২০৭ নং কিস্তি
কি সুন্দর ম্যাসেজটা দিল বলতো তোকে। দামিনীমাসি বললো।
সবাই দামিনীমাসির মুখের দিকে তাকাল। সুরোও অবাক হয়ে দামিনীমাসির দিকে তাকাল।
কিছু বুঝলি না।
না।
তোর ঘটে এসব ঢুকবে না।
মাসীমনি হেসে ফেললো।
বুঝলে ছেলের কীর্তি। দামিনীমাসি, মাসীমনির মুখের দিকে তাকাল।
এখনও কাজটা শেষ হয়নি শেষ হতে হতে বিকেল হবে, তাই বিকেলের পার্টিতে বাবু আসবেন। এই ছোট্ট নিউজটাও দেওয়া হয়ে গেল।
তুমি না সত্যি মাসি….।
শুভ, বুঁচকির সঙ্গে দেখা করেছিল? দামিনীমাসি বললো।
মাসীমনি সুরোর মুখের দিকে তাকিয়ে।
হ্যাঁ, যেমন কথা বলে তেমনি কথা বললো। বুঁচকিও দাঁত মুখ খিঁচিয়ে কিছুটা ঝাড় দিল। কিছুটা দাঁত বার করে হাসল।
অংশু কোথায় ছিল?
আমার পাশে বসে ছিল। তারপর বললো অনেক বক বক শুনলাম, বোর লাগছে। এবার একটু অফিসে যাই। চলে গেল।
নম্রতা?
ওদের সঙ্গে গেল।
যা বোঝার বুঝে গেছি। দেখছিস ছোটো তোকে একটু আগে বলছিলাম। আজকের দিনে ও ঘরে চুপ চাপ বসে আছে। টিভি দেখছে। হাসি মস্করা করছে। গল্প করছে। এবার কিছু বুঝছিস? আমার কথাটা মিলিয়ে নে। শুভ এখন অনি ব্যানার্জী হয়েছে। ইনভিজিবিল।
ও আবার গণ্ডগোল পাকিয়েছে! বড়োমা বললো।
তা কেন। ঘুঁটি গুলো নাড়াচাড়া করে দেখছে।
নাঃ এবার তোমাকে বিধানসভার টিকিটটা দিতেই হবে। তুমি যা পেকেছ।
আমি মাসির দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে বললাম।
হ্যাঁরে, তা বলবি না। আমি তোকে নতুন করে দেখছি তো।
বনি দিল্লী থেকে লাড্ডু নিয়ে এসেছিস?
বনি আমার দিকে তাকাল। চোখের মনি দুটো স্থির। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকর পর বললো।
কথা ঘোরাচ্ছ কেন।
যা বাবা কোথায় কথা ঘোরালাম। তুই সক্কাল সক্কাল দিল্লী থেকে এলি। লাড্ডু পেলাম না, তাই জিজ্ঞাসা করলাম।
বনি মুচকি হাসলো।
ও হ্যাঁ তোর আবার অনেক হিসেব-নিকেশ আছে, যাওয়ার সময় বলে গেলি।
নাগেশ পর্শুদিন ওর অফিসে রিজাইন দিয়েছে।
তাই! খুব খারপ খবর।
কেন দিল জিজ্ঞাসা করলে না?
সেই জন্য আজ সকালে নাগেশের কান ধরে টেনে নিয়ে আমার কাছে চলে এলি।
নাগেশ জোরে হেসে উঠলো।
এখানে আমি আর সুরো দুজনে আছি। চিমটি কেটে পেটের মাংস তুলে নেব।
মুখ থাকতে হাতে কেন।
সকলেই কমবেশি মুচকি হাসছে। আমি নাগেশের দিকে তাকালাম।
নাগেশ তুমি আজই বিকেলের ফ্লাইটে ফিরে যাও। কাল ফার্স্ট আওয়ারে অফিসে গিয়ে রিজাইন লেটারটা উইথড্র করো। না হলে আমার বোনটা না খেতে পেয়ে মরে যাবে।
বনি আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পরলো। সুরো এগিয়ে এসে থামা থামি করার চেষ্টা করলো।
আমি হাসতে হাসতেই বললাম, শুঁড়ির সাক্ষী মাতাল।
বহুদিন পর আজ আমার দোতলার সেই পুরনো ঘরটায় এলাম।
দিন বললে ভুল বলা হবে। বলা উচিত বহুবছর। শেষ রাতটা মিত্রার সঙ্গে এই ঘরে কাটিয়ে ছিলাম। তারপর হারিয়ে গেলাম। ছেলে, মেয়ে তখনও হয়নি। বসিরহাটে দাদুর কাছে যাওয়ার ঠিক আগের রাত। ও আমার সঙ্গে শুধু শুধু ঝগড়া করেছিল। মেয়েদের মান অভিমনটা বড্ড চড়া সুরে বাঁধা। চোখ বুঁজে থাকলে ছবির মতো সব চোখের সামনে ভেসে ওঠে। মেয়ে এখন এই ঘরের দখলদার। এই মুহূর্তে অনিকা, মেয়ে এই ঘরের বাসিন্দা।
একমাত্র রং ছাড়া ঘরের কোথাও কোনও পরিবর্তন নেই।
যা দেখেগেছিলাম ঠিক তেমনটি আছে। আমার পুরনো আলমাড়িটা যেখানে ছিল ঠিক সেখানে একটা আলমাড়ি আছে। নিচের টেবিলের মত একটা টেবিল। টেবিলটার ওপর আমার সেই সাধুবাবার ফটো বড়ো করে কপি করে বাঁধান। শোয়ার খাটটা যেখানে ছিল সেখানেই মেয়ের খাট। পায়ে পায়ে জানলাটার কাছে এলাম। এলোমেলো ঝাঁকড়া চুলের আমগাছটা আমার দিকে তাকিয়ে ফিক করে হাসলো।
কিরে তুই এই ঘরে! যা ভাগ, এইটা এখন তোর ঘর নয়।
নিজের মনে নিজে হাসলাম।
নিচের দিকে তাকালাম। পেয়ারা গাছটা ঠিক সেইভাবেই দাঁড়িয়ে।
পেছনের দিকে লোকজন আসতে শুরু করেছে। এখন সব ইনসট্যান্ট সাজান-গোছান হয়। ঘণ্টা খানেকের মধ্যে লাইটও লাগান হয়ে যাবে প্যান্ডেলও তৈরি হয়ে যাবে। অনেকটা সিনেমার স্যুটিং-এর সেট। কুশী-লবরা আসবে, অভিনয় করবে যে যার বাড়ি চলে যাবে।
আমগাছটার দিকে চোখ চলেগেল।
ওমা! দেখি একটা কাক নিজের বাসায় গুটিশুটি মেরে বসে আমার দিকে জুল জুল করে তাকিয়ে আছে। নিশ্চই ব্যাটা ডিম দিয়েছে। তা দিচ্ছে।
এ মনে হয় ওই ভাঙা ঠোঁট ওয়ালা কাকটার বংশধর।
ওই কাকটার সঙ্গে আমার ভীষণ ভাব ছিল।
আমাকে ঘরে দেখতে পেলেই গাছের ডাল থেকে উড়ে এসে জানালার ধাপিটাতে বসবে। কা কা করে ডাকবে। আমি না তাকালে একটা অদ্ভূত শব্দ করবে। বাধ্য করবে আমাকে তাকাতে। প্রণী জগতেরও আকর্ষণ করার কি অসীম ক্ষমতা। জানলার কাছে এলেই জুল জুল করে তাকিয়ে থাকবে। বড়োমা চা বিস্কুট দিয়ে গেলে ওদের বিস্কুটটা দিতাম। সেই নেশা। ওদের জন্য আমাকে বিস্কুট কিনে এনে রাখতে হতো।
সকাল হলেই কা কা করে কান ঝালাপালা করে দিত।
বিস্কুটগুলো টুকরো টুকরো করে হাতে নিলেই হাত থেকে নিয়ে চলে যেত আমগাছের ডালে।
একটা পায়ে বিস্কুটটা ধরে কুড়ে কুড়ে খেত। মাঝে মাঝে মাথা ঝাঁকিয়ে গিলত।
বেশ লাগত দেখতে।
কোথা থেকে যে সময় কেটে যেত বুঝতেই পারতাম না। মাঝে মাঝে ছোটোমা, বড়োমা আমার এই অবস্থা দেখে হেঁসে কুটি কুটি।
তুই কার সঙ্গে কথা বলছিস?
হেসে ফেলতাম।
তোর বন্ধুগুলো বেশ সুন্দর।
সেই নিয়ে খাবার টেবিলে কত ঝড় উঠতো। মল্লিকদা তাল ঠুকতো।
কাকটা আমার দিকে তাকিয়েই আছে। ওপরের ঘরে নতুন লোক দেখেছে।
একটা দিন গেছে এই জানলাটার সামনে দাঁড়িয়ে রাতের অনেকটা সময় আমি কাটিয়ে দিয়েছি। সারাটা বাড়ি নিস্তব্ধ। একমাত্র ঝিঁ ঝিঁ পোকার ঝিঁ ঝিঁ ডাক আমার সঙ্গী।
কি যে ভালোলাগত।
পাঁচিলের ওপারে কর্পোরেসনের আলো। আগে টিউবলাইট ছিল এখন হ্যোলোজেন হয়েছে। আমগাছের ফাঁক দিয়ে ওই আলো জানলার ধাপিটাতে এসে পড়তো। বাতাসে গাছের পাতা কাঁপলে আলোটাও থিরি থিরি কাঁপতো। এই আমগাছ এই পেয়ারা গাছ আমার অনেক কিছুর সাক্ষী। এক সকালে এই ঘরেতেই মিত্রার হাতে প্রথম থাপ্পরটা খেয়েছিলাম। তারপর সেই ভয়ঙ্কর মুহূর্ত। মিত্রা জ্ঞান হারাল। ডাক্তারদা এলো। সেই যে মিত্রা রয়ে গেল আর ফিরে গেল না। ছেঁড়া ছেঁড়া কত স্মৃতি।
আমগাছটায় বেশ আম হয়েছে। কত বয়স হবে দিন পনের কুড়ি। খুব একটা বড়ো হয়নি। একটু বড়ো হলেই কুচি কুচি করে কেটে কাঁচা নুন দিয়ে বেশ ভাল জমবে।
দেশের বাড়ির গাছের আমগুলো এরি মধ্যে কিন্তু বেশ বড়ো হয়েছে।
বাগানের পেছন পাশের জানলায় এলাম।
আরে, এরা কি ওপেন থিয়েটার বানাবে নাকি?
যে রকম ডেকরেসন করছে তাতে তাই মনে হচ্ছে। এরি মধ্যে মাঠের ঘাসের ওপর কার্পেট পাতা হয়ে গেছে। ছোট ছোট সোফা আর টেবিল।
বিরাট একটা হাই উঠলো। কাল সারারাত তনু মিত্রা জাগিয়ে রাখলো।
ওদের কথা শুনতে হবে। এর নাম বন্ধন।
পকেট থেকে মোবাইলটা বার করে অর্জুনকে ফোন করলাম।
মোবাইলটা বাজার সঙ্গে সঙ্গেই অর্জুন ধরলো। বিকট হাসি। স্পিকার ফেটে যাবার জোগাড়।
কিরে ব্যাটা এত হাসি কিসের?
টিভি দেখছি।
খুব মস্তিতে আছিস মন হচ্ছে?
থাকবো না।
এখন কোথায় আছিস?
তোমার ফার্মে।
ওখানে কে নিয়ে গেল!
সুকান্তদা। বললো এখন এখানে থাকো। ভালোপাহাড়ে যেতে হবে না।
সবাই।
হ্যাঁ।
বিনদ আছে?
আছে।
অনিদা কি বলছেরে অর্জুন। আলতাফের গলা পেলাম।
বিনদ আছে কিনা।
একবার আসতে দে তারপর হিসেব বুঝব।
কি বলছে শুনতে পাচ্ছ।
শুনছি।
ওদিককার খবর কি?
সব কুল।
ভাল করে খোঁজ খবর নিয়ে আমাকে জানা।
এ কথা বলছ কেন?
মনে হলো তাই বলছি।
ঠিক আছে দেখে নিচ্ছি। তুমি কাল আসছো তো?
সেরকমই প্রোগ্রাম আছে। ঠিক আছে রাখছি।
অর্জুনকে ছেড়ে চিকনাকে ফোন করলাম।
হ্যালো।
কিরে তুই কোথায়? চিকনার গলা।
বাড়িতে। আমার সেই পুরনো ঘরে জানলার সামনে দাঁড়িয়ে। তুই কি করছিস? টিভির আওয়াজ পাচ্ছি।
সেই সকালে যা টিভিতে বসেছি।
শরীর ঠিক আছে।
পুরো ফিট।
মীরচাচা?
পাশে বসে।
রাতের পার্টিতে আসবি না।
যেতাম। গুরুমা বললো এসে কাজ নেই। কাল সব আসবে, তার তোড়জোড় চলছে।
বেশি ঝামেলা করতে যাস না।
ঝামেলার কি আছে। যা ছিল তাই আছে। ঘরদোর একটু পরিষ্কার করছি।
এতো লোক শোবে কোথায় বলতো?
মাঠে সামিয়ানা খাটাইছি। সেউঠি শুবে?
হেসেফেললাম।
এখন একটু ঘুমো। রাতে আবার ঝামেলা আছে।
একথা বললি কেন?
কাল সারারাত গুরুমা, তনুদি ঘুমতে দেয়নি।
খবর চলেগেছে!
হ্যাঁ। গুরুমাকে ফোন করলাম, বললো।
আর কি বললো?
চিকন জোরে হেসে উঠলো।
তুই কি মোকে মউগা পাইছু।
ঠিক আছে কথাটা মাথায় রাখবি।
দাঁড়া এখন বুঁচকি লেকচার মারতিছে শুনি। পরে কথা কইবো।
ফোনটা বন্ধ করে পকেটে রাখলাম।
খাটে এসে টান টান হয়ে শুলাম। কটা বাজে?
রোদের যা তেজ তাতে মনে হচ্ছে দুটো-আড়াইটে হবে।
ভীষণ ঘুম পাচ্ছে। ফোনটা পকেট থেকে বার করে সিমটা খুলে বালিশের ওয়ারের মধ্যে ঢুকিয়ে রাখলাম। ফোনটা মাথার শিয়রে রেখে শুয়ে পড়লাম।
মাথাটা কোনও মুহূর্তে ফাঁকা নেই কিছু না কিছু একটা কাজ করে চলেছে। এ-কথা সে-কথা চিন্তা করতে করতে ঘুমিয়ে পড়লাম।
ঘুমটা যখন ভাঙল বুঝলাম এ ঘরে অনেকে রয়েছে। মাম্পি, মিকি আমার পিঠে গাড়ি চলাচ্ছে। বুরুর বুরুর আওয়াজ করছে।
চোখটা খুলতে ইচ্ছে করছে না। জ্বালা জ্বালা করছে।
এত হই হট্টগোলেও আমি মরার মতো ঘুমচ্ছিলাম? নিজেই কেমন যেন অবাক হচ্ছি।
তারপর শোনো না ছোটোমা। মেয়ের গলা পেলাম।
সবাই খুব হাসাহাসি করছে।
বুঝলাম গল্পের আসরটা খুব জোরদার চলছে।
মাঝে মাঝে মাম্পি, মিকি ঝগড়া করছে।
দেবনা পিঠ ফাটিয়ে। সুরোর ধমক কানে এলো।
আবার মারতে যায়, তোর কি অসুবিধে করছে শুনি। ছোটোমার ধমক।
সাগ্নিক বেশ কলার উল্টিয়ে শুভকে বললো….। আবার মেয়ের গলা পেলাম।
ব্যবসা করবো বলে বাবার কাছে নোট চেয়েছিলাম। বাবা দশলাখ দেবে বলছে কি ব্যবসা করি বলতো।
শীতের রোদ, মাঠে সবাই বসে চুটিয়ে আড্ডা চলছে। সাগ্নিক সব সময় একটু হামবড়াক্কি ভাব দেখায়। ওর বাবার নাকি প্রচুর পয়সা। ওর সাঙ্গপাঙ্গও কিছু আছে। সব সময় পেছন পেছন ঘুরছে। মাঝে কিছুদিন আমার পেছনে ঘুরেছিল। তারপর সব জানতে পেরে হাওয়া।
সেইটা বল। সুন্দর ফুট কাটল।
পরে।
শুভ গম্ভীর হয়ে বললো। মুতের ব্যবসা করতে পারিস।
কথাটা শুনেই ঘরের সকলে জোড়ে হেসে উঠলো।
কি বিটকেল বুদ্ধি বলো। তনু বললো।
মেয়ে হাসতে হাসতে বললো। হাসলে হবে না। আগে শোনো।
তুই তো নিজেই হাসছিস। সুন্দর বললো।
কথাটা শুনে সাগ্নিক প্রথমটা থতমতো খেয়ে গেছে। অতোগুলো মেয়ের সামনে শুভ বলেছে। প্রেসটিজ পুরো টাইট।
আমরা মুচকি মুচকি হাসছি।
শুভ আবার রিপিড করলো। হ্যাঁরে আমি ঠিক বলছি। দারুণ প্রমিসিং বিজনেস। নো ইনভেস্টমেন্ট খালি টাকা আর টাকা।
তোর বাবার সেই ডারউইনের থিওরি। মাথায় বুদ্ধি নেই পেছনে আছে। মিত্রার গলা পেলাম।
তুমি জানো না মা ডিটো বাবার নকল।
সাগ্নিক গম্ভীর হয়ে বললো, ওমনি চাটা শুরু করলি।
যা ফোট। শালা ভাল বুদ্ধি দিলাম, ওমনি চাটা শুরু করলি। ক্যান্টিনে চা আর মটন কাটলেট বল।
আমরা যারা মেয়েরা ছিলাম হাসছি। সাগ্নিক গম্ভীর। অতো মেয়েদের মাঝে শুভ প্রেসটিজে টিউন করে দিয়েছে।
কাকলি বললো, সাগ্নিক তুই শুভকে ব্যাপারটা ক্লারিফাই করতে বল।
কেন, না চুলকোলে হচ্ছে না। সাগ্নিক আরও খেপে গেল।
তোর বাবার টাকা নিয়ে ব্যাঙ্কে রাখ ইন্টারেস্ট পাবি। তোকে আর ব্যবসা করতে হবে না।
শুভ ব্যাপারটা একটু গুছিয়ে বলতো আমি করবো। সনাতন বললো।
সনাতনকে আমরা কাক বলতাম। যেমনি কালো তেমনি রোগা। গলাটা কি কর্কশ।
সেই শুনে সাগ্নিক আরও বেশি খেপচ্যুয়াস হয়ে উঠলো।
মূত্র দক্ষিণা একশো টাকা। কখনো শুনেছিস?
শুভর কথা শুনে আমরা হেসে গড়াগড়ি খাই।
আবার ভ্যাড় ভ্যাড় করে। শুভর গলা পেলাম।
মাথায় রাখবি আঙ্কেল জেগে ঘুময়।
কিরে শুভ ব্যাপারটা কি? মূত্র দক্ষিণা একশোটাকা….। বৌদির গলা পেলাম।
আবার সবাই জোড়ে হেসে উঠলো।
নাগো ভালোদিদাই, ওটা একটা এ্যাকসিডেন্ট। বুঁচকিটা আচ্ছাই গাড়ল….।
বলবি না। ছিলাম বলে তখন বেঁচেছিস। স্বার্থপর…. নেমক হারাম।
কেন তোকে শোধ করিনি। ইন্টারেস্ট হিসাবে দুটো মটন কাটলেট মেরেছিস।
ঠিক আছে ওটা পরে হবে। আগে মূত্র দক্ষিণার গল্পটা ঝাড়। অনিকার গলা পেলাম।
পক্কে।
তোকে চিন্তা করতে হবে না। ও স্ট্রেট ড্রাইভ না করলে আমি কেতাবী ঢঙে ড্রাইভ করবো।
শুভ ঝেড়ে দে। ঘণ্টা বললো।
সবাই হাসাহাসি করছে। আমিও যে বালিসে মুখটা গুঁজে মুচকি মুচকি হাসছি না তা নয়।
শুভকে সবাই চেপে ধরেছে।
তোমার অফিস থেকে সেদিন বেরিয়ে আমি বুঁচকি বুক ফেয়ার যাচ্ছিলাম।
ও বললো হেঁটে যাব না। মেট্রোতে চেপে ময়দান স্টেশনে নেমেই বুক ফেয়ারে ঢুকে পরবো।
সেই মতো ধর্মতলা মেট্রো স্টেশনে যাচ্ছি।
হিসি চাপলো।
সু সু, সুন্দর চেঁচাল।
আবার একটা বিকট হাসি।
বুঁচকিকে বললাম, তুই দাঁড়া আমি একটু আসছি।
ও বললো, কিরে মাইনাস করবি।
হ্যাঁ।
চলে এলাম, বেশ শান্তিতে কাজ সেরেছি। ও মা পেছন ঘুরে দেখি, এক ভদ্রলোক আমার দিকে তাকিয়ে দাঁত বার করে হাসছে।
ভাবলাম কি না কি?
কাছে আসতে খুব সুন্দর করে বললো, বাবা কাজ হলো।
প্রথমে ধরতে পারিনি।
বললাম, তাতে আপনার কি?
বলে কি এবার শ্রীঘরে চলো। আমার প্যান্টের পেছনটা ধরে ফেললো।
ভাবলাম এটা নতুন কোনও স্কিম কিনা। মাথা গরম হয়ে গেল।
বললাম, কি বলতে চাইছেন।
একটু হেয়ারস্ট্রীট থানায় চলো, একটা পেটি কেশ দিই, তারপর বাড়িতে ফোন করবে, বাড়ির লোক এসে তোমাকে ছাড়িয়ে নিয়ে যাবে।
তখন আমার বোঝা হয়ে গেছে।
এদিক ওদিক তাকালাম, দেখলাম ট্রাম কোম্পানির অফিসের গায়ে একটা পুলিশের গাড়ি দাঁড়িয়ে। কয়েকজন গাড়ির মধ্যে বসে। আমাকে দেখে হাসছে।
কেশ জণ্ডিস। কথা বারালাম না।
স্ট্রেইট বললাম, কত দিতে হবে।
থানায় গেলে খরচ পরবে দুশো-আড়াইশ স্পট ফাইন একশো।
এক মিনিট দাঁড়ান দিয়ে দিচ্ছি।
আগে দাও।
পকেটে নেই আনতে হবে।
তোমার মতো বোকা ছেলে আগে দেখিনি।
বাধ্য হয়ে বললাম ঘড়িটা রাখুন দু-মিনিটের মধ্যে এসে দিয়ে যাচ্ছি।
হাতের ঘড়িটা খুলে ভদ্রলোকের হাতে দিলাম।
মেজাজটা খিঁচড়ে গেল। ভাবলাম একবার আবিদ আঙ্কেলকে ফোন মারি। নিজেরই লজ্জা করলো। এই কেশে আবিদ আঙ্কেলকে ফোন করলে পুরো গিয়ো।
বুঁচকির কাছে আসতে বললো, কিরে এতো দেরি!
ওকে তখন কিছু বলিনি। গম্ভীর হয়ে বললাম, একশো টাকা দে।
একশো টাকা! কি করবি?
ফালতু কথা রেখে আগে দে না।
কি করবি আগে বল।
একটা জিনিষ কিনব। দেখে এলাম।
ও ব্যাগ থেকে বার করে দিল। আমি হন হন করে সামনের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম।
আর ওর দিকে পেছন ফিরে তাকায়নি।
সোজা হেঁটে সেই পুলিশের গাড়ির কাছে গেলাম।
একশো টাকা দিয়ে ঘরি নিয়ে ফিরে আসছি দেখি বুঁচকি একটু দূরে দাঁড়িয়ে আমার দিকে তাকিয়ে। বুঝলাম ধরা খেয়ে গেছি। এবার হাজার প্রশ্ন।
শুভর কথা শুনে ঘরের সবাই হেসে কুটি কুটি।
আরে এতো বুবুনের কেশ। মিত্রা হাসতে হাসতে বললো।
এ্যাঁ। তুমি কি বলছো মা! মেয়ের গলা পেলাম।
বাবাও হিসি করতে গিয়ে পুলিশের হাতে ধরা পড়েছিল?
আবার সারাটা ঘরে হাসির হিরিক।
না ধরা পরেনি। ও ভীষণ চালাক।
সেটা কি রকম রে মিত্রা। বড়োমার গলা পেলাম। বড়োমা থেমে থেমে হাসছে।
ও কুকুরের মতো হিসি করতো।
আবার হাসির শব্দে চারদিক ম ম করে উঠলো।
মিত্রাদি তুমি থামো। মিলির গলা পেলাম।
হ্যাঁরে।
আমাকে একটু দূরে দাঁড় করিয়ে রেখে বলতো, দাঁড়া ট্যাঙ্কটা ক্লিয়ার করে আসি, ওভার লোড হয়ে গেছে।
একদিন একটু আড়াল থেকে দেখি। ও এখানে একবার দাঁড়িয়ে ওখানে একবার দাঁড়িয়ে আবার একটু দূরে গিয়ে করলো।
তিন চরদিন ব্যাপারটা লক্ষ্য করার পর একদিন জিজ্ঞাসা করলাম।
বুবুন।
বল।
কাজ হলো।
হ্যাঁ। এখন শান্তি। তলপেটটা যা টন টন করছিল না।
তোদের কি সুবিধা তোরা যেখানে সেখানে দাঁড়িয়ে করে দিস।
কেন তোরা করিস না।
করা যায়, তুই বল।
তোরা আমাদের থেকে শেয়ানা। আমাদেরটা তোরা দেখতে পাস। তোদেরটা মইক্রস্কোপ দিয়ে দেখতে হয়।
কিরকম?
এই তো সেদিন হস্টেল থেকে বেরিয়ে কলেজে আসছি। একজন ভদ্রমহিলা আমার সামনে সামনে হাঁটছেন। হঠাৎ দেখি ভদ্রমহিলা দাঁড়িয়ে পড়লেন। একবার এদিক ওদিক তাকালেন। আমি ভবলাম ভদ্রমহিলার মন হয় শরীরটা গণ্ডগোল করলো।
একটু দূরত্ব বজায় রেখে থমকে দাঁড়ালাম। ভদ্রমহিলা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে আবার হাঁটতে শুরু করলেন। আমিও হাঁটা শুরু করলাম। কাছে এসে দেখি চারদিক শুকনো ওই খানটা কেমন জলে ভিঁজে গেছে।
আরে! এখুনি ফুটপাথটা শুকনো দেখলাম, জল এলো কোথথেকে? এবার বোঝ।
ঘরে তখন হাসির হুলুস্থূলুস চলছে।
অদিতি, মিলি, টিনা ধ্যুসধাস করছে।
আমি বললাম তুই ওরকম কুকুরের মতো এখানে একটু ওখানে একটু করলি।
সত্যি তুইও পারিস মিত্রা। ছোটোমার গলা পেলাম।
খুব গম্ভীর হয়ে বললো, যে কোন কাজ বুদ্ধি খাটিয়ে করবি। ধরা পরবি না।
ওর কথাটা শুনে আমি অবাক। প্রাকৃতিক কর্ম তাও আবার বুদ্ধি খাটিয়ে!
হুঁ হুঁ বাবা, না হলে মামার হাতে কট, সোজা শ্রীঘর।
হাসি থেমে নেই সে তার আপন খেয়ালে হয়েই চলেছে।
তারপর আমাকে ব্যাখ্যা করলো।
তিন জায়গায় একটু একটু করার অর্থ কি জানিস?
বল শুনি।
আমার আগে আরও দুজন করে গেছে তাই আমি করলাম।
আমি তো ওর কথা শুনে অবাক। তারমানে!
হ্যাঁ। আমি তিনজায়গায় করলাম মানে তিনজন হিসি করলো। স্পটটা তার প্রমাণ। মামা ধরলেই প্রথমে স্পটটা দেখিয়ে বলবো, আগের দুজনকে ছেড়ে আমাকে ধরছেন কেন। তারমান আমার কাছ থেকে টাকা খাওয়ার ধান্দা। ফাইট করার একটা রাস্তা তৈরি করলাম। ধরা পরলে চেঁচামিচি। লোক জরো। হাতেনাতে প্রমাণ আমি একা নয় আরও দু-জন আমার আগে করে গেছে। আমি বেকসুর খালাশ।
সমবেত হাসির তোরে চারদিক গম গম করছে।
বৌদি চেঁচিয়ে উঠলো, ওরে থাম থাম ওর ঘুম ভেঙে যাবে।
এরকম তেঁয়েটে মার্কা বুদ্ধি কখনও দেখিনি। বড়োমা বললো।
মিত্রা তখনও হেসে চলেছে।
তারপর বলে কি তুই যেন ওরকম করতে যাস না, কেশ খেয়ে যাবি।
তুমি থামবে। মিলি আবার চেঁচিয়ে উঠলো।
হাসির রেশ একটু কমলো।
শোনো না তারপর শুভ কি বললো। মেয়ে চেঁচিয়ে উঠলো।
আঙ্কেলের কেশটার পর আমারটা ধোপে টিকবে না। শুভ বললো।
তবু বলবো।
বল।
তারপর সাগ্নিককে হিসেব দিচ্ছে। কর্পোরেশন এখন অনেক মূত্রখানা তৈরি করেছে দেখেছিস। অলি গলি সব জায়গায়। এর আবার টেন্ডার হয়। তোকে ইয়ার্লি বিডিং করে নিতে হবে। পরিষ্কার করা জল দেওয়া সব কর্পোরেশন নিজে করবে। ইয়ার্লি তোর কাছ থেকে এককালীন একটা টাকা কর্পোরেশন নিয়ে নেবে।
মূত্র দক্ষিণা একটাকা পটি স্নান পাঁচ।
সারাদিনে তুই যদি দুশো ক্লায়েন্ট টানতে পারিস। খরচ খরচা বাদ দিয়ে নিট ছয় থেকে সাতশো টাকা। এবার হিসেব কর। একলাখ দিয়ে তুই যদি বিড করিস বছরের শেষে তোর কত হবে। আমি হিসেব টিসেব করে দেখেছি লাখ খানেক থাকবেই। একলাখে ব্যাঙ্ক তোকে এক বছরে এতো ইন্টারেস্ট দেবে না। বুদ্ধিটা দেওয়ার জন্য কালুকে ডবল ডিমের ওমলেট বল। একটু কড়া করে ভেজে দিতে বল। আর ছোট চা।
সনাতন বলে শুভ তুই আমার জন্য ব্যবস্থা কর। আমি একবার লড়ে যাই।
আমি উপুর হয়ে বালিশে মুখ গুঁজে শুয়ে ছিলাম। চোখ খুলে মাথটা তুলতেই সকলে আবার জোরে হসে উঠলো।
উঃ শান্তিতে একটু ঘুমবো তাও তোমরা ঘুমতে দেবে না।
হাসি তখনো থামেনি।
তোমার গল্প শুনছিলাম। মেয়ে বললো।
একবার ঘরের চারদিকটা দেখে নিলাম। দিদি, বসির আছে। আফতাবভাই নেই। মাসীমনি, সোনা আন্টিকে দেখতে পেলাম না।
বড়োমা আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে।
মাম্পিরা তখনও বুরুর বুরুর করছে। বললাম, এবার ওঠ অনেকক্ষণ গাড়ি চালিয়েছিস।
আমি চালাইনি মিকি চালিয়েছে।
কি শয়তান দেখ। ওমনি মিকির ঘারে দোষ। মিলি বললো।
ছোটোমা একটু চা খাওয়াবে।
উঠে আগে মুখে চোখে জল দে।
তোরা কখন এলি? অনিকাদের দিকে তাকালাম।
সকালের সাজ-পোষাক বদলে ফেলেছে।
মিত্রা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে। চোখে মুখে দুষ্টুমির হাসি।
ভালই ঘুমলি কি বল?
আমি উঠে বসলাম।
বিরাট বিরাট দু-চারটে হাই তুললাম।
মিকি, মিম্পি এঁটুলে পোকার মতো জড়িয়ে রয়েছে।
আঙ্কেল আজ নেমন্তন্ন খাবে? মাম্পি বললো।
আমি ওদের দিকে তাকালাম।
কোথায়?
নীচে।
কিসের নেমন্তন্ন?
বজু বললো।
তুই রান্না করবি?
না। হাঁড়ি কড়া সব এনেছে।
কে এনেছে?
বাইদাদাই।
বিছানায় হিসি করেছিস?
আমি না মিকি।
আর গম্ভীর থাকতে পারলাম না। হেসে ফেললাম।
ইসারায় বললাম মা গুম গুম। মাম্পি গলা জড়িয়ে ধরে বললো, না।
একজন কোলে ঢুকে পড়েছে, একজন পিঠে।
পক্কেবাবু স্যার আজ কটা ছবি তুললে।
ঘণ্টা, সবে লাইনপাতা শুরু হলো। পক্কে বলে উঠলো।
অনিকারা মুচকি মুচকি হাসছে।
তোদের কোম্পানির বিজ্ঞাপন বেরলে বলিস একটা এ্যাপ্লিকেশন করবো।
ঝেড়ে কাশো। এটা তোমার প্রশ্ন নয়।
মিত্রা আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে।
দাও উত্তর দাও। তনু বললো।
ছেলে এখন বড়ো হয়ে গেছে। রোজগেরে ছেলে বলে কথা।
তোমার সঙ্গে জয়েন্ট এ্যাকাউন্ট, এখনও নিজের নামে আলাদা করে এ্যাকাউন্ট করিনি।
বুঝেছি।
দিদি আমার মুখের দিকে তাকিয়ে। হাসছে।
দাদা কোথায়?
নীচে।
কাজ মিটলো?
তুই জানিস।
ছোটোমা, বনি, নাগেশকে দেখতে পাচ্ছি না।
টেরিয়ে দেখলাম অনিকারা নিজেদের মধ্যে ইশারায় কথা বলছে।
এয়ারপোর্ট গেছে?
চলে গেল!
না। মিসেস রাঘবন আসছেন।
মামা এবার ঘোরাটা একঘর পিছিয়ে নাও রাজা কিস্তি পড়ে যাবে। ঘণ্টা বলে উঠলো।
আমি হাসলাম।
দেখছিস কি কথার কি অর্থ। বৌদি বললো।
বৌদি আবার দিদিকে ট্রানস্লেট করলো।
দিদি হাসছে।
নম্রতা।
এখনও ইয়লো সিগন্যাল আছে।
হেসেফেললাম।
টেবিলের ওপর থেকে জলের বোতলটা দে।
কিরে জলের বোতলের সঙ্গে কি প্রশ্ন আছে। মিত্রা আমার দিকে তাকিয়ে বললো।
তোরা এক একজন যা পাকা হয়েছিস না।
কিরে শুভ। তনু, শুভর দিকে তাকাল।
কি হয়েছে।
আঙ্কেল জলের বোতলের সঙ্গে কি হিন্টস দিল।
কিগো চা এখানে নিয়ে আসতে বলবো। দামিনীমাসি গেটের সামনে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে উঠলো।
আমাকে দেখে হেসে ফেললো। তুই উঠেছিস!
তখন থেকে সব জ্বালিয়ে মারছে। মাসি দেখ না অনিদা উঠেছে কিনা।
কারা? বড়োমা খ্যাঁক করে উঠলো।
কে আবার তিন মক্কেল।
খাওয়ার পর রুমাদির সঙ্গে ফিস ফিস করছিল। তারপর তিনজনে কোথায় বেরলো তো। বৌদি বললো।
মাসিদিদা, নেপলা আঙ্কেল চলে এসেছে? শুভ উঠে দাঁড়াল।
অনেকক্ষণ।
নম্রতা জলের বোতলটা এনে আমার হাতে দিল।
আমাকে এট্টু দাও। মাম্পি হাঁ করলো। মিকি পিঠ থেকে সামনে এলো আমি খাব।
জলেও ভাগ! মিলি চেঁচিয়ে উঠলো।
উঃ তোমরা যা সব হয়েছো না। আমি বললাম।
ওদের একটু জল দিলাম।
বেশ বুঝতে পারছি তনু, মিত্রা আমার চোখে চোখ রেখেছে।
জলটা খেয়ে নম্রতার হাতে বোতলটা দিলাম।
মিকি, মাম্পি কোল থেকে নেমেছে।
আমি খাট থেকে নমলাম।
পাঞ্জাবীর পকেটে হাত ঢোকাতেই দিদি আমার দিকে তাকাল। হাসছে।
সিমটা কোথায়?
মামা এতক্ষণ তুমি যেটা জানতে চেয়েছিলে নিশ্চই তোমার জানা হয়ে গেছে। ঘণ্টা বললো।
ব্যাটা ফোক্করি হচ্ছে।
ঘণ্টা এসে জড়িয়ে ধরলো।
তুমি বিশ্বাস করো, আমরা অনেক খুঁজলাম। পেলাম না।
আমি হাসছি। মিত্রারাও হাসছে।
কেন?
তোমার আপডেটটা নিতে হবে না।
অনিকা ড্যাব ড্যাব করে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে।
দিদিভাই কিছু বলে নি?
টক্কর মারার চেষ্টা করছে। হয় নাকি। ওই ছুড়ুক ছুড়ুক।
আ গেলুম গেলুম। আর বলবো না। ঘণ্টা চেঁচিয়ে উঠলো।
বুঝলাম অনিকা চিমটে ধরেছে ওর কোমর।
বালিশের ওয়ারটা খোল পেয়ে যাবি। আমি হাসলাম।
মেয়ে বড়ো বড়ো চোখ করে আমার দিকে তাকাল।
মাসি চা নিয়ে ঢুকলো।
নেপলা, সাগির, অবতার পেছন পেছন এসেছে।
উঃ কতদিন পর এ ঘরে এলাম। নেপলা বলে উঠলো।
আর ঢং করতে হবে না। বড়োমা খ্যার খ্যার করে উঠলো।
আমি হাসছি।
নাঃ বুঁচকির ঘরটা ঠিকই আছে। তাই না সাগির?
সাগির হাসছে।
দাদার হাতে কোন স্পটে বসে ঝারটা খেয়েছিল মনে আছে।
যাঃ। অবতার বলে উঠলো।
ঝাড় খেয়েছিলি বলে আজ এই জায়গায় আসতে পেরেছিস। বড়োমা বললো।
আর একটু ঝাড় খেলে আরও ওপরে উঠতো তাই না ম্যাডাম। নেপলা তাকাল মিত্রার দিকে। মিত্রা মুচকি মুচকি হাসছে।
সাগির, অবতারও হাসছে।
এই উঠলে। সাগির আমার দিকে তাকাল।
এরা কি আর ঘুমতে দেয়। ভাবলাম নিচ থেকে ওপরে উঠলাম ভিড়ভাট্টা কম, ঠেসে ঘুমবো।
সে গুরে বালি। নেপলা বলে উঠলো।
দাঁড়া হাতমুখটা একটু ধুয়ে নিই।
একবারে রেডি হয়ে নাও।
কেন!
একটু পড়েই তো লোকজন আসতে শুরু করবে।
আমার কি?
তোমার কি মানে! তুমিই তো পুরুত ঠাকুর। পূজো করবে কে?
ভাগ এখান থেকে। গল্প মারার আর জায়গা পাস না।
নীচে যাও বুঝতে পারবে।
কেন খুব গরম গরম বাক্যালাপ চলছে।
গরম গরম না। নরম গরম।
আমি বাথরুমে ঢুকলাম।
বাথরুমে ঢুকেই বুঝলাম নেপলাকে নিয়ে সকলে পুরণো কাসুন্দি ঘাঁটতে শুরু করেছে। অনিসা, অনিকার গলা পাচ্ছি। দিদিও মাঝে মাঝে ফোরন কাটছে।
তবে যাই বলো দিদি, সেই বয়সে দাদার পেসেন্স দেখেছিলাম। আমাদের মাথা পুরো বাস্ট। দাদা কুল। তখন তো আমি নতুন, সেদিনই দাদাকে প্রথম দেখছি। রতনদার মুখ থেকে দাদার নাম শুনেছি।
তারপরের ঘটনা তোমাকে বলেছি সব ইতিহাস।
দাদার কাছ থেকে আমরা তিনজনে অনেক কিছু শিখেছি। আজও শিখি। আমি তবু দাদার সঙ্গে একটু আধটু তর্কাতর্কি করি। সাগির-অবতার স্পিকটি নট।
জানো দিদি আমার জীবনের ইতিহাসটা লেখা শুরু হয়েছিল এই বাড়ির এই ঘর থেকে।
তোর একার কেন আমাদেরও। সাগির বলে উঠলো।
সত্যি আমরা তিনজনে কোথায় ছিলাম কোথায় এলাম। ভাবতেই কেমন যেন সিউরে উঠি। অবতার বললো।
কবিতাদিরও জীবনটা এই ঘর থেকেই বদলেছে। নেপলা বললো।
সাগির মুচকি মুচকি হাসছে।
আমি বাথরুম থেকে বেরলাম।
কিরে সাগির হাসছিস কেন?
কবিতাদির লাথি খাওয়াটা মনে পরে গেছে তাই। নেপলা বললো।
খালি গল্প, গল্প ছারা জীবনে কিছু নেই?
তুমি আছো।
ঘরের সকলে হাসছে। অনিকা অনিসারা আমার দিকে তাকিয়ে।
আমি খাটে বসলাম, মাসি চা এগিয়ে দিল।
আজকের পার্টিটা একবারে কর্পোরেট ঘেঁষা। মনে হয় কোনও বড়ো ক্যাটারারকে বরাত দেওয়া হয়েছে। ঝাঁ চক চকে সব কিছু। কোথাও টোল খাওয়ার কোনও ব্যাপার নেই।
লোকজনও সব কর্পোরেট।
অনিকাদের চলন বলনও কর্পোরেট ঘেঁষা।
আমি পাজামা, পাঞ্জাবী পরতে চেয়েছিলাম। তনু, মিত্রা, সুরো, মিলিরা চেপে ধরে আমাকে স্যুট-টাই পরাল। এগুলো তনুর বুদ্ধি সেদিন জোড় করে ধরে নিয়ে গিয়ে মাপামাপি করিয়েছিল। তারপর একদিন পরে দেখতে হয়েছিল ঠিক আছে কিনা। তারপর আর পরিনি। পোষায় না।
সেই নিয়ে একচোট ওদের সঙ্গে হয়েগেল। মধ্যস্থতা করলো ডাক্তারদাদা।
মাসীমনিও বললো, কেন ওরকম করিস, ওদেরও একটু সখ আহ্লাদ থাকতে পারে।
আর কথা বাড়াইনি।
তিতাস আজ সুন্দরদের সঙ্গে উড়ে উড়ে বেরাচ্ছে। হয়তো ঠাম্মার মুখ থেকে শোনা গল্পের সঙ্গে মিল খোঁজার চেষ্টা করছে। মাঝে মাঝেই দেখছি কাছে এসে মাসীমনিকে ফিস ফিস করে কি জিজ্ঞাসা করছে। তিন্নী, মিলি-অদিতিদের সঙ্গে মিশে গেছে। বিনয়দা, বরুণদাও বেশ ব্যস্ত। এ বাড়ির সঙ্গে যাদের সম্বন্ধ খুব ঘনিষ্ঠ তারা সকলেই এসেছে। দাদা মনে হয় চম্পকদা, সনাতনবাবুদের আলাদা করে বলেছে। সুজিতদা পুরো ফ্যামিলি নিয়ে হাজির।
সুজিতদার পেছনে কিছুক্ষণ আমি, নীরু লেগে পরলাম। সুজিতদা বড়োমাকে সাক্ষী মানল। পরিবেশটাই আজ কেমন অন্য রকম। হ্যা-হ্যা, হি-হি বেশি করা যাবে না। মেপে কথা বলা, মেপে হাসা। পার্টিটা কেমন যেন ক্ল্যাসিক্যাল ঢঙে বাঁধা। পার্টির এটিকেট মেনে কনিষ্করাও সব স্যুট-টাই চড়িয়েছে। আমাকে নিয়ে কিছুটা হাসাহাসি করলো নীরু।
জীবনে প্রথম এই সব চাপালি তাই না?
আমি হাসছি।
সুজিতদা নীরুকে চিমটি কাটল।
যাই বল নীরু অনিকে আজ কিন্তু কর্পোরেট ব্যক্তিত্ব বলে মনে হচ্ছে।
নীরু হাসছে।
বেজায় অস্বস্তি হচ্ছে। কনিষ্ক বললো।
তা একটু হচ্ছে।
আজকের দিনটা কোনওপ্রকারে হজম করে নে, কাল থেকে আবার বাংলায় ফিরে এসো বাবা।
আর কেউ আসে নি?
এসে পরবে।
আমি চারদিক চেয়ে চেয়ে দেখছি। ঘুমবার আগে বাগানটার যা অবস্থা দেখেছিলাম এখন একবারে তার সম্পূর্ণ পরিবর্তন হয়েছে। চারদিকে একটা মায়াবী পরিবেশ। হাল্কা একটা ক্লাসিক্যাল মিউজিক বাজছে।
ইসলামভাই, ইকবালভাইদেরও শরীরে পরিবর্তনের ছোঁয়া।
যেদিকে তাকাই সেদিকেই পরিবর্তন।
নাম শুনেছি চোখে দেখিনি এরকম অনেক কর্পোরেট লোকজন আজ এই বাড়ির আঙিনায় ম ম করছে। মাঝে মাঝে অনিমেষদা এক একজনকে নিয়ে এসে আলাপ করিয়ে দিচ্ছে।
আফতাবভাই-এর চারপাশে মাছির মতো সকলে ভ্যান ভ্যান করছে। আজ এই পার্টির মধ্যমনি ও। দ্বিতীয় হচ্ছে রাঘবন। দু-জনের দুই পাশে দুই ময়ে, বসির, ঘণ্টা, পক্কে।
চারদিকে হট ড্রিংকস কোল্ড ড্রিংকসের ছড়া ছড়ি।
কমবেশি সকলেই আজ ভিআইপি।
আমি, মিত্রা, তনু, ইসি দাঁড়িয়ে কথা বলছিলাম।
পেছন থেকে কে যেন জড়িয়ে ধরলো।
ঘার ঘুরিয়ে দেখলাম সুমন্ত।
পেছনে একটা সুন্দর মতো মেয়ে দাঁড়িয়ে একটা বাচ্চা মেয়েটির হাতে ধরা। কিছুতেই হাত ধরে থাকবে না। পারলে এখুনি হাত ছাড়িয়ে ছিটকে বেরিয়ে যাবে।
হেসে ফেললাম।
কাজরী, দাদা। নতুন করে দাদার আর পরিচয় দিচ্ছি না।
মেয়েটি নীচু হতে যাচ্ছিল আমি হাতটা ধরে ফেললাম।
বাচ্চাটা এবার আমার দিকে তাকিয়েছে। আমি হাত বাড়িয়ে দিলাম।
কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে হাতটা বাড়িয়ে দিল।
আমি কোলে তুলে নিলাম।
অপরিচিত একটা মানুষকে একটা ছোট্ট শিশু যে ভাবে দেখে ও ঠিক সেইভাবেই তাকিয়ে আছে।
তুমি কোথায় যাবে?
খেলবো।
ও যে দিকে আঙুল তুললো সেদিকে তাকালাম। দেখলাম মাম্পি, মিকি আরও কয়েকটা বাচ্চা মাঠে লুটো-পুটি খাচ্ছে।
যাও।
কোল থেকে নামিয়ে দিলাম।
মুহূর্তের মধ্যে তীর বেগে ছুটতে ছুটতে চলে গেল।
বয়স কতোরে সুমন্ত?
মম্পির থেকে দু-মাসের ছোট।
এক না দুই।
এক। অনেক কষ্টে পাওয়া। বৌদি সব জানে। আর নীরুদা।
মা কেমন আছে?
আগের থেকে এখন একটু সুস্থ।
কাজরী তুমি কি হাউস ওয়াইফ?
মিত্রা হেসে ফেললো।
বৌদি দাদা জেনে বলছে, না, না-জেনে বলছে?
সুমন্ত তাকাল মিত্রার দিকে।
ও এ-সব ব্যাপারে মাথা ঘামায় না।
মিত্রা আমার দিকে তাকাল।
টিয়া-কাজরী বরুণদার দুটো হাত। একজন সফটওয়ার, একজন এ্যাকাউন্টস।
কই ওই দিন আমাকে কিছু বললি না! সুমন্তর দিকে তাকালাম
তুমি জানতে চাওনি, তাই বলিনি। তাছাড়া সেদিন ও অফিসে আসেনি।
তারপরও আমি অনেকবার অফিসে গেছি।
কাজরী হাসছে।
তারমানে কাজরী এর আগে আমাকে নিশ্চই দেখেছে? সুমন্তর দিকে তাকালাম।
সে ব্যাপারে আমাকে কিছু বলেনি।
কেন, তোর সঙ্গে এক ঘরে থাকে না।
এই তুমি উল্টো রাস্তায় হাঁটতে শুরু করলে। এবার অর্কদাকে ডাকতে হবে।
ওরা এসেছে!
অনেকক্ষণ। হ্যাঁ এই প্রসঙ্গে তোমাকে আর একটা কথা বলি।
বল।
তোমার টাকাটা সেইভাবেই ধরা আছে। তুমি গেলে তারপর একটা গতি করবো।
কেন?
কাজরী বলেছে।
(আবার আগামীকাল)