৩৯. এক্রামুদ্দিন : প্রথম যুগের রবীন্দ্র সমালোচক
বর্ধমান জেলার রায়না থানার কুলিয়া গ্রামে এক্রামুদ্দিনের জন্ম। বর্ধমান রাজ কলেজ ও হুগলি কলেজে পড়াশুনো করেন তিনি। স্নাতক হন। সাব-ডেপুটি কালেক্টর হিসেবে জীবিকা নির্বাহ করেন। সাহিত্য রসিক মানুষ ছিলেন। বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি এবং বীরভূম সাহিত্য পরিষদের সঙ্গে তাঁর যোগ ছিল। সৃজনশীল সাহিত্য ও সমালোচনা সাহিত্যে তিনি পারদর্শিতা দেখিয়েছেন।
‘কাচ ও মণি’, মহিমাময়ী নারী’, ‘নতূন মা’, ‘মতি মঞ্জিল’, ‘জীবনপণ’ প্রভৃতি উপন্যাসের রচয়িতা তিনি। ‘মেঘনাদবধ ও বৃত্তসংহার’, ‘চন্দ্রশেখর ও বঙ্কিমচন্দ্র’, ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’ প্রভৃতি তাঁর সাহিত্য সমালোচনামূলক প্রবন্ধের উদাহরণ।
এর পরেই আসে তাঁর ‘রবীন্দ্র প্রতিভা’র কথা। এই বইটি প্রকাশিত হয় ১৩২১ সালে। বইটির প্রকাশক বর্ধমানের উকিল মৌলবি নজিরুদ্দিন। ১৩২১ সালে এক্রমুদ্দিনের বই প্রকাশের আগে ১৩১৯ সালে বিশ্বভারতী থেকে প্রকাশিত হয়েছিল অজিতকুমার চক্রবর্তীর ‘রবীন্দ্রনাথ’। এই কারণেই আমরা এক্রামুদ্দিনকে প্রথম যুগের রবীন্দ্র-আলোচক বলেছি।
বইটির নামকরণ ও রচনার প্রেরণা সম্বন্ধে এক্রামুদ্দিন বলেছেন :
‘আমি প্রথম উদ্যমেই রবীন্দ্রনাথের সমালোচনারূপ দুরূহ কার্যে কেন কেন ব্রতী হইলাম তাহা অনেকবার চিন্তা করিয়াছি, কিন্তু কোন কারণ খুঁজিয়া পাই নাই। যেমন হৃদয় ভারাক্রান্ত হইলে মানুষ সঙ্গত হউক বা অসঙ্গত হউক আপনার বক্তব্য না বলিয়া থাকিতে পারে না, আমারও বুঝি তদ্রূপ। আমার মনে যাহা আসিয়াছিল তাহাই লিখিয়াছিলাম, ইহা পুস্তকাকারে প্রকাশিত হইবে তাহা কখনও স্বপ্নেও ভাবি নাই। …. এই পুস্তক প্রকৃতপক্ষে রবীন্দ্রনাথের নাট্যকাব্য বিসর্জনের আলোচনা হইলেও ইহাতে রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে সাধারণভাবে অনেক কথা বলা হইয়াছে, এই নিমিত্ত ইহার নাম রবীন্দ্র প্রতিভা দেওয়া হইল।’
এক্রামুদ্দিন তাঁর নিজের মতো করে রবীন্দ্র প্রতিভার ক্রমবিকাশের আলোচনা করেছেন। সে আলোচনার সীমাবদ্ধতা আছে। থাকাই স্বাভাবিক। কারণ ১৯১৪ সালে তিনি এই বই লিখেছেন। তখন রবীন্দ্র প্রতিভা পূর্ণ বিকশিত হয় নি; তাছাড়া তখনও রবীন্দ্রসমালোচনার কোন মানদণ্ড তৈরি হয় নি। আমরা আগেই বলেছি, এক্রামুদ্দিনের ‘রবীন্দ্র প্রতিভা’ প্রকাশিত হবার আগে সম্ভবত রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে আর একটিমাত্র বই, অজিতকুমার চক্রবর্তীর বই, প্রকাশিত হয়েছিল।
তবে সীমাবদ্ধতার মধ্যেও এক্রামুদ্দিন বাংলা কাব্য-সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাটি ধরতে পেরেছিলেন। তিনি বলেছেন :
‘রবীন্দ্রনাথ সেইরূপ কবি যাঁহার রচনা কাব্যজগতে বিপ্লব আনয়ন করে।’
কবিতার রূপ-রীতির পরীক্ষা-নিরীক্ষায়, যথার্থ গীতি কবিতার অবয়ব নির্মাণে রবীন্দ্রনাথ সত্যই বিপ্লব এনেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের মধ্যে যে খাঁটি গীতিকবির স্বভাব ছিল, সেকথা বলতে গিয়ে এক্রামুদ্দিন বলেছেন :
‘রবীন্দ্রনাথ পূর্ববর্তী কবিগণের ন্যায় শ্রোতৃবর্গকে মুগ্ধ করিবার জন্য দশের মাঝে সভামণ্ডপে দণ্ডায়মান নহেন, তিনি নির্জনে বসিয়া আত্মকৌতূহল নিবৃত্তির নিমিত্ত মানব জীবনের জটিল গুপ্ততত্ত্ব নিরূপণে যত্নবান।’
প্রায় অনুরূপ কথা রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন বিহারীলাল চক্রবর্তী সম্বন্ধে।
এক্রামুদ্দিনের ‘রবীন্দ্র প্রতিভা’ মোট চব্বিশটি পরিচ্ছেদে বিভক্ত :
নানাকথা, পিশাচশক্তির বলসঞ্চয়, দেবশক্তির বলসঞ্চয়, দেবশক্তির সহিত পিশাচশক্তির সংঘর্ষ, সত্য ও প্রেমের দ্বন্দ্বযুদ্ধ, বাহ্যশক্তির সহায়তায় সত্যের জয়লাভ, পিশাচের অন্তঃশক্তির পরাক্রম, বিশ্বপ্রেম ও ভক্তি, মনুষ্যত্ব ও সংস্কার, বায়ুতাড়িত গোলোক, মৃগ ও ব্যাধ, পথিকের পান্থশালা ও দেবতার গৃহ, পাপের সম্মুখে পাপী, অপরাধী ও বিচারক, দেবের বাহ্যশক্তির প্রতিক্রিয়া, পিশাচের বাহ্যবলের প্রতিক্রিয়া, মধুহীন পুষ্প, পৈশাচিক শক্তির প্রতিক্রিয়ার ফল, মানব সমাজের স্বার্থপরতা, সমাজচ্যুত অপর্ণা, দেবভাব ও পিশাচভাব, পাশব বা পৈশাচিক যুদ্ধের ফলাফল, কাব্যালোচনা, নামমাহাত্ম্য।
মোটামুটিভাবে বলা যায় ‘বিসর্জন’ নাটকে রবীন্দ্রনাথ যে দুই ভাবের বিরোধ তুলে ধরতে চেয়েছেন, সেটি এক্রামুদ্দিনের আলোচনায় প্রকাশ পেয়েছে। তবে তিনি সর্বত্র বিবেচনাবোধ ও শিল্পবোধের পরিচয় দিতে পারেন নি। সে যুগের পরিপ্রেক্ষিতে সেটা সম্ভবও ছিল না। এই বইটি সম্বন্ধে প্রশংসাসূচক মন্তব্য করেছেন সুরেশচন্দ্র সমাজপতি, দেবপ্রসাদ সর্বাধিকারী, প্রমথনাথ তর্কভূষণ, ক্ষীরোদপ্রসাদ বিদ্যাবিনোদ ; এবং ‘বেঙ্গলি’, ‘সওগাত’, ‘মোহাম্মদী’ প্রভৃতি পত্রিকার সমালোচকবৃন্দ।
এক্রামুদ্দিন রবীন্দ্রনাথকেও তাঁর বই পাঠিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে লিখলেন :
‘এই বই সম্বন্ধে আমি অভিমত জানাইতে পারিব না, ক্ষমা করিবেন। কেবল এটুকু বলিলে দোষ নাই যে, আপনি যে সরস বাংলা ভাষায় আমার রচনার সমালোচনা করিয়াছেন, তাহা পাঠ করিয়া আমি বিস্মিত হইয়াছি।’
Very nice