সময়ের কঠিন বাধা পার হয়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় স্বমহিমায় আমাদের মধ্যে রয়েছেন। সময়ের কঠিন বাধা সকলকেই পেরোতে হয়। বিশেষ করে যাঁরা শিল্পকর্মের সঙ্গে যুক্ত তাঁদের ক্ষেত্রে তো বিষয়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রথম যুগের উপন্যাস ‘আত্মপ্রকাশ’ আজও জনপ্রিয় এবং একই সঙ্গে বহু আলোচিত। তারপর ‘একা এবং কয়েকজন’, ‘অর্জুন’, ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’—এসব তো আছেই। পরবর্তীকালে সুনীল লিখলেন ‘সেইসময়’, ‘পূর্ব পশ্চিম’, ‘প্রথম আলো’ প্রভৃতি দীর্ঘ উপন্যাস। এর পাশাপাশি রয়েছে তাঁর কবিতা লেখা। ১৩৬৪ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর কাব্যগ্রন্থ ‘একা এবং কয়েকজন’। পরে এই নামটিই উপন্যাসের শিরোনামেও উঠে আসে। এর কয়েক বছর পর কৃত্তিবাস প্রকাশনী থেকে ‘আমি কীরকম ভাবে বেঁচে আছি’ শীর্ষক কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হলো। এই বইয়ের ভূমিকায় সুনীল লিখলেন, অসীম ধৈর্যের সঙ্গে ওষ্ঠাধার সঙ্কুচিত করে পড়তে হয় নিজের পুরোনো কবিতা। যেগুলি পছন্দ হয় না শরীর রি-রি করে…। জানি, যে কবিতা আমি লিখতে চাই, এখনও তার মর্মস্পর্শ করতে পারিনি। আমি কবিতায় সত্যি কথা লিখতে গিয়ে দেখেছি, পৃথিবীর সত্য প্রতিনিয়ত বদলে যায়। এখানে আমার ধারাবাহিক ভুলগুলি।
‘কৃত্তিবাস’ পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছে। প্রথমে ছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, আনন্দ বাগচী, দীপক মজুমদার প্রমুখ। পঞ্চাশের দশকে এই পত্রিকাকে ঘিরে রীতিমতো সাহিত্য আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। একই সঙ্গে কাব্যকলা এবং কথাসাহিত্যের কাছে নিজেদের দায়বদ্ধতা প্রমাণ করতে চেয়েছেন এঁরা। সুনীল লিখেছেন, খুব সচেতনভাবে দেশের কাজ, দশের কাজ, সমাজ ভাবনা—এসব করতে ঝাঁপাইনি। ভালো করে লেখার চেষ্টা করে গেছি। লেখাকে কী করে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মিলিয়ে দেখা যায় সেই চেষ্টা করেছি। সময় উপযোগী মানে বক্তব্য নয়, বরং সময়ের আঙ্গিককে বোঝার চেষ্টা। তিরিশ দশকের কবিতায় রবীন্দ্রনাথের প্রভাব নিয়ে তীব্র আলোড়ন ছিল। পঞ্চাশের দশকের কবি-লেখকদের সামনে বিষয়টা অনেক সহজ হয়ে গেলো। কারণ সামনে রয়েছেন স্বয়ং জীবনানন্দ দাশ। আর এক এবং অদ্বিতীয় বুদ্ধদেব বসু। এসবের মধ্যে দিয়ে বেড়ে উঠেছেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়। ‘আমি কী রকম ভাবে বেঁচে আছি’ কাব্যগ্রন্থে শেষ কবিতা ‘দেখা হবে’—ভ্রূ-পল্লবে ডাক দিলে, দেখা হবে চন্দনের বনে—/সুগন্ধে সঙ্গ পাবো দ্বিপ্রহরে বিজন ছায়ায়…। এই নির্জনতার খোঁজ করছিলেন এই কবিকুল। কখনও চাইবাসায়, কখনও চক্রধরপুরে কিংবা সাঁওতাল পরগনার কোনও প্রত্যন্ত গ্রামে পালিয়ে গিয়েছেন শহর ছেড়ে। সেই সব কাহিনী লিখেছেন অরণ্যের দিনরাত্রির মতো উপন্যাসে। এই কাহিনি নিয়ে সত্যজিৎ রায়ের অসামান্য ছবির কথা কে না জানে।
নীললোহিত ছদ্মনামে সম্পূর্ণ আলাদা লেখা লিখেছেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। সেখানেও সেই পরিসরের খোঁজ চালাতে পৌঁছে গেছেন দিকশূন্যপুরে। কিন্তু কোনও লেখাই মাটি থেকে দু-চার পা উঁচুতে অবস্থিত নয়। ধরা যাক, ভালোবাসা নাও হারিয়ে যেও না—এই উপন্যাসটির কথা। বাজারে শাক বিক্রি করেন এক বৃদ্ধা। হঠাৎই তিনি আসছেন না। তাঁর গ্রাম খোঁজ করে বৃদ্ধার বাড়িতে পৌঁছে যান নীললোহিত। আমাদের শাকান্নের ব্যবস্থা করেন যাঁরা তাঁদের খোঁজ আমাদের নিতে হবে বই কী। কিন্তু সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কখনও প্রত্যক্ষতা পছন্দ করতেন না। তাঁর আশ্চর্য ছোটোগল্প ‘গরম ভাত অথবা নিছক ভূতের গল্প’ আজ কিংবদন্তি হয়ে উঠেছে। এখানেও রাজনীতি আছে। কিন্তু একমুহূর্তের জন্য ওই প্রত্যক্ষতা নেই। তাঁর ‘কাকাবাবু’ সিরিজের গল্প যে কী প্রচণ্ড জনপ্রিয় তা বলাই বাহুল্য। এই পুজোতে ‘পাহাড় চুড়োর রহস্য’ গল্প নিয়ে ফিল্ম আসছে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের জন্ম ১৯৩৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর, তাঁর প্রয়াণ ২০১২ সালের ২৩ অক্টোবর। আজও তাঁর কবিতা, গল্প, উপন্যাস একইরকম সমাদৃত। ১১টা খণ্ডে উপন্যাস সমগ্র এখনও প্রকাশিত হচ্ছে।