৪১. গণিত সম্রাট যাদবচন্দ্র চক্রবর্তী
‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকায় ছন্দক গুহ লিখেছেন :
“ছোটবেলায় অঙ্কে ভয় ছিল খুব। বিশেষত পাটিগণিতে। তৈলাক্ত বাঁশ পিছলে পড়তে পড়তে চৌবাচ্চার জলে বুদ্ধি ডুবিয়ে প্রতিদিন কাটত দুই ঘন্টা। লসাগু-তে ভুল করলেই জুটত স্কেলের বাড়ি। আর কী কঠিন কঠিন গুণ-ভাগ! বাপরে বাপ! মলাট দেওয়া একখানা মোটা বই থেকে অঙ্ক দিতেন। ওঁদেরও নাকি ছোটবেলার বই। যাদববাবুর ‘এরিথমেটিক’। ক্লাশ ফাইভ-সিক্স-সেভেনের বাজারে তখনও চিরন্তন কে সি নাগ। কিন্তু বাবা ছিলেন খানিক পুরানোপন্থী। এরিথমেটিক মানেই যাদব চক্রবর্তী ল এলজেব্রা মানে কেপি বসু। বাবার মতে কে সি নাগ নাকি তুলনায় সহজ। আর ‘ভালো ছেলেদের’ তো কঠিন অঙ্কই সলভ করা উচিত। সেই থেকে চক্রবর্তী মহাশয়ের সঙ্গে আমার চিরকালীন শত্রুতা। …
“১৮৯০ সালে প্রকাশিত ‘এরিথমেটিক’ আমার মতো ফাঁকিবাজদের দুচোখের বিষ। সুতরাং তা সেকালের দুঁদে অঙ্কস্যারদের প্রিয় হওয়া স্বাভাবিক। শোনা যায়, শান্তিনিকেতনের কিংবদন্তী শিক্ষক জগদানন্দ রায় ক্লাশ নিতে নিতে হঠাৎ রেগে গেলে ছুঁড়ে মারতেন ‘পাটিগণিত’ বই। কারও দিকে তাক করে মারতেন না যদিও। কারণ ওই থান ইঁট মাথায় লাগলে পতন ও মূর্ছা অবশ্যম্ভাবী। গল্প আছে সিরাজগঞ্জ অঞ্চলের স্কুলের ছেলেরা অঙ্ক পরীক্ষা দিতে যাওয়ার আগে ওঁর (যাদবচন্দ্র চক্রবর্তী) বাড়ির মাটিতে পেন্নাম ঠুকে যেত। ব্রিটিশরাও বেজায় ভক্তি করত তাঁকে।”
বর্তমান সিরাজগঞ্জ জেলা শহর থেকে কয়েক মাইল দক্ষিণে কামারখন্দ উপজেলার তেতুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন গণিত সম্রাট যাদবচন্দ্র চক্রবর্তী (১৮৫৫-১৯২০)। দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবার। বাবা কৃষ্ণচন্দ্র ও মা দুর্গারানি। ছয় সন্তান তাঁদের। তিনটি ছেলে আর তিনজন মেয়ে। সবার বড় যাদবচন্দ্র। বাবা ছিলেন সামান্য পুরোহিত। পুরোহিতের কাজ করে সংসার চালানো ছিল কঠিন। অর্ধাহারে অনাহারে কাটত দিন। তারপর হঠাৎ মারা গেলেন বাবা। অথৈ জলে পড়ল চক্রবর্তী পরিবার।
সেই কষ্টের মধ্যেও যাদবচন্দ্র প্রাথমিকের পড়া শেষ করেন। এই সময় থেকেই অঙ্কের প্রতি তাঁর অনুরাগ দেখা যায়। প্রথম বিভাগে এন্ট্রান্স পাশ করে চলে আসেন কলকাতায়। ১৫ টাকার বৃত্তি পান তিনি। ভর্তি হন জেনারেল অ্যাসেমব্লিজ ইন্সটিটিুটশনে। পরে এই প্রতিষ্ঠানের নাম হয়েছে স্কটিশচার্চ কলেজ। জেনারেল অ্যাসেমব্লিজ ইন্সটিটিউশনে যাদবচন্দ্র পেয়ে গেলেন এক স্নেহশীল অভিভাবক। তিনি হলেন শিক্ষক গৌরীশঙ্কর দে। এফ এ পরীক্ষাতেও প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হলেন যাদবচন্দ্র। বৃত্তি পেলেন আবার। আগের ও পরের বৃত্তির টাকা যোগ করে মোট হল তিরিশ টাকা।
যাদবচন্দ্র পড়তে চান প্রেসিডেন্সি কলেজে। কিন্তু সেখানকার মাইনে অনেক। কলকাতায় থাকা-খাওয়ার খরচ মিটিয়ে প্রেসিডেন্সির মাইনে দেওয়া সম্ভব নয়। গৌরীশঙ্কর দের পরামর্শে তিনি ভর্তি হলেন ক্যাথিড্রাল মিশন কলেজে। এখান থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে পাশ করলেন বি এ।
— ‘এবার তুই কি করবি?’ — যাদবচন্দ্রের কাছে জানতে চাইলেন গৌরীশঙ্কর।
যাদব বলেন, — ‘কিছু একটা কাজ করতে হবে। মাকে সাহায্য করতে হবে। বড় কষ্টে আছে মা।’
‘বেশ। সিটি কলেজে পড়াবার কাজটা কর। কিন্তু মনে রাখিস, প্রেসিডেন্সিতে পড়তে হবে তোকে। পড়তেই হবে এম এ। বুঝলি?’
গুরুর কথা রেখেছিলেন যাদবচন্দ্র। এম এ পাশ করেছিলেন প্রেসিডেন্সি থেকে। তারপর পাড়ি দিলেন আলিগড়ে। সৈয়দ আহমেদ সাহেবের আমন্ত্রণে। সেখানকার অ্যাংলো ওরিয়েন্টাল কলেজে শুরু করলেন অধ্যাপনা। সিটি কলেজে থাকার সময়ে শুরু করেছিলেন পাটীগণিতের বই লেখা। সে বই প্রকাশিত হল ১৮৯০ সালে। কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন :
‘স্কুলের পাঠ্যবই হিসেবে এটি লেখা হয় নি। তিনি লিখেছিলেন প্রবেশিকা পরীক্ষার্থীদের কথা মাথায় রেখে। বইটি লেখা হয়েছিল ইংরেজিতে। প্রকাশিত হওয়ার অল্প কিছুদিনের মধ্যে এটি ছাত্রদের মন জয় করে নেয়। জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়তে থাকায় বইটি বাংলা, হিন্দি, নেপালি, অসমিয়া, মারাঠি ভাষায় অনূদিত হয়। এই প্রসঙ্গে একটা কথা বলে রাখা ভালো যে, গণিতে যাদবচন্দ্রের কোন মৌলিক অবদান নেই। তাই তাঁর লেখা পাটীগণিতে কোন মৌলিক গবেষণার ফসল খুঁজতে যাওয়া নিরর্থক। পাটীগণিত বই ছাড়াও তিনি একটি বীজগণিত বইও লিখেছিলেন। এছাড়া শিশুদের জন্য তিনি বেশ কয়েকটি অঙ্কের পাঠ্যবই লিখেছিলেন। তবে পাটীগণিতের বহুল জনপ্রিয়তার ফলে তাঁর অন্য কীর্তিগুলি ঢাকা পড়ে যায়।’
তখনকার ব্রিটিশ সরকার তাঁকে ‘গণিত সম্রাট’ উপাধি দেন।
যাদবচন্দ্রের আর একটি কীর্তির কথা অনেকেরও অজানা। তিনি ঘটকালি করেছিলেন। এই ঘটকালির ফলে ব্রাহ্মসমাজের নেতা কেশবচন্দ্র সেনের মেয়ে সুনীতিদেবীর সঙ্গে বিয়ে হয় কুচবিহারের মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণের।
আমরাও ছোটবেলায় যাদব চক্রবর্তীর পাটীগণিত পড়েছি এবং চোখের জল ফেলেছি। ওঁর জীবনকথা কিছুই জানতাম না। ভালো লাগলো। তবে একেবারে শেষে তাক লাগিয়ে দেবার ঘটকালির ঘটনা। সে ঘটনাই বটে সারা বাংলায় সুনীতি দেবীর বিয়ে নিয়ে কী আলোড়ন পড়ল! ব্রাহ্ম সমাজ ভেঙে দু টুকরো হলো। যাদববাবুর বইতে ভগ্নাংশের অঙ্ক ছিল কিন্তু তাতে ব্রাহ্ম সমাজ জোড়া লাগলো না। শেষে কেশববাবু ব্রাত্য হলেন।
দিলীপদাকে ধন্যবাদ।