কলেজ স্ট্রিট বইপাড়ার দুটি আড্ডা ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল—মিত্র ও ঘোষ প্রকাশনে একটি আর একটি এম. সি. সরকার-এ। এম. সি. সরকারে প্রবীণ ব্যক্তিরা বসতেন বলে সেটার নাম ছিল—হাউস অব লর্ডস। আর মিত্র ও ঘোষে অপেক্ষাকৃত নবীনরা যেতেন, সেজন্য নাম দেওয়া হয় হাউস অব কমনস। দুটি নামই প্রমথ বিশীর দেওয়া।
নরেন দেব
সুধীরবাবুর আড্ডায় কল্লোলের লেখকদের বোহেমীয় স্বভাবের কথা চলছিল। মহাস্থবির জাতক-এর লেখক প্রেমাঙ্কুর আতর্থী, ওঁকে সবাই বুড়োদা বলতেন, বললেন—নরেন, তুমি বলো তো আমাদের বোহেমীয়ান অ্যাডভেঞ্চারের কথা। আমাদের কাছে কল্লোলের লেখকরা তো ছেলেমানুষ।
নরেন দেব বলতে শুরু করলেন—আরে পুরীতে গেছে, হেমেন্দ্র, প্রমাঙ্কুর, সুধীর। চাঁদের আলোয় সমুদ্র তীরে ঘুরে বেড়াচ্ছি।—তা প্রেমাঙ্কুর বললে—দূর, এই চাঁদের আলোয় পোশাক-আশাক ভালো লাগছে না। দ্বিজেন্দ্রলাল তো বলেইছেন—এমন চাঁদের আলো মরি যদি সেও ভালো, সে মরণ স্বরগ সমান—চল আমরা নিরাবরণ হয়ে বেড়াই। তা আমি বললাম—তোমরা কাপরটাপর ছেড়ে যাও, আমি পাহারা দিচ্ছি। বুঝলে প্রবোধ, ওরা তো ঘুরে বেড়াচ্ছে দূরে দূরে। এক পুলিশ এসে আমাকে জিজ্ঞাসা করল, এসব বস্ত্র কার অছি ? তা আমি বললাম, এই স্নান করতে গেছেন আমার কাছে রেখে। সে সমুদ্রের ধারে গিয়ে দেখে ফিরে এসে বলল, কই কেউ তো নেই। আমি বললাম, আছে হয়তো এদিক-সেদিক। সে বোধ হয় কী ভেবে আমার কাছে গ্যাঁট হয়ে বসে রইল। আমি তো দেখি বিপদ। তিন মূর্তিমানের আবছা চেহারা দেখছি দূরে। পুলিশকে একটু বসতে বলে হোটেলে গেলাম। তিনটে গামছা এনে পুলিশের নজর এড়িয়ে ওদের কাছে দিলাম। সেই গামছা সমুদ্রের জলে ভিজিয়ে প’রে ওরা এল। তবে পুলিশের হাত থেকে নিস্তার পাই।
দাদাঠাকুর শরৎচন্দ্র পণ্ডিত
দাদাঠাকুর মানেই এক বর্ণময় চরিত্র। তিনি বেশ কয়েকবার এসেছেন এই আড্ডায়। আর তিনি থাকা মানে তিনিই হয়ে উঠতেন মধ্যমণি। আমাকে খুব স্নেহ করতেন। একবার ব্র্যাবোর্ন রোডে তাঁর সঙ্গে দেখা। বললাম, যাবেন না ? বললেন, হ্যাঁ, তোদের ওখানে তো একবার যেতেই হবে। আমি বললাম, দাঁড়ান, একটা ট্যাক্সি ডেকে আনি। উনি বললেন, ‘ট্যাক্সির দরকার নেই। দা আছে দুটো, কুড়ুল আছে একটা। কাটতে কাটতে চলে যাব।’ দা-কুড়ুল মানে বুঝলাম না। তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম। বললেন, ওরে, আমার নামের শুরুতেই দাদা, অর্থাৎ দুটো দা। আর ঠাকুরকে একটু উল্টেপাল্টে দিলেই কুঠার হয়ে যাবে। পায়ে হেঁটেই চলে এলেন। এসে একাই জমিয়ে দিলেন। গান ধরলেন কলকাতা ভুলে ভরা। আড্ডায় সজনীকান্ত দাসও হাজির। তিনি দাদাঠাকুরকে বললেন, ‘দাদাঠাকুর, কোথায় যাবেন, বলুন। আমার সঙ্গে গাড়ি আছে। আপনাকে ছেড়ে দেব।’ দাদাঠাকুর বললেন, ‘সারা জীবনে অনেক পাপ করেছিস, আমাকে গাড়ি চাপিয়ে একটু পুণ্যি সঞ্চয় কর।’ সজনীকান্ত বললেন, কেন, কী পাপ করেছি ? দাদাঠাকুর বললেন, ‘কত নিপাতনে সিদ্ধ লেখককে মেরে ফেলেছিস। দিকপাল সব লেখককে কত গালমন্দ করেছিস। এটা পাপ নয় !’
শিবরাম চক্রবর্তী
বছর শুরুর আগাম খবর নিয়ে উত্তর কলকাতার মুক্তারাম বাবু স্ট্রিটের মেস বাড়িতে নিমন্ত্রণপত্র গেল শিবরাম চক্রবর্তীর কাছে। তখন তার দারুণ সংকট। খাওয়ার পয়সা নেই বললেই চলে। ভোজন রসিক শিবরামের তখন সকাল, বিকেল কাটলেট, কবিরাজি খাওয়ার ইচ্ছে। কিন্তু চাইলেই জুটছে কই? প্রকাশকের হালখাতার নিমন্ত্রণ পেয়েই খিদেটা তার চাগার দিয়ে উঠল। অতি কষ্টে কয়েকটা দিন নিজেকে সংযত রাখলেন। তারপর পহেলা বৈশাখের দিন দুপুর দুপুর হাজির হলেন প্রকাশকের বৈঠকখানায়। সেখানে হাজির উঠতি কয়েকজন লেখকও।
মিষ্টির পেয়ালা এলো। গোগ্রাসে সেগুলো সাবাড় করে রয়্যালটি চেয়ে বসলেন শিবরাম। ঝানু প্রকাশক জানতেন শিবরামের হাল। তিনি বলে বসলেন, তাহলে একটা বই দিন। টাকা এখনই দেব। দমবার পত্র নন শিবরামও। ঝটপট জবাব দিলেন, বইয়ের অভাব কী? আমার চারটা বই তুমি প্রকাশ করেছ। সেগুলোর ২/৪টা করে পাতা নিয়ে বই করে ফেলো। লেখকের দরকার কী? বিপদ বুঝে অগ্রিম দিলেন সেই প্রকাশক।
আর শিবরাম!
টাকা হাতে পেয়েই উঠতি এক পেট রোগা লেখককে নিয়ে হাজির হলেন উত্তর কলকাতার একটি প্রখ্যাত রেস্তোরাঁয়। অর্ডার দিলেন এক জোড়া পেল্লাই আকারের কাটলেটের। একেকটা প্রায় আধহাত লম্বা! পেটরোগা ওই উঠতি লেখক প্রায় কিছুই খেলেন না। ওদিকে শিবরাম! নিজেরটা শেষ করে হাতিয়ে নিলেন অন্য কাটলেটটাও। তারপর পরম তৃপ্তি ভরে খেতে খেতে একটা ঢেকুর দিয়ে বললেন, ‘এই না হলে হালখাতা! খেয়েদেয়ে হালই যদি না ফিরল, তাহলে কিসের নববর্ষ।’
ঋণ স্বীকার—কলেজ স্টিটের সত্তর বছর (১ ও ২ খণ্ড) সবিতেন্দ্রনাথ রায়