তথ্যচিত্র কখনও কবিতা হতে পারে? নিকোলাসের ছবি দেখার আগে এমনই বিশ্বাস ছিল, যে না, তথ্যচিত্র মানেই সেটা এক তথ্যনিষ্ঠ দলিল। কিন্তু তথ্যচিত্র নিয়েই সেলুলয়েডের বুকে এক দৃশ্য কাব্যের রচনা করেছেন মেক্সিকোর বিশ্বখ্যাত তথ্যচিত্র নির্মাতা নিকোলাস এচেভারিয়া। কবিতার রূপ সৌন্দর্যের মতোই তাঁর তথ্যচিত্র ভিসুয়াল রহস্যময়, আত্মায় ধারণ করে থাকে মেক্সিকোর মূলনিবাসী মানুষের ঐতিহ্যবাহী লোকসংস্কৃতি, ছবির পরতে পরতে থাকে এক আধ্যাত্মিক অনুরণন।
বিশ্ব চলচ্চিত্রে মেক্সিকো এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নাম। লাতিন আমেরিকা ঘেঁষা এই দেশটি স্প্যানিশ ভাষার চলচ্চিত্রের মূল কেন্দ্র হয়ে ওঠে গত শতকে। ১৯৩০-৫০ সাল ছিল তাদের উজ্জ্বল অধ্যায়। তারপর থেকে হলিউড কিংবা অন্য ধারার ছবি, দুই মঞ্চেই মেক্সিকোর ছবি বারবার বিশ্বের দর্শকদের শ্রদ্ধা আদায় করেছে, বারবার অস্কার মঞ্চে পুরস্কৃত হয়েছে তাঁদের ছবি। ২০০০ সালের দিকে মেক্সিকান সিনেমা এক নতুন রূপ নেয়, যা বিশ্বজুড়ে সাড়া ফেলে। বাস্তবসম্মত গল্প, রাজনৈতিক সচেতনতা এবং ভিন্নধর্মী নির্মাণশৈলী এর প্রধান বৈশিষ্ট্য। কুয়ারনের ‘গ্র্যাভিটি’ ও ‘রোমা’, ইনারিতুর ‘বার্ডম্যান’ ও ‘দ্য রেভেন্যান্ট’ এবং দেল তোরোর ‘দ্য শেপ অব ওয়াটার’ ও ‘পিনোকিও’ বিশ্ব চলচ্চিত্রের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছেন এই “দ্য থ্রি অ্যামিগোস”! এদের উত্তরসূরি হয়ে এরপর এক ঝাঁক এমন পরিচালক উঠে এসেছেন যাঁরা মেক্সিকোর দীর্ঘ ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি ও আধুনিক চলচ্চিত্রের মিশেলে নতুন নতুন সৃজনে চমকে দিয়েছেন। জন্ম নিয়েছে নতুন ধারার মেক্সিকান সিনেমা (Nuevo Cine Mexicano)।

ম্যাজিকাল রিয়েলিজম ও অনন্য ভিজ্যুয়াল স্টাইল
মেক্সিকোর ছবিতে তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি, পরাবাস্তববাদ (Surrealism) এবং জাদুকরী বাস্তবতার (Magical Realism) এক অনন্য মিশ্রণ দেখা যায়। লুইস বুনুয়েলের মতো কিংবদন্তি পরিচালক মেক্সিকোতে থেকেই তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা ছবি ‘লস ওলভিদাদোস’ (Los Olvidados) নির্মাণ করেছিলেন। গিয়ের্মো দেল তোরোর ফ্যান্টাসি ও হরর ঘরানার ছবিতে এই মেক্সিকান সংস্কৃতির গভীর প্রভাব স্পষ্ট।সিনেমাটোগ্রাফার এমানুয়েল লুবেজকি (যিনি পরপর তিন বছর অস্কার জিতে ইতিহাস গড়েছেন) এবং রদ্রিগো প্রিয়েতো-র মতো মেক্সিকান ক্যামেরার জাদুকররা আধুনিক বিশ্ব চলচ্চিত্রের ভিজ্যুয়াল ভাষাকে বদলে দিয়েছেন।
মেক্সিকোর বিশ্বখ্যাত সিনেমাটোগ্রাফার ও পরিচালক নিকোলাস এচেভারিয়া এই ধারার সৃজনশীল পরিচালক। শুধু পরিচালনা নয়, ভিজ্যুয়াল বা দৃশ্যনির্মাণের ক্ষেত্রেও তিনিও মেক্সিকোর অন্যতম সেরা পরিচালক, বিশ্বসেরা তথ্যচিত্র নির্মাতা।
তাঁর ছবি শুধু তথ্য তুলে আনে না। বরং ভাবায়। সিনেমা নির্মাণের ব্যাকরণ, তথ্যচিত্র নির্মাণের স্টাইল এবং ভিজ্যুয়াল টেকনিকে তিনি ভীষণভাবে প্রভাবিত করেন। তাঁর ছবিতে মেক্সিকোর আদিবাসী সংস্কৃতি, আধ্যাত্মিকতা এবং ইতিহাস গভীর মেলবন্ধনে হাজির হয়। এচেভারিয়া এর জন্য সেদেশের ‘হুইচোল’ (Huichol) আদিবাসীদের সঙ্গে দুই বছর নিত্য যাপন করেছেন। তাঁদের জীবনযাত্রা ও প্রাচীন আচার-অনুষ্ঠান ক্যামেরাবন্দী করেছেন তাঁদের সঙ্গে থেকে। তাঁর প্রখ্যাত তথ্যচিত্র:

পোয়েতাস কাম্পেসিনোস (Poetas campesinos – 1980) : মেক্সিকোর গ্রামীণ জীবন ও লোকসংস্কৃতির এক অনন্য ভিজ্যুয়াল দলিল এই ছবি।
২. বিখ্যাত প্রামাণ্যচিত্রসমূহ
মারিয়া সাবিনা, মুহের এস্পিরিতু (María Sabina, mujer espíritu – 1978): এটি তাঁর অন্যতম সেরা প্রামাণ্যচিত্র মেক্সিকোর বিখ্যাত মাজাতেক ওঝা বা আধ্যাত্মিক নিরাময়কারী (Shaman) মারিয়া সাবিনার জীবনের ওপর ভিত্তি করে এটি নির্মিত।
পরিচালকের আশিতম জন্মদিনে মেক্সিকো দূতাবাসের সহযোগিতায় সিনে সেন্ট্রালের আয়োজনে নিকোলাসের চারটি ছবি প্রদর্শিত হল।
poetas campesinos (Rural poet)
মুষ্টিবদ্ধ হাত ছুঁড়ে দেয় আকাশে
poetas campesinos (Rural poet)
নির্মল লোকসংস্কৃতির প্রাণ কি নগর সংস্কৃতিতে হারিয়ে যাবে? বিশ্বময় এমন আশঙ্কার মধ্যেই মেক্সিকান পরিচালক নিকোলাস ইচেভারিয়া তাঁর প্রত্যয় জানিয়ে গেলেন অসামান্য তথ্যচিত্র : poetas campesinos (Rural poet) এর মধ্যে দিয়ে।

তথ্যচিত্র নির্মাণে নিকোলাস এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন।বিশ্ব চলচ্চিত্রে এটা এখন আলোচনার বিষয়।তাই তাঁর ছবি দেখার আগ্রহ ছিল ভীষনই। পরিচালকের জন্মদিনে তাঁর এই ছবি প্রদর্শিত হল নন্দনে সিনে সেন্ট্রালের আয়োজনে দুদিনের মেক্সিকো চলচ্চিত্র উৎসবে। পরিচালকের মুন্সিয়ানায় তথ্যচিত্র কতটা নান্দনিক হতে পারে এই ছবি তার একটি অনবদ্য দৃষ্টান্ত।
৪৯ মিনিটের তথ্যচিত্রটি শুরু হচ্ছে ফিচার ছবির ক্যামেরার অ্যাঙ্গেল নিয়ে। গাছের পাতায় বিগ ক্লোজ আপ,তারপর ক্যামেরা আস্তে আস্তে নেমে এসে ধরে একটা আঙিনায় দুই শিশুকে নিয়ে শিক্ষকের ছবি। দেখে মনে হয় যেন কোন শিক্ষক প্রাথমিকের পাঠ দিচ্ছেন ছাত্রকে। লেখাপড়ার অক্ষর দিয়েই চেনানো হচ্ছে সঙ্গীতের স্বর। চিরায়ত ঐতিহ্য এভাবেই বয়ে চলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। এটাই মেক্সিকোর সংস্কৃতি। বেঁচে আছে, বেঁচে থাকবে মানুষের মুখে মুখে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম। বিশ্বায়নের প্রতি যেন রেড লাইট দেখিয়ে দেওয়া এই দৃশ্য, যেন বলে দেওয়া হচ্ছে আগ্রাসী পুঁজিলালিত সংস্কৃতিকে, — না আর গ্রাম গিলতে এসো না।আমরা বেঁচে আছি, বেঁচে থাকব আমাদের আনন্দ নিয়ে। বিশ্বায়নের শুরুর পর্বে নির্মিত এই ছবি দিয়েই পরিচালক যেন জরুরি বার্তাটি রেখে যান লোকসংস্কৃতি বাঁচিয়ে রাখার ঐকান্তিক তাগিদেই।
পর্ণ কুটিরের সামনে দুটি বাচ্চাকে ড রে মি ফা শেখানোর দৃশ্য দিয়ে,তারপর সেটাকেই স্যাক্সোফোন, বাঁশি, তারপর মাঠের মধ্যে অর্কেস্ট্রা পার্টির অনুশীলন এবং তারপর তাদের প্রান্তর পেরিয়ে অন্য কোনো প্রান্তরে এক অনির্দিষ্ট যাত্রায়।ঘোড়ার পিঠে কেউ বাজনা রেখে কেউ নিজের কাঁধে নিয়ে হেঁটে চলেছে এক গ্রাম্য শিল্পীর দল। ঘুম নেই চোখে।নিরলস পদযাত্রা…
তারা বিভিন্ন শহরে কাজ করতে চায়।কাজ খোঁজে।
দ্য মোরেনা কোম্পানি গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়ায়। গাধার পিঠে চেপে তাদের ক্লাউন গ্রামে ঘুরে ঘুরে ডাকে সকলকে। জড়ো হয় শিশুরা। চারদিক থেকে ছুটে আসে শিশুর দল সেই জোকার দেখে। কোনো এক মাঠের মধ্যে ইতস্তত ছড়িয়ে থাকা গাছের নিচে মোরিনা কোম্পানির অর্কেস্ট্রা দল বাজনা বাজায়, জোকার পরিচালনা করে। এক মজার দৃশ্য উপভোগ করে সব বাচ্চা। গ্রাম্য ভাষায় জোকার বলে চলে গল্প, বাজনার দল বাজায় ফাঁকে ফাঁকে। প্রকৃতির বুকে এক নির্মল আনন্দে আবহ নির্মিত হয়।
১৯৮০ সালে নির্মিত এই ডকুমেন্টরি ছবি তুলে ধরে মেক্সিকান লোকসংস্কৃতি। কিছু গ্রাম্য শিল্পী যাঁরা হাততালি আর প্রশংসা ছাড়া কিছুই চায় না। বাচ্চাদের নিয়ে তারা খোলা মাঠে দড়ি টানিয়ে সার্কাস করে। নানা রকম খেলা। আনন্দ বিতরণের আনন্দ, যা আজকের নগর সংস্কৃতি ভুলিয়ে দিয়েছে, মানুষের ভিতর যে অনাবিল সত্তা তার এক আনন্দময় উদযাপন। শুধু বাজনা নয়, বাজনার আবহ আদলে উপস্থাপিত হয় সার্কাস। পরিচালক সেটাকেই প্রেক্ষিত করে সিনেমায় বুনেছেন মানুষের কঠিন সংগ্রামেও নির্মল আনন্দে বেঁচে থাকার ইচ্ছেটাকে।
এই ডকুমেন্টরি দৃশ্য কাব্য হয়ে ওঠে ক্যামেরার শৈল্পিক চলনে। শুরু হয় গাছের পাতার ক্লোজ আপ এবং ধীরে ধীরে নেমে এসে একটি বাচ্চার ড রে মি ফা দেখার বিগ ক্লোজ আপে। টাইটেল দেখানোর আগেই পরিচালক স্থাপিত করেন ট্র্যাডিশন।মেক্সিকান লোকসংস্কৃতির ঐতিহ্য কীভাবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম প্রবাহিত হয়ে চলেছে, তার এক নান্দনিক শিল্পিত প্রতিচ্ছবি সিনেমার প্রতিটা ফ্রেমে। গ্রামে কীভাবে সার্কাস দেখিয়ে বাচ্চাদের নিয়ে খেলা দেখিয়ে একদল মানুষ জীবিকা অর্জন করে, দেখতে দেখতে মনে পড়ে যাচ্ছিল আমাদের দেশের পথে পথে মাদারি খেলা দেখানোর দৃশ্য। কিন্তু এছবি শুধুই মাদারি খেলার নয়।সার্কাসের আড়ালে গ্রাম্য মানুষের কঠিন পেশা, চিত্তের বিনোদনের অছিলায় ক্ষমতার প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেন পরিচালক। সার্কাসের খেলায় শিশু শিল্পী মুষ্টিবদ্ধ হাত ছুঁড়ে দেয় আকাশে, যেন আগামী প্রজন্মের প্রতিবাদ, ক্ষমতাকে বদলে দেওয়ার। একান্ত অনুচ্চারিত নির্ঘোষ ছবির শট বিভাজনে — জনে, নান্দনিক মূঢ়তায় তাই নির্বাক হয়ে বসে থাকে দর্শক সারাক্ষণ। আপাত দৃষ্টিতে মনে হবে, এই ছবি গ্রাম্য জনগোষ্ঠীর জীবন কীভাবে লোক সংস্কৃতি বাঁচিয়ে রাখে তারই সংলাপহীন ভাষ্য যা কথা বলে সঙ্গীতের সুরে।

সিনেমার শেষ দৃশ্য ফের ফিরে আসে প্রথম দৃশ্যে, পরিচালক তুলে ধরেন শিল্পের আবহমানতা।না, ছবি জুড়ে কোনো ঘটনার নির্মাণ নেই, কোনো গল্প নেই। আছে এক দেশের মানুষের চিরন্তন সংস্কৃতির অন্তহীন বয়ে চলা। সিনেমাটোগ্রাফার পরিচালক নিজেই, তাই ছবির ভাবনার সঙ্গে মিশেছে ক্যামেরার অপূর্ব ট্রিটমেন্ট, পরিচালক ছবি নির্মাণ করেন না, ছবিটাই একটি শিল্প হয়ে ওঠে।
মারিয়া সাবিনা : মানুষ কেন ভালো হয় না?
মূলনিবাসী মানুষ ভোগে আত্ম পরিচয়ের সংকটে, কিন্তু এই বিশ্ব ভোগে তার আত্মার শূন্যতায়। ছবি জুড়ে গুপ্ত চর্চার বয়ানে এমনই এক ধ্রুব সত্য তুলে ধরলেন মেক্সিকো চলচ্চিত্রের অন্যতম মুখ নিকোলাস ইচেভারিয়া।
María Sabina, mujer espíritu নামে এই ছবিতে কেন্দ্রীয় চরিত্র মারিয়া। চারপাশের পাহাড় ঘেরা প্রকৃতি যেন হয়ে উঠেছে পার্শ্ব চরিত্র। প্রকৃতির মধ্যে মূলনিবাসী মানুষের বাস। তার সংস্কৃতি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয় নাগরিক সমাজকে। পবিত্রতা সাবিনা বলে, “ওরা দুষ্টু লোক খারাপ লোক।” তাঁর বিশ্বাস, ভালো লোক আসে সূর্যের আলো থেকে,পবিত্র জল থেকে।প্রকৃতির জঠর যেন সেই শুদ্ধ মানবতার জন্ম দেয়। মানবতার খোঁজে পাহাড় থেকে পাহাড়ে ভেসে বেড়ায় মেঘ। মারিয়া হেঁটে বেড়ায় পাহাড়ে, ঝোপের আড়ালে, জীবন লুকিয়ে।
মারিয়া খুব ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়েছে। এক বছরের বড় বোনের সঙ্গে তার বেড়ে ওঠা। তারপর বিয়ে। অল্প বয়েসেই বিধবা হয়ে যাওয়া। এ সবই যেন তাঁর ভবিতব্য। জন্মের আগেই ঠিক হয়ে ছিল।ক্রমে সে ডাইনি প্রথায় শিক্ষিত হয়ে ওঠে।সেই ডাইনি বিদ্যা যা সে শেখার জন্য বইও পড়েছে, সে বই অবশ্য গুপ্তবিদ্যার গুরুদের কাছেই ছিল লুকোনো।অন্য কেউ তার হদিস পায় না। মানুষকে রোগমুক্ত করতে মারিয়া স্পিরিট চর্চা শুরু করে।
৮১ মিনিট ধরে ক্যামেরা কথা বলে মারিয়ার সঙ্গে। ছত্রাক পুড়িয়ে, খাইয়ে (!), নিজে খেয়ে ছত্রাকের সঙ্গে কথা বলে: আমি তোমার হৃদয়ের রক্ত খেয়েছি, তুমি বলে দাও, কীভাবে আমি রোগীকে সারিয়ে তুলব?

Holy children,তারপর আমার শরীরে আসে। মারিয়া বলতে থাকেন : “আমি জিজ্ঞাসা করতে থাকি, কোথায় রোগের বাসা, ওরা বলে দেয়, রোগী সেরে ওঠে। মারিয়া অসুস্থ হয়ে পড়ত, তার শরীরের মধ্যে সেই অশরীরী আত্মা ভর করে। সেই আত্মার সঙ্গেই তার বাস। আত্মার চর্চা চলতে থাকে। মানুষ ঘুমোলে আত্মারা দূরে চলে যায়, জেগে ওঠার আগেই ফিরে আসে।”
গুপ্ত চর্চার অধিবিদ্যায় রোগীকে সারিয়ে তোলার পুঙ্খানুপুঙ্খ ডিটেল এই ছবিতে। অসুস্থকে সারিয়ে তোলার আগে মারিয়া জিজ্ঞাসা করে, কী করে শরীরে রোগ ঢুকলো, কোথায় বাসা করল, তার ঠিকানা জেনে মারিয়ার ঝার ফুঁক চলে। ঝারফুঁকের যে কত কৌশল পরিচালক তার নিখুঁত জীবন্ত প্রদর্শন হাজির করেছেন সিনেমার পর্দায়।
সিনেমা জুড়ে মারিয়ার এই গুপ্তচর্চা দেখতে দেখতে মনে হল : পৃথিবীময় মূলনিবাসী মানুষরা এভাবেই বেঁচে আছে। শত শত বছরের মুখে মুখে শেখা সংস্কৃতি এখনও জীবন্ত। সারা ছবিতে গুপ্ত চর্চার ডকুমেন্টেশন। তার চাইতেও বড় প্রশ্ন ছবিটি তুলে ধরে — নাগরিক সভ্যতার চোখে দেখা কুসংস্কারকে প্রশ্ন করে।কিন্তু কখনও সেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম চলতে থাকা গুপ্ত বিদ্যাকে প্রশ্ন করে না।আবহে মারিয়ার জীবন বর্ণনা চলতে থাকে কিন্তু কখনও তাকে নিয়ে পরিচালক কোনও মন্তব্য করেন না, গুপ্ত বিদ্যা চর্চাকে প্রেত চর্চা বলে, কিন্তু সেই প্রেতের অস্তিত্ব নিয়ে এই ছবি প্রশ্ন করে না।শুধু অন্তরালে থাকা অজানা সংস্কৃতির সাক্ষী হতে চায় মানুষ।
প্রকৃতি — মানুষ ও মূলনিবাসীদের জীবন, অনাদি সংস্কৃতির স্বরূপ সন্ধানে পরিচালক গড়ে তোলেন এমন এক তথ্যচিত্র যা অজানা জীবনের সন্ধানে যেন এক বাঙ্ময় মহাকাব্য।
তথ্যচিত্রটিকে পরিচালক অবিস্মরণীয় উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছেন। তাঁর চলচ্চিত্রের ভাষা নীরবে বুনে চলে একের পর এক অসামান্য ফ্রেম।ক্যামেরা যেন তুলি। নিকোলাস সেলুলয়েডে লিখে চলেন মূলনিবাসী এক বৃদ্ধার জীবন, বিশ্বাস ও সংস্কৃতি।
রুক্ষ পাহাড়ের ঢালে মারিয়া বাস করে এক ঝুপড়িতে। সেখান থেকে দূরে গ্রাম। পাহাড়ের ঢাল দিয়ে পিঠে কাঠ নিয়ে নেমে যায় মানুষ, কেউ বেহালা বাজায়। মারিয়া একা থাকে। কারুর সঙ্গে মেশে না। তবু সে এমন এক মহিলা যে প্রতিদিন জন্ম নেয় সূর্যের আলোয়, জেগে থাকে অন্ধকারে, অসুস্থ প্রতিবেশীর আরোগ্য লাভের সাধনায়। তার জন্য তাঁর নিজের ভিতরে সেই “হলি চিলড্রেন” জাগিয়ে তুলতে হয়, সেই অশরীরী আত্মা এসে বলে দেয় রোগমুক্তির উপায়।

এমন একটা মহিলার জীবন এই ছবির বিষয় যাঁকে নিয়ে একটা সময় গোটা মেক্সিকো উত্তাল হয়েছে। বিশ্বখ্যাত লাইফ ম্যাগাজিন পত্রিকায় কভার হয়েছে মারিয়া। বিশ্বের মানুষ জেনেছে তাঁর জীবনের গল্প। সুদূর আমেরিকা থেকে দল দল নানা মতের নানা ভাবনার মানুষ এসেছে তাঁকে দেখতে। মেক্সিকোর এই পাহাড়ি অজ গ্রাম অবাক! মারিয়া এসব কিছুই চায় নি। বিশ্বকে সে কিছুই জানাতে চায় না। জানতেও চায় না। তাঁর বাস একান্ত নির্জনে। নিজের ঝুপড়িতে। তবু এই বিশ্ব তাঁর পর্ণ কুটিরে এসে হাজির হল। কেন? পরিচালক তার উত্তর খুঁজলেন। অনন্য বিনয়ে পরিমিত সেই অন্বেষণ। ক্যামেরা শুধু অনুসন্ধান করে তাঁর গুপ্ত বিদ্যার রহস্য।
৯৩ তেও সক্রিয় আত্মার চর্চাকারী এই তথাকথিত ‘ডাইনি বুড়ি’।এই রহস্য কি সেলুলয়েডে ধরা সম্ভব? এক কথায় এক অসম্ভবের চিত্রায়ন এই ছবি। জীবনের শেষ প্রান্তে পৌঁছে মারিয়া চিনলেন জগতকে। তারই প্রতিবেশী তাঁর সন্তানকে খুন করে, তাঁর ঘরে আগুন দেয়। তবু সে বলে চলে : আমি তো গরিব। গরিব ছিলাম, গরিব হয়েই মরব যেদিন ঈশ্বর চাইবে। তবু তার প্রশ্ন : এই জগৎ কেন ভালো হয় না? কেন এত হিংসা? এত অসুয়া? সারা জীবন রোগ মুক্তি ঘটিয়েও মানুষের এই রোগের সন্ধান তিনি পান নি, এটাই বলার জন্য পরিচালক ক্যামেরা নিয়ে জাগিয়ে রাখেন সিনেমা শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও। এইখানেই ছবির দ্বন্দ্ব। দ্বন্দ্ব মুক্তির ঠিকানাও খোঁজে। দ্বন্দ্ব মানুষের চরিত্রে। আত্মা তার শুদ্ধ না হলে এই অসুখ সারবে কি করে? অনুচ্চারিত এই প্রশ্ন ছবি রেখে যায়। মেক্সিকোর অজানা পাহাড়ি গ্রাম থেকে বিশ্বময় ছড়িয়ে যায় সেই অমোঘ প্রশ্ন : কেন এই পৃথিবীর মানুষগুলো ভালো হতে পারে না?