৈলজানন্দের মুখোপাধ্যায়ের লেখা থেকে।
নজরুল ছিলেন সব ধর্মীয় চেতনার ঊর্ধ্বে। অন্তরে তিনি না ছিলেন হিন্দু না ছিলেন মুসলিম। বাড়িতে তিনি ‘ভগবান’ এবং ‘জল’ বলতেন, আবার মুসলমানদের সামনে ‘আল্লাহ’ এবং পানি বলতেন। (কাজী নজরুল ইসলাম, স্মৃতিকথা, মুজফফ্র আহমদ, পৃষ্ঠা-২৪৫)। তাঁর একটি কথাতেই এটা ছিল পরিষ্কার- ‘জাতের নামে বজ্জাতি সব জাত জালিয়াত খেলছো জুয়া।’ তিনি সবার ঊর্ধ্বে ছিলেন মানবতার কবি। গোটা ভারতবর্ষেই তাঁর যথাযথ মূল্যায়ন হয়নি।
১৯৪২ সালের দিকে কবি অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁর বাকশক্তি রহিত হয়ে যায়। মাত্র ৪৩ বছর বয়সে কবি কি বিশাল কাজ করে গেছেন বাংলা সাহিত্যের জন্য। সেটা ভাবলে অবাক লাগে। এ প্রসঙ্গে অচিন্ত্যকুমারের কিছু কথা মনে পড়ে গেল। কথাগুলো লিখেছেন পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্যিক ও প্রকাশক সবিতেন্দ্রনাথ রায়। তিনি একবার অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন আপনি ঈশ্বর আত্মা পরলোক এসব বিশ্বাস করেন? প্রতি উত্তরে তিনি বলেছিলেন, দ্যাখো-ঈশ্বর, আত্মা, পরলোক যে যাই বলুক আমি বিশ্বাস করি। আত্মা না থাকলে, পরলোক না থাকলে, ঠাকুর না থাকলে আমি ভেসে যেতাম ভানু (সবিতেন্দ্রনাথ রায়)। তারপর বললেন, প্ল্যানচেটের সময়ে শ্রীরামকৃষ্ণ লীলাপ্রসঙ্গ পড়া, সবশেষে ঠাকুরের আশ্রয় পাওয়া, এসব কি এক কথায় উড়িয়ে দেওয়া যায়? তারপর আমায় জিজ্ঞেস করলেন অচিন্ত্যবাবু, আচ্ছা ভানু বলো তো মানুষের জীবন কী দিয়ে মাপা যায়? আমি বললাম, কেন আয়ুর বছর দিয়ে। অচিন্ত্যবাবু বললেন, ভুল, এক-একজন মানুষের জীবনে আয়ু তো আপেক্ষিক। জিজ্ঞেস করলেন, শংকরাচার্য কত বছর বেঁচেছিলেন? আমি বললাম, ২৮ বছর জানি, তবে শংকরাচার্য একাধিক ব্যক্তি ছিলেন শুনেছি। অচিন্ত্যবাবু বললেন, ঠিক আছে, শংকরাচার্যের কথা বাদ দাও। স্বামীজি কত বছর বেঁচেছিলেন? আমি বললাম, ৩৮ বছর। অচিন্ত্যবাবু বললেন, ৩৮ বছরে স্বামীজি যা করেছেন, তা কটা মানুষ করেছে? ভাবো, কপর্দকহীন অবস্থায় বিশ্বজয় করে ফিরলেন। তারপর দ্যাখো রবীন্দ্রনাথকে। ৮০ বছর অবধি যা লিখেছেন, একজন সক্ষম মানুষ সারাজীবনে তা কপি করতে পারবে না। পরিমাণের কথা বাদই দিলাম, কিন্তু ভাবো-কতরকম লেখা, কত গান, কত কবিতা, কত প্রবন্ধ, নাটক, উপন্যাস, চিঠিই বা কত? এই মানুষটা তার সমস্ত সৃষ্টির জন্য ঈশ্বর হয়ে গেছেন। কাজী নজরুল ইসলাম সম্পর্কেও কিন্তু ঠিক একই কথা বলা যায়।