কেন্দ্রীয় সরকার অর্থনীতির ক্ষেত্রে পরপর তিনটি জবর ধাক্কা খেয়েছে—নোটবন্দি, জিডিপি-র হার কমা এবং মেক ইন ইন্ডিয়ার ব্যর্থতা। এই ধাক্কা সামলানো বড়ো কঠিন।
ধাক্কা এক— নোট বাতিল
নোট বাতিলের ফোলানো ফানুস চুপসে গেল। নোট বাতিল ঘোষণার দশ মাস পরে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক জানালো, বাতিল নোটের ৯৯ শতাংশ ব্যাঙ্কে ফেরত এসেছে। গত বছর নভেম্বর মাসের ৮ তারিখ রাতে দেশজুড়ে তোলপাড় তুলে ১০০০ ও ৫০০ টাকার নোট বাতিল করেছিল কেন্দ্রীয় সরকার। নাটকীয় ঘোষণা ছিল প্রধানমন্ত্রীর। এর ফলে বিস্তর হেনস্থার মুখে পড়েছিলেন অগণিত মানুষ। ব্যাঙ্কের লাইনে দাঁড়িয়ে ধকল সহ্য করতে না পেরে শতাধিক মানুষের মৃত্যুর মতো বেদনাদায়ক দুঃখবহ ঘটনা ঘটেছিল দেশের নানা প্রান্তে। নগদের অভাবে ব্যবসা বন্ধ, রুজিতে টান, ব্যাঙ্ক এবং স্বল্প সঞ্চয়ে সুদের হার কমা— এত সবের পরেও লাভের লাভ কিছু হলো না।
কোনও অর্থনীতিবিদ আজ পর্যন্ত নোট বাতিলকে একটি নীতি হিসেবে হাজির করেননি। এ কথা কি দেশের প্রধানমন্ত্রী জানতেন না? জানা তাঁর উচিত ছিল। তবুও, তিনি যখন নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত নিলেন, তখন এর সম্ভাব্য ফলাফল সম্পর্কে নিশ্চয়ই তাঁর স্পষ্ট ও সুবিবেচনাপ্রসূত ধারণা ছিল— এমনটা অনুমান করা যায়। কিন্তু আমরা যা দেখলাম তা অন্য কথা বলে। এ যাবৎকাল তিনি নোট বাতিলের লক্ষ্য নিয়ে যতগুলি কথা বলেছেন, নোট বাতিল তার কোনওটিই পূরণ করতে পারেনি। সন্ত্রাসবাদ আগের মতোই আছে। দুর্নীতিও কিছুমাত্র কমেনি। নকল নোট আছে। ডিজিটাল লেনদেনের পরিমাণ বাড়লেও এখন ফের কমে গেছে। করদাতার সংখ্যা ঠিক কত বেড়েছে, তার কোনও নির্দিষ্ট সংখ্যা এখনও জানা যায়নি। আয়কর আদায়ের পরিমাণ কতটা বাড়ল এবং নোট বাতিলের সাথে তার সোজাসুজি সম্পর্কটাই-বা কি, তার কোনও উত্তর পাওয়া যায়নি। গত ন-মাস ধরে চলছে শুধু অস্বচ্ছতা, আর গোপনীয়তা। সাথে আছে ভুল বোঝানোর চেষ্টা।
অর্থমন্ত্রী বোঝাবার চেষ্টা করছেন, রিজার্ভ ব্যাঙ্কে টাকা ফিরে আসার অর্থ, সেই টাকা কারও না কারও ব্যাঙ্কের খাতায় জমা পড়েছে। এটাই টাকা ফেরার একমাত্র পথ। এর অর্থ টাকার মালিকানা বদলায়নি। বরং কালো টাকা সাদা হয়েছে। সব টাকা যদি ফিরেই আসে, তবে প্রধানমন্ত্রী-অর্থমন্ত্রী কাদের শায়েস্তা করলেন? অর্থনীতির উপর এত বড়ো জুলুম চালাবার পর কী পাওয়া গেল? ন-মাস পরেও তার উত্তর নেই। প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক চিন্তার গলদ যে বিপুল— তা এখন ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
তবে কি নোট বাতিলের চিন্তাটি অর্থনীতির দিক থেকে করাই হয়নি, এটা ছিল পুরোপুরি রাজনৈতিক কৌশল? এর পেছনে ছিল কূটকৌশল। উত্তরপ্রদেশে নির্বাচনের আগে বিরোধীদের হঠাৎ নগদহীন করে দেওয়ার একটা চাল হিসেবেই নোট বাতিলের ঘোষণা। সাথে সাথে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কথা বলে মানুষের আবেগকে ব্যবহার করার বিষয়টাও নিশ্চিতভাবে ঘোষণাকারীর মাথায় ছিল। তিনি কেন নোট বাতিল করেছিলেন সেই প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট ও যুক্তিগ্রাহ্য কোনও উত্তর এখনও প্রধানমন্ত্রী দিতে পারেননি। তাই তার সম্পর্কে অভিযোগগুলি মান্যতা পায় বই কী।
অথচ নোটবন্দির পরে সাধারণ মানুষ অসীম যন্ত্রণা সহ্য করেছিলেন কেবলমাত্র এই আশায় যে, দুর্নীতির মূলোচ্ছেদ হবে। দেশের প্রধানমন্ত্রী তো ব্যাঙ্কের লাইনে দাঁড়ানো বৃদ্ধ নাগরিকদের সেই আশ্বাসই দিয়েছিলেন। স্বাধীনতা দিবসেও লালকেল্লা থেকে তিনি দাবি করেছেন, উদ্ধার হওয়া কালো টাকার মূল্য তিন লক্ষ কোটি। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের রিপোর্ট সেই দাবিকেও অসত্য প্রমাণ করলো।
আসলে, নোট বাতিলের ফলে কালো টাকা বা জাল নোট কতখানি উদ্ধার হবে, তা নিয়ে আগে থেকেই সংশয় ছিল। হিসেবের থেকেও বেশি নোট জমা পড়েছে। এই আশঙ্কায় রিজার্ভ ব্যাঙ্ককে জমা হওয়া টাকা দু-বার করে গুনতে নির্দেশ দেয় অর্থ মন্ত্রক। তাতেও মুখরক্ষা হলো না সরকারের।
জানা গেল, বাজারে চালু নোটের মধ্যে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের ঘরে ফেরত আসেনি ১৬ হাজার কোটি টাকা। অথচ নতুন নোট ছাপিয়ে তা দেশের ব্যাঙ্ক, এটিএম ও ডাকঘরে পৌঁছে দিতে খরচ হয়েছে ২১ হাজার কোটি টাকা।
নোট বাতিল নিয়ে প্রথম রাত থেকেই সরব ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের রিপোর্ট শোনার পর তিনি স্পষ্টভাবে বলেছিলেন,
”নোটবন্দি নিয়ে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক যা বলেছে তা কি দুর্নীতিকেই ইঙ্গিত করে না? আমি মনে করি, এটা পুরোটাই ফ্লপ শো। বাতিল হওয়া টাকার ৯৯ শতাংশই তো রিজার্ভ ব্যাঙ্কে ফিরে এসেছে। ফেরেনি মাত্র ১ শতাংশ। এদিকে, এর জেরে শয়ে শয়ে লোক মারা গিয়েছে। কোটি কোটি কৃষক-মজুর, অসংগঠিত ক্ষেত্রের কর্মী, যাঁরা সমাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, অপরিসীম যন্ত্রণার মধ্যে দিন কাটিয়েছেন। চতুর্থ অর্থবর্ষেই নোটবন্দির জেরে দেশের তিন লক্ষ কোটি টাকার জিডিপি নষ্ট হয়েছে। বলা হয়েছিল, নোটবন্দি কোটি কোটি কালো টাকা উদ্ধার করবে। বাস্তবে দেখা গিয়েছে, পুরোটাই মস্ত বড়ো গোল্লা। সরকার কি ইচ্ছে করেই কালো টাকাকে সাদা টাকায় বদলানোর সুযোগ করে দেয়নি? তলায় তলায় কী উদ্দেশ্য ছিল? সুপ্রিম কোর্টের উপর আমাদের অগাধ আস্থা। যেহেতু নোটবন্দির ব্যাপারটা সাংবিধানিক বেঞ্চে পাঠানো হয়েছে, সুপ্রিম কোর্টের কাছে আমাদের বিনীত আবেদন, এর যেন যথাযথ বিচার করে।”
এর আগে বলা হচ্ছিল, নোটবন্দির সময়ে বাজারে যে টাকাটা ছিল তার একটা বড়ো অংশ, প্রায় ২০ শতাংশের উপর কালো টাকা। কোনও কোনও হিসেবে জানা যায়, ৩ থেকে ৪ লক্ষ কোটি টাকাই ছিল কালো। আর এই টাকাগুলো ছিল মূলত ১০০০ ও ৫০০ টাকার নোটে। ওই টাকা আর সরকারের ঘরে আসবে না। এতে কালো টাকা নির্মূল হবে। কিন্তু তা হয়নি। ফেরেনি মাত্র ১৬ হাজার কোটি টাকা। প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক যে, সরকারের হিসেবটা কি জেনেবুঝেই ভুল ছিল?
হিসেবটা একবার ভালো করে দেখা যাক
ধাক্কা দুই— উৎপাদন শিল্পে অগ্রগতি হচ্ছে না
বড়ো বড়ো নীতির কথা অনেকেই বলেন। কিন্তু বাস্তবে সেই নীতিকে কার্যকরী করা সত্যিই খুব কঠিন। উৎপাদন শিল্পের জন্য ভারতের পরিবেশ কতটা অনুকূল, সেই বিষয়ে নীতি আয়োগের একটি সমীক্ষা ফের কঠিন বাস্তবতাটিকেই তুলে ধরেছে। ভারতের প্রধান প্রধান রাজ্যগুলিতে সংগঠিত ক্ষেত্রে তিন হাজারেরও অধিক ছোটো-বড়ো উৎপাদন শিল্পের উপর করা সমীক্ষা বলছে— অগ্রগতি যৎসামান্য। এমনকী কেন্দ্রের ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ নীতি আদৌ কোনও পরিবর্তন এনেছে কিনা, তা নিয়েও সংশয়ী শিল্পমহল। কিছু ক্ষেত্রে পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে— এমন কথাও এখন শিল্পমহলে কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে।
শিল্প প্রতিষ্ঠার জন্য প্রথমেই প্রয়োজন সরকারি ছাড়পত্র। প্রয়োজন পরিবেশ, বাস্তুতন্ত্র এবং সমাজকল্যাণের সুরক্ষা ব্যবস্থা। আর এ ক্ষেত্রেই লাল ফিতের ফাঁস বেশ আঁট হয়ে বসে গেছে। জমি পেতে, নির্মাণের ছাড়পত্র জোগাড় করতে একশো দিনেরও অধিক সময় লেগে যাচ্ছে। সমীক্ষা অনুযায়ী, বিদ্যুৎ সংযোগ পেতে লাগছে ৫২ দিন। এটা জাতীয় গড়। বলা বাহুল্য, অনেক রাজ্যে পরিস্থিতি আরও খারাপ। শিল্প-সম্পর্কিত অভিযোগের দ্রুত আইনি মীমাংসার ব্যবস্থাও যথেষ্ট দুর্বল। অবস্থার উন্নতি হয়নি। সমীক্ষা বলছে, কোনও অভিযোগের ফয়সালা হতে গড়ে দু-বছর লেগে যায়। তথ্যটি খুবই বিরক্তিকর।
শিল্পস্থাপনের বা চালু রাখার সুবিধা খুব আশাব্যঞ্জক নয়। ভারতকে শিল্পবান্ধব বা শিল্প-অনুকূল করে তোলার অঙ্গীকার কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে বারবার উচ্চারিত হলেও তা কার্যকরী হয়নি। সরকারের ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ নীতির প্রতীক সিংহ। এর সাথে গুজরাটের যোগ আছে। বহুল আলোচিত বিষয় হলো— গুজরাটে নাকি লগ্নি টানতে এবং শিল্পের উন্নতিতে গুজরাট সরকার সফল। তাই দেশবাসীর ভরসা আছে গুজরাটের এক সময়কার মুখ্যমন্ত্রী এবং এখন দেশের প্রধানমন্ত্রীর ওপর। কিন্তু নীতি আয়োগের সমীক্ষা দেখালো— বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার সিংহের গতিতে নয়, শম্বুকগতিতে চলছে।
কেন্দ্রীয় সরকারের ‘এক জানালা ব্যবস্থা’-র কথা নাকি ৮০ শতাংশ শিল্পকর্তা জানেনই না। তাই বিদেশি সংস্থাগুলিও লগ্নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না।
দিল্লি কিংবা মুম্বাইয়ের চিত্র যতই উজ্জ্বল করে দেখানো হোক না কেন, নীতি আয়োগের সমীক্ষা অনুযায়ী সর্বভারতীয় চিত্রটি যথেষ্টই ম্লান।
এর কারণ নিহিত আছে রাজ্যগুলির সাথে কেন্দ্রের শিল্প বিকাশ নিগমের প্রয়োজনীয় সংযোগ ও সহযোগিতার অভাবের মধ্যে। ফলে শিল্পের পরিকাঠামোগত উন্নতি হচ্ছে না। বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলিও বিশেষ উন্নতি করতে পারছে না শিল্পের ক্ষেত্রে।
এর জন্য যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোকে দুর্বল করার কেন্দ্রীয় প্রবণতা একটা বড়ো নেতিবাচক ভূমিকা নিয়েছে। একটি ব্যতিক্রমী রাজ্য হিসেবে পশ্চিমবঙ্গের আত্মপ্রকাশ অবশ্যই প্রশংসার দাবি করে। রাজ্যের শিল্পবান্ধব অনুকূল পরিস্থিতি অতীতের শিল্পবিরোধী ভাবমূর্তি পরিত্যাগ করে এখন নতুন শিল্পবান্ধব ভাবমূর্তি গ্রহণ করেছে। রাজ্য সরকারের এক জানালা নীতি, জমি নীতি এবং ই-গভর্ন্যান্স-সহ নানা শিল্পবান্ধব পদক্ষেপ পশ্চিমবঙ্গে শিল্পের ক্ষেত্রে সাফল্যের পথ প্রশস্ত করছে।
উল্লেখ্য যে, দেশের অর্থনীতির সার্বিক হাল ভালো নয়। রাষ্ট্রসংঘের ২০১৫ সালের মানবোন্নয়নের সূচকের তালিকায় ১৮৮টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ১৩১ নম্বরে। উদ্বেগজনক বিষয় হলো— দেশে পুষ্টির অভাবের মাত্রা অত্যন্ত বেশি। দারিদ্র ক্রমবর্ধমান। বেকারি ভয়াবহ। অর্থনীতির বৃদ্ধির হার নিম্নগামী। তাই প্রশ্ন উঠছে— ‘সুদিন’ কবে আসবে?
কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধি নেতা-মন্ত্রীরা উন্নয়নের বড়াই যতই করুন না কেন বাস্তব যে তার বিপরীত, সরকারি সমীক্ষাই তা প্রমাণ করে দিচ্ছে। আর্থিক সমীক্ষার সর্বশেষ রিপোর্টে ফাঁস হয়ে গেছে উন্নয়নের সাজানো তথ্য।
সমীক্ষায় একমাত্র ইতিবাচক দিক, মুদ্রাস্ফীতির হার কম। কিন্তু কম হওয়ার আড়ালে রয়েছে চাহিদা হ্রাস, তা আর আড়াল করা যাচ্ছে না। শিল্পোৎপাদন বাড়ছে না। বিনিয়োগ নেই। নতুন কর্মসংস্থান নেই। বেকারি বাড়ছে তীব্র হারে।
ধাক্কা তিন— জিডিপি বৃদ্ধির হার কমে যাওয়া
সরকারপক্ষের নেতা-মন্ত্রীরা উন্নয়নের যতই বড়াই করুন না কেন, বাস্তব যে একেবারে অন্য কথা বলছে, সরকারি আর্থিক সমীক্ষার সর্বশেষ রিপোর্ট তা স্পষ্ট করে দিয়েছে। এই রিপোর্টে ফাঁস হয়ে গেছে কেন্দ্রীয় সরকারের উন্নয়নের সাজানো তথ্য। এই সমীক্ষায় দেশের অর্থনীতির করুণ ছবিই ফুটে উঠেছে। দেখা যাচ্ছে অর্থনীতির ধূসর ছবি। যার মূল বিষয় হলো— জিডিপি বৃদ্ধির হার কমে গেছে। ঋণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিনিয়োগ হ্রাস হয়েছে। উৎপাদন ক্ষমতার ব্যবহার হচ্ছে না।
মানুষের চাহিদা হ্রাস পেয়েছে। শিল্পোৎপাদন বাড়ছে না। বিনিয়োগ নেই। নেই নতুন কর্মসংস্থান। বেকারি বাড়ছে তীব্রগতিতে। মজুরি বাড়ছে না। ফলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কম। বাজারে চাহিদা কম। চাহিদার অভাবে মুদ্রাস্ফীতির হার কমছে। এদিকে সুদের হার কমে যাওয়ার জন্য এক বড়ো অংশের মানুষের সুদ থেকে আয় কমেছে। চাকরি না মেলায় সাধারণ পরিবারের মাথাপিছু আয় বাড়ছে না। স্বাভাবিকভাবে কেনার চাহিদা বাড়ছে না। চাহিদা না বাড়ায় উৎপাদন ক্ষমতা ব্যবহার হচ্ছে না। নতুন বিনিয়োগের প্রয়োজন হচ্ছে না। পাশাপাশি টেলিকম ও বিদ্যুৎ সংস্থাগুলির মাথায় ঋণের বোঝা বিপুল। ঋণ সংকটে পড়ে বহু সংস্থা বিক্রি হয়ে যাচ্ছে বা একাধিক সংস্থার মার্জার হয়ে একটি সংস্থা হয়ে যাচ্ছে। ফলে কর্মী উদ্বৃত্ত হচ্ছে। হচ্ছে ছাঁটাই। ব্যয় সংকোচনের জন্যও কর্মী ছাঁটাই হচ্ছে। বেশি হচ্ছে তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে।
কৃষিক্ষেত্রে অবস্থা যথেষ্ট সংকটজনক। কৃষকদের সংকট বাড়ছে। কৃষক ফসলের দাম পাচ্ছে না। কয়েকটি রাজ্যে কৃষিঋণ মকুব হলেও, পরের মরশুমে চাষের জন্য আবার ঋণ নিতে হবে। সেই ঋণ শোধ দেওয়া কঠিন হয়ে যাবে। অতএব, কৃষকের মৃত্যুমিছিল থামছে না। ব্যাঙ্কের অনাদায়ী ঋণ আরও বাড়বে। ফলে বাড়বে অনুৎপাদক সম্পদ।
জিডিপি বৃদ্ধির হার ৫.৭ শতাংশ নেমে গেছে। এতে বিচলিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। সরকার দেশের অর্থনীতিকে এমন অবস্থায় নিয়ে চলেছে যে, এই সরকারের উপর ভরসা করা চলে না। ভরসা করা উচিতও নয়। জিডিপি কাকে বলে, তা যাঁরা জানেন না, সেই সাধারণ মানবসন্তানরাও বিলক্ষণ জানেন যে, এই হার কমতে আরম্ভ করলেই দেশের সর্বনাশ।
জিডিপি বৃদ্ধির হার গত তিন বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন স্তরে নেমে যাওয়া দেশের উন্নতির সঙ্গে একেবারেই সংগতিপূর্ণ নয়। নোট বাতিলের পর মনমোহন সিং আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, এর ফলে জিডিপির বৃদ্ধির হার দুই শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। সরকারি পরিসংখ্যান তাঁর আশঙ্কাই সত্য প্রমাণ করছে।
মেক ইন ইন্ডিয়ার ব্যর্থতা সম্পর্কে নীতি আয়োগের পর্যবেক্ষণ, নোট বাতিল বিষয়ে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের পরিসংখ্যান এবং সাম্প্রতিক আর্থিক সমীক্ষায় জিডিপির বৃদ্ধির হার কমে যাওয়ার কথা— একই সপ্তাহের মধ্যে প্রকাশিত তিনটি সংবাদ নিয়ে মন্তব্য করতে গেলে বলতেই হয়— অর্থনীতির ক্ষেত্রে ক্ষতির পর ক্ষতি হয়েই চলেছে।
প্রধানমন্ত্রী বুক চাপড়িয়েছেন, কেঁদেছেন, নোট বাতিলে পঞ্চাশ দিনে উপকার না পেলে তাঁর শরীরে আগুন লাগিয়ে দেওয়ার কথা বলেছেন। নানা ধরনের নামের উদ্ভাবক তিনি। তার থেকেও বেশি তিনি অজুহাত তৈরিতে দক্ষতা দেখিয়েছেন। কিন্তু অর্থনীতি তুঘলকি খেয়ালে চলে না। ভোটের তাগিদ এবং চালাকির আশ্রয় ছাড়া দেশকে এগিয়ে নেওয়ার গভীর চিন্তার কোনও ছাপ নেই সরকারি নীতি নির্ধারণে। দেশের পরিচালকরা এরকম হলে উদ্বেগ বেড়ে যায় বই কী।
এই অবস্থাকে আড়াল করতেই বিজেপি উগ্র হিন্দুত্বকে হাতিয়ার করছে। দেশপ্রেম, উগ্র জাতীয়তাবাদ, সাম্প্রদায়িক বিরোধ, বিদ্বেষ, অসহিষ্ণুতা, গোরক্ষার নামে মানুষ হত্যা, দলিত পীড়ন ইত্যাদির মধ্যে মানুষকে জড়িয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকার যে অপচেষ্টা— তা বিজেপি ত্যাগ করতে পারবে না। দেশের সর্বনাশ হোক, ক্ষমতা ধরে রাখতে হবে।