বেশ কিছুদিন রাজবংশীদের দাবি ছিল উত্তরবঙ্গ ও আসামের বেশ কয়েকটি জেলা নিয়ে পৃথক রাজ্যের। রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবি হওয়ার পর পৃথক উত্তরবঙ্গের দাবি তুলেছেন আলিপুরদুয়ারের বিজেপি সাংসদ জন বার্লা। বিজেপি সাংসদ দাবি করেছেন, উত্তরবঙ্গকে আলাদা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করা হোক। তাঁর দল ভারতীয় জনতা পার্টি যদিও এই মন্তব্যকে সমর্থন করেনি। কিন্তু দলের পক্ষ থেকে সাংসদ জন বার্লারের হটকারি ওই দাবির নিন্দাও করা হয়নি, এমনকি তা খণ্ডনও করা হয়নি।
রাজ্যভাগ করার মতো বিভেদ সৃষ্টিকারী দাবির পরও বিজেপি দলের অবস্থানকে আপাতদৃষ্টিতে ধোঁয়াশাপূর্ণ বলে মনে হলেও সেই অবস্থানের মধ্যেই আবার আলিপুরদুয়ারের সাংসদের পাশে দাঁড়িয়েছেন বিষ্ণুপুরের বিজেপি সাংসদ সৌমিত্র খাঁ। দিল্লিতে তিনি জন বার্লারের দাবিকে যুক্তিযুক্ত ও ন্যায্য দাবি বলে সমর্থন জানিয়েছেন। তার কথা অনুসারে উত্তরবঙ্গের মানুষ ৭০ বছর ধরে বঞ্চিত রয়েছেন। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে রাজ্য মন্ত্রিসভা তৈরি করেছেন তা পুরোপুরি কলকাতা কেন্দ্রিক সেখানে উত্তরবঙ্গ থেকে কাউকে ঠাঁই দেওয়া হয়নি। কেবল তাই নয়, সৌমিত্র খাঁ আরও একধাপ এগিয়ে বলেছেন, ‘উত্তরবঙ্গের মতোই এবার ন্যায্য দাবি আদায়ে সরব হবেন জঙ্গল মহলের মানুষ। তার কারণ রাঢ়বঙ্গও দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চিত রয়েছে। তৃণমূলের রাজত্বে গত ১০ বছরে বাঁকুড়া, পুরুলিয়া এবং পশ্চিম মেদিনীপুরে উন্নয়নের ছিটেফোঁটা পৌঁছয়নি। রাঢ়বঙ্গ থেকে মাত্র একজনকে মন্ত্রী করা হয়েছে৷
রাজনৈতিক বিশেষঞ্জদের একাংশের মতে, বিজেপিঢ় তরফে এই দাবি উঠেছে বাংলায় ক্ষমতা দখল করতে না পারায়। বিজেপি ধরেই নিয়েছিল তারা এবার বাংলায় শাসন ক্ষমতা লাভ করবে। কিন্তু সেই স্বপ্ন ভেঙে চুড়মার হয়ে যাওয়ার পর দলের মধ্যে যেমন ভাঙন ধরেছে পাশাপাশি তারা বাংলার ক্ষতি করতে উঠে পড়ে লেগেছে। লক্ষনীয়; বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি তুলনায় দক্ষিণবঙ্গের থেকে উত্তরবঙ্গে ভালো ফল করার পর এই দাবি উঠেছে। যে কারণে রাজনৈতিক বিশেষঞ্জদের অনেকে মনে করছেন উত্তরবঙ্গে বিজেপি নেতারা চাইছেন তারা তাদের মত করে চলবেন আর তার জন্য উত্তরবঙ্গকে পশ্চিমবঙ্গ থেকে বিচ্ছিন্ন করাই একমাত্র পথ। উত্তরবঙ্গের সাংসদ ও নেতারা মবনে করছেন, কেন্দ্র সরকারে বিজেপি রয়েছে, বিজেপি সরকার সংসদে পৃথক রাজ্যের বিল পাশ করালে রাজ্য গঠন সম্ভব। যে জায়গা থেকে কোচবিহারের বিজেপি নেতা জ্যোতিবিকাশ রায় স্পষ্টতই পৃথক উত্তরবঙ্গ রাজ্যের দাবিকে সমর্থন করে বলেন, উত্তরবঙ্গ বঞ্চিত, উত্তরবঙ্গের কাছে পশ্চিমবঙ্গ হল সৎ মা। উত্তরবঙ্গকে চিরকাল বঞ্চিত করে রাখা হয়েছে।
এদিকে পৃথক উত্তরবঙ্গ রাজ্য বা উত্তরবঙ্গকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল করার যে দাবি তুলেছেন বিজেপি সাংসদ জন বার্লা তাকে সমর্থন জানিয়েছেন মাটিগাড়া-নকশালবাড়ি কেন্দ্রের বিধায়ক আনন্দ বর্মন এবং দার্জিলিংয়ের বিজেপি সমর্থিত জিএনএলএফ বিধায়ক নীরজ জিম্বা। তাঁরা স্পষ্ট জানিয়েছেন; এই ইস্যুকে তাঁরা পুরোপুরি সমর্থন করেন। বোঝাই যাচ্ছে বিজেপি বাংলা ভাগ করার পরিকল্পনা চালাচ্ছে। বিজেপির সেই চক্রান্তে সামিল হয়েছেন ডাবগ্রাম-ফুলবাড়ির বিজেপি বিধায়ক শিখা চট্টোপাধ্যায়। যদিও বিজেপির বিধায়ক থেকে সাংসদের দাবীকে উত্তরবঙ্গবাসীরা আমল দিতে নারাজ কিন্তু রাজ্যের শাসন ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে মুখ থুবড়ে পড়া এবং দলের অন্দরের কোন্দল প্রকাশ্যে এসে পড়ায় বিজেপি অশান্তির রাজনীতি শুরু করছে। তারা এখন উত্তরের চা বাগান থেকে পর্যটনের অনুন্নয়ন, পিছিয়ে পড়া উত্তরবঙ্গ ইত্যদি কথা বলে আসলে বাংলায় বিভাজনের রাজনীতিকে উসকানি দিচ্ছে, আরব তার আড়ালে বাংলা ভাগের চক্রান্ত আঁটছে।
আলিপুরদুয়ারের বিজেপি সাংসদ জন বার্লাঢ় কথা অনুযায়ী তাঁর দাবি নীচু তলা থেকে উঠছে বলেই তিনি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল বা পৃথক রাজ্যের জন্য সরব হয়েছিলেন। তিনি সন্ত্রাস, সীমান্ত এলাকা, অনুন্নয়নসহ একাধিক যুক্তি খাড়া করতেও চেষ্টা করেছিলেন। পৃথক রাজ্য নিয়ে ধুনো দিলেও দল তাকে কোনও ধরণের শাস্তি দেয় নি। তাঁর নিন্দা বা সমালোচনাও করেনি। সোশ্যাল মিডিয়ায় এখনো এই দাবি জিইয়ে রেখেছে বিজেপি সমর্থকরা। তার ওপর আবার ফেসবুকে একটি বিজেপি পেজ থেকে পৃথক নদীয়া রাজ্যের দাবি জানানো হয়েছে। মুখে রাজ্য বিজেপি সভাপতি দিলীপ ঘোষ বিজেপি বাংলা ভাগ চায় না বললেও আলিপুরদুয়ারের সাংসদের সমালোচনা করেননি।
একজন সাংসদ একটি বিরাট অঞ্চলের মানুষের কথা বলে যখন এমন গুরুতর দাবি তোলেন, যার মধ্যে বিভেদ এবং বিচ্ছিন্নতা রয়েছে তখন বোঝাই যায় যে তার নেপথ্যে বিশেষ কোন কারণ অবশ্যই রয়েছে। তা না হলে একটি জাতীয় দল সাংসদের করা এমন ভয়ঙ্কর দাবিকে নিন্দা না সমালোচনা কেন করল না। তাকে দলের পক্ষ থেকে কারণ দর্শাতেও বলা হয় নি। তাহলে বুঝে নিতে হচ্ছে ওই সাংসদের দাবি আসলে দলের। এটা বিজেপির অভ্যন্তরীণ বিষয় হলেও একজন গুরুত্বপূর্ণ জনপ্রতিনিধির প্রকাশ্যে রাজ্যভাগের দাবি খুবই ভয়ঙ্কর। প্রশ্ন তাহলে কি বিজেপি বাংলাকে অশান্ত করতে বাংলা ভাগের চক্রান্র করছে?
ইতিমধ্যে উত্তরবঙ্গের অনুন্নয়ন নিয়ে বিজেপি সাংসদ ও বিধায়করা রীতিমত সংগঠিত হতে শুরু করেছেন। কোচবিহার ও আলিপুরদুয়ার জেলার বিজেপি সাংসদ ও বিধায়করা যৌথ কমিটিও গঠন করে ফেলেছেন। ঠিক সেই সময়ে রাজ্যপাল ধনখড়ের উত্তরবঙ্গ সফর বোঝাই যাচ্ছে দিল্লি নেতৃত্বের পুর্ণ সমর্থনেই বাংলায় বিভেদের রাজনৈতিক বাতাবরণ সৃষ্টি করতে চাইছে বিজেপি। রাজ্য ভাগের চক্রান্তে কামতাপুরীদের একটা গোষ্ঠীঢ় সমর্থন রয়েছবে। এককথায় উত্তাপ বাড়ছে উত্তরবঙ্গে।
ভোট পরবর্তী হিংসা,নারদা, আলাপন, এখন বাংলা ভাগ, বাংলাকে শান্তি মুক্ত করতে বদ্ধপরিকর বিজেপি।
যেখানে বেশি ভোট পেয়ে বাংলা ভাগাভাগির চক্রান্ত সেখানে দলের ভাঙন যে হাওয়ার থেকে জোরে দৌড়চ্ছে। আগে দল
সামলাক তারপর বাংলা ভাগের ভাবনা। দল উঠে গেলে তখন বাঁচার খাঁচা মিলবে না।