এই শরতে মহানায়কের বয়স হচ্ছে ৯১। ১৯২৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর উত্তর কলকাতার আহিরীটোলায় মামাবাড়িতে জন্ম। তাঁর বাবা সাতকড়ি চট্টোপাধ্যায়, মা চপলা দেবী। ভবানীপুরের গিরিশ মুখার্জি রোডে তাঁদের বাড়ি। আশি-নব্বই কাজের কথা নয়! আসলে মহানায়ক চিরতরুণ, চিরনবীন— আমাদের ওই পাশের বাড়ির ছেলেটি। আমাদের খুবই চেনা কোনও না কোন গলি কিংবা রাজপথের মোড়ে তাঁর জন্য বিশেষ গ্রীবা ভঙ্গি নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন সুচিত্রা সেন। এই ডিজিটাল যুগেও জিন্স, টি-শার্ট পরা তরুণরা মহানায়কের যথেষ্ট ফ্যান। আর তরুণীরা তো দু-হাত তুলে বলেন, সো কিউট, সো কিউট। আমবাঙালির মনে আজও চিরতরুণ উত্তম।
উত্তমকুমার বলতেন, যে ক-জন অভিনেতার উপস্থিতিতে শট দেওয়ার সময় তাঁকে একটু ভেবে নিতে হয় তাঁদের মধ্যে প্রধান হলেন তাঁর ভাই তরুণ কুমার। দু-জন অভিনেত্রীর কথাও বলেছেন। তাঁরা সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় ও অরুন্ধতী দেবী। নিজের দাদার সেই প্রথম অভিনয়ের গল্প শুনিয়েছেন তরুণকুমার। বাড়ির মাঝখানে মঞ্চ বাঁধা হয়েছে। মঞ্চস্থ হচ্ছে রবীন্দ্রনাথের মুকুট। মা-দিদিদের শাড়ি, গয়না নিয়ে রাজা সাজা। এর পর লুনার ক্লাবের প্রতিষ্ঠা। জগদ্ধাত্রী পুজোয় গিরিশ মুখার্জি রোডে দুটো নাটক হতো। একটা করতেন পাড়ার বড়োরা। আরেকটা এই লুনার ক্লাবের সদস্যরা। এর পর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তরুণকুমার আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। উত্তমকুমার জীবনে যা সাফল্য পেয়েছেন সেই সাফল্যকে কীভাবে সংহত করে আরও বড়ো লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়া যায় সে বিষয়েও মহানায়কের বিচক্ষণতা ছিল উল্লেখযোগ্য।
চক্রবেড়িয়া স্কুলে পড়াশোনার পর সাউথ সাবারবান স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাশ করে ১৯৪৪ সালে ডালহৌসির সরকারি কর্মাশিয়াল কলেজ থেকে বি.কম পাশ করেন। এই বছরই কলকাতা বন্দরের চাকরিতে যোগ দেন। সে সময়ের কথা নিজেই বলেছেন মহানায়ক। প্রতিষ্ঠিত পরিবার, পাশ করার পরেই চাকরি অথচ স্টুডিও পাড়ায় ঢুঁ মারা। দিনের পর দিনের নিরাশা। এর পরে তো ১৯৪৭ সালে প্রথম ছবিতে অভিনয়। কিন্তু সাফল্য নেই। ১৯৫৩-৫৪ সালে পর পর বেশ কয়েকটি ছবিতে সাফল্য। সাড়ে চুয়াত্তর, বউ ঠাকুরাণীর হাট, সদানন্দের মেলা, অগ্নি পরীক্ষা প্রভৃতি। এর ঠিক তিন বছর পরে ১৯৫৭ সালে নিজেই সিদ্ধান্ত নিলেন ফিল্ম প্রযোজনা করবেন। প্রথম প্রযোজিত ছবি ‘হারানো সুর’। একেবারে যাকে বলে বাম্পার হিট। অবশ্য তার আগে-পরেও অসংখ্য হিট ছবি রয়েছে। সাগরিকা, সাহেব বিবি গোলাম ইত্যাদি। ঠিক চার বছরের মাথায় আরেকটি ছবি প্রযোজনা, এবার ‘সপ্তপদী’। ভালো চিত্রনাট্য হচ্ছে জানলেই এগিয়ে যেতেন।
সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে উত্তমকুমারের যোগাযোগ খুবই গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন তরুণবাবু। ‘নায়ক’ ছবিতে বিরাট সাফল্য। এবং তার পরেই ‘চিড়িয়াখানা’ ছবিটি। ব্যোমকেশের চরিত্রে মহানায়ককে নির্বাচন করার মধ্যে অনেকেই সত্যজিৎবাবুর অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস রয়েছে ভেবেছিলেন। ছবিটি খুব সফল হয়নি। কিন্তু সাতের দশকের গোড়ায় সত্যজিৎবাবু এবং উত্তমকুমার দু-জনেই নতুনভাবে কাজ করলেন। অভিনয় বিষয়ে সত্যজিৎবাবুর কাছে নানা কিছুই শিখেছিলেন বলেও বার বার বলেছেন মহানায়ক।
যে সময় উত্তমকুমারের সাফল্যের শুরু ওই সময়ই অর্থাৎ ১৯৫৪-৫৫ সালের আরেকটি ঘটনার প্রতি উত্তমকুমারের তীক্ষ্ণ নজর ছিল— তা হলো, বহুরূপীর প্রযোজনা ‘রক্তকরবী’। শম্ভু মিত্রকে খুবই সম্মান করতেন উত্তমকুমার। বলতেন, আমি ওঁর বড়ো ফ্যান। শম্ভু মিত্র এবং তৃপ্তি মিত্র — এঁরা দু-জন বাংলা সংস্কৃতির ইতিহাস রচনা করছেন, বলতেন উত্তমকুমার। বার বার বলেছেন, উচ্চ মানের কাজ করার সুযোগ না থাকলেও সেদিকে যেন নজরটা থাকে। আমি যদি সুযোগ পাই ওটা কি করতে পারবো? এভাবেই এক সাফল্যের সোপান থেকে আরেক জায়গায় দাঁড়িয়েছেন মাহানয়ক উত্তমকুমার। ভিন্ন ভাষার থিয়েটার, সিনেমা— সবসময়ই নজরে রাখতেন।