জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়
১৩১ নং কিস্তি
অনিদা—
চোখ খুললাম।
আবিদ সামনে দাঁড়িয়ে।
ওরা নিতে এসেছে।
আমি আবার গাছের তলায় প্রণাম করে উঠে দাঁড়ালাম।
পুকুরের ওপারে গেটের মুখে দুটো ছেলে দাঁড়িয়ে, সঙ্গে দুটো মটোর সাইকেল।
আমি ধীর পায়ে এগিয়ে এলাম।
ছেলেদুটোকে চিনতে পারলাম না।
কে পাঠিয়েছে তোমাদের?
চিকনাদা।
কোথায় থাকো তোমরা?
রামপুরা।
তোমরা ওই বাইকটায় বসো, আমি অনিদা এই বাইকটায় বসছি। আবিদ বললো।
ছেলেগুলো কোনও কথা বললো না, আবিদের কথা বাধ্য ছেলের মতো শুনলো।
চাদরটা ভালো করে জড়িয়ে নিলাম।
মিনিট তিনেকের মধ্যে মোরাম রাস্তায় চলে এলাম।
চারিদিকে ভিড়ে ভিড়। গ্রাম শুদ্ধু লোক চলে এসেছে।
বাইকটা দাঁড়াতেই চিকনা এগিয়ে এলো।
কনিষ্কদের ধারে কাছে দেখতে পেলাম না।
আমি নামতেই চিকনা জড়িয়ে ধরলো।
পীরবাবার থানে গেছিলি?
চুপ করে রইলাম।
আমি জানতাম তুই ওখানে যাবি। মন খারাপ করে কি করবি বল। একটা বিপদে পড়েছি।
চিকনার মুখের দিকে তাকালাম।
সেরকম কিছু নয়। কাকীমা বায়না করেছে, স্যার নাকি কিছুদিন আগে থেকেই কাকীমাকে যতো সব উল্টো পাল্টা কথা বলতো। মানুষের শেষ সময় যা হয় আর কি। কাকীমা সেই কথা গেড়ো দিয়ে রেখেছে।
আমি চিকনার মুখের দিকে তাকিয়ে আছি।
স্যার মরার আগে কাকীমাকে বলে গেছেন মুখাগ্নি তুই করবি।
আমি অবাক হয়ে চিকনার মুখের দিকে তাকিয়ে। মাথা দোলাতে দোলাতে বললাম, তা হয় না।
এই কয়মাসে অনেক ঘটনা ঘটেছে তোকে বলিনি। এই মুহূর্তে বলতে ভালো লাগছে না। তবু তোকে বলতে বাধ্যে হচ্ছি, ঋজুকে স্যার গত একবছর ধরে নিজের সন্তান বলে মনে করতেন না। ব্যাপারটা এমন পর্যায় গেছিলো যে….।
ঋজু কোথায়?
শ্মশানে আছে।
গাড়িটা দেখতে পেলাম না।
চিকনাকে সঙ্গে নিয়ে মোরাম রাস্তা থেকে মেঠো পথে নামলাম।
শরু আইল পথ, পাশা পাশি হাঁটার উপায় নেই। পেছন পেছন লম্বা লাইন করে এগিয়ে চলেছি। সামনে চিকনা। এতটা নিস্তব্ধ নিজের হাঁটার শব্দ নিজে শুনতে পাচ্ছি। শ্মশানের অনেকটা ভেতরে চিতা সাজানো হয়েছে। আমি ঝিলের জলে হাত পা ধুয়ে মা-বাবাকে যেখানে দাহ করা হয়েছিল সেই বটগাছের তলায় প্রণাম করলাম।
সঞ্জু এগিয়ে এসেছে। জড়িয়ে ধরলো। চোখ ছল ছলে।
ভাঙা ছাতা হলেও একটা ছাতা ছিল বুঝলি অনি, আজ সেইটুকুও হারিয়ে ফললাম।
কাকে কি বলবো। কনিষ্করা দেখলাম একপাশে দাঁড়িয়ে। ঋজু এগিয়ে এলো।
মাথা নিচু করে সামনে দাঁড়াল।
কি এমন ভুল করলি, স্যারের মতো মানুষ এই কথা বলতে বাধ্যে হলেন?
ঋজু মাথা নিচু করে কেঁদে চলেছে।
তুই পাটকাঠি ধর আমি আগুন জ্বালাচ্ছি। তারপর দুজনে মিলে কাজ টুকু সেরে দিই। জীবনে এই টুকু অপূর্ণ রাখি কেন।
কাজ সারতে সারতে বিকেল গড়িয়ে গেলো। স্যারের বাড়িতে শ্মশান যাত্রীদের কিছু নিয়ম কানুন পালন করে যখন ফিরলাম তখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে। কনিষ্করা সবাই ফিরে গেল। ওদের সঙ্গে কথাই বলতে পারলাম না। আবিদকে শুধু বললাম—আমার কাগজপত্রগুলো একটু ঘরে রেখে আয়।
নীপাদির কাছে দিয়েছি।
ঠিক আছে। সাবধানে থাকবি। যা বেশি দেরি করিস না। ফিরতে আবার রাত হয়ে যাবে। ওরা সব ঠিক আছে।
হ্যাঁ।
পৌঁছে আমাকে একবার ফোন করবি।
তোমার ফোনটাও নীপাদির কাছে আছে। দুপুরে ম্যাডাম ফোন করেছিল। নীপাদির সঙ্গে কথা হয়েছে।
আচ্ছা।
এবাড়িতে ঢুকে কাকীমা, সুরমাসির আর এক চোট কান্নাকাটি হলো। নীপা তবু ধমক ধামক দিতে সবাই চুপ করলো।
নীপা গরম জল করে দিল। বাথরুমেই কোনও প্রকারে স্নান করলাম।
এ বাড়িতেও লোকের ভিড় কম নয়।
নিজের ঘরে এলাম। যা দেখে গেছি সেরকমই আছে।
চিকনা আমার ছায়া সঙ্গী।
জামা কাপর ছাড়লাম। এখন অনেকটা শান্তি। নিজের খাটে বসলাম। ঘরে লাইট জ্বলছে। চিকনা সোফায় বসলো। খিদে খিদে পাচ্ছে। সারাদিন কিছু জোটে নি। চিকনাকে বলতে যাচ্ছিলাম।
দেখলাম নীপা ঢুকলো। পেছনে ওর মেয়ে।
এতক্ষণে ওদের মুখটা যেন ভালো করে দেখতে পাচ্ছি।
ওগুলো সব টেবিলে রেখে ও বাড়ি থেকে মামার ব্যাগটা নিয়ে আয়।
নীপার হাতে বাটি।
কি এনেছো।
দই দিয়ে খই মুড়ি মেখে এনেছি।
খাওয়াটা ঠিক হবে।
খাও কিছু হবে না।
না নীপা একবার যখন করে ফেলেছি। ন-টা দিন তো—চালের জিনিষ নাইবা খেলাম।
তোমার শরীরটার দিকে একবার তাকাও। সকাল থেকে একটাও ওষুধ পেটে পরে নি।
কনিষ্ক বুঝি তোমাকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে গেল।
নীপার মেয়ে তুয়া আমার ব্যাগটা ঘাড়ে করে ঢুকলো।
তুয়া।
নীপা মেয়ের দিকে তাকালো।
সাবু, মুগডাল ভিঁজিয়ে ছিলাম ওগুলো নরম হয়েছে?
দিদাই মাখছে।
নীপা আমার দিকে তাকিয়ে হাসলো।
তুমি নাস্তিক নও, সবচেয়ে বড়ো আস্তিক।
চিকনাদা তুমি এটা খাও। আমি অনিদার জন্য নিয়ে আসি।
ভানুরা কোথায়?
সব পান্তা খেতে বসেছে।
এই অবেলায়?
কি বলবো, বললাম গরমভাত আছে খেয়ে নাও। বললো রাতে খাব, তুই এখন দুটি পান্তা দে।
তুয়া দিদাইয়ের মাখা হয়ে গেলে নিয়ে আয়।
নীপা ব্যাগ থেকে জামাকাপর বার করে আলনায় গুছিয়ে রাখলো। ওষুধের প্যাকেটটা টেবিলের ওপর রাখলো। সব পরিপাটি করে গুছিয়ে দিল।
তুয়া আমার খাবার নিয়ে এলো। আমি চিকনা দুজনে মিলে খেলাম। অনেক বেশি দিয়েছিল খেতে পারলাম না। তুয়ার হাতে দিয়ে বললাম খেয়ে নে।
ওটুকু পেটে গেল না।
যতটা পারলাম খেলাম।
নাও এই ওষুধটা খেয়ে নাও।
এখন নয় রাতে খাওয়ার আগে আর পরে।
তুমি খাও না। আমি ডাক্তার নই, কনিষ্কদা যেমন বলেছে তেমন করছি।
বাধ্য হয়ে খেয়ে নিলাম।
নীপার মুখের দিকে তাকালাম।
চা তো, গিয়ে পাঠাচ্ছি।
হাসলাম।
নীপা চলে গেল। একে একে সবাই ঘরে এলো। শুধু সঞ্জু আর অনাদি নেই।
বাসু এসে বললো, নীচে মীরচাচারা অপেক্ষা করছে, তোর সঙ্গে একবার দেখা করে চলে যাবে।
চল একবারে দেখা করে এসে বসি।
নীচে এসে দেখলাম মীরচাচারা বেঞ্চে বসে।
আমাকে দেখে জড়িয়ে ধরলো।
কতবার তোর হাসপাতালে গিয়ে ফিরে এসেছি। চোখের দেখাটা একবারও কেউ দেখতে দেয়নি। তান্যে খপর দিছে, এইটুকু যা।
আমি মীরচাচাকে জড়িয়ে ধরে আছি।
তুই এখন এখানে থাকবি?
আপাতত কয়েকদিন থাকতে হবে। দেখলে তো।
স্যার তোকে বড়ো ভালোবাসতেন। সেই সময় আমাদের বুকে করে আগলে রেখেছিলেন। বার বার আমাদের বলেছেন, অনি কোনওদিন অন্যায় কাজ করে নি। তোমরা কেন অন্যায় কাজ করবে। ধৈর্য ধরো, দেখবে ফল পাবে। স্যারের মুখ চেয়ে আমরা সবাই চুপ করে থেকেছি। স্যার আজ চলেগেলন। তুই স্যারের যোগ্য ছাত্র। তুই আমাদের চোখের মনি।
মীরচাচা ঝড়ের মতো কথা বলে চলেছে। আমি শ্রোতা। মীরচাচার সঙ্গে আরও যারা এসেছে তারা অবাক হয়ে দেখছে আমাকে।
খামারে তিনটে বাইক এসে থামল।
কেউ যেন চেঁচিয়ে বলে উঠলো, নীপাদি খুব খিদে লেগেছে।
চিকনার দিকে তাকালাম, সুকান্তর গলা মনে হচ্ছে।
চিকনা হাসলো।
মীরাচাচা আমাকে ছেড়ে পাশে দাঁড়াল।
ও এখানে কি করতে! আমি বললাম।
দু-মাস হলো আমাদের থানায় পোস্টিং হয়ে এসেছে। চিকনা বললো।
তার মানে!
ও দেবার ওখানে চাকরি করছিল না?
অনিমেষদার কথামতো চলছি।
সুকান্ত হাসতে হাসতে জুতো খুলে দালানে উঠে এলো।
কেমন আছো দাদা, খুব আবাক হচ্ছো।
প্রণাম করে জড়িয়ে ধরলো।
ওপর ওয়ালা আমাকে যা দায়িত্ব দিয়েছে তাই পালন করছি।
মীরচাচার দিকে তাকালো।
চাচা তোমার দক্ষিণপাড়া খুব গণ্ডগোল করছে। আমি কিন্তু এবার সব কটাকে ধরে নিয়ে গিয়ে সদরে চালান করে দেব।
মীরচাচা একটু অবাক হয়ে সুকান্তর দিকে তাকাল।
কি হয়েছে বল—
সুকান্ত তখনও আমাকে জড়িয়ে ধরে আছে।
সকাল থেকে ঝামেলা চলছে। সেই সামলাতে রাত হয়ে গেল। ইচ্ছে থাকলেও শ্মশানে যেতে পারি নি।
ব্যাপারটা কি খুলে বল।
তোমাদের ধর্মীয় ব্যাপার, আমি নাক গলাই নি। কিন্তু ব্যয়দপী সহ্য করবো না।
ঠিক আছে আমি এখুনি যাচ্ছি, তোকে কিছু করতে হবে নি।
আমি আজ রাতে দাদার কাছে থাকবো। কাল সকালে তুমি খবর দেবে। আমি বলে এসেছি, তুমি যা ডিসিশন নেবে তাই মেনে নেব। তোমার বাড়িতে গেছিলাম। চাচী বললো, তুমি সকাল থেকে যা বেরিয়েছ এখনও ফের নি।
সারাদিনটা ওখানেই কেটে গেল।
বাসুদা কিছুটা জানে। সকালে একবার মুখ দেখিয়ে চলে এসেছে। তুমি বাসুদার মুখ থেকে শুনে নিতে পার।
চলতো বাসু তোর মুখ থেকে শুনে নিই। ফকির বলে চেঁচিয়ে উঠলো মীরচাচা।
একটা সন্ডাগন্ডা ছেলে সামনে এসে দাঁড়াল।
ও পাড়ায় গিয়ে সব কটাকে থাকতে বল, আমি যাচ্ছি।
আমি ঘটনাটা জানি।
জানিস তো বলিসনি কেন?
কাল রাতে হয়েছে। সকালে বলতে এসেছিলাম, তা এই ঘটনা ঘটলো, তাই বলি নি।
মীরচাচা চুপ করে গেল।
আমি মীরচাচার হাতটা ধরলাম।
রাগারাগি করো না।
তুই জানিস নি অনি, সবকটা চুয়াড়ের দল, ভালো করতে চাই, এন্যে এদের ভালোটা বোঝে নি। তুই আমি এনকার কিছু করতে পারবো নি।
গাল দিও না। একবার যাও না। একটু ভালো করে বোঝাও, দেখবে ঠিক বুঝবে।
নীপা ওবাড়ি থেকে ট্রে হাতে এ বাড়ির বারান্দায় এসে দাঁড়ালো।
মীরচাচা চা খাবে?
একটু দে।
যাও তুয়া সকলকে দিচ্ছে। নিয়ে নাও।
সুকান্তর দিকে তাকাল।
তুমি কি এই জামাকাপর পরে সারারাত থাকবে।
সুবীরদার একটা পাজামা পাঞ্জাবী দাও।
যাক বলোনি অনিদার একটা পরে নেবে।
দাদারটা হবে না। হাসছে।
আগে মুখ-হাত-পা ধুয়ে নাও। তোমার লোক জন।
আমার সঙ্গে কেউ আসেনি।
তাহলে ওরা কারা!
মীরচাচাকে নিয়ে যেতে এসেছে।
অন্ধকারে খামারে দাঁড়িয়ে কেন! মীরচাচা ওদের ডেকে ও বাড়ির বারান্দায় গিয়ে বসো।
নীপা ভেতরে গেল।
আমি রেডি হয়ে আসছি দাদা, তোমার সঙ্গে অনেক কথা আছে।
সুকান্ত চলে গেল। বাসুকে আর মীরচাচার সঙ্গে যেতে হলো না।
আমি, বাসু, চিকনা ভেতরে এলাম।
ওপরে এসে দেখলাম নীপা গজ গজ করছে। ভানু চেঁচাচ্ছে। পচা, পাঁচু একপাশে বসে।
তোদের আবার কি হলো? চিকনা বলে উঠলো।
নীপা মাস্টারনী, ধমকায়।
ভানুর কথার টানে হেসেফেললাম।
কেন ধমকায় সেটা বললে না—
একটু শুইছিলি।
মাটিতে কেন, মাদুর নেই—
আচ্ছা আর হবে নি। চা দে। ভাত ঘুম কাটাই।
এই ভর সন্ধ্যেয় তোর ভাত ঘুম! আমি বললাম।
ক্লান্তি লাগে।
নীপার দিকে তাকালাম।
গাল টিপে হাসছে।
তুমি জানো না অনিদা। এখানে থাকলে পাগল হয়ে যাবে।
চিকনাকে পয়সাগড়ি দিচ্ছ—
বয়স হয়েছে, এখনও পেছনে লাগার অভ্যাসটা গেল না।
ঠিক আছে এবার থেকে সামনে লাগবো। তার আগে সুবীরের পার্মিশন চাই।
নীপা চোরা চোখে হাসলো। মিত্রাদি ফোন করেছিল—
কখন?
দুপুরের দিকে, তখন তুমি মুখাগ্নি করছো।
ও।
আমি খাটে এসে বসলাম। নীপা চায়ের কাপটা এনে দিল।
মিত্রাদি দাদাকে বলেছে, শোনার পর দাদা ফিরে আসার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।
কেন যে বলতে গেলো।
দাদা তোমার জন্য খুব দুশ্চিন্তা করছেন।
আমি চুপ করে রইলাম।
ইসলামভাইরা পর্শুর ফ্লাইটে ফিরে আসছে। আমাকে ফোন করেছিল। সবারই মনটা খারাপ।
আবিদ তোমাকে কোনও ফাইল দিয়ে গেছে।
হ্যাঁ।
আমাকে এনে দাও। দেখো তো আমার মোবাইলটা চালু আছে কিনা।
ওবাড়িতে আছে, এনে দিচ্ছি।
নীপা বেরিয়ে গেল।
নিস্তব্ধ ঘর। কেমন যেন গুমোট পরিবেশ। কারুর মুখে কোনও কথা নেই। আমি নিস্তব্ধতা ভাঙলাম।
চিকনা।
বল।
কাঞ্চনকে দেখতে পাচ্ছি না?
কলকাতায় আছে—কথাটা শুনে একটু অবাক হলাম।
কলকাতায়!
সে অনেক ঘটনা।
ছেলে, মেয়ে?
সবাই।
কাকা, কাকীমা?
তারাও গেছেন।
এখানকার বাড়ি?
একজনকে রেখে গেছে।
মাথায় ঠিক ঢুকলো না।
পরে ঢোকাস, এখন ঢুকিয়ে দরকার নেই। তাদের স্বামী-স্ত্রীর ব্যাপার।
স্বামী-স্ত্রী, কথাটা শুনে হাসি পেলো। নিজের মনেই হাসলাম।
সব শুয়ারের জাত বুঝলি আনি। ভানু বলে উঠলো।
চিকনা, ভানুর দিকে কট কট করে তাকাল।
তোকে বক বক করতে কইছি।
আমি তো বেইমানি করি নি।
এবার জুতায় ছাল খিঁচি দিব।
কেন সত্যি কথা বলা অন্যায়।
ওঃ ভানু থামনা। বাসু খিঁচিয়ে উঠলো।
তন্যে না কইলেও আমি কয়ে দেবো।
ঠিক আছে বলিস খোন।
নীপা আমার ফোনটা কানে দিয়ে ঢুকলো। কার সঙ্গে হেসে হেসে কথা বলছে।
সবাই চুপ করে গেল।
পেছনে সুকান্ত, সুবীর। দুজনে সোফায় বসলো।
ধরো সুরোদি।
নীপা ফোনটা আমার হাতে দিল।
বল।
কেমন আছো?
ভালো আছি।
তোমার বন্ধুরা সকাল থেকে দেখতে না পেয়ে মাথা খারপ করে দিচ্ছে। কথা বলো।
আঙ্কেল। মাম্পি চেঁচিয়ে উঠলো। কান থেকে ফোনটা সরিয়ে নিলাম।
আমাকে দে কথা বলি। মিকি পাশ থেকে বলছে, শুনতে পাচ্ছি।
না।
একটু ভয়েজ অন করো ওদের গলাটা শুনি। নীপা বললো।
আমি ভয়েজ অন করলাম।
কি করছো—
তুমি কোথায়। মা মেরেছে।
নাগো আঙ্কেল মিথ্যে কথা। মিকি বললো।
নীপারা হাসছে।
তুমি কি করছো। মিকি বললো।
বসে আছি।
বজু খেলে নি। মাম্পি বললো।
কেন।
গাছ পুঁতছিলো।
স্কুলে যাও নি।
মা নিয়ে যায় নি।
মাকে গিয়ে আমি বকে দেবো।
তুমি আজকে আসবে।
না। এখানে আমাকে বেঁধে রেখেছে।
এক থাপ্পর।
আবার কাকে মারবি।
দে-না। মিকি চেঁচাচ্ছে।
আমি আগে কথা বলি।
না আমি বলবো।
নীপারা হাসছে।
তুই কথা বলতে পারিস না। মাম্পি বললো।
আঙ্কেল।
বলো।
দেখোনা মিকিটা ডিস্টার্ব করছে।
আচ্ছা তুমি মিকিকে একটু দাও।
মিকি তোমার ঘরে হিসি করেছে।
তুমি করো নি।
না।
যা তোদের কথা বলতে হবে না। খালি নালিশ। সুরো বলে উঠলো।
না দেব না।
আঙ্কেল।
বলো।
আজকে অফিসে গেছিলাম। মিকি যায় নি।
নাগো আঙ্কেল গেছিলাম। মিকির গলা পেলাম।
সুরো।
বলো।
দেখি যদি রাতে পারি ফোন করবো। অনিমেষদার সঙ্গে কথা বলেছিস?
বলেছি। বাবা একটু মন খারাপ করলো।
করে আর কি করবে বল।
শরীরটার দিকে একটু নজর দিও। বেশি ঘোরা ঘুরি করো না। ঠাণ্ডা লেগে গেলে বিপদ।
না না সাবধানে থাকবো।
আমরা শনিবার বিকেলের দিকে যাব।
ঠিক আছে। কনিষ্করা পৌঁচেছে।
না। শেষ যখন কথা বললাম, বললো কাছাকাছি চলে এসেছে।
মিলি এসেছে?
হ্যাঁ। বাথরুমে গেছে।
তোর বৌদির সঙ্গে কথা বলেছিস?
বলেছিলাম। শুনেই মনটা খারাপ হয়ে গেছে।
মাসি ঠিক আছে?
সকালে খুব কান্নাকাটি করছিল। এখন ঠিক আছে।
কোথায়?
রান্নাঘরে।
এখন রাখি পরে কথা বলবো।
আচ্ছা।
শোন।
বলো।
বাচ্চাগুলোকে মারিস না।
বিশ্বাস করো একটুও মারি নি।
ওই যে বললো।
মিলিদি একটা থাপ্পর মেরেছিল।
কেন মেরেছে। তোদের খুব হাত ওঠে।
যখন সামলাতে পারি না তখন হাত চলে।
ভজুর কাছে রাখবি।
ভজুদার তো বয়স হচ্ছে। পারে কখনও।
কেন—
ভজুদার পিঠে যদি দুজনে একসঙ্গে চাপতে চায় হয় কি করে।
ও ঠিক সামলে নেবে। তোদের মতো মারবে না।
ঠিক আছে, পরে কথা বলবো।
গেলো কোথায় দুটো।
ভজুদার সঙ্গে লুডো খেলতে বসবে। হাত ধরে বড়োমার ঘরে টেনে নিয়ে গেছে।
ঠিক আছে রাখ।
আচ্ছা।
ফোনটা পাশে রাখলাম।
মিলিদির মেয়েটা ভীষণ টট্টরি তো।
নীপার দিকে তাকালাম।
দুটোই টট্টরি, ওরা ঠিক মতো ট্যাকেল করতে পারে না।
তুমি বুঝি খুব পারো।
হাসলাম।
আমার সঙ্গে তো বেশ থাকে।
সুরোদি তার গল্প বলেছে।
আমি নীপার দিকে তাকিয়ে।
রাতে কি খাবে?
কয়েকটা দিন নিরামিষ খাই।
নীপা হাসলো।
আর কোনও নিয়াম কানুন।
না সেরকম কিছু মানা যাবে না।
ঠিক আছে। এখন চা পাবে না। আরও কিছুক্ষণ পর পাঠাব।
ঠিক আছে।
নীপা বেরিয়ে গেল।
চিকনাকে বললাম, একটা সিগারেট দে। সকাল থেকে খাই নি।
চিকনা আমার দিকে তাকিয়ে হাসলো।
পকেট থেকে প্যাকেটটা বার করে আমার হাতে দিল।
সিগারেট ধরালাম। ওদের দে।
কেউ খায় না।
খায় খায় আমার সামনে লজ্জা পাচ্ছে। দে কিছু হবে না।
সুবীর হাসছে।
পার্মিশন পেয়ে গেলে। আর অসুবিধে নেই।
সুবীর।
বলুন।
ব্যাঙ্কের অবস্থা কি?
ভালো পজিশন।
অনেকদিন তোমাদের কোনও খোঁজ খবর নিতে পারি নি।
অসুবিধে হয় নি। যা ঝামেলা হয়েছিল সামলে নিয়েছি।
আবার কিসের ঝামেলা!
সব আপনাকে বললে আমরা কি করতে আছি।
লোকে ঠিক মতো সব টাকা পয়সা ফেরত দিচ্ছে।
হ্যাঁ।
কাল তোমার সঙ্গে একবার ব্যাঙ্কে যাব।
ঠিক আছে।
আমি দুটা গাড়ি করছি। ভানু বললো।
ভানুর দিকে তাকালাম।
দুটো!
সুবীর বার করে দিছে। একটা পেরাইভেট আর একটা ট্রেকার।
কোথায় চালাস?
একটা বিয়ে বাড়ির জন্য ভাড়া খটাই। আর একটা রুটে ভাড়া খাটে।
কে চালায়?
আমি, পাঁচু, পচা। ভাগা ভাগি করে।
পাঁচু, পচার দিকে তাকালাম।
কিরে? তাহলে এখানকার ব্যবসা।
এটাও করি।
বাচ্চারা সব ঠিক আছে।
সব এউখানে কাজ করে।
চিকনা হাসছে।
কথার ছিড়ি দেখছিস।
ওরা মাথা নিচু করে হাসে।
সুকান্তবাবু তোমার খবর বলো।
সুকান্ত আমার দিকে তাকিয়ে মিটি মিটি হাসছে।
হাসছো কেনো।
কোন খবরটা আগে দেব সেটা ভাবছি।
তুমি দেখছি গ্রামের লোকেদের সঙ্গে খুব ফ্যামিলিয়ার হয়ে গেছ।
না হয়ে উপায় কি দাদা। যা টাফ পজিশন, সমস্যার সমাধান করতে পারবো না।
কেন!
এখানকার এক একটা যা সমস্যা আছে আইনে তা সমাধন হওয়ার নয়।
সার কথাটা বুঝেছো এতদিনে।
আগে বুঝতাম না। আপনাকে দেখার পর, বেশি করে বুঝতে পারছি।
তারপর উঠে এসে প্রণাম করলো।
কতোবার প্রণাম করবে।
তখন প্রথম দেখার প্রণাম। এখন একটা সুসংবাদ আছে।
কি।
আমি অইপিএস পরীক্ষায় পাশ করেছি। এখানে আসার আগে সুমন্তদা ফোন করে জানাল।
খুব ভালো খবর দিলে।
চিকনারা সবাই হই হই করে উঠলো।
তারমানে তুমি আমাদের ছেড়ে চলে যাবে?
জানিনা।
কেন!
সরকার যদি এই ডিস্ট্রিক্টে পাঠায় তাহলে তোমাদের সঙ্গে আবার দেখা হবে।
মুস্কিলে ফেলে দিলে। চিকনা বললো।
কিচ্ছু মুস্কিল হবে না। তোমাদের চিন্তা করতে হবে না। আমার জায়গায় যে আসবে। দেখবে দু-দিনে আমার মতো হয়ে যাবে।
পাঁচু শিগগির নীপাকে চায়ের কথা বল, আর অপেক্ষা করা যাবে না। চিকনা বললো।
পাঁচুদা, মীরচাচাকে এখন কিছু বলো না। আমি দিন পনেরো এখনও এখানে থাকবো। সুকান্ত বললো।
দক্ষিণপাড়ার ঘটনাটা কি সুকান্ত।
মেয়ে ঘটিত। ও সমস্যার সমাধান আমি করতে পারবো না। মীরচাচাই পারবে।
তাহলে আর শুনে দরকার নেই। কি বলো সুকান্ত। বাসু বলে আর হাসে।
তারমানে তুই সব জানিস। আমি বললাম।
জানি। আমার কাছে প্রথমে এসেছিল। আমি ফকিরের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম।
তখন দেখলাম ছেলেটাকে।
ও ওই এলাকার পঞ্চায়েত।
ওই বাচ্চা ছেলেটা।
বাচ্চা নারে চৌবাচ্চা। সব মীরচাচার হ্যান্ডস।
সুকান্ত হাসছে।
ছোটোখাট ব্যাপার তোমার জন্য নয়।
সবাই হাসাহাসি করে।
চিকনা সঞ্জুটাকে একবার ফোনটন করেছিলি। আমি বললাম।
বলেছি খুব প্রয়োজন হলে ফোন করবি। না হলে কাল সকালে চলে আসবি।
বেচারা খুব গাড্ডায় পড়ে গেল।
পড়েগেল মানে! ওর একটা সমস্যা হয়েছে তোকে সমাধান করতে হবে।
সুকান্ত হাসছে।
হাসছো কেন?
ও সব ব্যাপারটা জানে বলে। চিকনা বললো।
কিসের সমস্যা?
আছে রে আছে।
মানে!
অনেক দূর পর্যন্ত জল গড়িয়ে গেছে। সুকান্ত চেষ্টা করেছিল পারেনি। সেই সময় স্যারের খুব দরকার ছিল তোকে, তখন তুই নার্সিংহোমে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছিস। সেই থেকে মন ভেঙে গেল স্যারের। শরীরটাও দিনকে দিন খারাপ হয়ে যেতে শুরু করলো।
আমি অবাক হয়ে চিকনার দিকে তাকিয়ে।
সব এখন শুনতে হবে না। থাকছিস তো। সব জানতে পারবি।
একটু হিন্টস দে—
ঋজুর বৌ সঞ্জুর নামে শ্লীলতাহানির কেশ করেছে।
তারমানে!
আর বলিস কেন মাথা খারাপ হলে যা হয়।
বউটা দেখতে শুনতে বেশ ভালো। ব্যাবহারটাও খারপ নয়।
তুই আবার তাকে কোথায় দেখলি!
কাকার কাজের সময় দেখা হলো। খুব একটা খারাপ বলে মনে হয়নি।
তুই একদিন দেখে সব বুঝে যাবি?
তা ঠিক।
তোরও মানুষ চিনতে মাঝে মঝে ভুল হয়।
হাসলাম।
আমাদের গ্রামে ওই একটা মেয়েই আগুন ধরিয়েছে। তারপর অনাদির দরাজ হাত।
আমি অসুস্থ হওয়ার আগের ঘটনা না পরে।
দু-একদিন আগে পরে হবে।
এখন?
ঋজু চাইলেও বৌ চাইছে না। দু-জনে দু-জায়গায় থাকে।
তারমানে!
বৌ তার বাপের বাড়ি। ঋজু দোকানে।
বাচ্চাগুলো।
যা হয়।
সুখে থাকতে ভূতে কিলোয়। বাসু বললো।
আমি অনেক চেষ্টা করেছিলাম ভবি ভুলবার নয়। সুকান্ত বললো।
তুমি মধ্যস্থতা করেছিলে!
প্রথমে আমার কাছে গিয়ে ডাইরি করতে চেয়েছিল। আমি নিই নি। বলেছিলাম আমি যাই সব শুনে ওখানেই ডাইরী নেব।
তুমি ইনভেস্টিগেশন করো নি?
করেছি, রিপোর্টও দিয়ে দিয়েছি। এখন কোর্টে কেশ চলছে। মেয়েটার বাড়িও সাপোর্ট করছে।
কেশের মেরিট?
হবে না কিছু। উকিলরা বোঝাচ্ছে, কিছু পয়সা ধ্বংস হবে।
হ্যাঁরে ঋজুর ব্যবসা কেমন চলছে? চিকনার দিকে তাকালাম।
ওটা আছে বলে কোনওপ্রকারে বেঁচে যাচ্ছে। কিছু ব্যাঙ্কলোন আছে।
শোধ করছে?
করবে না মানে। এক তারিখ হলেই লোক হত্যে দিয়ে বসে থাকে।
বুঝলাম। তারমানে সঞ্জুর মনের ওপর একটা বিরাট চাপ।
কি লজ্জার ব্যাপার বল। বাসু বললো।
সত্যি।
গ্রামের লোকজন তো বলেছিল পুড়িয়ে মেরে দেবে। যারা সঞ্জুকে জম্মাতে দেখেছে, তারা জয়েন্ট পিটিশন দিয়েছে সুকান্তর কাছে। সেটা দিয়েই সুকান্ত অনেকটা কাজ পজিটিভ করতে পেড়েছে।
চারিদিকে শুধু সমস্যা তাই না চিকনা?
আগে মনে হতো। এখন তেমন মনে হয় না। বেশ আছি। সারাদিন কাজ করি। নীপা দুটো খেতে দেয়, খাই। আর বাসুর দোকান। ব্যাশ দিন ফুরুত।
তোর বাড়ির অবস্থা?
আগে আমি বেওয়ারিশ ছিলাম। এখন সোনার ডিম। একটু আধটু ক্ষমতা অর্জন করেছি তোর কৃপায়। তাছাড়া বড়ো বড়ো নেতাদের সঙ্গে আমার ওঠাবসা। থানা, পুলিশ সকলে ভালো চোখে দেখে। এ ছেলেকে কি ফেলা যায়?
প্রতিদিন নিয়ম করে একবার বাড়িতে যাই। ভাই-বৌরা চা দিলে ভালো, না দিলে আরও ভালো। বাপ-মা যতদিন আছে যাবো। তারপর যাবো না। সাপ্তাহিক পয়সা হাতে গুঁজে দিই।
বুড়ো বয়সে থাকবি কোথায়?
কেনো তুই এই বাড়িতে থাকতে দিবি না!
হাসলাম।
তুই যেদিন তাড়িয়ে দিবি। এককৌটো ফলিডল খেয়ে নেব।
তাহলে তোর সঙ্গে গুরুমার পার্টনারশিপের বিজনেসের কি হবে।
এখন গুরুমা মালিক নয়।
তাহলে!
ভাইপো, ভাইঝি, আমি, নীপা, সুবীর।
সব্বনাশ, কবে থেকে!
তুই ফিরে আসার কয়েকদিন আগে গুরুমা সব পাকাপাকি ব্যবস্থা করে দিয়েছে।
আমার কমিশন?
পেয়ে যাবি।
বাসুরা সকলে হাসছে।
নীপা ঘরে ঢুকলো।
বাবাঃ খুব হাসির চোট দেখছি।
তোমার বড় আর একজনের সঙ্গে ইন্টু-মিন্টু করেছে তার গল্প বলছে। আমি বললাম।
ওরা এবার সকলে জোড়ে হেসে উঠলো।
নীপা আমার কথা শুনে একবার তাকালো। কিছু বলতে যাচ্ছিল, বলতে পারলো না। হাসিও নয় গম্ভীরও নয়। একটা অদ্ভূত মুখ ভঙ্গি।
আচ্ছা তোমার কি আর বয়স হবে না? মেয়ের তো বিয়ে দেওয়ার বয়স হয়ে গেছে।
বিয়ে করে ফেলেছে কিনা তাই বা কে জানে। হয়তো একদিন এসে বলবে, বাবা বিয়ে করে ফেললাম বুঝলে। একটা পার্টি দাও।
আমি বুঁচকিকে জানাচ্ছি।
আমার কথাটা এড়িয়ে গেলে।
কি।
সুবীর প্রেমে পড়েছে।
পড়ুক। আরও গোটা কয়েক বিয়ে করুক, আমার কিছু যায় আসে না।
সুবীর, সুকান্ত দুজনেই হাসছে।
আমাকে ভাগ দেবে বলেছে।
তোমার আরও….।
বলো বলো।
অনিদা আমার বয়সটা এখন আঠারো নয়।
সেই জন্যই তো সুবীর ঢলে পড়েছে।
তুমিও অমনি অনিদার কথায় নাচ্ছ না। নীপা সুবীরের দিকে তাকিয়ে ধমকাল।
তোমার সঙ্গে অনিদার কথা হচ্ছে। আমি এর ভেতর ঢুকে কাবাব মে হাড্ডি হতে যাব কেন।
চলো ওবাড়িতে তারপর হচ্ছে।
যাক চিকনা, তাহলে সুবীরের একটা চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করা গেল, কি বল।
ও এর মধ্যে চিকনদাও আছে, তাহলে তো কথাই নেই।
কান কাকে নিয়ে গেল অমনি কাকের পেছনে দৌড়লি। চিকনা চেঁচিয়ে উঠলো।
নীপা চা ঢালছে।
বাসু হেসে আমার গায়ে ঢলে পরলো।
তোকে অনেকদিন পর ফুল মুডে দেখতে পাচ্ছি। বেশ ভালো লাগছে। চিকনা প্রায়ই এসে বলতো, আমার গুরুটা কেমন মন মরা হয়ে গেছে বুঝলি বাসু। আর সেরকম নেই।
নীপা চায়ের কাপ নিয়ে এলো।
নীপা আমি গুরুর কাপে চুমুক দেব। চিকনা বললো।
কেন অনেক তো খেয়েছো।
ইচ্ছে করছে।
আমাকে একটু দিস। ভানু বললো।
সব কটা হাড় বজ্জাত। এমনি মিউ মিউ করে, যেই অনিদা এসেছে, অমনি ষাঁড়ের মতো চেল্লাতে শুরু করেছে।
নীপা গজ গজ করতে শুরু করলো। সুকান্তর দিকে তাকাল।
সুখবরটা আমাকে দেওয়া যেত না?
অনিদা ফার্স্ট, তারপর সবাই, তাই বলি নি।
সাতখুন মাপ। সুবীর বলে উঠলো।
তোমায় মাপ করাব। নীপা চিবিয়ে চিবিয়ে বললো।
আমরা হাসছি।
চায়ের পর সিগারেট খাওয়া হলো। সুকান্ত তার নিজের কথা বললো। সুবীর তার কথা বললো। সময়টা বেশ ভালো কাটলো। রাতে আমার ঘরে চিকনা শুলো। নিচের বারান্দায় চিকনার খাটে ভানু। নীপা এসে এক ফাঁকে বিছানা গুছিয়ে দিয়ে গেছে। আমাকে ওষুধ খাইয়ে দিয়ে গেল।
বার বার চিকনাকে বলে গেল, মোষের মতো ঘুমবে না। কোনও অসুবিধে হলে ডাকবে।
চিকনা কনটিনিউ মাথা দুলিয়ে গেল। বুঝলাম না, হ্যাঁ বললো, না, না বললো।
আমি মুচকি মুচকি হাসছি।
সত্যি নীপাকে যত দেখছি অবাক হয়ে যাচ্ছি। পুরো সংসারটা নিজের কাঁধে নিয়ে নিয়েছে। কার কি দরকার, তার কি প্রয়োজন, সব নখদর্পণে। দিনে দিনে যেন পাকা গিন্নী হয়ে উঠেছে।
সবাইকে দেখছি কিছু করার আগে ওকে একবার জিজ্ঞাসা করছে।
গৃহকর্তী বলতে যা বোঝায় ঠিক তাই।
একদিন এই নীপাই পাগলাম শুরু করে দিয়েছিল, আমাকে বিয়ে করবে। না হলে এটলিস্ট ওকে যেন একটা সন্তান উপহার দিই।
কথাটা মনে পড়তেই হাসি পেয়ে গেল।
নীপাকে দেখে আজ ভীষণ ভালো লাগছে।
নীপা চলেগেছে তবু ওর উপস্থিতি সারাটা ঘরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে।
কথা বলতে ভালো লাগছে না, ভীষণ ক্লান্তি লাগছে। মাথাটা টিপ টিপ করছে।
চিকনা বসে বসে সিগারেটে সুখটান দিচ্ছে।
চিকনাকে বললাম, একটু মাথাটা টিপে দিবি।
চিকনা মুখটা কাচুমাচু করে হন্তদন্ত হয়ে উঠে এলো।
কি হয়েছে!
কিছু হয়নি।
তাহলে!
সারাটা দিন খুব বাজে গেল।
বাম লাগিয়ে দিই।
না।
চিত হয়ে শো, টিপে দিচ্ছি।
আমি শুয়ে পরলাম। চিকনা মাথাটা আস্তে আস্তে টিপে দিল। কখন ঘুমিয়ে পরেছি জানি না। হঠাৎ যেন মনে হলো বৃষ্টি পরছে। ঘুমটা ভেঙে গেল।
অনুভব করলাম আমার মাথাটা একটা নরম কোলের ওপর। গায়ের গন্ধে বুঝতে পারলাম নীপা। আমার গাল বেয়ে জল গরিয়ে পড়ছে। নীপার নরম হাত আমার মাথায় বিলি কাটছে।
নিস্তব্ধে নীপা কেঁদে চলেছে। আমি কিছু বললাম না। চুপ করে শুয়ে থাকলাম। নীপার কান্না থামে না। ফোঁটা ফোঁটা চোখের জল আমার গালে গড়িয়ে পরছে। বেশ কিছুক্ষণ পর নীপার হাতটা ধরলাম। সোজা হয়ে নীপার মুখের দিকে তাকালাম।
দু-চোখ বেয়ে অঝোড়ে জল গড়িয়ে পড়ছে।
কাঁদছো কেন?
নীপা মুখটা ঘুরিয়ে নিল। কাপরের খুঁট দিয়ে চোখ মুছছে।
আমার দিকে তাকাও।
নীপার চোখের পাতা ভিঁজে গেছে।
বলো।
কথা বলতে গিয়ে গলায় আটকে গেল।
কাঁদছো কেন?
নীপা চুপ করে থাকল।
তোমরা কাঁদলে আমার খারাপ লাগে।
ওদের কি একটু মায়া দয়া নেই। তোমার মতো ছেলেকে এইভাবে….।
ওটা একটা অঘটন। ঘটে গেছে, কি করা যাবে।
তোমার মাথাটা এ মাথা থেকে ও মাথা পর্যন্ত….।
নীপা কথা বলতে পারলো না। চোখের কোল বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে।
আমি এখন ভালো হয়ে গেছি।
মীরচাচা ঠিক করেছে, সবকটাকে মেরে হাড়গোড় ভেঙে দিয়েছে। এখনও গোটা দশজন হাসপাতালে পরে রয়েছে। তোমার ওই অবস্থা দেখলে সবকটাকে হয়তো মেরেই দিত।
নীপার মুখটা শক্ত হয়ে উঠলো।
তখন এখানে খুব খারাপ অবস্থা ছিল তাই না।
নীপা চোখ মুছছে। ঘার নারলো।
কি হয়েছিল একটু বলবে।
আমি স্কুলে ক্লাস নিচ্ছিলাম। মীরচাচা গিয়ে হাজির। ওই রকম অবস্থায় মীরচাচাকে আগে কখনও দেখিনি। চোখ মুখ বিভৎস। হাতে রিভালবার। আমি প্রথমটায় একটু অবাক হয়েগেছিলাম। বাইরের বারান্দায় এসে দেখি মীরচাচার পুরো গ্যাং স্কুল ঘিরে রয়েছে। কেউ খালি হাতে নেই। সব ইয়া বড়ো বড়ো তরোয়াল, বন্ধুক নিয়ে দাঁড়িয়ে। বেশ কিছু নতুন মুখ দেখলাম, চিনতে পারছি না। মহরমের সময় মীরচাচাদের হাতে ওই তরোয়াল দেখতাম।
ছুটে নীচে চলে এলাম।
দেখলাম মীরচাচা গামছা দিয়ে চোখ মুছছে। টিচার্স রুম থেকে দু-একজন বেরিয়ে এসেছে।
কি হয়েছে মীরচাচা—তুমি কাঁদছো কেন!
বোন তুই স্কুলটা ছুটি দিয়ে দে আজ—ফকির বাজখাঁই গলায় চেঁচিয়ে উঠলো।
কেন বলবে তো? তুমি কাঁদছো কেন! চিকনাদা কোথায়?
আজ ওদের সবকটাকে শেষ করে দেব। কেউ রুখতে পারবে না। এরা সবাই বাড়ি চলেগেলে নামাজ পড়ে শুরু করবো।
মীরচাচার চোখ মুখ লাল। জিঘাংসায় শক্ত হয়ে উঠেছে। আমরা সব টিচাররা মীরচাচাকে ঘিরে ধরেছি। সবার একই প্রশ্ন। বাইরের রাস্তার দিকে তাকিয়ে দেখলাম অনেকগুলো ট্রলি দাঁড়িয়ে।
ওরা অনিকে মেরেছে।
হঠাৎ মাথাটা কেমন ঘুরে গেল। চোখে অন্ধকার দেখলাম। তারপর আর জানি না।
জ্ঞান ফিরতে দেখলাম আমি নিজের ঘরে শুয়ে আছি। ঘর ভর্তি লোক। মার মুখ শুকিয়ে গেছে। মনিমা ঠাকুর ঘরের সামনে বসে কেঁদে চলেছে।
ওর কথা জিজ্ঞাসা করলাম। মা বললো ও ঠিক আছে। তোকে চিনতা করতে হবে না।
জিজ্ঞাসা করলাম কলকাতা থেকে কোনও খবর এসেছে?
বললো, না, চিকনা যোগাযোগ রাখছে।
তখন আর কারুর কথা ভাবতে ভালো লাগছে না। চোখের সামনে তোমার মুখটা ভেসে উঠছে। তুমি আর এই পৃথিবীতে নেই। তখন জানিনা তোমার এই অবস্থা। বার বার মিত্রাদির মুখটা ভেসে উঠছে। বড়োমা, ছোটোমা কি করছে।
মেয়েকে বললাম, ফোনটা এনে দে, আমি ভালো হয়ে গেছি।
মেয়ে ফোনটা এনে দিল।
চিকনাদাকে ফোন করলাম।
একবার, দুবার, তিনবার লাইন কেটে দিচ্ছে।
বাইরে বেরিয়ে এলাম।
ওরা বাধা দিতে চাইল, শুনলাম না।
আমাদের বাড়ির চারদিকে লোক। কারুর হাত খালি নয়। মাঝে মাঝে বোমা গুলির শব্দ।
হাঁড়ি পাড়ার সুবল ঘড়ুইয়ের ছেলে ছিল। ওকে ডাকলাম।
বলো নীপাদি।
কি হয়েছে?
অনিদাকে মারছে। আমরা কাউকে ছারবো নি। শ্যামদা লোক পাঠাইছে।
কি হয়েছে কি অনিদার?
হাসপাতালে ভর্তি করছে। মাথা ফাটাই দিছে। জ্ঞান নাই।
কারা করেছে?
অনাদিদার পুলিশের লোক করছে।
বুকের ভেতর থেকে আধমনি পাথরটা নেমে গেল। তুমি তাহলে মরো নি। হাসপাতালে ভর্তি আছো। ঠাকুরকে মনে মনে বললাম। তুমি এতো নিষ্ঠুর, যে লোকটা মানুষের জন্য এতো করে, মানুষকে এতো ভালোবাসে, তাকে তোমরা আধমড়া করে দিলে।
তুমি ভিতরকে যাও। আমান্যে এঠি আছি।
মীরচাচা কোথায়?
পূর্বসাই, পশ্চিমসাইতে যুদ্ধ চলেঠে সেউখানে আছে।
কাকে কি বলবো বলো। চুপ করে থাকা ছাড়া আমার কি করার আছে। সেদিন ওদের চোখ-মুখ দেখে আমি নিজেই ভয়ে সিঁটিয়ে যাচ্ছি।
তোদের জামাইবাবু কোথায়?
বাজারে আছে, চিঁড়া গুড় জোগাড় করেঠে।
সারা রাত, সারা দিন ধরে বোমা-গুলির শব্দ। এলাকা দখল চললো।
মাঝে মীরচাচা এসে বললো, কোনও চিনতা করবি না। সব ব্যাটাকে ঠাণ্ডা করে দিয়েছি। গ্রাম শুদ্ধু উজার করে দেব। এতো বড়ো ক্ষমতা অনির গায়ে হাত।
মীরচাচা সারারাত এ বাড়ি আগলে পরে থাকলো। একটুও নড়লো না।
পুলিশকে পর্যন্ত গ্রামে ঢুকতে দেয় নি।
অনাদিদার পার্টির লোকজন দলে দলে গ্রাম ছাড়া হয়ে ঘরবাড়ি ছেড়ে চলে গেল।
প্রায় একমাস ধরে চললো। এই ঠাণ্ডা, এই গরম। চিকনাদা মাঝে মাঝে ফোন করে। খবরা-খবর নেয়। বলে তোদের চিনতা করতে হবে না আমি ঠিক আছি।
তখন কতো নতুন নতুন ছেলে দেখেছি। গ্রাম শুদ্ধু উজার হয়ে আমাদের বাড়িতে। এটা যেন মেইন স্টেশন। মীরচাচা খামারে চেয়ার নিয়ে বসে। ফোনে ফোনে সব বলে দিচ্ছে। সবার এক কথা তোমার কোনও খবর এসেছে কিনা কলকাতা থেকে।
কলকাতায় যাব। তার কোনও উপায় নেই। মীরচাচা যেতে দেবে না।
ঘটনা ঘটার তিন চারদিনের মাথায় শ্যামদা এলো। সেদিন তুমি যদি মৌসুমিমাসির গাল শুনতে। শ্যামদারা তিন চারজন এসেছিল। আরগুলোকে চিনতে পারিনি।
বলে কি শোরের পুত এইজন্য কি তোদের জম্ম দিছি। সব বেজন্মার বাচ্চা। সে কি গাল।
আমি গিয়ে মাসিকে বোঝাই।
কেনো, ছেলেটা ওনকার জন্য কিছু করে লাই। সব জোয়ান মরদ হইছে।
বুড়ী ভেউ ভেউ করে কাঁদে।
ছেলেটাকে কোলে পিঠে করে মানুষ করছি। কততো ছোটো বয়সে ছোটোবাবু, ছোটোগিন্নী সগগে গেল। তন্যে থাকতে তাকে মারি দিল। তন্যে এউখানে বসে বসে দেখুঠু।
শ্যামদারা মুখ গুঁজে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে সব শুনে গেল।
এখান থেকে খামারে গিয়ে মীরচাচার সঙ্গে কি কথা বললো। তারপর ফোনে কার কার সঙ্গে কথা বললো। যে যার চলে গেল।
ও মা বিকেলে খবর পেলাম, যারা তোমাকে মেরেছিল তাদের ছেলেদের কারা কিডন্যাপ করেছে।
আবার একচোট তোরজোড় শুরু হয়ে গেল।
মাঝে একদিন নতুন এসপি এসে মীরচাচার সঙ্গে মিটিং করলো। সেদিন বাসুদা, সঞ্জুদা ছিল।
মনিমার সঙ্গে দেখা করলো। আমার সঙ্গে দেখা করলো। সবাইকে বোঝাবার চেষ্টা করলো, যা হবার হয়ে গেছে। আমরা যত শীঘ্র সম্ভব ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করছি।
মিত্রাদিকে ফোন করি এক কথা, কি বলবো তোকে বল। আমার আর কিছু ভালো লাগছে না। আমি আর সহ্য করতে পারছি না।
তোমার ওই অবস্থা, কার মন ভালো থাকে।
এদিকে মৌসুমিমাসি মাথা খারাপ করে দিচ্ছে। কখনও এসে আমার পায়ে পড়ে যায়, কখনও মার পায়ে, আমাকে একবার অনির কাছে নিয়ে চল। ওর মুখটা একবার দেখি।
স্কুল বন্ধ। চারদিকে কেমন যেন দমবন্ধ করা পরিস্থিতি। সবাই বলাবলি করতে লাগল, অনিটা মনে হয় আর বাঁচবে না। মনিমা গুণীন জ্যেঠুর কাছে গেলো। গুণীণ জ্যেঠু বললো, ও বেঁচে যাবে আবার ভালো হয়ে যাবে। ও পীরবাবার সন্তান। রাখে হরি মারে কে। গুণীন কাকার কথায় সবাই যেন বুকে বল পেল সবাই।
মনিমা এসে সকাল, বিকেল ঠাকুর ঘরের দোরগোড়ায় বসে থাকে।
মাঝে মাঝে বাঁশবাগানে চলে গিয়ে পুকুরের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে বসে থাকে।
(আবার আগামীকাল)