মনে পড়ে পীযূষ চক্রবর্তীর কথা। কাশীপুরের সৎচাষিপাড়া লেনের পীযূষ : রবীন্দ্রভারতীতে আমাদের সহপাঠী। খোঁচা খোঁচা দাড়ি, এলোমেলো মাথার চুল, হাই পাওয়ারের চশমা। জয়পুরিয়া কলেজ থেকে ছাত্র ফেডারেশন করে। রবীন্দ্রভারতীতে আমরা ছাত্র ফেডারেশন তৈরি করতে চাই। পীযূষও হাত লাগালো। পার্টি সে করত। আর জড়িয়ে ছিল গণনাট্যের সঙ্গে। তার মুখেই প্রথম বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের নাম শুনলাম। প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্র। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের ভাইপো। উত্তর কলকাতার বাসিন্দা। রাজবল্লভ পাড়ার কাছে থাকেন।
সিপিএমের বিদ্যাসাগর লোকাল কমিটি থেকে এলাম উত্তর কলকাতা লোকাল কমিটিতে। সে কমিটির সম্পাদক অনিল মিত্র। মজার মানুষ। বুদ্ধদেব সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি হাসতে হাসতে বললেন, ‘হ্যাঁ, বুদ্ধ সুকান্তের ভাইপো। কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে আছে। কিন্তু তার পূর্বপুরুষ ছিলেন ব্রাহ্মণ্যবাদের মুখপাত্র। বুদ্ধর ঠাকুরদা কৃষ্ণচন্দ্র লিখেছিলেন ‘পুরোহিত দর্পণ’। তবে তাঁর বাবা নেপালচন্দ্র ব্রাহ্মণ্যবাদের পথ মাড়ান নি। তিনি ছিলেন সারস্বত লাইব্রেরি নিয়ে।’
উত্তর কলকাতার জিবি মিটিংএ দু-একবার দেখেছি বুদ্ধদেবকে। সম্ভবত শৈলেন্দ্র সরকার বিদ্যালয়েও একবার জিবি মিটিং হয়েছিল। এই স্কুলে পড়াশুনো করেছিলেন বুদ্ধদেব। ধুতি-পাঞ্জাবি পরতেন। একটু যেন আত্মকেন্দ্রিক, স্বল্পবাক, নাকউঁচু, আর তেমন প্রাণোচ্ছল বলেও মনে হয় না। সত্যি কথা বলতে কি, আমাদের কমরেড হলেও, তাঁকে আমার কফি-হাউজমার্কা আঁতেল বলেই মনে হয়েছিল। না, সে কথা কারোকে বলি নি বকুনি খাওয়ার ভয়ে। প্রমোদ দাশগুপ্ত যে পাঁচজন উত্তরাধিকারী নির্বাচন করে গিয়েছিলেন তাঁরা হলেন বিমান বসু, অনিল বিশ্বাস, সুভাষ চক্রবর্তী, শ্যামল চক্রবর্তী আর বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ; এঁদের মধ্যে বুদ্ধদেব স্বভাবত, স্বতন্ত্র।
কলকাতা জেলা কমিটি থেকে আমাদের আঞ্চলিক কমিটির দেখভালের দায়িত্বে ছিলেন অলক মজুমদার। একদিন অলকদা এসে বললেন যুব ফেডারেশন গঠনের কথা। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে তার সম্পাদক করা হয়েছে। ছাত্র আন্দোলন নয়, যুব আন্দোলনের মধ্যে দিয়েই বুদ্ধদেব পার্টি সংগঠনে আসেন। ধাপে ধাপে জেলা কমিটি থেকে রাজ্য কমিটিতে, তারপর কেন্দ্রীয় কমিটি ও পলিট ব্যুরোতে। যে সময় তিনি প্রেসিডেন্সিতে পড়তেন, সে সময়ে নকশাল আন্দোলনের সূত্রপাত হচ্ছে সেখানে। অসীম চাটার্জীর ‘নকশালনামা’য় তার ছবি আছে। কিন্তু সে সময়ে বুদ্ধদেবের কথা শোনা যায় নি। ১৯৭৭ সালে হন বিধায়ক। তারপর মন্ত্রী। তারপর মুখ্যমন্ত্রী।
প্রথম দিকে তিনি বেশ কট্টরপন্থী ছিলেন। অনেকে তাঁকে ‘স্তালিনপন্থী’ বলে উল্লেখ করতেন। আর একটা ব্যাপারে তিনি জড়িয়ে পড়েছিলেন। সেটা হল অপসংস্কৃতিবিরোধী আন্দোলন। সম্ভবত প্রমোদ দাশগুপ্তের অনুপ্রেরণা ছিল এর পেছনে। জ্যোতি বসুকে কিন্তু অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে জেহাদে কখনও দেখি নি। সিপিএম তাঁদের পত্র-পত্রিকায় অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে বহু প্রবন্ধ লিখেছেন। তাঁরা মনে করতেন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ অপসংস্কৃতি ফেরি করে এ দেশের যুব সমাজকে আন্দোলনবিমুখ করে রাখতে চায়। আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থা সি আই এ এ ব্যাপারে সমান সক্রিয়। যাকে –তাকে সি আই এর চর বলেও দেগে দেওয়া হত। আনন্দবাজার ও দেশ পত্রিকার লেখকদের প্রতি খ্ড়্গহস্ত ছিলেন সিপিএমের নেতা-কর্মীরা। তাঁদের বলা হত ‘বাজারি লেখক’, ‘অপসংস্কৃতির ফেরিওয়ালা’। বলা বাহুল্য বামপন্থার প্রতি অনুরক্ত অন্য অনেক ছাত্রের মতো আমরাও এই আন্দোলনে প্রভাবিত হয়েছিলাম। সমরেশ বসুর ‘বিবর’, ‘দগ্ধশুক্র’, বুদ্ধদেব বসুর ‘প্রজাপতি’ না পড়েই এই সব বইকে অপসংস্কৃতির নিদর্শন বলে চিৎকার করেছিলাম। আমরা ভাবি নি যে দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো পরিবর্তনের আগে সাংস্কৃতিক আন্দোলন সফল হতে পারে না। কোন মার্কসবাদী শাস্ত্র সে মতকে সমর্থন করে না।

একদিন পীযূষ এসে বলল যে উত্তর কলকাতার প্রতাপ মঞ্চের ‘বারবধূ’ নাটকের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক যুব ফেডারেশন আন্দোলন করবে। কেন না সেটা অপসংস্কৃতির নিদর্শন। ‘চতুর্মুখ’ দলের অসীম চক্রবর্তীর পরিচালনায় ১৯৭২ সাল থেকে সে নাটক অভিনীত হচ্ছে। অভিনয়ে আছেন কেতকী দত্ত। পীযূষ সে নাটক দেখে নি। কিন্তু কর্তাব্যক্তিরা যখন বলেছেন, তখন নিশ্চয়ই তা অপসংস্কৃতির নজির। এই হল রবীন্দ্রনাথের ‘কর্তার ইচ্ছায় কর্ম’এর উদাহরণ। পরে জেনেছি বিখ্যাত লেখক সুবোধ ঘোষের গল্প অবলম্বনে রচিত এই নাটক। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত প্রায় ১৮০০ রজনী অভিনীত হয়েছে নাটকটি। সে নাটক দেখে শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, মন্মথ রায়, উত্তমকুমার (স্ত্রী গৌরীদেবীকে সঙ্গে নিয়ে উত্তমকুমার সে নাটক দেখেন) প্রশংসা করেছেন।
নাটকটির শততম রজনীর অভিনয়ের দিন অসীম চক্রবর্তী তখনকার তথ্য ও জনসংযোগ বিভাগের মন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে আমন্ত্রণ জানান। সে আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেন বুদ্ধদেব। পরবর্তীকালে তিনি প্রত্যাখ্যানের কৈফিয়ৎ হিসেবে জানিয়েছিলেন, ‘নাটকের পরিচালক আমাকে আমন্ত্রণ করলেন সেই নাটকের শততম রজনীতে। আমি নিয়মিত বাংলা নাটকের দর্শক সেটা তিনি জানতেন। কিন্তু এক্ষেত্রে আমি সবিনয়ে আমন্ত্রণ ফিরিয়ে দিয়েছিলাম অন্য কাজের অছিলায়। একে সেই নাটকের বিরোধিতা বলা যাবে না। ’ বুদ্ধদেব ‘সংস্কৃতি ও সমাজের স্বার্থে’ এই নাটক বন্ধ করার আবেদন জানিয়েছিলেন নাট্যকারকে। নাট্যকারের স্ত্রী মালা চক্রবর্তী বলেছেন যে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের গণ সংগঠন গণতান্ত্রিক যুব ফেডারেশনের কর্মীদের বিক্ষোভে নাটকটি ১৯৭৭ সালেই বন্ধ হয়ে যায়।
‘বারবধূ’র কথা উঠলে ‘দ্বিখণ্ডিত’এর কথা এসে যায়। যদিও সেটা অনেক পরের কথা। তখন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য রীতিমতো মুখ্যমন্ত্রী। ২০০৩ সালের ২৮ নভেম্বর নিষিদ্ধ করা হল তসলিমা নাসরিনের বই ‘দ্বিখণ্ডিত’। বুদ্ধদেব বলেন, ‘আমি নিজে বইটি পড়েছি। বইটা তাঁদেরই পড়িয়েছি, যাঁদের মতামতের গুরুত্ব আছে। তার পরে এই সিদ্ধান্ত।’ আর একটু স্পষ্ট করে রাজ্য সম্পাদক অনিল বিশ্বাস বললেন, ‘বইটি সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে বলে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সরকার আগাম সতর্কতা হিসেবে এই নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।’ রাজীব গান্ধীর সময়ে সলমান রুশদির ‘স্যাটানিক ভার্সেস’ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। তার ২৭ বছর বাদে কংগ্রেস সেই ভুল স্বীকার করেছিল। সেই প্রসঙ্গ তুলে তসলিমা এক টুইটারে প্রশ্ন করেন, ‘ পি চিদাম্বরম বলেছেন স্যাটানিক ভার্সেস নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত ভুল ছিল। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য কবে বলবেন আমার বই দ্বিখণ্ডিত নিষিদ্ধ করাও ভুল ছিল।’ না, বুদ্ধদেব সরাসরি ভুল কবুল করেন নি। তিনি বলেছেন, ‘বিতর্ক খোঁচাতে চাই না। তবে আমি মৌলিকভাবে কখনও কোনও বই নিষিদ্ধ করার বিপক্ষে। ব্যক্তিগতভাবে আমি এভাবে ভাবিই না। কিন্তু এই বইটার সময়ে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে বাধ্য হয়েছিলাম।’ বুদ্ধদেব বলেছেন যে তিনি বইটি কোন কোন ‘গুরুত্বপূর্ণ’ মানুষকে পড়িয়ে তাঁদের মতামত নিয়েছিলেন। তসলিমা তাঁর অন্য লেখায় স্পষ্টভাবে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের নামোচ্চারণ করেছেন। এই সময়ে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে ঘিরে তৈরি হয়েছিল এক বুদ্ধিজীবী বাহিনী, যাঁদেরকে পরিহাস করে বলা হত ‘বুদ্ধজীবী’। সে কথা পরে বলা যাবে।
গত শতকের সত্তরের দশকে আমি ঢাকার অকালে নিহত প্রগতিশীল লেখক সোমেন চন্দের রচনাবলি উদ্ধার করি এবং আমার অনুরোধে নবজাতকের মজহারুল ইসলাম তা গ্রন্থাকারে প্রকাশ করেন। সেই বই-এর ভূমিকা লিখে দেন মুজফফর আহমদ। কিম্বার নাসিংহোমে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় ছিলেন তিনি। মুখে মুখে তিনি বলে যান আর সুমন্ত হীরা তার অনুলিখন তৈরি করেন। এটি তাঁর শেষ লেখা। আমরা সোমেন স্মৃতিরক্ষা সমিতি তৈরি করি। সে সমিতির দুটি সভায় বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য এসেছিলেন। প্রথমটিতে এসেছিলেন জ্যোতি বসু। আমন্ত্রণপত্র নিয়ে আমি ও মজহারুল ইসলাম মহাকরণে গিয়ে বুদ্ধদেববাবুর সঙ্গে দেখা করেছিলাম। তিনি উৎসাহ দিয়েছিলেন। মনে আছে স্টুডেন্টস হলে স্মৃতিরক্ষা সমিতির প্রথম সভায় তরুণ বুদ্ধদেব আবেগে উদ্দীপ্ত হয়ে আবৃত্তি করেছিলেন একটি প্রাসঙ্গিক কবিতা। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘ছুরি’ :
বিগত শেষ-সংশয় ; স্বপ্ন ক্রমে ছিন্ন,
আচ্ছাদন উন্মোচন করেছে যত ঘৃণ্য,
শঙ্কাকুল শিল্পীপ্রাণ, শঙ্কাকুল কৃষ্টি,
দুর্দিনের অন্ধকারে ক্রমশ খোলে দৃষ্টি।
হত্যা চলে শিল্পীদের, শিল্প আক্রান্ত,
দেশকে যারা অস্ত্র হানে, তারা তো নয় ভ্রান্ত।
বিদেশি চর ছুরিকা তোলে দেশের হৃদবৃন্তে
সংস্কৃতির শত্রুদের পেরেছি তাই চিনতে।
শিল্পীদের রক্তস্রোতে এসেছে চৈতন্য
গুপ্তঘাতী শত্রুদের করি না আজ গণ্য।
ভুলেছে যারা সভ্য-পথ, সম্মুখীন যুদ্ধ,
তাদের আজ মিলিত মুঠি করুক শ্বাসরুদ্ধ,
শহিদ-খুন আগুন জ্বালে, শপথ অক্ষুণ্ণ :
এদেশে অতি শীঘ্র হবে বিদেশি-চর শূন্য।
বাঁচাব দেশ, আমার দেশ, হানবো প্রতিপক্ষ,
এ জনতার অন্ধ চোখে আনবো দৃঢ় লক্ষ্য।
বাইরে নয় ঘরেও আজ মৃত্যু ঢালে বৈরী,
এদেশে জন-বাহিনী তাই নিমেষে হয় তৈরি।
ন্যাশনাল বুক এজেন্সি ছিল পার্টির বইএর দোকান। কিছু কিছু প্রকাশকের প্রগতিশীল বইও সেখানে রাখা হত বিক্রির জন্য। নবজাতক প্রকাশনের বইও রাখা হত। কিন্তু আমি পার্টি সদস্য পদ ত্যাগ করার পরে তাঁরা আর আমার লেখা কোন বই রাখতে চাইলেন না। আমার পার্টি সদস্য পদ ত্যাগের ছোট একটি কাহিনি আছে। আগেই বলেছি জেলা সম্পাদকমণ্ডলির সদস্য অলক মজুমদার আমাদের লোকাল কমিটি দেখভাল করতেন। তাঁর নামে সমকামিতার অভিযোগ ওঠে। এই ব্যাপারে আলোচনার জন্য সলিলবাবুর বাড়িতে লোকাল কমিটির সদস্যদের সঙ্গে আলোচনায় বসেন প্রমোদ দাশগুপ্ত ও লক্ষ্মী সেন। কিন্তু এই নেতারা অভিযুক্তকে রক্ষা করার চেষ্টা করছেন দেখে লোকাল কমিটির একাধিক সদস্যের সঙ্গে আমিও পদত্যাগ করি। আমার পদত্যাগের আরও একটা কারণ ছিল। বারবার বলা সত্ত্বেও আমাকে সাংস্কৃতিক ফ্রন্টে নিয়ে যাওয়া হয় নি। পদত্যাগ করে আমি অন্য কোন দলে যোগ না দিলেও পার্টিতে আমি ‘রেনিগেড’ হয়ে যাই। রেনিগেডের বই কেন রাখা হবে পার্টির বইএর দোকানে ? আমি এ ব্যাপারে বিমান বসু ও বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে চিঠি দিলেও তাঁরা কোন উত্তর দেন নি।
আশির দশকের শেষ দিকে সোমেন চন্দকে নিয়ে একটি চক্র সক্রিয় হয়। তারা অন্নদাশঙ্কর রায় ও পবিত্র সরকারকে শীর্ষে রেখে একটি কমিটি তৈরি করে। সোমেন চন্দ বিষয়ে আমাদের কৃতিত্বকে আত্মসাৎ করে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করাই ছিল তাদের অভিপ্রায়। বুদ্ধদেববাবু তাদের সাহাষ্য করেছেন। সচেতনভাবে করেছেন, না অচেতনভাবে করেছেন, তা জানি না। এই চক্র ১৯৮৭ সালের ২২-এ নভেম্বর রবীন্দ্র সদনে সোমেন চন্দের উপর এক আলোচনাচক্রের আয়োজন করে। এই মর্মে ‘বসুমতী’ পত্রিকায় ১৯ নভেম্বর একটি বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হয়। অথচ আমাকে কিছু জানানো হয় নি। আমি আমার এক বন্ধুর কাছে ব্যাপারটা জানতে পারি ২০ নভেম্বর বিকেলে। আমি অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে রবীন্দ্র সদনের পরিচালককে একটি চিঠিতে লিখি :
‘আমাকে বক্তা হিসেবে নির্বাচন করার ব্যাপারে আপনারা আমার সঙ্গে কোন আলোচনা করেন নি। সবচেয়ে মজার কথা, আজ এই ২১ নভেম্বরের বেলা বারোটা পর্যন্ত আমি কোন আমন্ত্রণ পাই নি। এই ধরণের আচরণের অর্থ কি? আমাকে অনাবশ্যকভাবে আপমানিত করার অধিকার কি আপনাদের আছে?’
চিঠির একটা অনুলিপি আমি তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকেও পাঠিয়েছিলাম। সত্য-মিথ্যা জানি না, পরে শুনেছি রবীন্দ্রসদনের পরিচালককে শোকজ করা হয়েছিল। যদি তা হয়ে থাকে, তাহলে বলতে হবে বুদ্ধদেববাবু রাজধর্ম পালন করেছেন।
রাজ্য সম্পাদক প্রমোদ দাশগুপ্ত চিকিৎসার জন্য চিনে গিয়েছিলেন ১৯৮২ সালে। সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ছিলেন তাঁর সঙ্গী। প্রমোদবাবুর মৃত্যুর সঙ্গে বুদ্ধদেবকে জড়িয়ে কিছু প্রশ্ন তুলেছেন সিপিএমের প্রাক্তন বিধায়ক সুমন্ত হীরা। অন্য কারও লেখায় এ রকম অভিযোগ পাওয়া যায় নি। অভিযোগের সত্য-মিথ্যা যাচাই করা আমাদের সাধ্যের বাইরে। তবু অভিযোগটি গুরুতর বলে তা উল্লেখ করা প্রয়োজন। দুর্বার কলম প্রকাশনের ‘স্বাধীনতার ৭৫ বছরে বাংলা’ গ্রন্থের ‘স্বাধীনতার ৭৫ বৎসরে পশ্চিমবাংলার রাজনীতির হালহকিকত’ প্রবন্ধে সুমন্ত হীরা লিখেছেন :
‘১৯৮২ সালে অক্টোবর মাসের শেষ দিকে, সম্ভবত ২৬ অক্টোবর তাঁর (প্রমোদ দাশগুপ্তের) অনিচ্ছা সত্ত্বেও এবং তাঁর দুজন ডাক্তার বিনয় ভট্টাচার্য ও ননী গুহের নিষেধ সত্ত্বেও পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি ও পলিটব্যুরো পার্টি টু পার্টি আলোচনার জন্য তাঁকে চিনে যেতে বাধ্য করেছিল। সেই সঙ্গে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে চিন যাত্রায় সঙ্গী করতে বাধ্য করেছিলেন কেন্দ্রীয় নেতারা।
‘কেন কেন্দ্রীয় কমিটি শ্বাসকষ্টের রোগী প্রমোদ দাশগুপ্তকে তীব্র শীতের সময় চিনে পাঠাবার সিদ্ধান্ত করলেন, আর কেনই বা বুদ্ধদেবকে সঙ্গে নিতে বাধ্য করলেন, সে রহস্য অবশ্য কোন দিন জানা যাবে না।’
বুদ্ধদেবকে প্রমোদ দাশগুপ্তর ভাবশিষ্য বলা হয়। কিন্তু জ্যোতি বসুর সঙ্গে কেমন ছিল তাঁর সম্পর্ক? হৃদ্যতা যাকে বলে, তা ছিল না নিশ্চয়ই। তার কারণ, জ্যোতিবাবু নিজেই। তিনি ছিলেন তটস্থ মানুষ। আবেগহীন, বাস্তববাদী। তত্ত্বকপচানো মানুষ আদৌ নন। প্রমোদবাবুকে অনায়াসে ‘প্রমোদদা’ বলে ডাকা যায়, কিন্তু জ্যোতিবাবুকে কেউ কি কখনও ‘জ্যোতিদা’ বলে ডেকেছেন? সুতরাং জ্যোতি বসুর সঙ্গে বুদ্ধদেববাবুর একটা মানসিক দূরত্ব ছিল। ১৯৯৩ সালে জ্যোতি বসুর মন্ত্রীসভা থেকে বুদ্ধদেব যখন পদত্যাগ করলেন, তখন পরোক্ষ কারণ হিসেবে সেই মানসিক দূরত্বের কথা বলা যায়। কিন্তু পদত্যাগের প্রত্যক্ষ কারণ কি ?
১৯৯৩ সালের ৭ জানুয়ারি রাইটার্স বিল্ডিংসে জ্যোতি বসুর ঘরের সামনে ধরণায় বসেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি তখন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। তিনি এক ধর্ষিতার বিচার চান। রাতে পুলিশ তাঁকে বলপ্রয়োগ করে তুলে নিয়ে যায়। এই ঘটনায় অদূরে থাকা প্রেস কর্নারের কয়েকজন সাংবাদিকের ভূমিকা ভালো ছিল না বলে প্রেস কর্নারকে সরিয়ে দেওয়া হয়। প্রেস কর্নার ভাঙার নিন্দা করেন সাংবাদিকরা। বিষয়টা প্রেস কাউন্সিল পর্যন্ত গড়ায় এবং তাঁরা রাজ্য সরকারের রিপোর্ট তলব করেন। তখন তথ্য ও সংস্কৃতি সচিব ছিলেন অরুণ ভট্টাচার্য। তিনি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী বুদ্ধদেবকে না জানিয়ে প্রেস কাউন্সিলের চিঠির জবাব পাঠিয়ে দেন। এতে ক্ষুব্ধ হন বুদ্ধদেব। আবার ক্ষুব্ধ বুদ্ধদেবের ব্যবহারে ক্ষুব্ধ হন অরুণবাবু। তিনি মুখ্য সচিব নারায়ণ কৃষ্ণমূর্তির গোচরে আনেন। মুখ্য সচিব জানান মুখ্যমন্ত্রীকে। এই বিষয় নিয়ে কিছুটা বিরক্তির সঙ্গে জ্যোতি বসু না কি বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে বলেছিলেন, ‘তোমাদের নিয়ে সমস্যা কি জানো ? এখনও তোমাদের মধ্যে প্রমোদ দাশগুপ্ত ভর করে আছেন।’
এটাই বুদ্ধদেবের মন্ত্রীসভা থেকে পদত্যাগের প্রেক্ষাপট। প্রমোদবাবুর মতো আমলানির্ভরতা সহ্য করতে পারতেন না বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। এর পর রবীন্দ্র্র সদনে মঞ্চস্থ হয় বুদ্ধদেবের নাটক ‘দুঃসময়’। ১৯৯৩ সালের ১৫ আগস্ট। বেশ কয়েকজন বুদ্ধজীবী বুদ্ধিজীবী বুদ্ধদেবকে তাতিয়েছিলেন। সে বছর নভেম্বর বিপ্লব বার্যিকীতে ধর্মতলায় লেনিনের মূর্তিতে মালা দেবার পরে বুদ্ধদেব বলেছিলেন, ‘এই বার মিশে যাব জনতার মাঝে’। অনেকটা বিপ্লবী কবিতার মতো শোনালেও আসলে অবাস্তব। কারণ, জনতার সঙ্গে মিশে যাবার ক্ষমতা তাঁর ছিল না। তাঁকে তাত্ত্বিক নেতা বলা যায়, মার্কসবাদী শিল্প-সাহিত্য বোদ্ধা বলা যায়, কিন্তু জননেতা বলা যাবে না।
বুদ্ধদেব আবার মন্ত্রীসভায় ফিরে এসেছিলেন। কেন এসেছিলেন, তার ব্যাখ্যা তিনি দেন নি। জ্যোতি বসুর সঙ্গে মনের মিল না থাকলেও তাঁর প্রধানমন্ত্রীত্বের প্রশ্নে বাস্তবতাকে স্বীকার করে নিয়েছিলেন। ১৯৯৬ সাল। লালুপ্রসাদ যাদব, মুলায়ম সিং যাদব, ভি পি সিং, করুণানিধি একমত হয়ে বলেছিলেন জ্যোতি বসুই প্রধানমন্ত্রী হবেন। সি পি আই ও সে প্রস্তাব সমর্থন করেন। সিপিএম দলের সাধারণ সম্পাদক হরকিষেণ সিং সুরজিৎও তাই চান। কিন্তু বাধ সাধল কেন্দ্রীয় কমিটি। বাধ সাধলেন প্রকাশ কারাত, সীতারাম ইয়েচুরি, অচ্যুতানন্দনের মতো নেতারা। পশ্চিমবঙ্গের যে গুটিকয় নেতা এই প্রস্তাবের পক্ষে ছিলেন তাঁরা হলেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, গৌতম দেব, শ্যামল চক্রবর্তী। ২০০০ সালে জ্যোতি বসুকে সরিয়ে বুদ্ধদেবকে মুখ্যমন্ত্র্রীর পদে বাসানোর মধ্যে অনেকে ষড়যন্ত্রের গন্ধ পান। আমি এর মধ্যে অসঙ্গতি দেখতে পাই না। প্রবীণকে নবীনের জন্য জায়গা ছেড়ে দিতে হয়, সেটাই ইতিহাসের নিয়ম।
বুদ্ধিজীবী ও লেখকদের অভাব সিপিএমকে পূর্ণ করতে হয়েছিল অনেক মেহেনত করে। প্রমোদ দাশগুপ্ত বা জ্যোতি বসু ‘কালচার ফালচার’ নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামান নি। তথ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব সেদিকে দৃষ্টি দিলেন। প্রথম দিকে তিনি অবশ্য একটু গোঁড়া ছিলেন। লেখক-বুদ্ধিজীবীরা তাঁকে কট্টরপন্থী মনে করতেন। তিনিও বাজারি লেখকদের ভাড়াটে লেখক বলে আঘাত করতেন। প্রসঙ্গত তাঁর ‘সংস্কৃতির প্রভুরা, আপনারা কোনদিকে’ প্রবন্ধটির কথা উল্লেখ করা যায়। কালের আবর্তনে বুদ্ধদেব গোঁড়ামি ত্যাগ করেন। রাজনৈতিক কারণে দলও তাঁকে ছাড়পত্র দেয়। তিনি যোগাযোগ শুরু করেন অন্নদাশঙ্কর রায়, সত্যজিৎ রায়, শঙ্খ ঘোষ, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, সুচিত্রা মিত্র, হীরেন মুখার্জী, উৎপল দত্ত, অমর্ত্য সেন, মহাশ্বেতা দেবীদের সঙ্গে। গড়ে তোলা হয় গণতান্ত্রিক লেখক, শিল্পী ও কলাকুশলী সম্মিলনী।

লেখক-বুদ্ধিজীবীদের সম্বন্ধে সিপিএমের দৃষ্টি ভঙ্গি পরিবর্তনের দুটি কারণ। প্রথমত, একটি প্রভাবশালী পত্রিকাগোষ্ঠী বামেদের বিরুদ্ধে বুদ্ধিজীবীদের জড়ো করছিলেন। অতীতে বামপন্থী ছিলেন, বর্তমানে বীতশ্রদ্ধ, এমন বুদ্ধিজীবী সেখানে জড়ো হন। এই প্রচেষ্টা প্রতিহত করা প্রয়োজন। কারণ সাধারণ মানুষের উপর এঁদের প্রভাব আছে। দ্বিতীয়ত, যত দিন যাচ্ছিল, সিপিএমের ভাবমূর্তি ফ্যাকাশে হচ্ছিল। সিপিএমের বিরুদ্ধে একটা লাগাতার প্রচার ছিল : এরা জাতীয় ঐতিহ্যের বিরোধী, শিল্পরসবোধহীন। এই প্রচার ভোটব্যাঙ্কের পক্ষে ক্ষতিকর।
দলের মনে হয়েছিল লেখক-বুদ্ধিজীবীদের টেনে আনার ব্যাপারে বুদ্ধদেবই উপযুক্ত ব্যক্তি। তাঁর নান্দনিক ধারণা আছে, রবীন্দ্রনাথ-জীবনানন্দ-ক্যমু-কাফকায় অনুরাগ আছে। বুদ্ধদেবের নেতৃত্বে নানা মেলার সূত্রপাত হল। কলকাতা বইমেলা প্রথম। বুদ্ধদেব প্রায় রোজ যেতেন মেলায়। মেলার কিছু কর্তাব্যক্তি আঠার মতো তাঁর সঙ্গে লেগে থাকতেন। বুদ্ধজীবী হবার চেষ্টা করতেন। বুদ্ধদেবের ক্ষমতা যাবার পর এঁরা নতুন মুখ্যমন্ত্রীর পেছনে ঘুরছেন। শুধু বইমেলা নয়, চলচ্চিত্র উৎসবও একটা নতুন মাত্রা পেল। মাত্রা পেল সংগীত মেলা ও লিটিল ম্যাগাজিন মেলাও। আরও নানা মেলার আয়োজন হতে লাগল। জাতীয় ঐতিহ্যবিরোধী ভাবমূর্তি খণ্ডনের জন্য বিভিন্ন মনীষীর জন্মশতবর্ষ পালনেরও আয়োজন হল। কিছুটা হলেও নাগরিক সমাজ ও মধ্যবিত্তের মন জয় করল সিপিএম। কিন্তু একটা নেতিবাচক দিকও ছিল এসবের। বুদ্ধদেবকে ঘিরে গড়ে উঠল একটা বলয়। রাজনৈতিক অনুরাগীর বলয় নয়। বুদ্ধিজীবীদের বলয়। কিংবা বুদ্ধজীবীর বলয়। এঁরা বুদ্ধদেবকে কতটা বিপথে পরিচালিত করেছেন, তার হিসেব বিশেষজ্ঞরা করবেন।
বুদ্ধদেব অবশ্যই আদর্শবাদী ছিলেন, কিছুটা আত্মমগ্ন ও বাস্তববিমুখ ছিলেন, স্বপ্ন দেখতেন তিনি, কিন্তু স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করার কৌশল জানতেন না। বাস্তববাদী রাজনৈতিক নেতার মতো কূটকৌশলী তিনি হতে পারেন নি। নিরুচ্চার অভিমানে দগ্ধ হয়েছেন, নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন, লজ্জা-ঘৃণা-ভয়কে দূরে সরিয়ে মুখোশধারী নেতা হবার সাধ ও সাধ্য তাঁর ছিল না।
একটা ব্যক্তিগত প্রসঙ্গের কথা বলে এই প্রবন্ধ শেষ করছি। ২০০৪ সাল। আমার আর সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ‘হাজার বছরের বাংলা সাহিত্য’। বাংলা আকাদেমিতে সে বইএর উদ্বোধন করেন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। অনুষ্ঠানের সঞ্চালিকা ছিলেন আমার মেয়ে কেকা। সেই অনুষ্ঠানে কেকা মুখ্যমন্ত্রীর হাতে একটি আবেদনপত্র ধরিয়ে দেয়। লোকনৃত্যের এক প্রজেক্টে আহবান করেছিলেন কেন্দ্র সরকার। তাতে রাজ্যের সুপারিশ চাই। অনুষ্ঠানের পরের দিন সকাল দশটা নাগাদ মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তর থেকে আমাদের কাছে ফোন আসে। প্রজেক্ট নিয়ে আজই মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে হবে। মেয়েকে নিয়ে আমি গিয়েছিলাম রাইটার্সে। রাজ্যের তরফে সুপারিশ করে প্রজেক্টটি পাঠানো হয় কেন্দ্রে। এটাও বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের রাজধর্ম পালনের দৃষ্টান্ত।
চমৎকার লেখা, সৎ ও তথ্যনিষ্ঠ থেকে বুদ্ধবাবুকে চিত্রিত করা হয়েছে। এই কালখণ্ডের মধ্যে আমাদের রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপ সমান্তরালে ছিল, তাই বলতে পারি দিলীপবাবুর মূল্যায়ন যথাযথ, আবেগ তাড়িত নয়, অতি কথন নেই। আমারো বুদ্ধবাবু যখন মুখ্যমন্ত্রী তখন অন্তত দুবার তাঁকে জানবার এবং বোঝবার সুযোগ হয়েছে। ভদ্র রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তবে ঠিকই জননেতা ছিলেন না। দল তাঁকে ডুবিয়েছে বলে আমার ধারণা।