| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

সমরেশ বসু : জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়

Reporter
জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায় / ৩২২৬ জন পড়েছেন
আপডেট শনিবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০২১

‘বেশ রাতের দিকে আমরা কয়েকজন তাঁকে শিয়ালদহ স্টেশনে পৌঁছে দিয়ে আসতে গেছি, তখন লাস্ট ট্রেন সদ্য ছেড়ে দিয়েছে। সমরেশ বসু একটা ছুট লাগালেন, প্ল্যাটফর্ম দিয়ে। তারপর ট্রেনটার সমান্তরাল ভাবে ছুটতে ছুটতে লাফিয়ে একটা কামরায় উঠে পড়ার আগে একবার আমাদের দিকে মুখ ফিরিয়ে চেঁচিয়ে বললেন, কাল দেখা হবে’।—সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আনন্দবাজার পত্রিকায় ১৩ মার্চ ১৯৮৮ সমরেশ বসু প্রসঙ্গে লিখতে গিয়ে এভাবেই শুরু করলেন,—আর সমরেশ নিজের প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে লিখলেন, ‘উত্তরঙ্গ বেরোবার পর একটা চিঠি পেয়েছিলাম তাতে লেখা ছিল আপনি প্রতিশ্রুতবান….গঙ্গায় আপনার যাত্রা….আপনাকে সাগরসঙ্গমে দেখতে চাই। সাগরসঙ্গম বহুদূর প্রতিপদেই অজস্র চর আর বালিতে ঠেকে আছি, ভ্রান্তি আর বিপথের অনেক তাড়না, তবু টেনে যাই,—যেতে চাই’।

জন্ম ১১ ডিসেম্বর ১৯২৪ সাল। ঢাকা জেলার মুন্সিগঞ্জ মহকুমার অন্তর্গত রাজনগর গ্রামে পৈতৃক বাস্তুভিটায়। জন্মের সময় বাবার এক মাসিমা সদ্যোজাত সমরেশকে দেখতে এসে বলেছিলেন, ‘এযে তড়বড় কইরা আইয়া পড়ল’। এতেই ডাক নাম দাঁড়ালো ‘তড়বড়ি’। পরে উচ্চারণ পরিবর্তে তরবরি। বাবার দেওয়া নাম ‘সুরথনাথ’। বাবার নাম মোহিনীমোহন বসু। মায়ের নাম শৈবলিনী বসু।

ঢাকা শহরের পশ্চিম উপকণ্ঠে দোলাইয়েশ্বরী খাল। খালের ধারের এলাকার নাম এক্রামপুর। বড়ো রাস্তার নাম সূত্রাপুর রোড। এর পাশাপাশি জিযাশের গলি। জিযাশের গলির বাসিন্দা মোহিনীমোহন। কাজ করেন রূপলাল দাস এস্টেটে রেকর্ড কিপার হিসেবে। বাবা ছবি আঁকতে ভালোবাসতেন। কাগজের মণ্ড দিয়ে মূর্তি তৈরি করতেন। বাড়ির পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে সমরেশের আদলটা একটু আলাদা। বই পড়ায় তাঁর মন নেই, বাঁধাধরা শিক্ষার বাইরের জীবনযাপনই তাঁকে বেশি টানে। ছুটে যান সেদিকে। তবু তাঁকে পাঠানো হলো গিরিশ মাস্টারের পাঠশালায়। পরে গ্রাণ্ডারিয়া (গ্যাণ্ডারিয়া) গ্রাজুয়েট স্কুলে পড়লেন সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত। পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ায় বাবা তাঁকে পাঠালেন নৈহাটিতে দাদা মন্মথর কাছে। মন্মথ তখন কর্মসূত্রে নৈহাটির রেল কোয়ার্টার্সে থাকতেন।

শুরু হলো নতুন জীবন। ১৯৩৯ সমরেশ নৈহাটিতে এলেন। দাদা মন্মথনাথ নৈহাটির মহেন্দ্র স্কুলে ভর্তি করলেন অষ্টম শ্রেণিতে সেটা ৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৯। অষ্টম শ্রেণিতে ফেল। ভায়ের কোনও ভ্রূক্ষেপ নেই। তিনি মেতে থাকলেন স্থানীয় বন্ধুদের লেখা, ছবি আঁকা এবং শরীরচর্চা নিয়ে। ব্যতিব্যস্ত মন্মথনাথ ফেরত পাঠালেন সমরেশকে ঢাকায়। ঢাকায় ঢাকেশ্বরী মিলে কিছুদিন অ্যাপ্রেন্টিস হিসেবে কাজ করলেন। পাশাপাশি অভিনয় নিয়ে মেতে উঠলেন। ঢাকায় ‘দেবলাদেবী’ নাটকে ‘মতিয়া’ চরিত্রে অভিনয় করলেন, গান গাইলেন। মন টিকলো না। আবার চলে এলেন নৈহাটিতে। সাহিত্যচর্চা, নাটক, অভিনয় এই ছিল তখন তাঁর কাজ। নৈহাটিতে ‘সিরাজউদ্দৌলা’ নাটকে অভিনয় করেন। গান শিখতে আসেন ‘নাট্যনিকেতন’, পরে নাম বদল হয়ে বিশ্বরূপা থিয়েটার। আর রোজগারের জন্য চটকলের কোয়ার্টার্সে কোয়ার্টার্সে মেম মহিলাদের প্রতিকৃতি আঁকেন।

দেবশংকর মুখোপাধ্যায় ছিলেন তখন ওঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। এক জায়গায় তিনি লিখেছেন—“বোধ হয় আমার সঙ্গে পরিচয়ের বছর খানেক পর একদিন আমি তখনকার সুসাহিত্যিক সৌরেন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায় মহাশয়ের একটা উপন্যাস পড়ছিলাম, তার নায়কের নাম সমরেশ। সেই মুহূর্তে ওই নামটা আমার কাছে খুব রোমান্টিক মনে হল। আমি ওকে বলি—তোকে আজ থেকে আর ওই সুরথ নামে ডাকব না, আজ থেকে তুই ‘সমরেশ’ এবং ওরও নিশ্চই ভাল লেগেছিল। বার কতক ওর সেই খয়েরি-কাম-ব্লু খাতায় সমরেশ নামটা লিখে ও বলল, ‘আচ্ছা তাই থাক’।” অতএব সুরথনাথ হলেন সমরেশ।’ যাওয়া-আসা বাড়ল দেবশঙ্করের বাড়ি। দেবশঙ্কররা হলো ছয় ভাই চার বোন। বড়ো বোন গৌরী। ডাক নাম বুড়ি। ১৩ বছর বয়সে বিয়ে হয়ে আবার ফিরে আসেন বাপের বাড়িতে। শ্বশুরবাড়ির পরিবেশ তাঁর পছন্দ হয়নি। গৌরী গান গাইতে পারতেন। রীতিমতো ভালো গাইয়েও ছিলেন। সমরেশের সঙ্গে ওঁর সম্পর্ক গড়ে উঠল।

সমরেশের তখন যাযাবরের জীবন। দাদার সঙ্গে ঠিক সেই সময় বনিবনা হচ্ছে না। কিন্তু সাহিত্যচর্চা থেকে নিজেকে কিছুতেই সরিয়ে রাখলেন না। হাতে লেখা পত্রিকা ‘বীণা’ ছিল তখন তাঁর লেখার একমাত্র জায়গা। এই সময় সমরেশ কিছুদিন জন্ডিস এবং ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হন। বন্ধু দেবশঙ্করের দিদি দেখতে আসতেন তাঁকে। সম্পর্ক গভীর থেকে গভীরতর হলো। গৌরী নিজের অলংকার বন্ধক রেখে অসুস্থ সমরেশকে পাঠালেন গাজিপুরে হাওয়া বদল করতে। ফিরে এসে দুজনে বিয়ে করলেন। ১৮ বছরের যুবক ২১ বছরের যুবতীকে বিয়ে করলেন। অসমবয়সি। পালিয়ে গিয়ে এই বিবাহ দুই পরিবারের কেউই মেনে নিলেন না। ফলে নৈহাটি থেকে চার মাইল দূরে আতপুরের পুলিশ ফাঁড়ির পেছনে চটকলের আবদুল মিস্ত্রির বাড়িতে ২ টাকা ভাড়ায় ঘর ভাড়া নিলেন।

শুরু হলো জীবনযুদ্ধ। এক পোলট্রি ফার্মের সঙ্গে কমিশনের শর্তে ডিম, মুরগি, সবজি বিক্রি করে কোনওরকমে টিকে থাকার চেষ্টায় প্রাণপাত পরিশ্রম করতে লাগলেন। সপ্তাহে তিন-চার দিন খাওয়া জোটে, বাকি দিন অভুক্ত অবস্থায় কাটে। ১৯৪২ সালে নভেম্বরের এক সকাল বেলায় কমিউনিস্ট নেতা সত্যপ্রসন্ন দাশগুপ্তের সঙ্গে পরিচয় হয়। চটকল এলাকায় উনি সত্যমাস্টার নামে পরিচিত ছিলেন। সমরেশ পার্টিতে যোগ দিলেন। পার্টিতে যোগ দেওয়া সম্পর্কে তিনি পরবর্তী সময়ে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন—

‘ফ্যাসিজম সম্পর্কে আমি অবগত হয়েছিলাম কম বয়সে কিছু পত্র পত্রিকা পড়ে। এছাড়া আমার নিরন্ন দরিদ্র জীবনই আমাকে রাজনীতির দিকে প্রধানত আকর্ষণ করে। প্রকৃতপক্ষে, আমার রাজনীতির দীক্ষা আমার কৈশোর কালে ঢাকা শহরে। আমাদের ঢাকার বাড়ি ছিল তিরিশের দশকের সশস্ত্র টেরোরিস্ট আন্দোলনকারীদের এক আস্তানা। স্বভাবতঃই সেই সময় থেকেই রাজনৈতিক জীবনের মধ্যে জড়িয়ে পড়া’। (সাক্ষাৎকার-অশোকরঞ্জন সেনগুপ্ত)।

২       

পার্টিতে যোগ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হারালেন ডিম সাপ্লাইয়ের কাজ। পার্টির পোস্টার লেখা শুরু করলেন। বিনিময়ে পেলেন চাল, আটা। দারিদ্র চরম পর্যায়ে কিন্তু সাহিত্যচর্চা ছাড়লেন না। লেখা তখনও চলছে। ১৯৪৩ সালে জানুয়ারি মাসে ইচ্ছাপুর রাইফেল ফ্যাক্টরির ইনস্পেক্টরেট অব স্মল আর্মস-এর ড্রয়িং অফিসে এক টাকা চার আনা রোজে ট্রেসারারের চাকরি পেলেন। ১৯৪৩ থেকে ১৯৪৯ পর্যন্ত ছ-বছর এখানেই কাজ করেন। প্রথমে মার্কার, মার্কার থেকে ট্রেসার, ট্রেসার থেকে ড্রাফ্‌টসম্যান। পাশাপাশি ব্যারাকপুরে জুট ফ্রন্টে পার্টির ট্রেড ইউনিয়নের কাজ করতেন। সমরেশ আর গৌরী পার্টি সদস্যপদ লাভ করলেন। সংগঠনের কাজের ফাঁকে ‘উদয়ন’ পত্রিকায় আঁকা ও লেখা। উদয়ন লাইব্রেরিতে পড়াশুনা। এই সময় সমরেশের জীবনে অনেকগুলি ঘটনা ঘটে যায়। প্রথমে সাংসারিক দিকের কথা বলা যেতে পারে। প্রথম সন্তান বড়ো মেয়ে বুলবুলের জন্ম ১৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৩ সাল। দ্বিতীয় সন্তান বড়ো ছেলে দেবকুমারের জন্ম ৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৫ সাল। তৃতীয় সন্তান মেজো ছেলে নবকুমারের জন্ম ডিসেম্বর ১৯৪৬ সাল। চতুর্থ সন্তান ছোটো মেয়ে মৌসুমির জন্ম ডিসেম্বর ১৯৪৮ সাল। সাহিত্যের ক্ষেত্রে প্রথম ছোটোগল্প ‘শের সর্দার’ প্রকাশিত হয়েছে ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকায়। এ ছাড়া উদয়ন পত্রিকা তো আছেই, সবচেয়ে বড়ো ঘটনা ১৯৪৬ সালে শারদীয় ‘পরিচয়’ পত্রিকায় ‘আদাব’ গল্পের প্রকাশ সময়। উদয়ন পত্রিকার জন্য আদাব গল্প উনি লিখেছিলেন। কিন্তু বন্ধু গৌর জোর করে ‘পরিচয়’ পত্রিকাতে গল্প পাঠিয়ে দেন। বাংলা সাহিত্যে সেই অর্থে সমরেশের প্রবেশ এই গল্পের মধ্য দিয়েই।

১৯৪৯ সালে কমিউনিস্ট পার্টি বেআইনি ঘোষিত হলো। আবার দারিদ্রের মধ্যে পড়তে হলো সমরেশ এবং সমরেশের পরিবারকে। সমরেশের বাসা হয়ে উঠল পার্টি ‘ডেন’। সমরেশ গ্রেফতার হন ১৪ ডিসেম্বর ১৯৪৯ সাল। লর্ড সিন্‌হা রোডে স্পেশাল ব্রাঞ্চ সেলে তাঁকে সাত দিন আটকে রেখে জেরা করা হয়। দৈনিক ‘ইনটারোগেশন’ ও অত্যন্ত ‘হিউমিলিয়েটিং’ অবস্থায় স্নান ও প্রাতঃকৃত্য—শারীরিক ও মানসিক নিপীড়নের একটা স্থায়ী দাগ কেটে দেয়। এসবি সেল থেকে সমরেশকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় প্রেসিডেন্সি জেলে। সেখানে ছিলেন এক বছর। তখন সমরেশের চার সন্তান—দুই ছেলে, দুই মেয়ে। সমরেশ বন্দি থাকায় সংসার অচল। বিপর্যস্ত গৌরী দেবী মুখ্যমন্ত্রী ডাক্তার বিধান রায়ের শরণাপন্ন হয়েছিলেন, তিনি বন্দি সমরেশের পরিবারের জন্য দেড়শো টাকা মাসোহারার বন্দোবস্ত করে দিয়েছিলেন।

পার্টির দলাদলির শিকার হয়েছিলেন প্রেসিডেন্সি জেলে বন্দি সমরেশ। ইছাপুর অর্ডিন্যান্স ফ্যাক্টরিতে সমরেশ ঢুকেছিলেন এক টাকা চার আনা রোজে, সেটা উঠেছিল সাড়ে তিনশো টাকা মাসমাইনেতে। এক বছর বাদে যখন ছাড়া পেলেন তখন কর্তৃপক্ষ বললেন ‘বন্ড’ দিতে, তাতে সমরেশ রাজি না হওয়ায় চাকরিটা গেল। ওদিকে ছাড়া পাওয়ায় গেল মাসোহারা। ১৯৫০-এর শেষে বা ১৯৫১-র শুরুতে জেল থেকে ছাড়া পেয়ে সমরেশ যখন বাইরে এলেন তখন তিনি বেকার। দারিদ্র প্রতিটি প্রহরে তাঁকে আঘাত করছে। কারামুক্ত সমরেশ ঠিক করলেন—‘লিখব। লিখেই বাঁচব’।

৩       

নিজের লেখার সম্বন্ধে তাঁর বক্তব্য,—‘বেশির ভাগই অভিজ্ঞতা প্রসূত লেখা। তবে একেবারে কোথাও কল্পনা নেই তা তো নয়, কল্পনাও কাজ করেছে। নইলে উপন্যাস হতে পারে বলে আমার মনে হয় না। আমার ধারণা এই আর কি যে, যে-কোনও শিল্প, তাতে বোধ হয় একটু খাদ মেশানো দরকার হয়। নইলে, কিছু করা যায় না। খাদটা সেজন্যই মেশানো। খাদ এই কারণেই মেশানো হয়, যে জিনিসটা বানিয়ে তোলার জন্য। সোনা দিয়ে কিছু তৈরি করতে গেলে….সুতরাং খাদটাকে আমি ধরছি অতি আবশ্যিক জিনিস। শিল্পের ক্ষেত্রে….পদ্য, উপন্যাস বা গল্পের ক্ষেত্রে ওটা হচ্ছে কল্পনা।….একটা কিছু গড়বার জন্য’—

‘বাল্যকালে দারুণ ইচ্ছে ছিল Artist হবার। ছাত্রজীবনে তাই কয়েকজন বন্ধু মিলে কয়েকটা হাতে লেখা Magazine-এ আমরা গল্প, বিভিন্ন ধরনের হাতে আঁকা ছবি ছাপাতাম। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় অলঙ্করণের ভারও আমার উপর পড়েছিল। তারপর কৈশোর থেকে যৌবন এই সময় সাহিত্যের দিকে ভীষণ ঝোঁক এল। আর বিভিন্ন গল্প প্রবন্ধ লিখতে আরম্ভ করলাম। চাকরি জীবন শুরু হলো ১৯৪৩ সাল থেকে ১৯৪৯ সাল দীর্ঘ সাত বছর। এর মধ্যে লেখা কিন্তু এক মুহূর্তের জন্যও থামেনি। তবে এই সময়টা প্রচুর অভিজ্ঞতা লাভ করেছি। সত্যি ভাবতেও পারিনি কোনদিন পেশাদার সাহিত্যিক হতে পারব। আমার নিঃসঙ্গ জীবনের আশ্রয় আমি এখানেই খুঁজে পেয়েছি। এখানেই আমি পারি নিজেকে প্রকাশ করতে’।—

আর এক জায়গায় তিনি বলেছেন—

‘১৯৪৯ সালে কমিউনিস্ট আন্দোলনের ব্যাপারে প্রেসিডেন্সি জেলে দীর্ঘ কারাবাস উল্লেখযোগ্য ঘটনা। এখানেই আমি সমাজের রূপটা চিনতে শিখলাম, বুঝতে পারলাম। জেলে আমি আমার লেখার যথেষ্ট অনুপ্রেরণা পেয়েছি। প্রকৃতপক্ষে এই ঘটনাই আমার লেখার ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল’।

সমরেশের প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস ‘উত্তরঙ্গ’। উপন্যাসের উপাদান লেখক সংগ্রহ করেছিলেন ইছাপুর রাইফেল ফ্যাক্টরির ইনস্পেক্টরেট অব স্মল আর্মস-এ চাকুরিকালে (১৯৪৩-১৯৪৯)। তা রূপ পেয়েছিল প্রেসিডেন্সি জেলে বন্দি থাকা কালে। উপন্যাস লিখতে তিনি যাঁর কাছ থেকে বেশি সাহায্য পেয়েছিছেন তিনি হলেন ৯০ বছর বয়স্ক নবকুমার দাস। তিনি গত শতকের ষষ্ঠ দশক থেকে একটার পর একটা চটকল তৈরি হতে দেখেছিলেন। মাত্র ১৫ বছর বয়সে তিনি চটকলের মিস্ত্রি হিসেবে জীবন শুরু করেছিলেন, আজীবন মিস্ত্রি ছিলেন।

‘নয়নপুরের মাটি’ তাঁর প্রথম লেখা উপন্যাস। সমরেশ নিজে উপন্যাসটির ভূমিকায় বলেছেন—

‘‘নয়নপুরের মাটিতে একটা লাইন আছে ‘আহা! বাঁধা বীণার তারে বেসুর কি গভীর!’ সেই সুর বাঁধারই প্রথম উন্মাদনা নয়নপুরের মাটি। আমার প্রথম লেখা উপন্যাস।

আমার লেখা ‘উত্তরঙ্গ’-এর বহু পূর্বে (১৯৪৬ সালে) এ বই আমি লিখেছি। অর্থাৎ সাহিত্য আসরের দরজার চৌকাটটা তখন আমি দূর থেকে উঁকি মেরে দেখেছিলাম। এখন দরজার কাছে (বোধ হয় চৌকাটটা পেরিয়ে?) এসেছি। ইচ্ছেটা আস্তে আস্তে আসরের মাঝখানে গিয়ে বসি।

সুর বাঁধতে গিয়ে হয়তো পেরিয়ে গিয়েছে কোথাও তালের চৌহদ্দি, দিক-পাশ না ভেবে সে আপনার মনে এগিয়ে গেছে। একে যদি বেসুর বলা যায়, তবে বলি, জীবনের সুর-তালভঙ্গের বেদনাই না বার বার মানুষকে নতুন করে সুর বাঁধতে শিখিয়েছে।

প্রায় বছর খানিক ধরে উপন্যাসটির অংশ ‘পরিচয়’ মাসিক পত্রিকায় ধারাবাহিক ভাবে ছাপা হয়েছিল। নানান কারণে তা মাঝ পথেই থেমে যায়, অনেক দিন পরে আবার বই আকারে প্রকাশিত হচ্ছে। এতে যদি কেউ ক্ষুণ্ণ হন তো, সে দোষ আমারই। সাধারণ নিয়মে আর কাহিনীর চুম্বকটা হাজির করলাম না, ওটা পাঠকের হাতেই থাক।

নতুন বলে ভূমিকা লেখার লোভ যতই থাক ‘নয়নপুরের মাটি’র গুণ ও স্বাদ যদি ভাল না হয়। তবে জানি সে বন্ধ্যাই থাকবে। সে বেদনাও আমার (১৪ই শ্রাবণ ১৩৫৯)’’।

বন্ধু দেবশঙ্কর মুখোপাধ্যায় লিখেছেন, তারও আগের কথা যখন সুরথনাথ হয়েছেন সবে সমরেশ—‘মনে পড়েছে ও একটা নীলচে রঙের ডায়েরির মতো বাঁধানো খাতায় আর একটা নভেল লিখেছিল, নাম দিয়েছিল ‘অশ্রুমুখী অন্তরাগ্নি’। তাও কালের গর্ভে কোথায় চলে গেছে’। সমরেশ নিজেও তাঁর লেখার সম্বন্ধে এ কথা স্বীকার করেছেন—‘বন্ধু জয়নাল’ গল্প লেখার সময়, আমার এ গল্পটা হবে অতীতের পুনরাবৃত্তি। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পরে একটা গল্প লিখেছিলাম ‘তরণি’ পত্রিকায়। কয়েকটা গল্পই লিখেছিলাম। তার মধ্যে ‘সাতকড়ি মাসী’ আর ‘জয়নাল’ গল্পটা আর খুঁজে পাইনি। ‘সাতকড়ি মাসী’কে ভুলে থাকতে পারলেও ‘জয়নাল’কে ভুলতে পারিনি। (UTTOR PROBASHI BOX 2061 S 44502 SURTE 2 SWEDEN)।

জেল থেকে বেরিয়ে আসার পর সমরেশের সাংসারিক অবস্থা মোটেই ভালো ছিল না। বিধান রায় বন্দি থাকাকালীন যে ১৫০ টাকা দিতেন তা বন্ধ হলো। পার্টির পক্ষ থেকেও কোন সুবিধাজনক ফল পাওয়া গেল না। এর মধ্যেই ‘উত্তরঙ্গ’ উপন্যাস প্রকাশ পেলো। ‘উত্তরঙ্গ’ বইটির দাম ছিল তিন টাকা আট আনা। প্রথম উপন্যাস প্রকাশের দিন দফতরির বাড়ি থেকে ১৫ খানা বই নিয়ে নৈহাটিতে এলেন, নৈহাটির ‘বসন্ত কেবিনে’ বসে বন্ধুদের কাছে বিক্রি করলেন সেই সব বই, পেলেন ৫২ টাকা। শোধ করলেন এক বছরের বাড়িভাড়া। দ্বিতীয় উপন্যাস ‘বিটি রোডের ধারে’, তারপর ‘শ্রীমতী কাফে’। প্রথম গল্প সংকলন ‘মরশুমের একদিন’। ‘দেশ’ পত্রিকায় প্রথম গল্প ‘গুণিন’।

গুণিন গল্প প্রসঙ্গে সাগরময় ঘোষ বলেন—“সমরেশের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় আনন্দবাজার পত্রিকার পুরনো অফিস বর্মণ স্ট্রীটে। আনন্দবাজারে প্রয়াত সাংবাদিক সরোজ আচার্য ওকে আমার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেন। বললেন, ছেলেটির লেখার হাত আছে। আপনি একটু দেখুন, যদি ওর লেখা ইমপ্রুভ করতে পারেন। সরোজবাবু চলে গেলে আমি সমরেশকে জিজ্ঞেস করলাম, কোন লেখা এনেছ? ও পকেট থেকে একটা গল্প আমাকে দিল। দিয়েই চলে গেল। ছিপছিপে লাজুক প্রকৃতির। নৈহাটি থেকে কলকাতায় এসেছে। বয়স খুবই কম কুড়ি বাইশ হবে। কিন্তু চেহারায় কঠোর সংগ্রামী জীবনের ছাপ। চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গল্পটা পড়ে ফেললাম। এত ভালো লাগল যে সাত দিনের মধ্যেই সমরেশের সেই গল্প ‘গুণিন’ দেশ পত্রিকায় ছাপা হয়।”

গল্পটি দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার পর পার্টির বিরাগভাজন হন। পার্টির সঙ্গে ক্রমশ সমরেশের দূরত্ব বাড়তে থাকে। অবশেষে তা তলানিতে এসে ঠেকে। ‘গঙ্গা’ উপন্যাস সমরেশকে সাহিত্য ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত করে। ‘গঙ্গা’ সম্বন্ধে সাগরময় ঘোষকে এক পত্রে সমরেশ লিখেছিলেন—‘গঙ্গা উপন্যাসের ব্যাপারে, আমি যে detail দেবার চেষ্টা করেছি, সেটা অনেকের পছন্দ হয়নি, তার কারণ আর কিছুই নয়, আমি শৌখিন মজদুরির দুর্নামটা কাটাবার চেষ্টা করেছিলাম’। ১৯৫৬-তেই সমরেশের পার্টি সদস্যপদ ড্রপড্ হয়ে যায়।

তাঁর নিজের কথায়—‘অর্থাৎ কমিউনিস্ট রাজনীতি আমাদের দেশে যতই বেশি বাড়ল, তত বেশি আমার প্রত্যাশাও বাড়তে লাগল….যদিও আমি কমিউনিস্ট পার্টির সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে এসেছি….সরে এসেছি এই কারণেই যে আমি দেখলাম সাহিত্যিক জীবন যাপন করতে হলে সর্বক্ষণ সক্রিয় রাজনীতিতে থাকা যায় না। অন্তত আমার তাই মনে হয়েছে। কেন না পার্টির সক্রিয় সদস্যদের কাছে কতকগুলো দাবি থাকে। প্রাথমিক দাবিগুলো তাদের করতেই হবে। তা আমি দেখলাম যে আমি সেটা পারছি না। সুতরাং আমার না পারার মধ্য দিয়ে তাঁরা যখন বুঝলেন যে সমরেশের দ্বারা….পার্টি সদস্য থেকে যা করা উচিত করতে পারছে না তখন তাঁরা আমাকে….আমার মেম্বারশিপ….এই মেম্বারশিপে দু’রকমের ব্যাপার আছে। একরকম আছে পার্টি থেকে এক্সপেল করে দেওয়া, অর্থাৎ হঠানো, বের করে দেওয়া। আর একটা হচ্ছে মেম্বারশিপ….তার নিষ্ক্রিয়তার জন্য ড্রপড্ হয়ে যাওয়া। তা ১৯৫৬ সাল নাগাদ আমার মেম্বারশিপ ড্রপড্ হয়ে যায়’।

১৯৫৮ সালে পান আনন্দ পুরস্কার।

এরপর সমরেশ নিজেকে অনেকটা বদলে ফেলেন। তার প্রতিফলন সাহিত্যে। তিনি মনে করেন জীবন ছাড়া সাহিত্য অচল। তাই—‘বাল্যকাল থেকেই সাহিত্যের দিকে ভীষণ ঝোঁক ছিল। আর সমাজের দুর্নীতি এবং ঘৃণিত রূপটা আমাকে যথেষ্ট প্রভাব ফেলেছিল। তাই সাহিত্যিক জীবনে এটাকেই মূল বিষয়বস্তু করে বই লিখতে উৎসাহী হয়েছিলাম’।

‘রুচি সকলের সমান নয়। তাই আমার বইগুলি কারো মতে শ্লীল আবার কারো মতে অশ্লীল। একজনের রুচির সাথে অন্যের খাপ খায় না। বাংলা সাহিত্য কখনও যাত্রীর নিয়মে এগিয়ে চলতে পারে না, তার বিশেষ বক্তব্য থাকা উচিৎ। সমালোচকদের মতামতে আমার কিছু এসে যায় না। যাঁরা আমার বইকে বলেন অশ্লীল, আমি তাঁদের প্রতিক্রিয়াশীল, বুর্জোয়া বলে চিহ্নিত করব। তাঁরা কেবল মূর্খের মত চিৎকার করে চলেছে, কোনরকমে সমাজের ব্যভিচারকে ধামা চাপা দিয়ে রাখবার জন্য’।

“আসলে ‘বিবর’ নয় তারও আগে থেকে বদলটা শুরু হয়। ‘স্বীকারোক্তি’ গল্পটাই  আমার লেখার টার্নিংস্টোন। তখনই শুরু হলো যে হোয়াই নট স্পিক অর রাইট মাই সেলফ! আমার নিজের জন্য আমি কি করছি? অবশ্য এই প্রশ্নটা আমাকে ধরিয়ে দিয়েছিলেন—এটা আমি বহু জায়গায় বলেছি, ‘দেশ’-এ লিখেছি—অন্নদাশঙ্কর রায়ের স্ত্রী মিসেস লীলা রায়। ৬১-৬২ সালে শান্তিনিকেতনে তিনি আমাকে প্রশ্ন করেন, সমরেশ তুমি কেন লেখ? আমি বললাম আমি লিখি মানে, ধরুন জানবার জন্য লিখি। তিনি বললেন, জানবার জন্য? কি জানবার জন্য লেখ? জবাব দিলাম, ‘মানুষকে জানবার জন্য’। মিসেস রায় বললেন, তোমার মনে হয় না নিজেকে জানবার জন্য কোন কিছু লেখা উচিৎ নয়। কথাটা নতুন কিনা আমি জানি না। কিন্তু আমি অবাক হই এবং কোন জবাব দিতে পারি না। তিনি আরও বললেন, দ্যাখো রবীন্দ্রনাথ একমাত্র কবি যিনি সারাজীবন আলোর কথা লিখেছেন। আলো চাই আলো দাও আরো আলো—মনে কি হয় না তাঁর মধ্যে কোথাও একটা অন্ধকারের যন্ত্রণা ছিল এবং তিনি সেজন্যই নিজের জন্য লিখেছেন—যে লেখা আমাদের সকলের হয়ে উঠেছে। কথাটা আমাকে খুব ভাবায়! আমি বস্তির কথা লিখেছি, জেলেদের কথা লিখেছি, বস্তিতে ছিলাম, জেলেদের সঙ্গে থেকেছি। কিন্তু আসলে তো আমি মধ্যবিত্ত। আমার ভেতরে যে বসে আছে সে কূপের ব্যাঙের মত এক মধ্যবিত্ত মন। সে জেলেও না, বস্তিবাসীও না, সে এসেছে মধ্যবিত্ত ঘর থেকে তার দৃষ্টি মধ্যবিত্ত ছাঁচে, সংস্কারে গড়া। এই মধ্যবিত্তের কথা তো আমি বলতে পারিনি ঠিক মতন। ‘শ্রীমতী কাফে’-তে একটু টাচ করেছিলাম অন্যভাবে। ফর দ্য ফার্স্ট টাইম আমার মনে হলো, আমার নিজের কথা লেখা দরকার। সেটা লিখতে গিয়ে ‘স্বীকারোক্তি’ ছোটগল্প—উপন্যাস নয়—প্রথম লিখলাম। গল্পটা প্রকাশিত হয়েছিল নৈহাটি থেকে আমরা একটা কাগজ বের করতাম—‘ছোটগল্প, নবনিরীক্ষা’—সেই কাগজে। এবং তৎক্ষণাৎ আমি সর্বপ্রথম আক্রান্ত হলাম, বাই কমিউনিস্ট পার্টি। আমি নাকি পার্টি বিরোধী গল্প লিখেছি।”

কিন্তু ‘বিবর’ নিয়ে দেবশঙ্কর মুখোপাধ্যায় যখন তাঁকে প্রশ্ন করেছিলেন—‘তুই কী ভাবছিস এ নিয়ে?’ ও বলেছিল,—‘আমি সব চেয়ে বেশি বাধিত হব এখন যদি সরকার আমায় জেলে পোরে। কারণ তা হলে আমি হয়তো সত্যিকারের কিছু মহৎ সাহিত্য সৃষ্টি করতে পারব, যেমন ধরো ডস্টেয়ভস্কির ব্যাপার। The insulted And the Injured-এর মতো সাহিত্য উনি জেলে বসেই সৃষ্টি করেন।’

পিতা মনমোহন বসু লেখক সমরেশকে সেইভাবে দেখে যেতে পারেননি। ‘উত্তরঙ্গ’ প্রকাশ পাবার বেশ কয়েক মাসের মধ্যেই তিনি মারা যান ১৯৫১ সলের ডিসেম্বর মাসে। সমরেশের সাংসারিক জীবনে তখন এক জটিল পরিস্থিতি। একদিকে অর্থের চরম সংকট, অন্য দিকে সংসার। এর মধ্যেই ঘুরে দাঁড়াবার একটাই মাত্র পথ লেখা। যেখানে তিনি একান্তে নিজের কথা বলতে পারেন নিঃসংকোচে।

সমরেশ চার নাম নিয়ে সাহিত্যের ক্ষেত্রে পদচারণা করেছেন। সমরেশ বসু, কালকূট, অশোক ঠাকুর, ভ্রমর। সমরেশ বসুকে আমরা চিনি। কালকূট? কালকূট ছদ্মনাম প্রথম ব্যাবহার করেন ‘ভোটদর্পণ’ নামে একটি রচনায়। ‘প্রবাহ’ পত্রিকায় ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ সালের সংখ্যায় এটি প্রকাশ পায়। সমরেশ নিজে বলেছেন—“রোগটা আমার ছেলেবেলা থেকেই। রোগ মানে ঘুরে বেড়ান। নইলে আমার লেখাপড়া হলো না কেন? আমাদের পারিবারিক অবস্থা খুব ভাল না হলেও মোটামুটি ছিল। আমার সব ভায়েরা লেখাপড়া করেছে অথচ আমার স্কুলে যেতে ভাল লাগত না, স্কুল পালিয়ে নদীর পাড়ে, শ্মশানে ঘুরে বেড়াতে ভাল লাগত। এটা কেন আমার জীবনে এসেছে আমি জানি না। আমার বাবা ছবি আঁকতেন। তিনিও বাড়িতে থাকতে চান না। তাঁর প্রভাব হতে পারে। সারাজীবন আমি ভেসেই বেড়িয়েছি বলতে গেলে—ঘুরে ঘুরে। কোথাও আবদ্ধ থাকতে ভাল লাগে না। এখনো সুযোগ পেলেই বেরিয়ে পড়ি। যদিও শারীরিক কারণে আগের মত আর পারি না। ‘কালকূট’ নামটা নিয়েছিলাম আমি এজন্য যে, এই নামে আমি যা জানি, যা দেখেছি যেন ঠিক ভাবে লিখতে পারি। নাম-টামগুলো গোপন করতে হয় অবশ্যই”।

অশোক ঠাকুরের পরিচয় দিতে গিয়ে তিনি ‘স্বর্ণচঞ্চু’ উপন্যাসের ভূমিকায় বলেছেন—“ছেলেবেলায় একদা স্বর্গীয় পাঁচকড়ি দে মহাশয়ের রহস্য ও গোয়েন্দা কাহিনী পড়তে খুবই ভালবাসতাম। আরো অনেকেরই পড়েছি; ভালোও লেগেছে। কিন্তু পরিণত বয়সে বাঙালী রহস্য ও গোয়েন্দা কাহিনী লেখকদের মধ্যে, আমার সকল বিষ্ময় ও মুগ্ধতা একজনই মৌরসীপট্টা করে নিয়েছিলেন তিনি শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়।

অবকাশের সময় একটু রিলাক্স মুডেও কিছু লিখতে ইচ্ছা করে। স্বর্ণচঞ্চু হচ্ছে আমার সেই রকম মুডের প্রথম চেষ্টা, রহস্য আর গোয়েন্দা কাহিনী লেখবার প্রথম সাধ। যদিও জানি, মোটেই রিলাক্স মুডে কোনো জটিল অঙ্কের সমাধান সম্ভব না, কেন না খুনের কিনারা করা এবং গোটা গল্পটিকে আগাগোড়া তৈরি করে, আগেই মনে মনে সাজানো রীতি মতো কঠিন।      

সতর্কতার দাবি আমার নেই। নিতান্ত এক আন্তরিক সাধ, এক নন এ্যাম্বিশাস চেষ্টা”।

সম্ভবত বাবার মৃত্যুর পর সমরেশের মা নৈহাটিতে চলে আসেন। মৃত্যুর আগে পর্যন্ত তাঁর কাছেই ছিলেন। সমরেশ ২১ ডিসেম্বর ১৯৬৫ এলাহাবাদ থেকে গৌরী বসুকে একটি চিঠি লিখেছিলেন, তার একজায়গায় লেখা আছে,—‘তোমাদের কোন খবর না পাওয়াতে চিন্তিত হইয়া পড়িয়াছিলাম। মায়ের কথা তো জানই, তা গো খবর আহে না ক্যান, কী অইলো, আমি তো বুঝি না, ইত্যাদি প্যাচাল তো শুনিতেই হইয়াছে’। ১৯৬৭ সালের ১৪ মার্চ সমরেশ কনিষ্ঠ শ্যালিকা ধরিত্রীকে বিবাহ করেন। দ্বিতীয় বিবাহ। ১৯৬৮ সালের ১ এপ্রিল পঞ্চম সন্তান (ধরিত্রী বসুর) উদিত কুমারের জন্ম। মা মারা যান ২ ডিসেম্বর ১৯৭২ সাল।

১৯৬৭ সালে ‘প্রজাপতি’ দেশ পত্রিকার শারদীয় সংখ্যায় প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে জনৈক উকিলের অভিযোগে সমরেশ অশ্লীলতার দায়ে আদালতে অভিযুক্ত হন। প্রজাপতি কোর্টের আদেশে বাজেয়াপ্ত হলো। মামলা চলল সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত। দীর্ঘ আঠারো বছর পর সুপ্রিম কোর্ট থেকে প্রজাপতি মুক্তি পায়। সে সময় অনেকেই ‘পপুলারি’টির ব্যাপারটা তাঁর লেখার পেছনে জুড়ে দিয়েছিলেন। এমনকী ‘অশ্লীল’ লেখালেখির দিকেই তাঁর ঝোঁক বেশি, এই বদনামও তাঁর জুটেছিল। তিনি বিচলিত হননি, কম্প্রোমাইজ করেননি কারুর সঙ্গে বরং বলেছেন—“তবে এই কথাই কেবল বলব যে সাহিত্য কখনও কাউকে বিপথে পরিচালিত করতে পারে না। সাহিত্য সর্বদাই অশ্লীলতা যুক্ত এবং সাহিত্যের সঙ্গে অশ্লীলতার যে কোন সম্পর্ক নেই সে কথা আগেই বলেছি। যদি কেউ উপন্যাসের মূল বক্তব্যকে অনুসরণ করতে না পারে তবে দোষ কার? আমার মধ্যে যদি সর্বদাই ‘কু’ জিনিস থাকে তাহলে আমার ‘সু’ দিকে অর্থাৎ ভাল দিকে কখনই মন যাবে না—কেবলই খারাপ জিনিষটা দেখতে চেষ্টা করব। রাস্তায় কোন ময়লা জিনিষ দেখলে আমরা তার থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করি। তবে পাঠক পাঠিকাদের দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ার জন্য একমাত্র দায়ী তার Family।

আমার বইগুলির জনপ্রিয় এবং বিতর্ক সৃষ্টির পেছনে আছে, অধিকাংশ পাঠকের বোঝার অক্ষমতা। অক্ষমতা বলতে আমি বলতে চেয়েছি পাঠকরা না বুঝে অনেকটা হৈ-চৈ করে ব্যাপারটাকে কিম্ভূত কিমাকার, বিকৃত করে তোলে। ফলতঃ তাদের বোকামি এবং অকারণে উত্তেজনাই প্রকাশ পায়। মধ্যবিত্ত সমাজ আজ একটা দোদুল্যমান পরগাছা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষ আজ বাংলা সাহিত্যে অন্যের মিনমিনে ভাবটা সর্বপ্রযত্নে পরিহার করতে চায়। আধুনিক যুবমানসের অস্থিরতা দ্বিধা দ্বন্দ্বকে আমি আমার লেখার মধ্যে টেনে এনেছি। তাই আমার লেখা তাদের মনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাড়া জাগায়। প্রধানতঃ বইগুলো বিতর্কিত হওয়াও আরও বেশি Popularity অর্জন করতে পেরেছে বলে আমি মনে করি”।

সমরেশ একসময় রাজনীতি করেছেন। রাজনীতি করা চরিত্রগুলির সঙ্গে তিনি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়েছিলেন। খুব কাছ থেকে তিনি এই চরিত্রগুলি দেখেছেন। একসময় ছিল মোহ। কিছু করার আশা। পরবর্তীকালে তা ভেঙে যায়।

‘প্রথমদিকে মার্কসীয় রাজনীতিতে আমার বিশ্বাস ছিল। মার্কসীয় লেখা বলতে যা বোঝায় তেভাগা আন্দোলন নিয়ে একটা গল্প আর ‘নতুন খোকা’ নামে একটা গল্প—যা ভেরি মাচ পলিটিকাল স্টোরি লিখেছিলাম’। পরে তাঁর চিন্তা ভাবনার পরিবর্তন ঘটে। স্বীকার করেছেন—‘তবে যদি বলতেই হয় তবে বলবো, আজকে রিয়েল নকশাল বলতে যাদের বোঝায় তাদের প্রতি আমার সিমপ্যাথি বেশি। পলিটিকাল দিক থেকে যদি বিচার করা যায়। যদিও নকশালরা নানাভাগে ভাগ হয়ে গেছে, জেনুইন নকশাল কম। আমরা একসময়ে স্ট্যালিনের পতনও দেখেছি। তেমনি চোখের সামনে জায়েন্ট নকশালের পতনও দেখলাম। তবু আমি যেটুকু জানি, যা খবর পাই, তলেতলে খুব জেনুইন কিছু ছেলেমেয়ে জীবনের কোন পরোয়া না করে এখনো কাজ করে যাচ্ছে। এদের জন্য আমার রেসপেক্ট আছে। প্রধান কথা হচ্ছে, বর্তমান সংশোধীয় গণতন্ত্রে আমার আদৌ বিশ্বাস নেই। আমি এতে একেবারে বিশ্বাস করি না। কোন মার্কসবাদী যদি বলেন সংসদীয় গণতন্ত্রের মাধ্যমে দেশে সাম্যবাদ আসবে। তিনি একদম মিথ্যা বলছেন—বা সেই দলও নিশ্চিত মিথ্যে বলছে বা বোঝাচ্ছে। কারণ মার্কসবাদের সঙ্গে এর মূলতঃ কোন মিল আছে বলে আমি বিশ্বাস করি না—আমার যেটুকু মার্কসবাদ সম্পর্কে জ্ঞান আছে তার থেকে বলছি। সেই দিক থেকে ঐ মুষ্টিমেয় ছেলেরা বরং সত্যি কথা বলছে, পলিটিকাল ক্ষেত্রে এই-ই আমার বিশ্বাস—পলিটিকালি মূলতঃ মার্কসবাদে আমার আস্থা আছে। কিন্তু অর্থনীতির ক্ষেত্রে মার্কসবাদকে আমি যতটা বেশি পরিবর্তনের হাতিয়ার বলে মনে করি, দার্শনিকতার ক্ষেত্রে আবার মার্কসবাদকে মেনে নিতে কোথায় যেন আমার অসুবিধে হয়”।

এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন—‘প্রত্যেকটা জায়গায় স্বপ্নের সমস্ত সৌধগুলি ভেঙ্গে গেছে, সোভিয়েত রশিয়া থেকে আমার স্বপ্নের সৌধ ভেঙ্গে গেছে, চীন থেকে ভেঙ্গে গেছে, লেনিন আমার জন্মের আগে মারা গেছেন, কিন্তু আমার জীবৎকালে যে সব নেতাদের দেখেছি, জেনেছি তার মধ্যে একজন মাত্র মার্কসিস্ট লিডারের প্রতি আমার শ্রদ্ধা অটুট, হো-চি-মিনে’র কথা বলেছি, তাঁর হাতে ক্ষমতা ছিল—সবই ছিল তবু জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মোটরের টায়ারের চটি পড়েছেন, এত সহজ সরল জীবন তাঁর। একদিক থেকে তাঁকে গান্ধীর সঙ্গে তুলনা করা যায় পলিটিকাল মতের ব্যাপারে তুলনা করা যাবে না—সে তো বিরাট ডিফারেন্স, এবং গান্ধী সত্যি সত্যি আমরা বাইরে থেকে যা দেখি তা তো ছিলেন না—ভারতীয় বিগ ক্যাপিটালিস্টদের সঙ্গে তাঁর বিশেষ যোগাযোগ ছিল। তাছাড়া যে কারণে হো-চি-মিনকে আমার ভাললেগেছে, তিনি কিন্তু তাঁর দেশ থেকে রামায়ণকে দূর করেননি তাঁর সময়ে ও আজও ভিয়েতনামে রামায়ণ চিত্র দেখান হয়’।

অন্য আরো এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন,—‘তবে, হ্যাঁ কমিউনিজম আর মার্কসবাদ….সেই হিসেবে কমিউনিজম আর মার্কসবাদে বোধহয় তফাত আছে, কেন না কমিউনিজম হচ্ছে সাম্যবাদ কিন্তু মার্কসবাদ হচ্ছে….এক ব্যক্তির….বিশেষ….মানে কি বলব….তাত্ত্বিক, তত্ত্বগত বিশ্বাস….বা তিনি যেভাবে সমাজতন্ত্রকে….এই বিশেষ কার্ল মার্কসের থেকেই মার্কসবাদের তত্ত্বটা এসেছে। কিন্তু কমিউনিজম শব্দ তো ভিন্ন। এ কথা….এ কথা অনেক আগের থেকেই বলা হয়েছে। সাম্য মানুষ অনেক আগে থেকে চেয়েছে পৃথিবীতে। কিন্তু আমার বক্তব্য সেখানেই হচ্ছে এই যে, আমরা মার্কসবাদী হিসেবেই কমিউনিজমকে দেখেছিলাম। পরবর্তীকালে আমার মনে হয়েছে যে….এই যেমন সাম্প্রতিক কালে গান্ধীজি সম্পর্কেও আমার নানা চিন্তা হয়েছে। আমার মনে হয়েছে যে, গান্ধীর নব মূল্যায়নের সময় হয়ে এসেছে। যেখানে আমরা ভারতীয়রা এ ক্ষেত্রে….প্রথম কথা হচ্ছে আজকের যে কংগ্রেস….এই কংগ্রেস কেন….গান্ধীজি বেঁচে থাকতেই কংগ্রেসের সঙ্গে তাঁর কোনও সম্পর্ক ছিল না। আজকের কংগ্রেসের সঙ্গে তো গান্ধীবাদের কোনই মিল নেই….কোন যোগসূত্রও নেই। যেমন আমার মনে হয় যাঁরা বলেন মার্কসবাদী….মার্কসের সঙ্গে আদৌ তাঁদের বা মার্কসীয় তত্ত্বের সঙ্গে তাঁদের কোনও মিল আছে কিনা আমার সন্দেহ হয়। ঠিক তেমনই, কংগ্রেসের কিছু যায় আসে না গান্ধীজিকে বাদ দিলে। গান্ধীকে তাঁরা অনেক আগে ত্যাগ করেছেন….যেমন গান্ধীও কংগ্রেস ত্যাগ করেছিলেন। কিন্তু আমার নিজের মনে হচ্ছে যে, আজকে পৃথিবীর মানুষ গান্ধীকে নব মূল্যায়ন করছে এবং গান্ধী সম্পর্কে তারা অনেক বেশি অবহিত হচ্ছে। অথচ আমরা ভারতীয়রা এই ব্যক্তিকে কেন ছেড়ে দেব আমি বুঝতে পারি না! এবং আজকে আমরা আবার সেই পঞ্চায়েত রাজের কথা বলছি এবং গান্ধীর কাছাকাছি আসতে চাইছি অন্য উপায়ে….অন্য ভাবে….এবং আমার মনে হচ্ছে যে, গান্ধীকে ছাড়া যাবে না’।

১৯৮০ সালে সমরেশ বসুকে সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার দেওয়া হয় ‘শাম্ব’ উপন্যাসের জন্য। তাঁর নিজের কথায়—‘শাম্ব উপন্যাসই। তবে ‘কালকূট’ ভ্রমণ কাহিনীই লেখেন। তাই শাম্বর শুরুতে বলেছি, এখন প্রাচীন যুগে যাচ্ছি, পুরাণে ভ্রমণ করছি। এ ভঙ্গি আদ্যপান্তই আছে।….বিশ্বাস এবং কর্মশক্তি মানুষকে দুর্ভাগ্য থেকে উত্তরণের সম্মান দেয়—আমার শাম্ব উপন্যাসের সার কথা এই।….আমি বোঝাতে চেয়েছি, মানবিক আবেদন না থাকলে কোন সংগ্রামই শক্তি পায় না। তাই ক্ষত্রিয় কৃষ্ণপুত্র কার্যসমাধায় অস্ত্র ও বাহুবলের অধিক বিশ্বাসী না হয়ে মানবিক আবেদনই সফল’।

কিন্তু সবচেয়ে দুঃখের ঘটনা ঘটে এ বছরেই। প্রথমা স্ত্রী গৌরী দেবী মারা যান ১১ জুলাই ১৯৮০। ১৯৮২ সালে কিছুদিন ‘মহানগর’ মাসিক পত্রিকার সম্পাদনা করেন। তাঁর সম্বন্ধে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলেছেন—“প্রথমবার হৃদরোগের পর তিনি লেখা তো থামানইনি বরং ‘মহাকালের রথের ঘোড়া’ কিংবা ‘শেকল ছেঁড়া হাতের খোঁজে’র মতন বলিষ্ঠ লেখায় হাত দিয়েছেন। মনের জোরে তিনি কাটিয়ে উঠেছেন শারীরিক বাধা। মনে পড়ে, বছর দেড়েক আগে আমরা একসঙ্গে গিয়েছিলাম জার্মানীতে। পশ্চিম বার্লিন থেকে দেয়াল পেরিয়ে আমরা এসেছি পূর্ব বার্লিনে, সেখানকার দ্রষ্টব্য স্থানগুলি হেঁটে হেঁটেই দেখতে হয়। আমাদের পক্ষে গাড়ি জোগাড় করার কোনো উপায় ছিল না। সমরেশ বসুর তখন ঠাণ্ডা সহ্য হচ্ছে না। শরীরটা বেশ দুর্বল, তবু সব কিছু দেখার জন্য তাঁর অদম্য উৎসাহ। রাস্তার ধারের বেঞ্চে একটুখানি বসে জিরিয়ে নিচ্ছেন, তারপরেই বলেছেন, চলো চলো, আরও অনেক কিছু বাকি”।

জীবনের শেষ লেখা ‘দেখি নাই ফিরে’ রামকিঙ্কর এর জীবনী নিয়ে লেখা উপন্যাস। সমরেশ নিজে বলেছেন—‘শুধু শিল্পী চরিত্র নয়, শিল্পী চরিত্রের মধ্যেও মানুষ হিসেবে একজন শিল্পী কি রকম হতে পারে তার যে একটা….কী বলব, এটাকে আমি নিচ্ছি একটা আদর্শ হিসেবে, যে এই ধরনের মানসিকতা ছাড়া বোধহয় এত বড়ো শিল্পী হওয়া যায় না। যেখানে তিনি কোন অবস্থার সঙ্গেই কখনও আপোশ করেন না। কোন কিছুর সঙ্গেই নিজের জীবনকে গাঁটছড়া বাঁধলেন না….নিজের শিল্প ছাড়া। এবং জীবনের….যখন সকলেই….তাঁর আশেপাশে সব বন্ধুরাই প্রায় বৈষয়িকভাবে চিন্তিত হতেন…. বিবাহ করলেন….সংসার করতে গেলেন….তিনি কিন্তু সে সবও করলেন না। তিনি কিন্তু এক জায়গায় খুব পরিষ্কার ভাবে বললেন—আমার যদি বিবাহ কোথাও হয়ে থাকে তাহলে শিল্পের সঙ্গেই হয়েছে’।

রামকিঙ্কর সম্বন্ধে তিনি বলেছেন—‘একটা কথা ঠিকই যে আমি ওর জীবনী লিখছি না, জীবনকে নিয়ে একটা উপন্যাসই লিখছি। ঐতিহাসিকতার দায়বদ্ধতা না থাকলেও আমি নিজে মনে করি যে রামকিঙ্করের জীবন সমস্ত দিক দিয়েই এত নাটকীয় যে সেগুলির ডকুমেন্টেশনের সঙ্গে….প্রায় সমস্ত জীবনের বাস্তব ক্ষেত্রেই মিশে আছে….তাই বাদ দিতে পারব না প্রায় কিছুই তবু হয়তো সব ক্ষেত্রে সহযোগিতার অভাবে আমাকে নিশ্চয়ই তো কিছু কল্পনার আশ্রয় নিতেই হবে আর তা ছাড়া, সেই কল্পনার মাত্রা যদি আমি সংযোগ না করি তবে আমি উপন্যাসই ভাল করে লিখতে পারব না। শুধু মাত্র যে ডকুমেন্টেশন বা ওই ভাবে বাস্তবকে দিয়ে হবে না। এই কারণে যে, তা হলে উপন্যাস হয় না এবং সেই উপন্যাসে মাত্রাও যোগ করা যায় না এবং তাঁর জীবনটিকেও আমি সেই ভাবে দেখতে চাই না’। 

‘দেখি নাই ফিরে’ উপন্যাস ‘দেশে’ ধারাবাহিক বেরোবার ঠিক আগে আনন্দবাজারে একটা বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছিল। বিজ্ঞাপনটা আপত্তিকর। সমরেশ, সাগরময় ঘোষকে এ বিষয়ে এক পত্রে লেখেন—‘আজ আনন্দবাজারে ‘দেখি নাই ফিরে’র যে বিজ্ঞাপন বেরিয়েছে, তার প্রথম লাইন পড়ে আমি বিস্মিত ও মর্মাহত হয়েছি। এটাই আমার শেষ লেখা (কীর্তি) কি না, এ কথা লেখার মানে কি? বিজ্ঞাপন লেখক কি আমার কোষ্ঠী দেখে মৃত্যুর দিন অথবা আর কোন দিন লিখতে পারব না, এ কথা ভবিষ্যৎ বাণী করতে চেয়েছেন? অত্যন্ত আপত্তিকর, দুঃখও পেয়েছি’। (১৬ জানুয়ারি ১৯৮৭)।

ঘটনাটা কাকতালীয় কিন্তু সমরেশ সত্যি ‘দেখি নাই ফিরে’ শেষ করতে পারলেন না। ১২ মার্চ ১৯৮৮ বিকেল ৩-৪৫ মিনিট। সমরেশ বসু নেই। পুত্র নবকুমার বসু বলেছেন—“চল্লিশ বছরের কিছু বেশি সময়ের লেখক জীবনে যে সাফল্য এবং ব্যর্থতার ধারাবাহিকতায় সমরেশ বসু চলমান ছিলেন, ‘দেখি নাই ফিরে’ প্রকাশিত হওয়ার শুরু থেকেই যেন আন্দাজ পাওয়া গিয়েছিল, তাঁর চলিষ্ণুতা এইবার অন্য এক সংহত ধারা অনুসরণ করে কালোত্তরের দিকে আগুয়ান। না, এ এক অন্য সমরেশ বসু—তা নয়। এই লেখায় তিনি হয়েছিলেন সেই অভিজ্ঞ পরিণত আসল সমরেশ বসু যিনি অসফল সফল নানা জাতীয় লেখায় শক্তিক্ষয় এবং আহরণের মধ্য দিয়ে এসে এক পূর্ণতার আকাশকে স্পর্শ করেছিলেন। —দেরি থেকে আরও দেরি। কিন্তু নিখুঁত হতে চেয়েছিলেন, চেয়েছিলেন তাঁর এতাবত সব লেখার যা যতটুকু পূর্ণতার অভাব, সীমাবদ্ধতা তা অতিক্রম করতে।” তাই উপন্যাসের শেষের বাক্যও রহস্যাবৃত ও তাৎপর্যপূর্ণ,—‘রামকিঙ্কর কোন জবাব দিল না’।

আপনার মতামত লিখুন :

4 responses to “সমরেশ বসু : জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়”

  1. কৌশিক পাল says:

    দারুন লেখা।

  2. Monojit Kumar Das says:

    সমরেশ বসু একজন সত্যিকারের লেখক। বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি লিখেছেন।
    আপনার এই লেখাটা তার জীবনের পূর্ণাঙ্গ চালচিত্র। আপনাকে ধন্যবাদ।

  3. Monojit Kumar Das says:

    অসাধারণ লেখা

  4. নিশীথ ষড়ংগী says:

    খুব সুন্দর লেখা

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev