১৪৮. শুধুমাত্র রাজস্বের সামগ্রিক দাবির ভিত্তিতে কোনো অঞ্চলের খাজনা নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নিলে তার অনেকটাই ভুল হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায় ফলে বড়জোর তা অনুমান নির্ভর হওয়াই সম্ভব। কৃষি, জনসংখ্যা, মুদ্রা, বাণিজ্যের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি একই ছিল — এমন ধারাবাহিক বছরগুলোতে প্রকৃতপক্ষে যে রাজস্ব আদায় হয়েছে, তার নির্ভরযোগ্য হিসাব (অথবা যেখানে পরিস্থিতির পার্থক্য নির্ণয় করা সম্ভব) ভবিষ্যতে তুলনার একটা মানদণ্ড হিসেবে কাজ করতে পারে (অনুবাদটা ঠিক মত করতে পারলাম কি না জানি না, তাই মূল বাক্য আলাদা করে তুলে দিলাম — Authentic accounts of the revenues actually levied from the country for a continued series of years, where the circumstances of it with respect to cultivation, population, specie, and commerce, can be proved to be similar, or where the difference can be ascertained, may furnish a standard for comparison at a future period)। তবে এই আলোচনায় উল্লিখিত হিসাবগুলোকে মানদণ্ড হিসেবে ধরলে দেখা যায়, ১৭৮৭ সালের এপ্রিলে সমাপ্ত ১১৯৩ বঙ্গাব্দের প্রকৃত রাজস্ব আদায় কাসিম আলীর আমলের পূর্ববর্তী যেকোনো বছরের তুলনায় বেশি ছিল; উল্লেখ্য, কাসিম আলীর বন্দোবস্তকে আমি তুলনার উপযুক্ত মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করি না। দেওয়ানি লাভের প্রথম বছরের বন্দোবস্তের অর্থের পরিমাণ এবং ১১৯৩ বা ১৭৮৬-৮৭ সালের বন্দোবস্তের পরিমাণের মধ্যে যে পার্থক্য রয়েছে, তা সামগ্রিকভাবে পরবর্তী সময়ের (অর্থাৎ ১১৯৩ সালের) অনুকূলেই যায় — এবং এই হিসাবে লবণের ব্যবসা থেকে অর্জিত মুনাফা অন্তর্ভুক্ত হয়নি। ভূমি-রাজস্বের ঘাটতি কাস্টমস আর শুল্ক থেকে পাওয়া আয় দিয়ে বেশিমাত্রায় পুষিয়ে নেওয়া হয়েছে; এছাড়া, সেই সময়কাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত নগদ মুদ্রার (specie) ক্রমহ্রাসমান অবস্থার কথা বিবেচনা করলে — এবং সেই সাথে দুর্ভিক্ষ, পরবর্তীকালের আংশিক খাদ্যসংকট আর অন্য দুর্যোগের প্রভাব এবং পূর্বে উল্লিখিত অন্য যুক্তি আমলে নিলে — সম্ভবত বলা যায়, বর্তমান খাজনা-নির্ধারণের পরিমাণ মোটামুটি যথাযথই হয়েছে। তবে এই সিদ্ধান্তে একটা বিষয় ব্যতিক্রম হিসেবে রাখতে হবে — সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতির যথাযথ বিবেচনাসহ কোনো হস্তান্তরিত বা বিচ্ছিন্ন জমি (alienated lands — অর্থাৎ বিশেষ উদ্দেশ্যে যে জমি, ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা ইজারাদারের নামে রাজস্ব বা খাজনা ছাড় দেওয়া হয়েছিল বা হাতবদল হয়ে অন্য মালিকানায় চলে গিয়েছিল – অনুবাদক) নতুন করে সরকারের নিয়ন্ত্রণে আনার ফলে যদি রাজস্বের কোনো বৃদ্ধি ঘটে, তবে তা এর অন্তর্ভুক্ত হবে না।
১৪৯. এই সিদ্ধান্ত আমি মূলত সারসংক্ষেপের হিসাব এবং সাধারণ যুক্তির ভিত্তিতে তৈরি করেছি; আর এই কারণেই ঠিক হওয়া সম্ভব। কিন্তু যখন জেলার কালেক্টররা তাঁদের নিজ নিজ অঞ্চল সম্পর্কে যে সব তথ্য দিয়েছেন, সেগুলো যখন বিবেচনায় আনা হবে, তখন হয়তো আমরা প্রতিটি জেলার রাজস্ব আর পরিস্থিতির আরও বিস্তারিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সামগ্রিক রাজস্ব-নির্ধারণ সম্পর্কে আরও উপযুক্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারব। কারণ আমি স্বীকার করে নিচ্ছি, কিছু জেলার রাজস্ব উপযুক্ত কারণেই কমেছে, আবার অন্যগুলোতে হয়তো রাজস্ব অনেক বেশি ধার্য করা হয়েছে। এই বিস্তারিত পরীক্ষায় যদি আমি দেখি যে আমার বর্তমান মত পরিবর্তন করার মতো যথেষ্ট কারণ আছে, তাহলে আমি তা করতে দ্বিধা করব না; তবে আমি মনে করি, এই পরীক্ষা আমার আগের মতকেই আরও দৃঢ় করবে।
১৫০. মিস্টার গ্রান্ট বাংলার রাজকোষে জমা করা সমীচীন ও উপযুক্ত মোট রাজস্বের পরিমাণ ৫ কোটি ৩ লক্ষ টাকার হিসাব করেছেন। তিনি রাজস্ব আদায়ের আনুষঙ্গিক খরচ ৫৬ লক্ষ টাকা ধরে নিয়ে কোম্পানিকে সুবা থেকে ৪ কোটি ৪৭ লক্ষ টাকার নিট রাজস্ব তোলার কথা বলেছেন; এর মধ্যে অন্তত ২ কোটি সিক্কা টাকার এমন বার্ষিক অর্থ-অপচয় বা তছরুপের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে যা পুনরুদ্ধারযোগ্য।
১৫১. আমি তাঁর হিসাব বা সিদ্ধান্ত — কোনোটিই মেনে নিচ্ছি না; আমার মতে, এগুলোর কোনোটিরই পেছনে প্রতিষ্ঠিত তথ্য বা জোরালো যুক্তির সমর্থন নেই। আমার বিশ্বাস, কোনো অভিজ্ঞ ব্যক্তিই দাবি করবেন না যে এই বিপুল সম্পদের কোনো বাহ্যিক লক্ষণ দেশে দৃশ্যমান; রায়ত বা জমিদারদের সঞ্চয়ের মধ্যেও এর কোনো হদিস মেলে না, আবার জমিদারদের বিলাসিতার মধ্যেও এর কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। গত দুশো বছরেরও বেশি সময়ের রাজস্বের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে মিস্টার গ্রান্টের হিসাব সমর্থন করার মতো তথ্য পাওয়া মুশকিল; জাফর খানের কর্মদক্ষতা কিংবা কাসিম আলীর বলপ্রয়োগে অর্থ আদায়ের প্রচেষ্টাও তাঁর হিসাবের সপক্ষে কোনো প্রমাণ জোগায় না। এই তথাকথিত সম্পদের বিষয় আবিষ্কারের ভার বর্তমান সময়ের জন্যই হয়তো তোলা ছিল; কিন্তু এর সপক্ষে আরও ভালো কোনো প্রমাণ উপস্থাপিত না হওয়া পর্যন্ত, আমি আশা করব যে সব সময়ের বিচক্ষণ মানুষই তাঁর এই হিসাব কোনো কর্মপদ্ধতির ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকবেন।
১৫২. মিস্টার গ্রান্টের যুক্তি ও মতের বিপরীতে আমার মত লিপিবদ্ধ করার সময়, আমি তাঁর ‘অ্যানালিসিস’ বইটিকে হালকাভাবে দেখতে চাই না। তাঁর গবেষণার শ্রম আর বুদ্ধিমত্তা অত্যন্ত প্রশংসনীয়; তিনি যে উচ্চমানের জ্ঞান আর দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন, তা আমি সানন্দে স্বীকার ও প্রশংসা করি; এবং যখনই সুযোগ আসে, তখনই আমি রাজস্ব সংগ্রহ আর ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে তাঁদের সেই ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে আগ্রহী — যদিও সেই অভিজ্ঞতার দাবি মিস্টার গ্রান্ট নিজেও করেন না। তিনি তাঁর নিজস্ব তাত্ত্বিক ধারণার বাস্তবতা এবং সেগুলোকে বাস্তবে রূপায়িত করার সম্ভাব্যতা — উভয় বিষয়েই সন্দেহের যথেষ্ট কারণ খুঁজে পেয়েছেন। বস্তুত, এ বিষয়ে আমার মত তাঁর গৃহীত অবস্থানের সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। কোম্পানির বর্তমান বিপুল ঋণের বোঝা যে তাদের জন্য এক চরম অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে, সে সম্পর্কে আমি সম্পূর্ণ অবগত; এবং দেশের সম্পদ বা আয়-উৎস থেকে যদি মিস্টার গ্রান্টের ধারণা অনুযায়ী ঋণের বোঝা কমানোর মতো কার্যকর উপায় থাকত, তবে তা কাজে লাগানোর প্রচেষ্টার সুপারিশ করতে আমি বিন্দুমাত্র দ্বিধা করতাম না। কিন্তু আমি যেহেতু নিশ্চিত যে এমন প্রচেষ্টা ব্যর্থ আর কষ্টদায়ক হবে, তাই আমার কর্তব্যের তাগিদেই এই দৃঢ় বিশ্বাসের কথা প্রকাশ করা প্রয়োজন বলে মনে করি।
১৫৩. এখন আমি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় নিয়ে আলোচনা করব — কোন পদ্ধতিতে দেশের রাজস্ব সংগ্রহ করলে কোম্পানির সর্বাধিক লাভ হবে –সেটা নির্ধারণ করা। কোর্ট অফ ডিরেক্টরস এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন; তাই তাঁদের সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা নিয়ে আলোচনা না করে কেবল সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণের সুপারিশ করেই আমি ক্ষান্ত হতে পারতাম। কিন্তু আমার নিজস্ব অভিজ্ঞতালব্ধ পর্যবেক্ষণ লিপিবদ্ধ করাকে আমি আমার পবিত্র কর্তব্য বলে মনে করি; কারণ এই পর্যবেক্ষণগুলো হয় ইওরোপে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলোর সপক্ষে নতুন যুক্তি জোগাবে, অথবা ভবিষ্যতে পুনর্বিবেচনা ও নতুন সিদ্ধান্তের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান সরবরাহ করবে। [১৫৩ স্তবক থেকে আসলে শুরু হল জন শোরের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত সংক্রান্ত প্রস্তাবনা। এটা নিয়ে একটা দীর্ঘ টিকা রইল পরে প্রকাশের জন্য; এখানে দিলাম না — অনুবাদক]
১৫৪. রাষ্ট্রের জন্য দেশের রাজস্ব আদায়ের তিনটে পদ্ধতি রয়েছে। প্রথমত, সরকার নিযুক্ত কর্মকর্তাদের কাজে লাগিয়ে সরাসরি রায়ত বা রাজস্ব থাকবন্দীর নিম্নস্তরের প্রজাদের থেকে রাজস্ব সংগ্রহ — এক্ষেত্রে জমিদার বা ইজারাদারের মধ্যস্থতা লাগে না। ব্যবস্থাপনার এই পদ্ধতি সাধারণত ‘খাস’ নামে পরিচিত; কালেক্টরের অধীনে কাজ করা নিম্নস্তরের কর্মচারী আর রাজস্ব আদায়কারীদের তিনি নিজেই নিয়োগ করেন এবং তাঁদের জন্য নির্দিষ্ট বেতন নির্ধারিত থাকে।
১৫৫. এই পরিকল্পনা যথাযথ ও সফল বাস্তবায়নের জন্য নিযুক্ত কালেক্টরের খাজনা ও ভূমি সংক্রান্ত বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা থাকা আবশ্যক, যাতে তিনি বন্দোবস্ত ও রাজস্ব সংগ্রহের যাবতীয় খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। পাশাপাশি, এই কাজ সম্পন্ন করার জন্য প্রয়োজনীয় সময় ও নিষ্ঠাও তাঁর থাকা চাই; বিশেষ করে মফস্বল বা স্থানীয় পর্যায়ের হিসাবপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই-বাছাই করা প্রয়োজন। গ্রাম বা পরগনার খাজনা আদায়ের কাজে নিয়োজিত নিম্নপদস্থ কর্মীদের ওপর আরোপিত ব্যয়ের বিষয় খতিয়ে দেখা উচিত এবং অত্যধিক হলে তা ছাঁটাই করা প্রয়োজন; তাদের সংখ্যাও নিয়ন্ত্রণ করা উচিত এবং প্রতিটি গ্রামের — এমনকি প্রতিটি রায়তের — খাজনার পরিমাণও যথাযথভাবে নির্ধারণ করা আবশ্যক।
১৫৬. তাত্ত্বিক বিচারে এই বন্দোবস্ত পদ্ধতির সুবিধাসমূহ হলো – কালেক্টর বা রাজস্ব আদায়কারীর হাতে কর বা উপকর (cesses) অত্যধিক বা বোঝার মত হলে তা কমানোর এবং নিম্নবর্গের রায়তদের (শোর লিখছেন, lower classes of ryots) প্রদেয় করের হার সুষম করার ক্ষমতা; এটা তাঁকে জেলার সম্পদ ও আয়-ক্ষমতা যাচাই করার, খাজনা নির্ধারণে অন্যায্য ছাড় দেওয়া হয়ে থাকলে তা জানার, প্রয়োজনে সহায়তা বা ছাড় প্রদানের এবং কৃষি-উন্নয়নে উৎসাহ জোগানোর সুযোগ করে দেয়। এছাড়া, বর্তমানের অতিরিক্ত আদায় ও ভবিষ্যতের নিপীড়ন থেকে কৃষকদের সুরক্ষার জন্য তিনি উপযুক্ত নিয়মকানুন প্রবর্তন করতে পারেন।
১৫৭. মধ্যস্বত্বভোগী কৃষক আর ঠিকাদারদের মুনাফা এবং তাদের জালিয়াতি আর অর্থ আত্মসাতের মধ্য দিয়ে অর্জিত অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা করার ফলে এই পদ্ধতি সর্বাধিক রাজস্ব-উৎপাদনকারী হওয়ার কথা।
১৫৮. এই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে আপত্তি আর এর অসুবিধা হলো — এতে কালেক্টরদের এমন পর্যায়ের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা আর কর্মতৎপরতার প্রয়োজন হয় যা সচরাচর দেখা যায় না অথবা অর্জন করা কঠিন। বর্তমান কালেক্টরদের মধ্যে হয়তো এই গুণাবলি থাকতে পারে, কিন্তু তাঁদের উত্তরসূরিদের মধ্যেও যে সে সব পাওয়া যাবে, তার নিশ্চয়তা নেই। উপযুক্ত অধস্তন কর্মচারী বা প্রতিনিধি নির্বাচন তাঁদের ওপরই নির্ভর করে; এবং দেওয়ান ও তাঁর কাছারির কর্মকর্তারা থেকে শুরু করে সর্বনিম্ন স্তরের ডেপুটি পর্যন্ত সকলের বিশ্বস্ততা আর কর্মতৎপরতা মূলত তদারককারী কর্মকর্তার দক্ষতা ও সতর্কতার ওপরই নির্ভর করে। যদি তিনি তাঁর প্রতিনিধিদের হিসাবপত্র যাচাই করতে এবং তাতে কোনো অসঙ্গতি বা জালিয়াতি ধরতে অক্ষম হন, তবে তিনি প্রতিনিয়ত প্রতারণার শিকার হবেন এবং সেই অনুপাতে সরকারি রাজস্বের ক্ষতি হবে। কর্মে অবহেলার ফলেও একই ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।
১৫৯. রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট চুক্তির মাধ্যমে সরকারের স্বার্থ সুরক্ষিত থাকে না; আবহাওয়া বা ঋতুজনিত বিপর্যয় বা অন্য কোনো কারণে সব ধরণের ক্ষতি বা ঝুঁকি সরকারকেই বহন করতে হয়। রায়তরা যদি ব্যর্থ হয় বা খাজনা পরিশোধে অক্ষম হয়, তবে তা সমাধানের কোনো উপায় থাকে না এবং বার্ষিক রাজস্বের পরিমাণে উল্লেখযোগ্য তারতম্য ঘটতে পারে। দৈনন্দিন কাজকর্ম পরিচালনায় নিয়োজিত দেশীয় কর্মকর্তারা কেবল তাঁদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব বিশ্বস্ততার সাথে পালন এবং সংগৃহীত অর্থের হিসাব প্রদানের সাধারণ দায়বদ্ধতার অধীন থাকেন।
১৬০. এই ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির ওপর রাজস্ব বোর্ডের (Board of Revenue) খুব একটা নিয়ন্ত্রণ থাকে না; তাদের মূলত দায়িত্ব পাওয়া কর্মকর্তার ওপরই নির্ভর করতে হয়, কারণ কাজের খুঁটিনাটি বিষয়গুলো তাদের সরাসরি তদারকির জন্য অত্যন্ত বিশদ ও জটিল।
১৬১. যখন কোনো জমিদারের ভূমিখণ্ডের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়, তখন তিনি নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন; অথবা — যা আরও খারাপ — কালেক্টরের সাফল্য ব্যাহত করার জন্য গোপনে কাজ করতে থাকেন, এবং এমতাবস্থায় সরকারকে তাঁর জীবিকা নির্বাহের জন্য একটা ভাতার ব্যবস্থা করতে হয়।
১৬২. সাধারণত দেখা যায় যে, আমাদের শাসনামলে এই পরিকল্পনার ভিত্তিতে করা বন্দোবস্তগুলো ব্যর্থ হয়েছে। তবে মুসলিম শাসনামলে এটি প্রায়শই কার্যকর করা হতো; তখন তারা কাজের প্রতিটি খুঁটিনাটি বিষয় খতিয়ে দেখত এবং ‘আমিল’ বা কালেক্টরের হিসাবপত্র অত্যন্ত কঠোরতা ও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করত। এই কারণে আমাদেরও এমন পদ্ধতির চেষ্টা করা উচিত কি না, তা এখনো সিদ্ধান্তসাপেক্ষ। [১৮৫]
১৬৩. সাধারণত যেভাবে ‘খাস বন্দোবস্ত’ (সরাসরি সরকারি ব্যবস্থাপনায় বন্দোবস্ত) কার্যকর করা হয়, তাতে আমি যেসব খুঁটিনাটি বিষয়ের কথা বলেছি তার খুব কমই বিবেচনায় নেওয়া হয়; এর অর্থ মূলত সমগ্র জমিদারির রাজস্বের জন্য মালিকের সাথে চুক্তি করার পরিবর্তে, জেলার কালেক্টরকে এমন ক্ষমতা দেওয়া — যাতে তিনি বিভিন্ন পরগনা ও বিভাগের খাজনা আদায়ের লক্ষ্যে কৃষক বা ক্ষুদ্র ভূ-স্বামীদের সাথে সুনির্দিষ্ট চুক্তি সম্পাদন করতে পারেন। কালেক্টরের নিজস্ব বিবেচনানুসারে এই চুক্তিগুলোর বিস্তারিত বিবরণ কম বা বেশি হতে পারে। এই ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির মূল সুবিধা হলো এতে বেশি রাজস্ব পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এই সম্ভাবনা কয়েকটা অনুমানের ওপর নির্ভরশীল — জমিদার তাঁর ভূমির রাজস্ব দানের চুক্তি করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন; ভূমির প্রকৃত আয় বা সম্পদ নির্ধারিত রাজস্বের সমতুল্য; এবং কালেক্টর সেই আয় সম্পর্কে অবগত থেকে তা আদায়ের সক্ষমতা রাখেন ও জমিদারের জন্য প্রয়োজনীয় ভাতার ব্যবস্থা করতে পারেন। যাদের সাথে কালেক্টর চুক্তি করেন, তাদের ক্ষেত্রে একটা আপেক্ষিক সুবিধা থাকতে পারে — তা হলো জমিদারের পরিবর্তে সরকারের সাথে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার ফলে অধিকতর নিরাপত্তা লাভ; তবে কালেক্টর যদি তাঁর দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন থাকেন ও তা যথাযথভাবে পালন করেন, তবে এমনটি হওয়ার কথা নয়। অন্য দিক থেকে বিচার করলে, এই পরিকল্পনায় ‘ফার্মিং সিস্টেম’ বা ইজারা প্রথার অনেক ত্রুটি-বিচ্যুতিই বিদ্যমান; সেই প্রথাটি নিয়েই এখন আলোচনা করা হবে।
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভলিউম-২, ইন্ট্রোডাকশন অ্যান্ড বেঙ্গল এপেন্ডিক্স।

বিশ্বেন্দু নন্দ