২০৮ নং কিস্তি
অনিমেষদা এসে দাঁড়াল।
চল।
আবার কি হলো?
তুই পিছলে বেরিয়ে আসলে হবে। আজকের এই পার্টিটা তোর জন্য। এই দিনটার জন্য কতো দিন অনিদ্রায় কেটেছে। তোকে বলে কি হবে।
মিত্রারা হাসছে।
অনিমেষদা আমার হাতটা চেপে ধরলো। যেন আমি বাচ্চা ছেলে যদি হাত ছিটকে পালিয়ে যাই।
আবার এক দঙ্গল ব্যবসায়ীর সঙ্গে আলাপ করাল। সবাই বেশ মার্জিত।
হায়, হ্যালো। সবাই বেশ গদ গদ। চোখে মুখে স্বার্থের কাজল।
ভেতরে ভেতর বেজায় অস্বস্তি হচ্ছে। এইরকম পরিবেশে কোনওদিন পরিনি। সব সময় আড়ালে থেকে কাজ করার চেষ্টা করেছি।
এক দঙ্গল ব্যবসায়ী দেখলাম রাঘবনকে ঘিরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। দাদারা সোফায় বসে বেশ জমপেশ করে গল্প করছে। মাসীমনি বিধানদাও রয়েছে। এই ভিড়ে কে কোথায় আছে সত্যি বোঝা মুস্কিল।
অনুজবাবু, কেষ্টবাবু, আমিনসাহেব, আলিসাহেব এলেন। সঙ্গে আরও বেশ কয়েকজন রয়েছে। চিনি না। ওঁদের সঙ্গে এক প্রস্থ দাঁড়িয়ে কথা বললাম।
প্রায় এগারটা নাগাদ অতিথি অভ্যাগতদের ভিড়টা পুরো ফাঁকা হয়ে গেল। যারা এই বাড়ির সঙ্গে একান্ত ঘনিষ্ঠ তারা রয়েগেল।
আমি ফুটবলের মতো একবার এর পায়ে একবার তার পায়ে গড়াগড়ি খাই।
ঠোক্কর খেতে খেতে নীরুদের কাছে এসে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলাম।
বড়োমা, ছোটোমা এসে জড়িয়ে ধরলো।
আজ দুজনেই খুব সুন্দর করে সেজেছে। অন্য দিনের মতো খুশী মতো নয়। একবারে নিয়ম বেঁধে সাজা।
একেবারে আটপৌরে তবু কোথায় যেন জৌলুসের ছোঁয়া।
আমি দুজনের মুখের দিকে তাকিয়ে।
হঠাৎ বড়োমার চোখটা কেমন ছল ছল করে উঠলো।
এই দেখ আবার কি হলো?
না-রে কাঁদছি না। আজ একটা কথা ভীষণভাবে মনে পড়ে যাচ্ছে। কথাটা যে আজ এত বড়ো সত্যি হয়ে আমাদের দুজনের সামনে দাঁড়াবে ভাবতে পারিনি।
ছোটোমারও চোখ ছল ছল।
যারা আমার সঙ্গে দাঁড়িয়েছিল তারা ততটা অবাক নয়।
যেদিন তোর দাদার সঙ্গে আমি ছোটো এই বাড়িটা দেখতে এসেছিলাম তোর দাদা কিনতে চায়নি। বললো এতো বড়ো বাড়ি আমরা মাত্র চারটে প্রাণ। আমি বললাম, একদিন দেখবে তোমারই এতটা জায়গা কাজে লেগে যাবে। কাগজের অফিসে কাজ করছো। শুনেছি এডিটররা নাকি মাঝে মধ্যে পার্টি দেয়। অনেক বড়ো বড়ো লোকজন আসে। তাদের বসাবে কোথায়।
বুঝেছি। আর বলতে হবে না। এতক্ষণ ঘোরাঘুরি করলে, কিছু খেয়েছ।
ছোটোমা মাথা দোলাল। না।
চলো। এবার খেতে হবে। দু-জনকে জড়িয়ে ধরে গোল টোবিলের সামনে এলাম। ওখানে তখন সবাই দাঁড়িয়ে আছে।
ইসলামভাইকে বললাম, এবার আর দেরি করে লাভ নেই, খাবার ব্যবস্থা করো।
যারা এতক্ষণ সার্ভিস করছিল তারা সকলে মনে হয় বিদায় নিয়েছে।
মনা, টনা, বেচাকে দেখলাম খাবার গরম করছে, সঙ্গে কবিতারা লেগে পড়েছে।
আমাদের খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা হলো।
দেখলাম রাঘবন মূল ভূমিকা গ্রহণ করলো। বিশাল টেবিলের চারপাশে আমরা বাড়ির কজন। কেউ দাঁড়িয়ে কেউ চেয়ারে বসে।
নিরামিষ আমিষ সব ধরণের খাবার আছে। একবারে সব নিয়ম-কানুন মেনে আলাদা আলাদা ভাবে সাজানো।
অনুভব করলাম এই মুহূর্তটা একবারে ঘরোয়া। আমাদের নিজস্ব।
এই মুহূর্তে কারুর পেছনে আর সচিব, মালিক, মন্ত্রীর তকমা নেই সবাই প্রাণোচ্ছল।
খেতে খেতে খুনসুটি ইয়ার্কি ফাজলামো সব চলছে।
এর মধ্যেই রাঘবন হঠাৎ বলে উঠলো, স্যার আপনাকে সাক্ষী মেনে আজ কয়েকটা কথা অনিকে জিজ্ঞাসা করবো।
রাঘবনের কথায় সবাই কেমন যেন থমকে গেল। খাওয়া থামিয়ে সকলে এ ওর মুখের দিকে তাকায়। পরিবেশটা হঠাৎ কেমন থমথমে।
ইতি-উতি সকলে মুখ চাওয়া চাওয়ি করছে।
আমি আমার খাওয়ায় মনযোগী। পাশে তনু, মিত্রা, ইসি নতুন সংযোজন দিদি, তিন্নী।
আমি কেন? ডাক্তারদাদা বললো।
আপনি কথায় কাথায় একদিন আমাকে বলেছিলেন, আপনি যদি অনির প্রাণটা ফিরিয়ে দিতে পারেন, তাহলে আর কোনওদিন ছুঁড়ি কাঁচি ধরবেন না। আপনার সেই প্রতিজ্ঞা আপনি এখনও পালন করে চলেছেন। মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত আপনি এই প্রতিজ্ঞা পালন করবেন।
অবশ্যই করবো। তুমি একসময়ে আমার ছাত্র ছিলে। ছাত্র সন্তান তুল্য। তাই তোমার সেই অনুরোধ আমি প্রত্যাখ্যান করিনি, আমার মনের কথাটা তোমকে বলেছিলাম।
আমি জানি স্যার। আমি যেমন আপনার সন্তান তুল্য অনি আপনার সন্তানের থেকেও অধিক।
তা বলতে পারো। তবে শুধু আমার কাছে বললে ভুল হবে। আমার মতো সবার কাছে।
জানি স্যার। তাই তো আপনাকে সাক্ষী মানছি। দাদাদের ও মোটেই পাত্তা দেয় না। অশ্রদ্ধা করে একথা বলছি না। অনিমেষবাবু, বিধানবাবুর কথা আলাদা। ওঁদের সঙ্গে ওর একটা ঠাণ্ডা লড়াই প্রথম থেকেই চলে আসছে। এখনও আছে। সেখানে ও কখনও কম্প্রমাইজ করে না। কিন্তু কোথাও অশ্রদ্ধার ব্যাপারটা নেই। সবাইকেই ওর পিতা-মাতার স্থানে বসিয়ে রেখেছে।
এটা আমি বেশ ভাল বুঝি। ডাক্তারদাদা বললো।
আবার তাদের কোনও ক্ষতি হোক, এটাও ও মন থেকে মেনে নেবে না। কেউ ক্ষতি করতে চাইলে শক্ত হাতে তার মোকাবেলা করে।
বহুবার ও তার প্রমাণ দিয়েছে। ডাক্তারদাদা বললো।
এতদিন ওর নিজের বলতে কেউ ছিল না। আমরাই ওর আত্মীয়-স্বজন ছিলাম। আজ মাসীমনিকে পেয়েছি আমাদের মধ্যে। মাসীমনি….।
তুমি এই মুহূর্তে খুব ইমোসন্যাল হয়ে পরছো রাঘবন। ডাক্তারদাদা বললো।
হতে বাধ্য হচ্ছি স্যার। সারাটা জীবন কোনও অন্যায় কাজ আমাকে দিয়ে কেউ করাতে পারে নি।
সেটা তোমাকে দেখেই বোঝা যায়।
চাপের মুখে কখনও নতি স্বীকার করিনি। মাইনের টাকাটুকু ছাড়া আন ওয়ন্টেড কোনও মানি আমার কাছে নেই। আজ আমি উভয় সঙ্কটে। একটা ভ্যাকুমের মধ্যে পড়ে গেছি। এর থেকে কিছুতেই বেরিয়ে আসতে পারছি না। অনেক ভেবেচিন্তে এই সময়টাকে তাই বেছে নিয়েছি। আপনাদের সকলকে একসঙ্গে পেয়েছি। অন্ততঃ ও আমাকে সরাসরি ডিনাই করবে না। একটা হ্যাঁ না কিছু বলবে।
ও কি আবার কোনও গণ্ডগোল পাকিয়েছে!
হ্যাঁ স্যার। তাই আপনাকে সাক্ষী মানছি। পার্টিকুলার এই ক্ষেত্রে ও আমাকেও পাত্তা দেবে না। তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেবে।
ডাক্তারদাদা, রাঘবনের মুখের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে।
আমি তো আপনার ছাত্র, আমি অন্যায় করলে আপনি শাসন করবেন।
সবাই খাওয়া থামিয়ে রাঘবনের মুখের দিকে তাকিয়ে।
বলো।
যতদিন চাকরি করছি আমাকে সবাইকে নিয়ে চলতে হবে। এটাই এ্যাডমিনিস্ট্রেশনের মূল মন্ত্র।
সবটা নয়, কিছুটা।
খাওয়া দাওয়া চলছে। কথা হচ্ছে।
আমি যেন ফাঁসীর আসামী। সবাই আমার দিকে সেই ভাবে তাকিয়ে। আমার ছেলেমেয়ারা আমাকে গিলে খাচ্ছে। রাঘবন আঙ্কেলের মতো পার্সোনালিটি ডাক্তারদাদাইকে সাক্ষী মানছে। তনু মিত্রার চোখ দুটো কেমন কুত কুত করছে। প্রবীরদারা কুল। মাঝে মাঝে এ ওর মুখের দিকে তাকায়। হঠাৎ আবার কি হলো!
আমি বলছি না ও আমার ক্ষতি করবে বা করেছে। আমার যাতে ক্ষতি না হয় তার ব্যবস্থাও ও করেছে। প্রত্যেকটা পথ ও মেপে মেপে বেঁধেছে। খুব সূক্ষ্মভাবে। অনেক সময় নিয়ে।
সবাই মুখ চাওয়া-চাওয়ি করছে। ব্যাপারটা কি?
মিঃ রাঘবন, আমি, অনিমেষ ব্যাপারটা কি জানি? বিধানদা বললো।
না আপনারা কেউ জানেন না। জানার কথাও না। তবে দেশের অনেক মন্ত্রী-সন্ত্রী এর মধ্যে জড়িত। আঁতে ঘা লাগলে যা হয়। ঠিক মতো খোঁজ-খবর না নিয়ে তারা ওকে টার্গেটও করেছিল। তাতে উল্টে বিপত্তি ঘটে। কিছু খারাপ ঘটনা এরিমধ্যে ঘটে গেছে।
অনিমেষদা, বিধানদা অবাক চোখে রাঘবনের দিকে তাকিয়ে।
পরে আসল ব্যাপারটা যখন তারা জানতে পারলো। একটা নিগোসিয়েসনে আসার চেষ্টা করেছে। ও আসতে চায়নি। রিফিউজ করেছে।
বলতে পারেন আজ আমি তাদের রিপ্রেজেন্টেটিভ। এককথায় বলতে পারেন তারা আমাকে জোড় করে এই দায়িত্বটা চাপিয়ে দিয়েছে। আমি সরাসরি এই মুহূর্তে ওর সঙ্গে নিগোসিয়েশনে বসবো। এছাড়া আমার কোনও গতি নেই। আপনি, অনিমেষবাবুরা, দাদারা আছেন আমাকে একটু সাহায্য করবেন।
রাঘবন, বিনদকে নিয়ে কোনও প্রবলেম? আফতাবভাই বললো।
ঠিক বিনদ নয়। তবে বিনদকে কেন্দ্র করে সব কিছু তৈরি হয়েছে।
বিনদকে তুলে নাও।
রাঘবন হাসলো।
পরের ব্যাপারটা কে সামলাবে?
কিছুদিন ঝড়-ঝাপ্টা চলবে তারপর সব ঠিক হয়ে যাবে।
হবে না। হবে না বলেই নিগোসিয়েশন।
রাঘবন আমার দিকে তাকাল। চোখে মুখে একটাই আর্তি তুই কিছু বল। চুপ-চাপ থাকিস না।
ঠিক আছে দুজনকে ছেড়ে দিলাম, আর একজনকে ছাড়তে পারবো না।
খেতে খেতেই, আমি খুব আস্তে কথা বললাম।
সবাই আমার দিকে স্থির দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে।
আমি জানি। দোষটা আমার। সেই সময় আর একটু সতর্ক হলে দাদার এরকম অবস্থা হতো না। তুই এতদিন অপেক্ষা করার পর প্রত্যাঘাত করলি।
আমি সরাসরি রাঘবনের চোখে চোখ রাখলাম।
তোর রি-এ্যাকসনগুলো এতটা কঠিন সকলে সহ্য করতে পারে না। তুই তো কাউকে মারিস না। জীবন-মৃত করে বাঁচিয়ে রাখিস। তোর বৌদিকে জিজ্ঞাসা কর। আমি বহুবার এই কথা তোর বৌদিকে বলেছি। নাগেশ আজ পর্যন্ত আমার মুখের ওপর কখনও কোনও দিন কথা বলে নি।
নাগেশের দিকে তাকালাম। মাথা নীচু করে খেয়ে যাচ্ছে।
গত সপ্তাহে ও যখন সমানে আমাকে যুক্তি দিয়ে বোঝাতে চাইলো, তখনই আমি বুঝে গেলাম, কোথাও একটা গণ্ডগোল করে ফেলেছি। পরে আমি নাগেশের কাছে ভুল স্বীকার করেছি। আমার একমত্র মেয়ে আমার সঙ্গে তিনদিন কথা বলেনি। সন্তান এ্যাডমিনিস্ট্রেশন দুটো সম্পূর্ণ আলাদা। এই ব্যাপারটা তুই আমাকে বহুবার বুঝিয়েছিস। আমিও বুঝি।
এ্যাডমিনিস্ট্রেশনের ব্যাপারটা তুই বুঝিস না তা নয়। না বুঝলে তুই এইভাবে আমাকে ওখান থেকে সরিয়ে নিয়ে আসতিস না। চাকরী মানে গোলামী, এটা তোর থেকে ভাল কেউ বোঝে না। সবাই শিক্ষিত মন্ত্রী হবে এমন কথা ভারতের সংবিধানে কোথাও লেখা নেই।
তুমি কি চাইছো। আমি বললাম।
ও তোকে এতো টাকা দিতে পারবে না।
কেন ওটা কি ওর রোজগারের টাকা। আমার গলার স্বর নীচু হলেও ক্ষানিকটা রুক্ষতার ছোঁয়া।
তোকে কি করে বোঝাই। রাঘবনের গলায় হাতাশার সুর।
রিজাইন দাও।
এই কথাটা জানিয়ে তুই বাহাত্তর ঘণ্টা আগে আমাকে ইন্টিমেশন দিয়েছিস।
রাঘবন অনি কিসকো পাস রূপিয়া মাঙ্গা। আফতাবভাই বললো।
ভিখারাম।
মুম্বাই কা জহুরী!
হ্যাঁ।
কিতনা।
হাজার ক্রোড়।
আফতাবভাই সারাটা শরীর কাঁপিয়ে শব্দ করে হেসে উঠলো।
সবাই একবার আমাকে দেখে একবার আফতাবভাইকে দেখে।
প্রবীরদাদের চোখ গোল গোল। এ কি কথা শুনলো! ঠিক বিশ্বাস করতে পারছে না।
সবার চোখে মুখে একটাই অভিব্যক্তি যা শুনল ঠিক তো?
হাসতে হাসতেই আফতাবভাই আবুভাই-এর দিকে তাকাল।
আবু, অনি বহুত বঁড়িয়া গেম খেলা।
আবুভাই মুচকি মুচকি হাসছে।
ইসলামভাই, ইকবালভাই, নেপলারা, রতনরা, চাঁদরা সব অবাক হয়ে আমাকে দেখছে। সত্যি তো এই ব্যাপারটা ওরা কিছুই জানে না। কোনও আঁচও পায়নি।
নেপলারা তবু ভিখারামের নাম শুনেছে। ওরা হয়তো নেপলার মুখ থেকে শুনে থাকতে পারে। কারুর মুখ থেকে কোনও কথা বেরচ্ছে না।
দিদি মাঝে মাঝে মুচকি হাসছে।
রাঘবন তুমি এখান থেকে সরে এসো। অনি যখন এই জায়গায় হাত দিয়েছে বুঝে নিতে হবে ওর কলজেতে দম আছে। আমি হলে কখনই হাত দিতাম না।
অফতাবভাই দিদির দিকে তাকল।
নাজমা তখন থেকে তুমি মুচকি মুচকি হাসছ। তুমি কিছু জানতে।
না! দিদির চোখে মুখে বিষ্ময়।
তাহলে তুমি হাসছ!
ওর চোখ-মুখটা লক্ষ্য করছো। কি ভীষণ কুল। তোমাদের কথা-বার্তা ও গায়েই মাখছে না।
মিত্রা, তনু, দিদির মুখের দিকে তাকাল। চোখের চাহুনিতে শাসনের ছোঁয়া।
মাসীমনি আপনি কিছু বুঝতে পারছেন। আফতাবভাই মাসীমনির মুখের দিকে তাকাল।
কোথায় যেন জট পেকে আছে।
এখন আমি একটু একটু ধরতে পারছি অর্জুন, বিনদ এক হলো কি করে। আফতাবভাই বললো। কাল রাতে আবু আমাকে বলেছিল, এইরকম একটা কানাঘুষ আওয়াজ পাচ্ছি।
আবু আমাকেও বলেছিল। রাঘবন বললো।
আমাকে বলো নি কেন?
তখনও কাজটা শেষ হয়নি। আজ বিকেলের দিকে কাজটা শেষ হয়েছে।
তুমি খবর পেলে কখন?
ঘণ্টা দুয়েক আগে।
কে দিল?
অয়েল মিনিস্টার।
ও ভি ফাঁস গিয়া?
হুঁ।
উসকো পাস ভি অনি রূপায়া মাঙ্গা?
নেহি। ভিখারাম ওয়েল মিনিস্টারকা জান-পাহচান আদমী।
কেয়া ও বালা কেশ?
হ্যাঁ। পুরা ডেটা অনি কা পাস আ গায়া। বাহারবালা ব্যাঙ্ককা এ্যাকাউন্ট, অউর স্টেটমেন্ট ভি। সেকেন্ড চ্যানেলকা লোডিং ভি।
কেয়া হামভি ফাঁস গায়া!
ও লোক তুমকো ফাঁসানা চাহতে থা। ইসিলিয়ে অনি এ কাম কিয়া। আভি সব কোই ফাঁস গায়ি।
অনিমেষবাবুকা পার্টিকো কোই আদমী?
হ্যাঁ ও ভি ফাঁসা। পার্টিকা আন্দার ও লোক অনিমেষবাবুকো এ্যান্টি হ্যায়।
আনিমেষবাবু আপকা পাস কোই সিগন্যাল আয়া?
আফতাবভাই, অনিমেষদার মুখের দিকে তাকাল।
আভিতক আয়া নেহি।
আয়েঙ্গে ভি নেহি।
ডাক্তারদাদা মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে হাসছে।
নম্রতা বেটি। রাঘবন খুব মিষ্টি করে ডাকলো।
নম্রতা ফিক করে হেসে ফেললো।
অনিমেষদা আর গম্ভীর থাকতে পারলো না। হেসে ফেললো।
সবাই মুচকি মুচকি হাসছে।
তুই তো এখন মশাইয়ের কাছের লোক। তোর সঙ্গে শুভর খুব কম্পিটিসন তাই না? রাঘবন বললো।
নম্রতা মাথা নীচু করে হাসিমুখে খেয়ে চলেছে। স্পিকটি নট।
অর্ক তুই দিল্লী থেকে কটার ফ্লাইটে ফিরলি। রাঘবন তাকাল অর্কর দিকে।
একটা দশ।
বাবাঃ একটুও সময় নিলি না। অনিমেষদা বললো।
প্রম্পট উত্তর। রাঘবন বললো।
বৌদি, ছোটোমারা সকলেই অর্কর কথা শুনে হাসছে।
তোরা পুলিশের ডগ স্কয়াডের থেকেও তো ডেঞ্জার, এত গন্ধ পাস কি করে। অনিমেষদা বললো।
অর্ক অনিমেষদার কথা শুনেও শুনলো না।
ইসলামভাই একটা চিকেন তুলে দাও তো। ভালো বানিয়েছে। অর্ক বললো।
রাঘবন মুচকি মুচকি হাসছে। সুরো এগিয়ে এসে আমার কাছ ঘেঁসে দাঁড়াল। একবার আমার মুখের দিকে তাকায়। আবার খায়। মুচকি মুচকি হাসে। একবার অংশুর দিকে তাকায়।
সুমন্ত ও গুলো প্রিন্ট হয়ে গেছে। রাঘবন তাকাল সুমন্তর দিকে।
কোনটা!
রাঘবন হাসলো।
সত্যি, ব্যাপারটা মাথায় ঠিক ঢুকছে না। কি করে বলি বলুন।
আচ্ছা তুই অনিকে চিনিস?
না।
সকলের চোখ এবার বেশ বড়ো বড়ো।
জল জ্যান্ত লোকটা তোর সামনে দাঁড়িয়ে আছে। অনিমেষদা বললো।
উনি অনিন্দ ব্যানার্জী। আমি এই নামেই ওনাকে চিনি। এই নামে ওনাকে প্রেস কার্ড ইস্যু করেছি। আমার কাছে তার একটা অফিস কপিও আছে। দেখতে চাইলে আপনাকে দেখাতে পারি। এমনকি তার বায়োডেটা।
অনিমেষদা হেসে ফেললো।
তারমানে কাগজপত্র তুই ভালই গুছিয়েছিস। রাঘবন বললো।
সেটা বলতে পারব না। তবে ফাইট করার একটা জমি বেশ শক্তপোক্ত ভাবে তৈরি আছে। এজপার ইন্ডিয়ান নিউজ পেপার এ্যাক্ট।
রাঘবন হেসে ফেললো।
ডেটাগুলো নষ্ট করে দে। জানাজানি হলে দেশের খতি।
আপনি আমাদের অফিস সার্চ করতে পারেন। আমি দায়িত্ব নিয়ে বলছি তার পার্মিশন আমি এডিটরকে দিয়ে করিয়ে দেব।
এই মনা। মাসীমনি হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠলো।
মাসীমনির ওই কর্কশ স্বরে সবাই মাসীমনির দিকে তাকিয়েছে। একটু অবাকও হয়েছে সকলে।
যাই মাসী।
মনা মনেহয় খাবার যেখানে রাখা হয়েছে ওখানে ছিল। কাছে এসে দাঁড়াল।
বলো কি নেবে।
কিছু দিতে হবে না। তখন তুই নম্রতাকে কি পাগল পাগল বলছিলি।
কখন!
ন্যাকা বুঝতে পারছিস না?
বিশ্বাস করো। কখন কাকে কি বলি মনে থাকে। তুমি একটু মনে করিয়ে দাও।
বিকেলে যখন দুধ নিয়ে এলি।
ও তখন। ভজুর কথা বলছিলাম।
কি বলছিলি।
নম্রতা বললো, সবাই ওপরে আছে ভজুদাকে বলি গরম করে নিতে। তা আমি বললাম ওই পাগলটাকে দিয়ে কাজ করাস না। কোথায় কি করে ফেলবে।
তোদের মুখে কি সব সময় রেডিমেড গল্প লেখা থাকে, কোনওদিন সত্যি কথা বলতে শিখলি না।
মাসীমনির কথা শুনে সোনা আন্টি হেসে ফেললো।
তুমি জানো না সোনা। সবকটা হাড় বজ্জাত। আমাকে কম জ্বালিয়েছে।
মনা সারাট মুখে বোকা বোকা হাসি মেখে মাসীমনির মুখের দিকে তাকিয়ে।
মসীমনি রাঘবনের দিকে তাকাল।
তুমি পাগল খুঁজে বার করো। তার কাছে আছে। আমি এইরকমই একটা কথা তখন শুনছিলাম।
আমি হাত থেকে প্লেটটা টেবিলে রাখলাম। টেবিলের এক কোনে ভাঁজ করে গুছিয়ে রাখা একটা টাওয়েল তুলে হাত মুখটা ভাল করে মুছলাম।
কিরে তোর খাওয়া হয়ে গেল? বড়োমা চেঁচিয়ে উঠলো।
হ্যাঁ।
মিষ্টি খাবি না?
কাল খাব।
সাজিয়ে রাখা কোল্ডড্রিংকসের একটা বোতল তুলে নিয়ে নিজেই ওপেনার দিয়ে খুললাম। একটা স্ট্র বোতলে ভরে সোজা হাঁটা লাগালাম।
কোথায় যাচ্ছিস? মিত্রা চেঁচিয়ে উঠলো।
ঘুরে দাঁড়ালাম।
ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছে। পোষাকটা ছাড়ি।
নীরুরা মুখ ঘুরিয়ে হাসল।
কেউ আমাকে কোনও বাধা দিল না। ধীর পায়ে আমি আমার ঘরে চলে এলাম। ঘার না ঘুরিয়েও এইটুকু বুঝলাম, অনেকগুলো চোখ আমার এই যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে। ভেজান ঘরের দরজা খুলে ভেতরে চলে এলাম।
লাইট জাললাম না। বাগানের যেটুকু আলো ঘরে এসে পড়েছে, তাতেই বেশ দেখা যাচ্ছে। মুহূর্তের মধ্যে শরীর থেকে জামাপ্যন্টটা খুলে বিছানায় ছুঁড়ে ফেলেদিলাম। টাওয়েলটা কাঁধে চড়িয়ে বাথরুমে চলে গেলাম।
রাঘবন সবে শুরু করেছিল। ভেবেছিল আমি হয়তো যুক্তি-তর্ক জুড়ে দেব। তারপরেই ও ওর কাজ হাসিল করে নেবে। সেই সুযোগ আমি রাঘবনকে দিইনি। বরং বলটা ওর কোর্টে ফেলেই চলে এসেছি। আমি শেষ টুকু জানিয়ে আসিনি। শেষ না জানা পর্যন্ত এই অধ্যায়টা চলবে। তবে তার আগে কেউ একবার এসে দেখে নেবে আমি ঘরে আছি কিনা। হয়তো বা আমার পকেট ঘেঁটে মোবাইলটারও হদিস করে নেবে। আমি মবাইলটা সঙ্গে নিয়ে বাথরুমে গেছি কিনা।
আমি বাথরুমে ঢুকেই আস্তে করে জানলার খরখরিটা হাল্কা করে খুলে দিলাম। রাঘবনের সঙ্গে ভিখারামের কি কথা হয়েছে আমার জানা হয়নি। তবে কাজ যে হয়েছে সেটা বেশ বুঝতে পারছি।
মাঠে বেশ হাসাহাসি চলছে।
রাঘবন এ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ লোক শুভদের পেট থেকে ও ঠিক কথা বার করে নেবে। না হলে ওর রাতে ঘুম হবে না। চাকরি জীবনের শেষ কয়েকটা বছর ওকে দেশের সর্বোচ্চ সচিবের পদটা যে কোনওপ্রকারে হোক বাগাতেই হবে। এই মওকাটা ও ছাড়বে না। প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয় বলে কথা। খুব সম্মুক গতিতে রাঘবন তার শেষ মকসদের উদ্দেশ্যে এগিয়ে চলেছে। আমার এই কেশটা হ্যাণ্ডেল করে ও কয়েক ধাপ পেছনে ফেলে দেবে ওর রাইভ্যালকে।
সন্মুগমও সেটা জেনে ফেলেছে। প্রাণপণে তাই বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে চলেছে। আমার কাছে যে তার অফার আসেনি। তা নয়। আমার কথাবার্তার ভাঁজে ও বুঝে ফেলেছে আমি রাঘবনের প্রতি যথেষ্ট দুর্বল। তাই সম্মুগম হাল ছাড়েনি খোঁচাখুঁচি কনটিনিউ করে চলেছে। সম্মুগম, রাঘবন দুজনের কেউ এত কাঁচা লোক নয়। ওই রকম একটা জায়গায় বসে থেকে ওরা আমার কাজের কোনও হদিস রাখেনি, এটা আমি বিশ্বাস করতে পারছি না। আমার এই কাজে রাঘবনের প্রচ্ছন্ন মদত আছে। সেটা ওর কথাতেই আমি বুঝে গেছি।
এই মুহূর্তে ও সঙ্গে পেয়ে যাবে অনিমেষদা, বিধানদাকে।
এখন মনে হয় শুভকে নিয়ে পড়েছে।
তোরা তো আচ্ছাই স্যাঙ্গাত হয়েছিস। এখনও গোঁফ গজায়নি। চাল চলন হাবভাবে একবারে সোমত্ত পুরুষ হয়েগেছিস। বড়োমার গলা পেলাম।
বড়োমার রসাল কথায় সকলে হাসাহাসি শুরু করে দিল।
ভাগ্যিস শুভর দাদু নেই। উনি বেলা বেলি খেয়ে চলেগেছেন।
এই শুভ রাঘবন যা বলছে তার ঠিক ঠিক উত্তর দিবি। না হলে ঘাড় মুটকে ভেঙে দেব।
বড়োমা আবার ধমকাল।
যা বাবা, আমাকে বলছো কেন, আঙ্কেল এতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল কিছু বলতে পারলে না।
সে তো গট গট করে নবাবের মতো পা ফেলে চলেগেল। শয়তানের হাড্ডি। সারাটা জীবন জ্বালিয়ে পুরিয়ে মারলো।
না বড়োমা ও অন্যায় করেছে এটা বলতে পারবো না।
রাঘবন বেশ ধীর-স্থির-নির্লিপ্ত ভাবে কথা বলছে।
এতদিন তো ঠিক চলছিল কই কোনও অসুবিধে হয়নি। গণ্ডগোল ও পক্ষ প্রথমে করেছে। এটা চলছে বেশ কয়েক বছর ধরে। তখন ও ফেরেনি। ফিরে আসার পর একটু জোরদার হয়েছিল। ও চুপ-চাপ ছিল। কাউকে এতটুকু বুঝতে দেয়নি ও কি করতে চলেছে।
আফতাবভাই এখানে ইনভেস্ট করলে ওদের অনেক অসুবিধে। ওরা কেউই তা চায়নি। তার ছিটে ফোঁটা এখানে যে পরেনি তা নয়, পড়েছে। সুবিধে করতে পারেনি। সবাই যার যার নিজের স্বার্থ নিয়ে চলে। প্রথমে, টাকা পয়সা যা পেত তা পাবে না। দ্বিতীয়, ক্ষমতাও অনেকটা কমে যাবে। এটা ওরা কেউ সহ্য করতে পারবে না। ফলে একটা রিভেঞ্জ নেবেই। সেটা অনি জানত।
ওদের মিডিয়েটর ভিখারাম। অনি ওদের না ধরে ভিখারামকে ট্যাপ করেছে। ব্যাশ সকলে জালে জড়িয়ে পরেছে। এতটা ওরা আসা করেনি। জাল অনি নিজে ফেলেছে। সেও আজ থেকে বছর দুয়েক আগের কথা। এখন টেনে তুলতে শুরু করেছে।
আপনি যেটা বলছেন, এই ব্যবসা সকলে করে। অনিমেষদা বললো।
আপনার কথা মেন নিচ্ছি। তাই বলে ডিমাণ্ড হাজার কোটি! নট এ জোক।
বিধানদা জোড়ে হেসে উঠলো।
একবার ভাবুন যাকে চেয়েছে সে এককথায় রাজি হয়ে গেছে, অতো দিতে পারবে না। তবে সেভেন্টিফাইভ পার্সেন্ট দেবে। ও রাজি হয়নি। তাও কখন! যখন আমরা সই সাবুদ করছি। প্রেস কনফারেন্স চলছে।
কই! তখন ও আমাদের সঙ্গে বসে গল্প করছিল, টিভি দেখছিল। একটা ফোনও তখন ও করেনি। একটা ফোনও তখন আসেনি। তাই নারে ছোটো? বড়োমা বললো।
ওর কি লোকের অভাব আছে বড়োমা। এই ধরুণ নম্রতা, শুভ, অংশু। আমার জামাই নাগেশ।
আপনি কার বিরুদ্ধে ড্রাস্টিক এ্যাকসন নেবেন। পুলিশ দিয়ে এদের এ্যারেস্ট করাবেন?
অর্ক, অরিত্র, সুমন্তর কথা ছেড়ে দিন। পরিষ্কার বলে দিয়েছে। এ্যাজ পার নিউজ পেপার এ্যাক্ট ওরা যা করবার তাই করবে। বেশি কিছু করতে গেলে সমস্ত মিডিয়া এককাট্টা হয়ে হই হই করে উঠবে, সরকার সংবাদপত্রের কণ্ঠরুদ্ধ করছে।
শুনলাম এই বছর মিত্রাদের কাগজ প্রয়োজনের তুলনায় বেশি টাকা ট্যাক্স দিয়েছিল। সেটা আবার ফেরত পাবার জন্য হিমাংশু আবেদন করেছে।
অনির সঙ্গে রিলেটেড অন্যান্য ব্যবসা দেবাশীষের ফার্ম, ইসলামের কো-অপারেটিভ কারুর এ্যাকাউন্টসে কোনও গোঁজামিল এই মুহূর্ত পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া যায়নি। এই সব ওরা ঘেঁটে নিয়েছে। আর ওর পার্সোনাল এ্যাকাউন্টের ব্যাপার ছেড়ে দিন।
অনির সবচেয়ে বড়ো এ্যাডভান্টেজ কোনও কাজ বার করতে গেলে ওকে কোনও এক্সট্রা মানি প্রোভাইড করতে হয় না। যারা কাটমানি নেয় তারা ওর পকেটের লোক।
এবার ইসলামভাই হেসে উঠলো।
আপনি ইসলামভাই, দামিনীমাসিকে জিজ্ঞাসা করুণ। আমিও মাঝে মাঝে ওদের কাছে সাহায্য চাই। তবে হ্যাঁ, এই হ্যাণ্ডস গুলোকে ও অন্যভাবে আরও বেশি টাকা পাইয়ে দেয়। আপনি একটু ভেবেদেখুন। কেউ অন্যায় করেনি। সবাই সবার জায়গায় ঠিক আছে। তাই নিগোসিয়েসনের প্রস্তাব। মিডিয়েটর আমি।
আমাকে কি করতে হবে। ডাক্তারদাদা বললো।
আপনি ওকে একটু বুঝিয়ে শুনিয়ে রাজি করিয়ে দিন।
আমার কথা শুনবে কেন?
শুনবে। এই দৃঢ় বিশ্বাস আমার আছে। ওর কাছে দাদার পরেই আপনার স্থান। কোনও কোনও ক্ষেত্রে ও দাদার ওপরে আপনাকে স্থান দেয়। আমি ওর সঙ্গে মিশে এটুকু বুঝেছি।
সত্যি ভিখারামবাবু সেভেন্টি ফাইভ পার্সেনট দেবেন!
এ ছাড়া ভিখারামের কোনও উপায় নেই। টাকাটা অনি নেবেই। অনেক দিন থেকে ও তক্কে তক্কে ছিল। আজ ঘায়েল করেছে। রাঘবন হাসল।
কেন?
সে অনেক গল্প, আপনাকে পরে বলবো।
ডাক্তারদাদা হাসল।
অনেক রিকয়েস্টের পর অনি নাইন্টি পর্যন্ত নেমেছে। বাহাত্তর ঘণ্টা সময় দিয়েছে।
বাবাঃ সময়-টময়ও বেঁধে দিয়েছে।
হ্যাঁ। না হলে নিউজ করবে। শেষে ভিখারাম সেভেন্টি-ফাইভের ওপর আর সাত-আট পার্সেন্ট দিতে রাজি আছে।
এইট্টি থ্রি পার্সেন্ট!
হ্যাঁ।
তুমি কি সব অবাস্তব কথা বলছো!
একদম না স্যার। ভিখারামের এই পার্পাসে যা টার্নওভার আছে। এই টাকাটা জিরো পয়েন্ট এইট থ্রি পার্সেন্ট, অনি ওয়ান পার্সেন্ট চেয়েছিল। এবার আপনি বুঝে নিন।
আমার কাছে সব কেমন গল্প বলে মনে হচ্ছে। তুমি এত সব জানতে!
সবটা নয়, ওটা অন্য ডিপার্টমেন্টের কথা, তবে ভাসা ভাসা জানতম।
ড্রিলটা ফাইন্যাল হওয়ার পর ওর কিংবা শুভদের যদি কোনও ক্ষতি হয়?
স্যার আপনাকে একটা ছোট্ট কথা বলি। তাহলে আপনি কিছুটা ধরতে পারবেন।
বলো শুনি।
আমার কাছে ওর যা রিপোর্টকার্ড এসেছে….। আফতাবভাই মনে কিছু করবে না।
রাঘবন হয়তো আফতাবভাই-এর দিকে তাকিয়েছে।
না না তুমি বলো। আফতাবভাই-এর গলা পেলাম।
ওর সঙ্গে যে সব ইনভেস্টারের খুব গভীর রিলেশন আছে, আফতাবভাই তাদের মধ্যে সেভেন্ত পজিসন হোল্ড করছে। আফতাবভাই-এর মতো প্রত্যেকেরই বিনদ এবং অর্জুন আছে। গ্রেডেসনের দিক থেকে আপনি এক দুই করে নিজের মনে সাজিয়ে নিন। বিনদ কিংবা অর্জুনরা বিলংস করে নাইন্থ কিংবা টেন্থ গ্রেডে। সবার সঙ্গেই অনির খুব সুইট রিলেশন। প্রত্যেকেই অনিকে যথেষ্ট সমীহ করে।
অনি যদি তাদের কাছে সাহায্য চায়। কেউ খালি হাতে অনিকে ফিরিয়ে দেবে না। অনেক ব্যাপারেই তারা অনির কাছে উপকৃত। ওর মাধ্যমে বাকি সব ইনভেস্টাররাও ইন্ডিয়াতে ইনভেস্ট করতে চায়। এবং পুরোটাই অনি কেন্দ্রিক। এই ব্যাপারটাকে কেন্দ্র করে সেন্ট্রালেরও একটা বড়ো অংশ অনিকে দারুন ভাবে সাপোর্ট করে। বলতে পারেন প্রত্যেকের স্বার্থ জড়িয়ে। তাই নিগোসিয়েশন। বাকিটা আপনাকে ব্যাক্তিগতভাবে বলবো। আপনি যে সাধারণ মানুষটাকে আপনার চারপাশে ঘোরা ফেরা করতে দেখছেন ও এতটা সহজ, সরল, সাধারণ নয়। ভিখারাম আজ যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, তার পেছনেও অনির হাত আছে।
আফতাবভাই-এর সঙ্গে ভিখারামের পরিচয় অনির মাধ্যমে। আপনি ছোট্ট একটা কথা ভেবে দেখুন স্যার, এক-দু-কোটি টাকার মামলা নয়। ভিখারাম এক কথায় রাজি হলো কি করে?
ভিখারাম রাজি না হলে ওই এক থেকে ছয়-নম্বর লোক ওর কাছ থেকে সরে যাবে। সাত নম্বর ব্যক্তি আফতাবভাই আজ না হোক কাল সরে যাবে। এতে ওর ব্যবসার ক্ষতি। চালু ব্যবসার ক্ষতি কে চায় বলুন। আফতাবভাই-এর মতো তারাও অনিকে সাপোর্ট করে। আফতাবভাইও তাদের কাছ থেকে সাহায্য পায়। সৌজন্যে অনি। একথা আফতাবভাই জানে না। তবে ম্যাডাম, আবু সব জানে।
এখান থেকে আবুভাই, দিদির মুখটা দেখতে পাচ্ছি না। তবে অনুভব করছি আফতাবভাই এতদিন পর একটা নতুন কথা শুনছে। বুঝতে পারছে ফাইনান্সের ক্রাইসিসে ও টাকা পেত কোথায়।
এতো টাকা ও কি করবে! ডাক্তারদাদার গলা পেলাম।
কেউ কিন্তু একটা কথাও বলছে না। নিস্তব্ধ পরিবেশে রাঘবনের গলা গম গম করছে। মাঝে মাঝে ডাক্তারদাদার গলা পাচ্ছি।
একটা পয়সাও ও নেবে না। হাত দিয়েও দেখবে না। দশটা প্রতিষ্ঠানের নাম ও পাঠিয়ে দিয়েছে। কাদের কত টাকা দিতে হবে তাও জানিয়ে দিয়েছে। বাহাত্তর ঘণ্টার মধ্যে সেই প্রতিষ্ঠানের এ্যাকাউন্টে টাকাটা ট্রান্সফার করে দিতে হবে।
কিসের প্রতিষ্ঠান!
এনজিও। অর্জুন, বিনদ, আলতাফ প্রত্যেকেই এই সব এনজিও-র সঙ্গে যুক্ত।
ডাক্তারদা নিশ্চই রাঘবনের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে।
এবার আপনি বলুন তারা ওর জন্য জীবন দেবে, না কি আমার আপনার জন্য দেবে।
যেই কিছু করতে যাক, তাদের টোপকে ওর কাছে পৌঁছনো একটু শক্ত। ওকে কেন্দ্র করে কোনও ঘটনা ঘটাতে গেলে আমার আইবির থেকেও তারা আগে খবর পায়।
আইবি খবর পায় কি করে? আকাশ থেকে তো খবর আসে না। পায় সেই সব লোকের থেকে। আর সেই সব লোকেরা ওর প্রিয়জন। যে অঘটনটা ঘটে গেছে, সেটা আপনি ভুলে যান। এ জীবনে আর কোনওদিন ওই ঘটনা ঘটবে না। এখন ওর চালচলনের ওপর নজর রাখার লোক প্রচুর।
প্রবীরবাবু? রাঘবনের গলার স্বরটা এই মুহূর্তে একটু চড়া মনে হল।
বলুন।
আপনাকে যদি কোন অপরাধীকে গ্রেপ্তার করার জন্য অনুরোধ করি, আপনি করতে পারবেন?
আপনি বললে আধঘণ্টার মধ্যে ব্যবস্থা করবো।
আকাটের মতো কথা বলিস না। একটু ভেবে বল। অনুপদা ঝাঁঝিয়ে উঠলো।
চারদিক নিস্তব্ধ। মনেহলো অনুপদা বেফাঁস কথা বলে ফেলেছে।
সরি প্রবীর, মনে কিছু করিস না। আমরা ঘরোয়া আলোচনা করছি। তাই এরকম আচরণ করে ফেললাম। আমাকে ক্ষমা করিস।
রাঘবন হাসছে।
আমি মনে কিছু করিনি। কেন তুই এ কথা বলছিস! প্রবীরদার গলা পেলাম।
এখুনি সুরোকে এ্যারেস্ট করতে বললে তুই করবি?
মিঃ রাঘবন এতটা অবিবেচক নন।
ওনার কথাগুলো ফলো আপ কর না। কেশটা অনিকে নিয়ে। তোর থেকেও ওনার ক্ষমতা অনেক বেশি। এ্যাকসন কিছু নেওয়ার হলে উনি নিতেন। এইভাবে আমাদের সবার সামনে ঘরোয়া আলোচনা করতেন না। এই সারার্থটুকু বুঝতে তোর এতো দেরি হচ্ছে কেন। আবেগ দিয়ে সব কাজ হয় না। অনি এত কাঁচা কাজ করবে এটা ভাবিস কি করে?
তারমানে তুই ভেতরের রহস্যটা জানিস।
জানতাম না। কানাঘুষ শুনেছিলাম। এই আলোচনা শুনে গেইজ করছি।
প্রবীর একটা কথা মাথায় রাখ। পার্টি ফান্ডের টাকার জন্য তুই ভিখারামকে যদি অনুরোধ করতিস ও তোকে এতো টাকা দিত? রূপায়ণদার গলা পেলাম।
আমরা ডোনেসন তুলি। একজন ব্যবসায়ীর কাছে কতোবার ঘোরার পর তারা পকেট থেকে টাকা বার করে। তাও যা চাই তার ফিফটি পার্সেন্ট দেয়। তখনই দেয়, যখন সে বোঝে আমাদের কাছ থেকে সে কিছু সাহায্য পাবে।
আর অনি চাইল হান্ড্রেড পার্সেন্ট, ভদ্রলোক এক ধাক্কায় এইটিথ্রি পার্সন্ট পর্যন্ত দিতে রাজি হয়ে গেল। তারমানে অনি ওনাকে কতটা বেঁধেছে বুঝতে পেরেছিস। কাজটা নিঃশব্দে হয়েছে। আমরা কেউ ধরতে পেরেছি। পারিনি। তুই তো মোটামুটি ঘটনাটা শুনলি। বুঝতে পারছিস পরবর্তীতে কি ঘটতে যাচ্ছে। পারবি অনিকে এ্যারেস্ট করতে।
সে কেন করবো?
সবাই হেসে ফেললো।
এই জায়গায় তুইও মরেছিস, মিঃ রাঘবনও আটকে আছে।
আজকের পার্টিতে ওর চলা ফেরা দেখেছিস। একবারে কুল। হেসে হেসে সবার সঙ্গে কথা বলেছে। বেশির ভাগ সময় অনিকা, অনিসা, পক্কে, ঘণ্টাকে এগিয়ে দিয়েছে। শুভ, অংশু, নম্রতা একবারের জন্যও সামনে আসেনি।
আমাদের ফোকাসটা অন্যদিকে চলে যাচ্ছে। অনিমেষদা বললো।
আমাদের শুনতে অসুবিধে কি আছে উনি কাকে এ্যারেস্ট করতে বলছেন। সুরো যদি সত্যি অপরাধ করে থাকে তাহলে তাকে এ্যারেস্ট করা হবে। আমার মেয়ে বলে সে তো আইনের ঊর্ধে নয়। অংশু, নম্রতা, শুভর ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার ঘটবে।
আপনি যুক্তির দিক থেকে একবারে সঠিক কথা বলেছেন অনিমেষবাবু। কিন্তু যুক্তি দিয়ে সব কিছুর ব্যাখ্যা আপনি করতে পারবেন না। অনেক সময় যুক্তি ভোঁতা হয়ে যায়। তাকে ছাপিয়ে মানবিকতার গ্রাউণ্ডস অনেক বেশি স্ট্রং এলিমেন্ট হয়ে দাঁড়ায়।
(আবার আগামীকাল)