এবার জনারণ্য ছেড়ে প্রশান্তির ছায়াঘেরা বৃক্ষমায়ায়, পাহাড় যেথায় নিশ্চিন্ত নিদ্রায় নীল আকাশের গায়।
আর সবুজ দেহলীতে চা-কফির আরামের আশ্বাস, প্রশ্বাসে আনে শান্তির বাতাস।
২৫শে ডিসেম্বর ভোর ৫টায় কলকাতার বাড়ী থেকে বেরিয়ে সকাল ৯.৪৫ ব্যাঙ্গালুরু পৌছে, ওইদিনই ২টোতে মাইসোর রওনা। প্রথমে ১৫০০ বছরের পুরোনো ফিলোমিনা চার্চ দেখে, চামুণ্ডা হিল থেকে সাঁঝের আলোয় মাইসোর দেখা। পাহাড়ের ওপর থেকে মনে হচ্ছিল ‘থোকায় থোকায় জোনাই জ্বলে’ পাহাড়কোলে। তারপর মাইসোর প্যালেসের আলোকসজ্জা দেখে মনে হচ্ছিল, যেন স্বর্গ নেমেছে ধরায়…
রাত ৮টাতে ওই রাতে রওনা হলাম অরন্যবাসে এই প্রথম…কর্ণাটকের বন্দিপুর, তামিলনাড়ুর মধুমালাই ও মাসিনাগুড্ডির উদ্দেশ্যে।

বন্দিপুর ফরেস্ট থেকে ১৬ কিলোমিটার দূরে একটি হোটেলে রাত্রি যাপন করে ভোরবেলা বেরোলাম অরন্য অভিযানে। কুয়াশার চাদর সরাতে সরাতে দৃষ্টি আটকালো রাস্তায় ঘোরা এক পাল হরিনের ওপর।

গাড়ি থেকে নামতে যাচ্ছিলাম, তারা যেন বলে উঠলো, ‘আমাকে আমার মতো থাকতে দাও’। এগিয়ে গেলাম তাদের রেখে আরো ভেতরে। হাতির দল তখন গজমতি চালে প্রাতঃভ্রমণে। আরো কিছুটা এগিয়ে দেখি ময়ূরেরা পায়রার মতো খুঁটে খুঁটে কি যেন খায়। পৃথিবীর যত রঙ, সব যেন তাদের পুচ্ছে ধরা। আহা! জীবন যদি এমন রঙ্গিন হতো তবে কেমন হতো! এখানেই বন্দীপুর ফরেস্ট শেষ আর মধুমালাইতে প্রবেশ আমাদের।
চেকপোষ্টে বাঘ, সিংহ, বাইসনের মতো হিংস্র পশু ছাড়াও মাওয়িস্টদের ছবি আটকানো আছে এখানে।
ভয়ে ভয়ে এগিয়েও এদের কারো সাথে দেখা হয়নি আমাদের। ভাগ্যিস….! কিন্তু আমার পুত্র বললো চলো, আরো গভীর অরন্যে….অগত্যা মাসিনাগুড্ডির উদ্দেশ্যে বিশেষ জীপে বাঘের পরিবার দর্শনে।

অসাধারন সাফারিতে গাছেরা মত্ত নিজ আলাপে, সরু নদী সাপের মতো এঁকেবেঁকে, জলের মধ্যে সূর্যালোক এমন…চাঁদের চাঁদনী মনে হয়, কঞ্চি সব হাত বাড়িয়েই জীপের ভেতর জানায় সম্ভাষণ। এতটাই ঘন জঙ্গল, দিনকে রাত্রি বলে ভুল হচ্ছিল। যাইহোক ১ ঘন্টার পরিক্রমায় বাঘের দেখা পাই নি। প্রার্থনা করছিলাম যে, হে ভগবান বাঘ যেন বেড়াতে যায়, বাড়ী না থাকে। বাঘ না পেলেও এই শীতেও রক্তরাঙ্গা পলাশ দেখেছি। অকল্পনীয় আনন্দ নিয়ে শেষ হলো আমাদের সাফারি এই অরণ্যে যেথা….
ভোরের রঙ নীল
দিন ধূসর….
কমলা গোধূলি আর
রাত রূপোলি।
পরেরদিন রওনা হলাম হিমগিরি পর্বতের পাদদেশে শৈলশহর উটি। বৃক্ষের স্নেহচ্ছায়া মাখতে মাখতে পাহাড়ী পথে চলেছি। গাছেরা বলছে, সূর্যের উষ্ণতা নাও, কিন্তু উত্তাপে পুড়ো না….ছায়ায় এসো আমার।

এলাম উটি
নীল আকাশের ছাদ
সবুজ চায়ের উঠোন
পাহাড়ের দেওয়াল….. ভাবলাম ফিরবো না আর এখান থেকে। পরের দিন ভোরে রোজ গার্ডেনের গোলাপী আভায় গোলাপী হলাম। ৫ডিগ্রী টেম্পারেচারে লেকের জলে নৌকাভ্রমণে রোদস্নান। ডোডাবেট্টা পিক থেকে সূর্যাস্ত, বোটানিক্যাল গার্ডেনে শান্তির বিরাম, চা প্রসেসিং, গরম চকোলটের আস্বাদ ও সুগন্ধি সৌরভের কারখানায় ফুরফুরে মন, চা বাগানের সবুজ স্নেহ…. সব মনভোলানো।

পরেরদিন ফিরতে মাইসোরের বৃন্দাবন গার্ডেনের সৌন্দর্যে মনে হলো রাধাকৃষ্ণ এখানেই বিরাজ করেন। এটি বিতর্কিত কাবেরী নদীর বাঁধের পাশে।তারপর মাইসোর প্যালেসের মিউজিয়াম দেখে আপনজনের জন্য টুকটাক জিনিস কিনে ফিরলাম ছেলের ফল্যাটে।
দু-দিন পর কলাকাতা ফিরলাম নিজের ফল্যাটে। তরপর কর্মজগতে।