সহজ পাচ্য ভাতই আমাদের প্রধান খাদ্য। চালের উপরের থাকে পাতলা খোসা বা তুঁষ। চালের উপরের পাতলা খোসা (ব্রান) পুষ্টিগুনে সমৃদ্ধ। অথচ জানেন কি এই খোসা ছাড়ানো চকচকে প্যাকেটের চালই আমাদের রোগভোগের অন্যতম কারন। বেশীর ভাগ চিকিৎসক, পুষ্টি বিষেশজ্ঞ ও ক্রেতারাও এই নিয়ে চিন্তিত নয়। বড় রাইস মিলে ধান ভাঙানোর সময় উপরের এই খোসা পালিশ করে দেওয়া হয় কারনে বাজারে চকচকে চালের চাহিদা বেশী। এর জন্য প্যাকেট বন্দী চালের মনমোহিনী বিজ্ঞাপনও দেওয়া হয়। মিলে ধান ভাঙানোর সময় মোটা চালও সরু করে দেওয়া যায়। পুষ্টিগুন থাকুক বা না থাকুক কারন সরু স্বচ্ছ ধরনের মসৃন চালের চাহিদা বেশী। দৃষ্টি নন্দন প্যাকেট বন্দী চকচকে পালিশ করা সরু চালে পুষ্টিগুন প্রায় ৬০ ভাগ বেরিয়ে যায়। বেশীর ভাগ ফসফরাস, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনসিয়াম, ফোলেট সহ অন্যান্য ভিটামিন বি, প্রোটিন এবং সম্পুর্ণ ভাবে ফাইবার, তুষের সঙ্গে থাকা অত্যন্ত উপকারী ও পুষ্টিকর তেল (ব্রান তেল) ইত্যাদি নষ্ট হয়ে যায়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য এই জন্যই তুঁষ জ্বালানীর কাজে লাগে। এখন ভোজ্য তেল হিসাবে তুঁষ তেলও বাজারে পাওয়া যাচ্ছে। ইদানীং প্রায় পুষ্টিবিহীন এই চালের মধ্যে থাকছে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক বিষের অবশেষ। কিছু জায়গায় ভারী ধাতুও। খালি চোখে চাল দেখে কিছুই বোঝা যাবে না। লক্ষ্য করেছেন এখন মানুষের রোগভোগ কত বেড়েছে! গ্রামেগঞ্জেও ক্যানসার এখন আর বিরল নয়। ডায়বেটিস, স্নায়ুর গোলযোগ, শারীরিক দুর্বলতা প্রায় প্রত্যেক পরিবারে। ভুগছে শিশুরাও। খাবারটাই এখন আমাদের শত্রু। ইদানিং বিষমুক্ত খাবার নিয়ে চর্চা হচ্ছে।
দেশ বিদেশে লাল ও কালো চালকেই বেশী পুষ্টিকর বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। আগে আউশ ধানের চাষ হত বহু জায়গায়। ভাদ্র আশ্বিন মাসে কাটা হত। বেশীর ভাগ আউশ ধানের চালের রঙ লাল। আমনেরও অনেক চালের রঙ লাল। তখন ঢেঁকিতেই ধান ভাঙানো হত এবং কিছুটা খোসা উঠে যেত, খসখসে লালচে ধরনের চাল মানুষ খেতেন। এটাই সাহেবদের কথায় ব্রান রাইস।পরে তা ব্রাউন রাইসে পরিবর্তিত হয়। সেই হিসাবে খোসা সমেত, পালিশ না করা চালকেই “ব্রাউন রাইস” বলা হয়। তবে পালিশ না করা চাল বলাটাই যুক্তিযুক্ত। লাল, হালকা হলুদ, সাদা, হালকা লাল, কালচে, কালচে লাল-এই সব চালই এর আওতায় পড়ে। গর্ভবতী মায়েদের ফেন-ভাত খাওয়ার চল ছিল এবং এর মাধ্যমে লোহা ও ফলিক আ্যসিডের চাহিদার অনেকটাই মিটত। এখন ঔষধের দ্বারা মেটানো হচ্ছে। কয়েকটি লালচাল হল-ষাটিয়া, শালকেলে, কেলেআউশ, কেলাস, ভুতমুড়ি, কয়া, অগ্নিবান, দোরাঙী, লাল দুধের সর, খাড়া ইত্যাদি। পালিশ না করা চাল শপিং মলে ব্রাউন রাইস নামে পাওয়া যায়। অনেক দাম-১০০ টাকা কেজি।
কালোচালের কথা শুনে অবাক হচ্ছেন! ঠিক ধরেছেন। এটাই চালের স্বাভাবিক রং। এরও অনেক জাত আছে। এটিসি ফুলিয়াতে ৭টি জাত সংরক্ষণ করা হচ্ছে।আদতে মহারাষ্ট্র অঞ্চলের রপ্তানি যোগ্য কালোচাল-সুগন্ধী কালাভাত এখন পশ্চিমবঙ্গেও চাষ শুরু হয়েছে। এটিসি ফুলিয়া থেকেই এই ধানের বীজ ও চাষ রাজ্যের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। ওড়িষ্যার সম্ভব সংস্থা থেকে ২০০৮ সালে প্রতিবেদক ওই চাল সংগ্রহ করেন। কৃষি দপ্তর এর প্রচার ও প্রসারে এগিয়ে এসেছে। প্রায় সব জেলায় কৃষকরা এই ধান চাষ করছেন সম্পূর্ণ জৈব সারে এবং রপ্তানীযোগ্য পরিমানে উৎপাদন হচ্ছে যা গোটা দেশে একটি দৃষ্টান্ত। অনান্য দেশী ধানের মত এই ধান চাষের খরচ কম, বীজ সংরক্ষণ পদ্ধতি ঠিক হলে একই বীজ সারা জীবন চলবে-পাল্টানোর দরকার নেই এবং রোগ পোকার উপদ্রব খুবই কম। ৩৩ শতকের বিঘায় ১২-১৩ মন ফলন হয়। দাম ও ভালো। কিছু জায়গায় বিপননের সমস্যা রয়েছে। মনিপুরে কালোচাল চাহাও জাতটি খুব প্রচলিত। আসামেও এখন পাওযা যায়।কালোচাল অন লাইনেও বিক্রি হচ্ছে।
মোটামুটি ভাবে পালিশ না করা কালো ও লাল চাল অধিক এন্টিঅক্সিডেন্ট, লোহা, জিঙ্ক, ফাইবার সমৃদ্ধ এবং কম শর্করা যুক্ত।এর গ্লাইসেমিক ইনডেক্স ৪০-৪২। মধুমেহ রোগীর পক্ষে ভালো। আনথোসায়ানিন নামক এন্টিঅক্সিডেন্টের জন্য এই চালের রঙ কালচে লাল। এই চালকেই ওষধিগুন সম্পন্ন চাল বলা হচ্ছে। চাল ধোয়ার পর আনথোসায়নিন সমৃদ্ধ সুগন্ধী লালচে জল বেরিয়ে আসে। দেখতে কালো হলেও কালো চালই বেশী পু্ষ্টিকর। শিশু ও রোগীর পথ্য। সাদা ভাতের সঙ্গে ঔষধ হিসাবে রোজ খাওয়া যেতে পারে। এক রাত ভিজিয়ে রাখার পর রান্না করতে হবে। উপরের লাল খোসা থাকার জন্য রান্না হতে দেরী হয়। প্রেসার কুকারে ৫-৬ টা সিটি দিলে ভালো হয়।ভাতের রং কালো, ফ্যান কালচে ঘন। এর সঙ্গে দুধ ও চিনি মেশালে গোলাপী বর্ণ ধারন করে। ফ্রিজে রেখে দিলেই হালকা গোলাপী রঙের সুগন্ধী সুস্বাদু আইসক্রিম। এক ভাগ চাল গুড়োর সঙ্গে তিন ভাগ আটা মিশিয়ে রুটি করে খাওয়া যেতে পারে। হুগলীর চন্ডীতলার কৃষকরাই এই আবিষ্কার করেছেন। এক ভাগ কালো বা লাল চাল গুড়োর সঙ্গে আটা মিশিয়ে রুটি করেও খাওয়া যেতে পারে। আসুন সপ্তাহে অন্তত ৪ দিন পছন্দমত দেশী চাল ও ২ দিন পালিশ না করা চালের ভাত খাওয়া শুরু করি।
কালাভাতের বৈশিষ্ট্য
| চালের রং কালেচে লাল | ভাতের রং কালো |
| ক্যানসার প্রতিরোধক আন্টি অক্সিডেন্ট যৌগের উপস্থিতি | ফাইবার বেশী তাই-আন্টি ডায়াবেটিক |
| লোহা ও জিঙ্ক সমৃদ্ধ | ক্যানসার রোগীর আদর্শ পথ্য |
| ভাত আঠালো ও সুগন্ধী | পায়েশ, খিচুড়ী, ঘিভাত, আইস ক্রিম, পাস্তা, পাঁপড়, নুডুলস |
| শিশু ও রোগীর পথ্য | চাল ধোয়া সুগন্ধী লাল জল সিরাপ হিসাবে ব্যবহার |