৩৭. গীতিকার মুকুল দত্ত
খড়গপুর কলেজে আমাদের সঙ্গে পড়ত সত্যজিৎ দত্ত। রোগা, লম্বা সত্যজিৎ ছিল প্রাণবন্ত, কৌতুকময়। খড়গপুরের দক্ষিণে কৌশল্যার কাছে তাদের বাড়ি। দত্তবাড়ি। এটুকুই জানতাম। কিন্তু দত্তবাড়ির সদস্যরা যে কৃতী মানুষ তা জানতাম না। আমাদের ক্লাশে আমাদের চেয়ে বেশি বয়েসের একটি ছেলে ছিল। তাকে আমরা কাকু বলে ডাকতাম। তাতে তার আপত্তি ছিল না। গান ভালোবাসত কাকু। গানও গাইত। একদিন সে যখন ‘তুমি এলে অনেক দিনের পরে যেন বৃষ্টি এল’ গানটা গাইছে, তখন সত্যজিৎ প্রশ্ন করল, ‘গানটা কে লিখেছে বলতো!’ কাকু বলল, ‘কেন, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়।’ সত্যজিৎ তার ভুল ভাঙিয়ে জানাল যে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় গানটা গেয়েছেন, কিন্তু গীতিকার হলেন মুকুল দত্ত।
পরে সত্যজিৎ আমাকে বলেছিল যে বিমল দত্ত (১৯২৪-১৯৯৬), মুকুল দত্ত ( ১৯৩৩- ২০১১) — এঁরা সব তার পরিবারের সদস্য। বিমল দত্ত চিত্রনাট্যকার, পরিচালক, প্রযোজক। ‘আনন্দ’, ‘মিলি’, ‘অনুপমা’, ‘সত্যকাম’ — এসব ছবির চিত্রনাট্য তিনি লিখেছেন। আর মুকুল দত্ত গীতিকার ও চলচ্চিত্র পরিচালক। সুরেন্দ্রনাথ দত্ত ও ঊষারানিদেবীর সন্তান তাঁরা। তাঁর বাবা বি এম রেলওয়েতে চাকরি করতেন। মুকুল দত্ত মধ্যপ্রদেশের রেওয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। চাকরিতে স্থানান্তরের ফলে তাঁরা চলে আসেন খড়গপুরে। সাহেবপাড়ার বোগদার কাছে ৫৭০নম্বর বাংলোতে থাকেন। তারপরে কৌশল্যার কাছে তৈরি হয় দত্তবাড়ি।
মুকুল দত্ত খড়গপুরের রেলওয়ে বয়েজ হাইস্কুলে পড়াশুনো করেন। ইন্টারমিডিয়েট পড়েন মধ্যপ্রদেশের বিলাসপুরে। বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক স্তরের পড়াশুনো শুরু করলেও শেষ না করে চলে আসেন খড়গপুরে। খড়গপুরের সিলভার জুবিলি হাইস্কুলে শিক্ষকতা করেন কিছুদিন। তারপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে এম এ পাশ করেন।
গান ও সিনেমার প্রতি ছিল তাঁর সহজাত আকর্ষণ। ১৯৫৭ সালে পাড়ি দিলেন মুম্বাই। সহ পরিচালক, সহ গায়কের কাজ করলেন। বাংলা ছবি ও আধুনিক বাংলা গানের গীতিকার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেন অচিরে। ‘আন মিলো সজনা’, ‘রাস্তে কা পথ্থর’, ‘ছলিয়া’, ‘ফুলওয়ারি’ — এসব ছবি তিনি তৈরি করেছেন বটে, কিন্তু বাংলা ভাষার এক সফল গীতিকার হিসেবেই তাঁর মূল পরিচয় তৈরি হয়। বিখ্যাত সব গায়করা তাঁর গান গেয়েছেন :
১] বাংলা ছায়াছবির গান :
১. জীবনপুরের পথিক রে ভাই (পলাতক/হেমন্ত মুখোপাধ্যায় )
২. কেন গেলে পরবাসে (মণিহার/লতা মঙ্গেশকর)
৩. কে যেন গো ডেকেছে আমায় (মণিহার/হেমন্ত ও লতা )
৪. যখন ডাকলো বাঁশি (বাঘিনী/হেমন্ত )
৫. ফুলেশ্বরী, ফুলেশ্বরী ফুলের মতো নাম (ফুলেশ্বরী/হেমন্ত )
৬. টাপুর টুপুর বৃষ্টি (ওই)
৭.আষাঢ় শ্রাবণ মানে নাতো মন (মণিহার/লতা মঙ্গেশকর )
৮. ওগো নিরুপমা (অনিন্দিতা/কিশোরকুমার)
৯. কেন গেলে পরবাসে (মণিহার/লতা মঙ্গেশকর )
১০. কারও কেউ নইকো আমি ( লালকুঠি/কিশোরকুমার )
১৯৫৮ সাল থেকে মুকুল দত্ত বাংলা ছবির ও আধুনিক বাংলা গানের গীতিকার রূপে আত্মপ্রকাশ করেন। অনবদ্য আধুনিক বাংলা গানেরও স্রষ্টা মুকুল দত্ত। সে সব গান আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে :
১. নয়ন সরসী কেন (কিশোরকুমার )
২. বন্ধু তোমার পথের সাথীকে (হেমন্ত মুখোপাধ্যায়)
৩. তার আর পর নেই (ওই)
৪. তুমি এলে অনেক দিনের পরে বৃষ্টি এল (ওই)
৬. তারে আমি চোখে দেখিনি (কিশোরকুমার)
৭. সে যেন আমার পাশে (ওই)
৮. তোমায় পড়ছে মনে (ওই)
৯. আমার পূজার ফুল (ওই)
১০. আমি নেই ভাবতেই ব্যথায় (ওই)
জীবনের বেশির ভাগ সময় বাংলার বাইরে থেকেছেন মুকুল দত্ত। কিন্তু বাংলাদেশ, বাঙালি ও বাংলা ভাষার সঙ্গে তাঁর প্রাণের যোগ ছিল। তাঁর বাংলা গানগুলির মধ্যে তাই সেই আবেগের স্পর্শ রয়েছে।
অনেক কিছু জানতে পারলাম।
খুব আকর্ষণীয় তথ্য।