পার্থদা হসপিটালাইজড। সম্বিত। পার্থদার ছোট ছেলে। তার সঙ্গে রাত্রি বেলা পার্থদার শারীরিক বিষয় নিয়ে প্রতিদিন মেসেঞ্জারে কথা হত। গত সোমবার রাত্রিতেও কথা হয়েছিল।
হঠাৎ…
হঠাৎ একদিন রাত্রি। পার্থদার ফোন।
অরূপ বাংলাদেশের বিশ্ব বাঙালি সংঘ ২০১৯-র পাঁচ জন্য শ্রেষ্ঠ বাঙালির মধ্যে আমাকে নির্বাচন করেছে। আমার সম্পর্কে ওঁরা একটা লেখা চান। খুব সংক্ষেপে। লিখতে পারবি?
একটা লেখা লিখে ছিলাম।
বাংলাদেশের কোন এক সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছিল।
এবং পার্থ বসুর ‘শ্রেষ্ঠ বাঙালী ২০১৯’ ইন্ট্রোডাকশন হিসেবে এটা পাঠও হয়ে ছিল।
লেখাটা ছিল। এরকমই। আমি আর একটু সংযোজন করলাম।
#
তখনো শৈশবে। হঠাৎ চার লাইনের নিখুঁত ছন্দ মিলিয়ে একটা ছড়া লিখে ফেলা। আচমকা। ভবিষ্যতের অনিবার্য কবিতা লেখার প্রতিশ্রুতির ভেতর ঢুকে পড়লেন পার্থ বসু।
প্রাত্যহিকতার ফাঁকে পিতার মেরামত করে দেওয়া ছন্দের কান পরবর্তীতে ছন্দের প্রচলিত ও অপ্রচলিত অলিন্দের অভিনবত্বে সহজেই পটুত্ব দেখাবেন তিনি।
ধুলোওড়া মফস্বল। স্বাধীন নাবালক ভারতবর্ষ।
বাগনান হাইস্কুলের মেধাবী ছাত্র। শিক্ষকদের চোখে ছাত্রকে নিয়ে উচ্চাকাক্ষা।
পড়াশোনার পাশাপাশি কবিতার খাতাও ভরে উঠছিল। কবিতার বিষয় শৈশবের মজা। কখনো নিজের সহপাঠীকে নিয়ে
নিছক ছড়া কাটা। ছাত্রদের মুখে মুখে ছড়াটা ক’দিন ঘুরত।
সারা ইস্কুল হইচই।
অত্যন্ত মেধাবী রেজাল্ট। বৃত্তি নিয়ে কলকাতা।
সেন্টজেভিয়ার্স কলেজ। কেমিস্ট্রি অনার্স।
চোখে স্বপ্ন। বড় মাপের কোন কেউকেটা হবার।
শত্তরের উত্তাল কলকাতা।
নকশালবাড়ি আন্দোলন।
মিছিল
তর্ক
টিয়ারগ্যাস
গুলি
আত্মগোপন
প্রায় সমগ্র ছাত্র সমাজ রাষ্ট্র ব্যবস্থা বদলে দৃঢ় চোয়াল। প্রতিনিয়ত ছাত্রদের ওপর পুলিশি জুলুম।
সব কিছু ঘটছে। যেন এটা তাঁর অভিজ্ঞতার একটা পাঠ।
মগজে একটা অদ্ভুত উত্তেজনা। নতুন শহর। নতুন ধরনের বন্ধু। তবু মেধাবী সতর্কতা।
হঠাৎ ছাত্রদের ওপর পুলিশি পাশবিকতা।
নাটক। কবিতা। গল্গ। সিনেমা।
সব কিছুর মধ্যে একটা তীব্র তছনছ করা রাগ।একটা শহর বিদ্রোহে। রাগে। আগুনে।
মিছিল। শ্লোগান। পোস্টার।
পার্থর শরীরমনে একটা ধারণার আঁচ। তবু এই গনগনে আগুনে সময় থেকে এড়িয়ে চললেন।
পার্থর মেসের পাশের রুমের ঘনিষ্ট সহপাঠী ও বন্ধু কল্যাণ দেব। পার্থকে শ্রেণী সংগ্রামে উদ্বীপ্ত করার চেষ্টা করছেন। পার্থ শুনছেন। কিন্তু কোনও প্রতিক্রিয়া তৈরী হচ্ছে না তাঁর। হয়ত হচ্ছে। মগজে। কেননা তাঁর কবিতা ভাবনায় একটা বাঁক এল। লিখলেন—
‘এবং গ্রাম’
‘পল্লীগ্রাম শুনেছিলাম
তোমার নাম সুধা।
কি দেখলাম? দিবসযাম
হাজার চোখে খুদা!’
…………
‘এবার গ্রাম তাই দিলাম
তোমার নাম লড়াই
যে সজ্ঞায় পথ মারায়
উত্তরের তরাই’
……
কল্যাণের অনুরোধে একদিন ইউনির্ভাসিটি ইন্সটিটিউট হলে ছাত্র জমায়েতে। অতর্কিতে পুলিশী আক্রমণ। লাঠিচার্জ। চোখে মোটা পাওয়ারের চশমার কারণে ছুটে পালাতে গিয়ে হোঁচট। ছিটকে পড়লেন। গলিতে। মুখের ওপর নেমে এল অনেকগুলো ঘুসি। মুখ রক্তাক্ত হবার আগেই জ্ঞান হারালেন।
জ্ঞান ফিরতে বুঝতে পারলেন তিনি পুলিশী কাস্টোডিতে। শরীর অসার। পুলিশি জেরার মুখোমুখি।
এক কনস্টেবল তাঁর শরীরে জলন্ত বিড়িটাকে অ্যাস্ট্রেতে ফেলার মত ঘষে ঘষে নিভিয়ে দিচ্ছে।
আবার জ্ঞান হারালেন পার্থ।
জ্ঞান ফিরতে বুঝতে পারলেন তিনি কোন হসপিটালে। শরীরে ব্যথা আর স্থবিরতা। চশমাহীন ঘোলাটে চোখ। মগজে চাপচাপ অন্ধকার।
পার্থর মা ছেলেকে খুঁজতে এসে তাঁর মুখের আকৃতি দেখে সনাক্ত করতে পারছেন না। বেড নম্বর ও নামের কারণে চিনতে পারলেন তিনি।
শীর্ণকায় এক মানুষ পার্থকে বললেন ‘কমরেড জিন্দাবাদ।’
পরে জানতে পারেন মানুষটার নাম কমরেড আজিজুল হক।
পার্থ পরের দিনের সংবাদ পত্রের হেডলাইন।
কমরেড পার্থ বসু। পুলিশী খাতায় কুখ্যাত গুন্ডা। পরবর্তীকালে পুলিশী চোখ তাঁকে নিরন্তর পাহারা দেবে। এমনকি চাকরির স্থলেও।
পার্থ মার্কসবাদের বুনিয়াদি দর্শন বীক্ষা শুরু করলেন। পড়লেন ‘রেডবুক’। কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো। মাও-এর বিপ্লব সংক্রান্ত লেখাপত্র। লি শাও চির হাউ টু বি গুড কমিউনিস্ট।
পাঠ্যপুস্তকের মানচিত্রের বাইরে এসে দাঁড়ালেন তিনি। গ্রন্থের বাইরের একটা দেশ। ভারতবর্ষ।
মুটেমজুর। শ্রমিক। কৃষক। নিন্মমধ্যবিত্ত। ছাত্র। ভিখারি। আরও বঞ্চিত নিরিহ অভুক্ত মানুষ। আর অন্য দিকে রাষ্ট্র ব্যবস্থার মধ্যে অনুপ্রবেশকারী রাজনৈতিক ছদ্মবেশে প্রতিক্রিয়াশীল সম্প্রদায়।
শহর মুখরিত শ্লোগান।
গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরো। শ্রেণী শত্রু নিপাত যাক। জোতদার খতম কর। সিভিল ওয়ার জিন্দাবাদ। চিনের চেয়ারম্যান আমাদের চেয়ারম্যান। প্রজাতান্ত্রিক বিপ্লব জিন্দাবাদ।
পার্থ তাঁর শ্রেণি চরিত্রের অর্ন্তদ্বন্দ্বে। নিজেকে ভাঙছেন। ডি-ক্লাসড হবার চেষ্টা করছেন। উত্তাল সময়ের রাজনীতির মধ্যে ঢুকে পড়লেন তিনি।
তাঁর নবজন্ম হল।
এতদিনের ভাববিলাসের কবিতা আর ক্যারিয়ার ভাবনা থেকে নির্বাসিত হয়ে প্রত্যক্ষ জীবনের মুখোমুখি। এই প্রত্যক্ষতা তাঁকে ভাষা দিল। আর কবিতার অর্ন্তগত রক্তের ভেতর গুঁজে দিল বারুদ। তির্যকতা।
‘শিবো আর কবে ঘুম ভাঙবে
দিব আর কতমন দুগ্ধ
এবং বেলপাতার এই তুষ্টি’
এবং ‘দড়ি’, ‘বাদুড়’, ‘অমিতাভ আনবাড়ি সড়কে’ আরও অসংখ্য কবিতার ভেতর তাঁর শ্রেণী জিজ্ঞাসা। তির্যকতা।
পার্টি নেতৃত্ব তাঁকে পাঠিয়ে দিল গ্রামে। যদিও তিনি গ্রামেরই ছেলে।
কিন্তু এই গ্রাম তো অন্য গ্রাম। যেন বিবর্তনের মাঝখানে থমকে পড়া তালগোল পাকানো আদিম কোন জনগোষ্ঠী।
গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, সিনেমা, নাটকে পড়া মানবজীবনের বৈপরীত্যে এক পরাবাস্তবতা। ঘর নেই। খাদ্য নেই। আলো নেই। পোশাক নেই। এবং অভাব জিনিসটাও খাদ্য ছাড়া অন্য কিছু জানা নেই। বহুযুগ আগেই অভাবের কান্নাটা বিস্মৃত। অথচ জীবন।
পার্থর মনে হল ‘সত্যিই তো এঁদের তুলনায় আমি সুবিধাভোগী।’
যদিও পার্থর পিতা নিত্য বসু ছিলেন বাগনান মফস্বলের একজন হোমিওপ্যাথি ডাক্তার। আদি নিবাস হরিনারায়ণপুর। বাগনানের আর একটু ভেতরের কোনও গ্রাম। শরিকি জমিজিরেত আছে অনেকটা। ভাগচাষীরা চাষ করেন। বাড়িতে বছরের চালটা আসে। হঠাৎ তৎকালীন গর্ভমেন্টের ব্লক করিডরিং। মনিটরিং। বাড়িতে চাল আসা বন্ধ হয়ে গেল।
বাড়িতে চূড়ান্ত খাদ্যের আকাল। রোগ আছে। রুগী আছে। কিন্তু রোজগার নেই।
নিত্য বসুর চার কন্যা ও এক পুত্র। স্ত্রী হেমলতা বসু। একদা আব্বাসউদ্দীন সাহেবের ছাত্রী। এবং সহগায়ক। তাঁর এইচ.এম.ভি-তে একাধিক গানের রেকর্ডও ছিল। কিন্তু তিনি একজন গৃহবধূ। সাংসারিক কাজের অবসরে দাত্বব্য হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা করেন।
যদি পার্থ বৃত্তি না পেতেন তাহলে তাঁর উচ্চ শিক্ষা অবান্তর হয়েপড়াটা স্বাভাবিক ছিল।
পরিবারকে ছেড়ে শিক্ষাভিলাষের অপরাধ তাঁকে নিয়ত পীড়িত করত। ভাবতেন বড় কোন চাকরি করে বাড়ির অভাব একদিন মিটিয়ে দেবেন। কিন্তু গ্রামের প্রাগৈতিহাসিক মানুষগুলোর সান্নিধ্য তাঁকে আর এক অপরাবোধ চেনাল।
প্রান্তিকতার ভেতর আর এক প্রান্তিকতা। গ্রন্থ থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন আগেই। এবার বেরিয়ে এলেন ব্যক্তি জীবনের বাইরের একটা পৃথিবীতে।
প্রজাতন্ত্রিক বিপ্লব। জিন্দাবাদ।
বন্দুকের নলই ক্ষমতার একমাত্র উৎস।
এবং বিশ্বাস করলেন শ্রেণি সংঘর্ষের অনিবার্যতা।
নিপীড়িত মানুষের এই সান্নিধ্য পরবর্তীকালে তাঁকে আরও বেশি কমিটেড কবিতা লিখিয়ে নেবে।
হয়তো ভেবেছিলেন কবিতায় শিল্পের মুন্সিয়ানার থেকেও জরুরী সমসাময়িক সময়কে শব্দিত করা। প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞাণকে উচ্চারিত করা।
কবি। ব্যক্তিজীবন। রাজনৈতিক বোধের সংমিশ্রণ। এবং আত্মবিরোধ।
এই সামগ্রিক দ্বান্দ্বিকতা। তাঁকে আজীবন তাড়া করে বেরাবে। কবিতা লেখাবো। কবিতার বিষয় চিনিয়ে দেবে। রাষ্ট্র সম্পর্কে অস্বস্তিকর প্রশ্ন তুলবে। সেই প্রাগৈতিহাসিক মুখগুলো ব্যাংকের উচ্চপদস্থ বড়বাবুর চেয়ারের গদিতে অদৃশ্য আলপিন লুকিয়ে রাখবে। যাতে চেয়ারে বসার কোনও আরাম না পায় মানুষটা।

#
মতাদর্শ। পার্টি লাইন অফ অ্যাকশন। নকশালবাড়ি বনাম নকশাল। তীব্র গোষ্ঠী দ্বন্দ্ব। এবং রাষ্ট্রের সামগ্রিক সন্ত্রাসে নকশাল আন্দোলন ইতিহাস বিবেচিত বিষয় হয়ে পড়ল এক দশকেই।
বিপর্যস্ত। ক্লান্ত। দিশেহারা। পার্থ পড়াশোনা অসমাপ্ত রেখেই ঘর ফিরলেন।
বাড়িতে অনটন। পার্থ চাকরি খুঁজছেন। কিন্তু চাকরির বাজারও তো আক্রা। তার ওপর পুলিশি খাতায় কুখ্যাত আসামী।
মেধাবী ছাত্রের কারণে ‘ব্যাংক অফ বোরোদা’-য় কেরানীর চাকরি। পুলিশ তখনও তাঁর পিছু ছাড়েনি।
স্বয়ং তৎকালীন কুখ্যাত পুলিশ কমিশনার তাঁর ব্রাঞ্চে হানা দিলেন। ব্রাঞ্চ ম্যানেজারের বদান্যতায় চাকরিটা টিকে গেল।
চাকরি। বিয়ে। সংসার।
চাকরির বদলির সূত্রে ঘুরে ঘুরে বেরালেন বিহার, নাগাল্যান্ড, শিলচর।
প্রাদেশিক ভিত্তিতে মানুষের রুচি, খাদ্যাভাস, পারিবারিকতা এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্রতার মধ্যে পার্থ খুঁজতে থাকলেন আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন।
দেশ মানে কি?
ভারতবর্ষ মানে কি?
জাতীয়তা মানে কি?
আর্ন্তজাতিকতা মানে কি?
যদিও চাকরি করছেন। কবিতা লিখছেন। কিন্তু তাঁর ভাবনায় ‘দেশ’ খোঁজার এক নিরন্তর অন্তর্গত যাত্রা শুরু হয়ে গেল।
পার্থর ইতিমধ্যে বারোটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত। এবং প্রশংসিত। বীরেন চট্যোপাধ্যায় থেকে জয় গোস্বামী। অনেকে তাঁর কবিতায় বীরেন চট্যোপাধ্যায়ের সময়ের প্রত্যক্ষতা খুঁজে পান। পার্থ নিজেও সেটা কবুল করেন।
পার্থ এখন দেশ খুঁজছেন। অভিন্ন বাঙালির আত্মসত্তা। তিনি মনে করেন ভারতবর্ষ কোন দেশ নয়। অনেকগুলো জাতির সমাহারে গঠিত একটা রাষ্ট্রীয় কাঠামো। বাউন্ডারির কাঁটাতারের মধ্যে আটকে নিপীড়িত জাতিসত্ত্বাকে বন্দুকের নলের ডগায় অনবদমিত অবনত করে রাখা।
তিনি বিশ্বাস করেন মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারে।
এ মুহূর্তে ভারতবর্ষে উন্মত্ত হিন্দুত্ব বোধের যে রাষ্ট্রীয় চক্রান্ত চলছে পার্থ তার বিপ্রতীপে।
খুঁজে চলেছেন তাঁর দেশের ঠিকানা।
বাংলা ভাষা। আর অখণ্ড বাঙালীর জাতি সত্বাকে।