সুদেব সিংহ
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সাহিত্যের রূপ ও রীতিতে নানারকম পরিবর্তন আসছে। যে লেখক তাঁর নিজের সময়ময়ে খুবই জনপ্রিয় ছিলেন, এখন তাঁর অস্তিত্ব খুঁজে বের করাই কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এরকম অনেকের কথাই হয়তো বলা যাবে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় মারা যান মাত্র ৪৮ বছর বয়সে। এই অল্প সময়ে তাঁর বিপুল কীর্তি সমসময়ে সঠিক মর্যাদা পায়নি। তীব্র দারিদ্রের সঙ্গে লড়াই করেছেন এই লেখক। চিকিৎসার সুযোগ পেয়েছেন অতি সামান্য। লেখা প্রকাশিত হয়েছে। তার পর অর্থমূল্য জুটেছে সামান্যই। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানিকবাবুকে নিয়ে আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক বেড়েই চলেছে। জীবনানন্দ দাশ, ঋত্বিক ঘটক, বিজন ভট্টাচার্য, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়— এঁরা সেই বিরল শিল্পীদের মধ্যে পড়েন, যাঁরা সমসময়কে নির্মমভাবে সমালোচনা করেছেন। আপোসহীন মনোভাব নিয়ে এঁরা মানুষের অবস্থানকে নিজের নিজের ক্ষেত্রে নানা পরিপ্রেক্ষিত থেকে বিচার করেছেন। আর মানিকবাবুর জীবন তো এত মজাদার যে তাঁকে নিয়েই রীতিমতো ফিল্ম তৈরি করা যায়। মানিকবাবুর জন্ম ১৯০৮ সালের ১৯ মে। তিনি জন্মেছিলেন সে সময়ের সাঁওতাল পরগনার দুমকা শহরে। যদিও তাঁদের আদি নিবাস ঢাকার বিক্রমপুরে। ১৯২৪ সালেই তাঁর মা নিরোদা দেবী প্রয়াত হন ঢাকার কাছে টাঙ্গাইলে। ১৯২৬ সালে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় মেদিনীপুর কলেজিয়েট স্কুল থেকে অঙ্কে দারুণ নম্বর পেয়ে পাস করেন। ১৯২৮ সালে বাঁকুড়ার ওয়েসলিয়ন মিশন কলেজে প্রথম বিভাগে আইএসসি পরীক্ষায় পাস করেন। এটা অনেকটা হালফিলের উচ্চ মাধ্যমিকের মতো। তাঁর বাবা হরিহর বন্দ্যোপাধ্যায় ডেপুটি কালেক্টর পদে চাকরি করতেন। বাংলার নানা জায়গায় তো বটেই ওড়িশা, বিহার, সাঁওতাল পরগনাতেও চাকরি সূত্রে বসবাস করতে হয়েছে।
অঙ্কে অনার্স নিয়ে ১৯২৮ সালেই বিএসসি পড়তে ভর্তি হলেন প্রেসিডেন্সি কলেজে। অত্যন্ত উজ্জ্বল ছাত্র হিসেবে খুব তাড়াতাড়ি শিক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। কিন্তু বিধি বাম। তাঁর মাথায় তখন ভূত চেপেছে সাহিত্যচর্চার। বন্ধুদের সঙ্গে বাজি ধরে বিচিত্রা পত্রিকায় পাঠিয়ে দিলেন প্রথম গল্প ‘অতসী মামী’। ১৯২৮ সালের ডিসেম্বর সংখ্যায় প্রকাশিত হলো প্রথম গল্প। ক্রমশ এই পত্রিকাতেই নেকি, ব্যথার পূজা গল্পগুলি প্রকাশিত হতে থাকে। প্রথম উপন্যাস ‘দিবারাত্রির কাব্য’ লেখায় হাত দেন। তাঁর দাদারা খুব রাগারাগি শুরু করেন। এক দাদা ধমক দিয়ে বলেন, লেখাপড়ায় ঢিলে দিলে প্রথম শ্রেণি পাওয়া যাবে না। মানিক তাঁর দাদাকে জানান, প্রথম শ্রেণির লেখক হিসেবে আমি অবশ্যই সমাদৃত হবো। এ কথা আজ কে না জানেন যে, তিনি প্রথম শ্রেণির লেখক তো বটেই, বলা যায়, তিনি লেখকদের লেখক। বাংলা ভাষায় যাঁরা লেখালেখি করতে চান, তাঁদের অবশ্যই তন্নতন্ন করে পড়তে হবে, মানিকবাবু রচনাসম্ভার। এর পর একের পর এক অসামান্য ছোটোগল্প এবং উপন্যাস লিখেছেন মানিকবাবু।
১৯৩৫ থেকে ১৯৩৭ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখকজীবনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ সময়। ১৯৩৫ সালের শীত সংখ্যা ‘ভারতবর্ষ’ পত্রিকায় ধারবাহিকভাবে প্রকাশ শুরু হয় তাঁর কিংবদন্তিরও অধিক উপন্যাস ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’। এই বছরই জননী উপন্যাসটি প্রকাশিত হয়। দিবারাত্রির কাব্য উপন্যাসটিও বই আকারে বেরোয়। ১৯৩৬ সালে বই আকারে প্রকাশিত হয় তিনটি অসামান্য লেখা— পুতুল নাচের ইতিকথা, পদ্মানদীর মাঝি এবং জীবনের জটিলতা। ১৯৩৭ সালে প্রকাশিত হয় দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থ ‘প্রাগৈতিহাসিক’।
মানিকবাবু এক সময় সপরিবারে টালিগঞ্জের কাছে দিগম্বরীতলায় থাকতেন। সেখান থেকে চলে যান বরাহনগরের গোপাললাল ঠাকুর রোডে। এখানেই আমৃত্যু তাঁর বসবাস। বাবা ও তিন ভাই এবং পরিবার নিয়ে ওখানেই বসবাস শুরু করেন। ১৯৩৫ সালেই ধরা পড়েছিল তাঁর এপিলেপ্সি বা মৃগী রোগ। দারিদ্র এবং অনাহারের সঙ্গে লড়াই করতে করতে আরও নানা অসুখে আক্রান্ত হন। বিকেলে সামান্য মুড়ি খাওয়ার পয়সাও থাকতো না। তাঁর ভাব ছিল বরাহনগরের জেলে-মাঝিদের সঙ্গে। এই মাঝিরা তাঁকে মুড়ি, ছাতু ইত্যাদি খাইয়েছেন। ১৯৫৬ সালের ৩ ডিসেম্বর এন আর হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উন্মোচিত হচ্ছে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিশ্বরূপ। দুঃখের কথা এই যে, অভাব, যন্ত্রণায় মানসিক ভারসাম্য হারানো মানিকবাবুকে লুম্বিনী পার্ক মানসিক হাসপাতালেও ভর্তি করতে হয়েছিল।
সংগ্রমী মা মাটি মানুষ পত্রিকা ১৯ মে ২০১৭ সংখ্যায় প্রকাশিত