হাসতে হাসতে এ বছরের ইউএস ওপেন জিতে যাওয়ার কথা জোকোভিচের কিন্তু হল না। বিনা মেঘে বজ্রাপাত। ম্যাচের আগে নোভাক জোকোভিচের টুইটার অ্যাকাউন্ট থেকে একটা ভিডিও পোস্ট করা হলো। দেখা গেল, নিজের ফিজিও উলি’র সঙ্গে সেলফি ভিডিওতে নাচানাচি করছেন এই সার্বিয়ান তারকা। এবার ছিলেন না নাদাল-ফেদেরার। নাদাল করোনাভাইরাসের কারণে, ফেদেরার চোটের কারণে। ফলে জোকোভিচের গলাতেই ঝুলছিল ইউএস ওপেনের বরমাল্য। কিন্তু হলো না। ফলে ২০০৪ সালের ফ্রেঞ্চ ওপেনের পর এই প্রথম কোয়ার্টার ফাইনালে ‘টপ থ্রি’ এর কেউই থাকবেন না।

দ্বিতীয় রাউন্ডের প্রথম সেটেই ঘটেছে অঘটনটা। ২০ তম বাছাই স্পেনের পাবলো বাস্তার বিপক্ষে শেষ আটে ওঠার লড়াইয়ে প্রথম সেটে ৬-৫ গেমে পিছিয়ে জোকোভিচ। হয়তো কিছুটা হতাশও। পকেট থেকে বল বের করে ড্রপ করতে করতে হুট করে পেছনের দিকে মেরে বসেন, পেছনে যে লাইন জাজ আছেন সেটা ভুলেই গেছিলেন! সোজা লাইন জাজের গলায় আঘাত করে সেই বল। সঙ্গে সঙ্গে বসে পড়েন ওই নারী লাইন জাজ, তাঁর আতঙ্কিত চিৎকার শুনে সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে যান জোকোভিচ, ক্ষমা চান। একটু পর সুস্থ হয়ে উঠে দাঁড়ান। কিন্তু ততক্ষণে অঘটন যা ঘটার তা ঘটে গেছে। অনেকক্ষণ ধরে টুর্নামেন্ট রেফারির সঙ্গে কথা বলেন জোকোভিচ। কিন্তু নিয়ম অনুযায়ী শাস্তি এড়াতে পারেননি তিনি, ছিটকে যান টুর্নামেন্ট থেকে। নিয়ম অনুযায়ী, কোনো খেলোয়াড় কোনো পরিস্থিতিতেই ম্যাচ কর্মকর্তা, প্রতিপক্ষ, দর্শক বা টুর্নামেন্টের এলাকার মধ্যে কাউকে শারীরিকভাবে আঘাত করতে পারবেন না। ব্যস, আর তাতেই সাঙ্গ হয়েছে জোকোভিচের ইউএস ওপেনের স্বপ্ন।

২০২০ সালে একটা ম্যাচও হারেননি জোকোভিচ, নাদাল-ফেদেরারহীন টুর্নামেন্ট জিতে হেসেখেলে ওই দুজনের সঙ্গে গ্র্যান্ড স্ল্যামের ব্যবধান কমানোর সুযোগটাও হেলায় হারালেন। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের আচরণের জন্য ক্ষমা চেয়েছেন জোকোভিচ, ‘সম্পূর্ণ পরিস্থিতিটা আমাকে হতাশাগ্রস্ত ও বিষণ্ন করে তুলেছে। আমি ওই লাইন জাজের খোঁজ নিয়েছি, টুর্নামেন্ট কর্তৃপক্ষ বলেছে তিনি ঠিক আছে, ঈশ্বরকে ধন্যবাদ। আমি ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রতি সম্মান রেখে তাঁর নাম বলছি না। আর বাদ পড়ার ব্যাপারে বলব, আমাকে আরও উন্নত খেলোয়াড় ও মানুষ হওয়ার জন্য শিক্ষা নিতে হবে এই ঘটনা থেকে। ইউএস ওপেন টেনিস কর্তৃপক্ষ ও টুর্নামেন্টের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার কাছে আমি আমার আচরণের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করছি। আমার দল, সমর্থক ও পরিবারের প্রতি কৃতজ্ঞ, আমাকে সমর্থন দেওয়ার জন্য। সবাইকে ধন্যবাদ, আমি অনেক দুঃখিত।’
তবে এটা প্রথম নয় এর আগে এই ধরণের ঘটনা টেনিস কোর্টে একাধিক বার ঘটেছে। একে বলা হয় ‘থার্ড কোড ভায়োলেশন’। সেটা শুরু হয়েছিল ১৯৯০ সালে। টেনিস বিশ্বকে এই বিধিমালার আওতায় আনা হয়েছিল। কিন্তু সেই বছরেই ঘটেছিল প্রথম বিপত্তি। ঘটিয়েছিলেন জন ম্যাকেনরো। এরপর ২০১২ লন্ডন কুইন্স ক্লাব এটিপি টুর্নামেন্টের ফাইনাল এবং ২০১৭ সালের ডেভিস কাপে।

১৯৯০ অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের চতুর্থ রাউন্ডে জন ম্যাকেনরো খেলতে নেমেছিলেন মিকায়েল পার্নফোর্সের বিপক্ষে। প্রথম সেট জিতলেও হেরে বসেছিলেন দ্বিতীয়টায়। তৃতীয় সেটে আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছিলেন। চতুর্থ সেটে আবার জেতার পথে ছিলেন পার্নফোর্স। এমন অবস্থায় ঘটল বিপত্তি। গোটা ম্যাচ জুড়েই আম্পায়ার, সুপারভাইজার, রেফারিকে গালাগাল করে যাচ্ছিলেন, অসম্মান করছিলেন জন ম্যাকেনরো। এক লাইন্স-ওম্যানের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করায় আম্পায়ার জেরি আর্মস্ট্রং তাঁকে সতর্ক করে দেন। সে টুর্নামেন্টের আগে নতুন বিধিমালা অনুসরণ করা শুরু করেছিল টেনিস বিশ্ব, যে বিধিমালায় উল্লিখিত ছিল, ‘থার্ড কোড ভায়োলেশন’ করলে খেলোয়াড়কে টুর্নামেন্ট থেকে বের করে দেওয়া হবে। সে অপরাধটাই করেছিলেন ম্যাকেনরো। ব্যস, টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় করে দেওয়া হয় তাঁকে।

২০১২ লন্ডন কুইন্স ক্লাব এটিপি টুর্নামেন্টের ফাইনালে ঘাসের কোর্টে ক্রোয়েশিয়ার মারিন চিলিচের বিপক্ষে নেমেছিলেন আর্জেন্টিনার ডেভিড নালবান্ডিয়ান। প্রথম সেট জিতেছিলেন, দ্বিতীয় সেটে আবার ফিরে আসছিলেন চিলিচ। এই অবস্থায় একটা শট ভালো মতো মারতে পারলেন না নালবান্ডিয়ান। মেরেই বুঝেছিলেন, ভালোমতো মারা হয়নি যে। শট নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মেজাজ হারিয়ে নাইকির বিজ্ঞাপনী এক বোর্ডে লাথি মেরে বসেন এই তারকা। সমস্যা হলো, নাইকির ওই বিজ্ঞাপনী বোর্ড লাইন জাজের আসনের চারপাশে পরিবেষ্টিত হয়ে ছিল। লাথিটা তাই বোর্ড ভেদ করে বিচারকের পায়ে লাগে। ব্যস, বিজয়ী হয়ে যান চিলিচ!

২০১৭ সালের ডেভিস কাপে গ্রেট ব্রিটেনের কাইল এডমুন্ডের বিপক্ষে নেমেছিলেন কানাডার ১৭ বছর বয়সী ডেনিস শাপোলোভ। দুই সেট হেরেছেন, তৃতীয় সেটও হারের মুখে। মেজাজ খারাপ থাকাটাই স্বাভাবিক, এমন অবস্থায় জোরে বল মারলেন একটা। বলটা সোজা আঘাত করল পাশে থাকা আম্পায়ারের আর্নোঁ গাবাসের বাঁ চোখে। সঙ্গে সঙ্গে নিজের ভুল বুঝতে পেরে গাবাসের দিকে এগিয়ে যান শাপোলোভ, ক্ষমা চান। লাভ হয়নি। অখেলোয়াড়োচিত আচরণের দায়ে ম্যাচ রেফারি ব্রায়ান আর্লি শাপোলোভকে সাত হাজার ডলার জরিমানা করার পাশাপাশি বহিষ্কার করেন।